ডাক্তারদের ভুয়া সার্টিফিকেট!

  ডা. সাঈদ এনাম ৩১ অক্টোবর ২০১৮, ১৮:৫৭ | অনলাইন সংস্করণ

চিকিৎসক

একটি সায়েন্টিফিক সেমিনারে প্রধান অতিথির পাশে বসে ফিস ফিস করে বললাম, স্যার এ রকম একটা ভুয়া সার্টিফিকেট আপনি দিতে পারলেন? দেশ নিয়ে এরকম জঘন্য মিথ্যাচার আপনি করতে পারলেন? আপনাকে তো স্যার আমরা আইডল মানতাম, আর আপনি কিনা...!

স্যার ফিসফিস করে ভ্রু কুঁচকে বললেন, কী বলছিস এসব?

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ স্যার। আমার কাছে সব প্রমাণ আছে, আপনার স্বাক্ষর ও সিল।’

স্যার একটু বিব্রতবোধ করে নড়েচড়ে বসলেন। তবে তিনি কনফিডেন্ট। তিনি বললেন, ‘তুই ভুল বলছিস, ভালো করে মিলিয়ে দেখিস’।

‘স্যার, দেখেছি। ফান করলাম।’

স্যার বললেন, কী বিষয়, খুলে বলিস তো, সেমিনার শেষে।

দুই.

রুমে বসে আছি, রোগীদের অনেক ভিড়। প্রায় সব হাসপাতালেই আরএমওদের রুমে রোগীদের উপচে পড়া ভিড় থাকে।

মাস দু'য়েকের জন্যে আমার ঘাড়ে সে দায়িত্ব আসে। সুতরাং হঠাৎ করেই বেড়ে যায় রোগীদের চাপ। এসময় অফিস সহায়ক এসে জানালেন, বিদেশি অ্যাম্বাসি থেকে দুজন অফিসার এসেছেন দেখা করতে।

তিনি টেবিলে তাদের ভিজিটিং কার্ড রাখলেন।

কার্ড হাতে নিয়ে দেখলাম একটি অ্যাম্বাসির লিঁয়াজো অফিসার।

একটু খটকা লাগলো, কী ব্যাপার! লিয়াঁজো অফিসার মফস্বলের এই হাসপাতালে 'আরএমও' র কাছে কেন?

আমি চারিদিকে রোগীদের ভিড়ের মধ্যেও কোনমতে বসতে দিলাম।

আমার চারপাশে রোগীদের ভিড় থাকায় তারা বললেন, আমরা বাইরে অপেক্ষা করি স্যার। আপনি বরং রোগী দেখা শেষ করুন।

আমি বেল টিপে অফিস সহায়ককে বললাম, উনাদের ইউএইচএফপিও মহোদয়ের রুমে নিয়ে বসাতে। চা নাস্তার আয়োজন করতে। আমি ওখানেই আসবো কথা বলবো।

আমি ইংরেজিতে বললাম, ‘কী ব্যাপার, বলুন কিভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?’

তিনি বাংলায় বললেন, আপনি বাংলায় বলতে পারেন, আমি বাংলাদেশি।

তারপর টুকটাক সৌজন্য আলাপ শেষে তিনি একটা কাগজ বের করে দিলেন আমার হাতে, আমরা এ সম্পর্কে জানতে এসেছি। কাগজটি একটি দেশের আদালতের সন্দেহ হওয়ায় ভেরিফিকেশন এর জন্যে পাঠানো হয়েছে।

কাগজটি হাতে নিয়ে পড়ার চেষ্টা করলাম। ইংরেজিতে একটা সার্টিফিকেট। অসংখ্য বানান ও গ্রামাটিক্যাল ভুল। নীচের স্বাক্ষর ও সিল দেখে চমকে গেলাম, আমার হাসপাতালের প্রাক্তন আর এম ও মহোদয়ের বছর তিনেক আগের লিখা।

আমি তারিখের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলাম, হ্যাঁ ঠিকই। ওই সময় স্যার এই হাসপাতালের 'আরএমও' ছিলেন। কিন্তু খটকা লাগলো, বানান ভুল, আর স্বাক্ষর দেখে। উনি এরকম যা তা ভুলভাল ফলস সার্টিফিকেট লেখার মতো চিকিৎসক না, এবং স্বাক্ষরটাও খটকা লাগলো, কারণ আমি উনার সচরাচর ব্যবহৃত স্বাক্ষর চিনি যেহেতু আমি উনার অধঃস্তন মেডিকেল অফিসার ছিলাম চাকরি জীবনের শুরুতেই।

......উক্ত আইডি নাম্বারের বর্ণিত ব্যক্তি কতিপয় বিরোধী রাজনৈতিক মতাবলম্বী দুস্কৃতি দ্বারা আক্রান্ত হন। তারা তাকে হত্যা করতে আঘাত করে। তার ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। মারাত্মক আহত হয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি থাকেন, চিকিৎসা নেন, এবং সৌভাগ্যবশতঃ তিনি বেঁচে যান।

তিনি দেশে ফিরলে তার জীবন সংকাটাপন্ন হবে। তিনি হত্যাকাণ্ডের স্বীকার হবেন। দেশে চলছে নৈরাজ্য। দেশ এখন....

ইত্যাদি ইত্যাদি, বাংলাদেশ সম্পর্কে নানান কুৎসিত কথাবার্তাও কাগজটিতে লেখা ছিলো শেষ দুলাইনে।

বক্তব্যের সারসংক্ষেপ পড়ে আমার ভীষণ খারাপ লাগলো। অবাক হলাম। রীতিমত ঘেমে গেলাম।

বিদেশে সামান্য আশ্রয়ের জন্যে এভাবে কি কেউ নিজের দেশ সম্পর্কে বিদেশীদের কাছে নালিশ করে? ছি ছি ছি নিজের দেশকে নিজের দেশমাতাকে নিয়ে কেউ কি এমন কুৎসিত, জঘন্য, ঘৃণ্য কথাবার্তা বলতে পারে?

বললাম, আই থিংক ইট টোটালি ফলস।

লিয়াঁজো অফিসার বললেন, আপনি কি একটু নাম, ইমার্জেন্সি রেজিস্ট্রেশন নাম্বার, ইনডোর, বেড আই ডি সব মিলিয়ে দেখবেন?।

আমি বললাম, শিওর।

আমি রেজিস্টার খাতা আউটডোর ইনডোর সব উনাদের সামনেই চেক করলাম। আমি ছিলাম কনফিডেন্ট। সব দেখে বললাম, দেখুন এই নামে কোন রোগীই আসেনি ওইদিন, এমনকি এই মাসেও এ নামে কোন রোগী আসেনি।

তারা বললেন, তাহলে কি ডাক্তার সাহেব ভায়াস্ট হয়ে মনগড়া কিছু একটা করলেন? যেহেতু ওই সময়ে ওই ডাক্তার এখানে পোস্টিং ছিলেন।

আমি বললাম, না। কখনই এটা হতে পারে না। আমি ওই ডাক্তার সম্পর্কে জানি। খুবই ভালো মানুষ। তিনি খুবই সৎ। তাছাড়া স্বাক্ষরটাও তার না। একটা জাল সিল বানিয়ে, জাল স্বাক্ষর করে দিয়ে এটা করা হয়েছে। শুনেছি দেশ বিদেশের কিছু দালাল, এজেন্টরা ক্লায়েন্টদের 'পলিটিকাল এসাইলাম' বানাতে এসব করে।

তারা বললেন, আসলে এটা দেখে আমাদেরও সন্দেহ হয়েছে। একজন ডাক্তার এরকম ভুলে ভরা সার্টিফিকেট দিতে পারেন না।

তারা আমার কাছে এ বিষয়ে ডকুমেন্টসহ একটা সার্টিফিকেট চাইলেন।

আমি বললাম, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কোন অনুমতি ছাড়া হাসপাতালের কোন ডকুমেন্ট সরবরাহ করা হয় না। তাছাড়া আপনারা নিজেরাই তো দেখলেন।

তারা বললেন, ওকে, তাহলে আপনার কি মতামত? বিষয়টি কি হতে পারে?।

আমি বললাম, এটা বাহিরে থেকে ওই ডাক্তারের নাম ব্যবহার করে কাউকে দিয়ে বানানো হয়েছে। তাছাড়া ওই ডাক্তার যদি লিখতেনও তাহলে এতো বানান ভুল আর ডিজিজ রিলেটেড বা ইনজুরি রিলেটেড মেডিকেল টার্মগুলোতে এতো ভুল হতো না। মেডিকেল সার্টিফিকেট লেখারও একটা নিয়ম আছে।

তারা আমার কথায় বিশ্বাস করলেন। আমি তারপরও বললাম, প্রয়োজনে আপনারা ওই ডাক্তার সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। দেখা করে নিশ্চিত হতে পারেন। তিনি যদিওবা বদলি হয়েছেন, তবে এ শহরেই তার বাস এবং এখানে তার চেম্বার আছে।

তারা বললেন, না থাক, লাগবেনা। আপনি অনেক সময় দিয়েছেন। উই ট্রাস্ট ইউ। ভালো হয় আমাদের এ ব্যপারে আপনার দুটো মতামত লিখে দেন। আর আমরা সময় পেলে সার্টিফিকেট ধারি ব্যক্তিটির ঠিকানায় ও যাবো। বিষয়টি তিনি মোটেও ঠিক করলেন না।

আমি বললাম, হ্যাঁ সেটা করলে তো আরো ভালো হয়, নিজেরা সব সরেজমিন দেখে আসলেন।

এমন সময় সাইরেন বাজিয়ে হঠাৎ আমাদের সিভিল সার্জন মহোদয় হাসপাতালে উপস্থিত।

স্যার প্রায়ই হেলথ কমপ্লেক্স ভিজিট করেন। আমি তাদের বসিয়ে রেখে সার্টিফিকেটের একটা ডুপ্লিকেট কপি পকেটে পুরে স্যারকে এটেন্ড করতে গেলাম। সিভিল সার্জন স্যারকে যখন গাড়িতে তুলে দিচ্ছি তখন ভাবলাম বিষয়টি স্যারের সঙ্গে চট করে শেয়ার করি ফেলি।

স্যার সব শুনে বললেন, আর ইউ কনফার্ম, ইটস টোটালি ফলস?

আমি বললাম, হান্ড্রেড পার্সেন্ট।

স্যার বললেন, দেখিতো সার্টিফিকেট।

আমি দেখালাম। স্যার চমকে উঠে বললেন, মাই গড, আমিতো চিনি এই 'আর এম ও' কে। এতো আমার বন্ধুপ্রতীম। সে এরকম লিখতেই পারে না। ইউ আর এবসোলিউটলি রাইট।

স্যারকে বিদায় দিয়ে আমি, লিয়াঁজো অফিসার ও তার সহকারীর খানিক সময় এ সব জাল সার্টিফিকেট নিয়ে কথা বললাম। পরে দুলাইন লিখে দিলাম মতামত।

তিন.

সেমিনার শেষে স্যারের পাশে বসে খেতে খেতে পুরোনো গল্পটি পাড়লাম। স্যার বললেন, চোর বাটপাররা পারেও! সার্টিফিকেটটার একটা ফটোকপি দিও। স্মৃতি হিসেবে রাখবো এলবামে ।

প্রতিকূল পরিবেশে আপনি আক্রোশ বা আক্রান্তের শিকার হতে পারেন, জীবন বিপন্ন হতে পারে বা জীবন-জীবিকার সন্ধানে আপনি বিদেশ যেতে পারেন সেখানে থাকার আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন, এসব অবাস্তব কিছু নয়। এমনকি জাল একটা সার্টিফিকেট বানাতে পারেন, সেটা অবাস্তব কিছু নয়। কিন্তু পুরো দেশের প্রতি ঘৃণ্য জঘন্য মিথ্যাচার আপনি কেন করবেন? নিজের মামুলী সার্থের জন্যে দেশের বদনাম করে ষোলো কোটি মানুষের জীবনকে কেন বিপন্ন করবেন? দেশপ্রেম তো ঈমানের অঙ্গ।

দেশের জন্যে যারা জীবন দেন তাদেরকে ধর্মে শহীদের মর্যাদা দান করা হয়েছে। নিজের সার্থ হাসিলের জন্যে দেশের ক্ষতি না করলে কি নয়? আসুন সবাই দেশের স্বার্থে সচেতন হই।

লেখক: ডা.সাঈদ এনাম, সাইকিয়াট্রিস্ট, মেম্বার, ইউরোপিয়ান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন।

ঘটনাপ্রবাহ : ডা. সাঈদ এনামের লেখা

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×