যে রোগে বিড়াল ভীতি তৈরি হয়

  ডা. মো. সাঈদ এনাম, সাইকিয়াট্রিস্ট ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ২২:০৩ | অনলাইন সংস্করণ

বিড়াল

মি. রহমান এসেছেন তার সদ্য বিবাহিতা পুত্রবধূকে নিয়ে। সমস্যাটা বেশ জটিল আকার ধারণ করেছে। বিয়ের দিন পর্যন্ত সবই ঠিকঠাক ছিলো। বাসর রাতের পরদিন সকাল থেকেই ঘটনার সূত্রপাত।

সকালে সবাই বসেছেন নাস্তার টেবিলে, অমনি নববধূ ‘ওমাগো বিড়াল’ বলে চিৎকার দিয়ে দিলেন এক লাফ। ডাইনিং টেবিল উল্টে গিয়ে গরম তরকারি শাশুড়ির আর জ্যা'দের গায়ে পড়ে লঙ্কাকাণ্ড। তারপর থেকে নববধূর সঙ্গে শাশুড়ি আর জ্যা'য়েদের মুখ চাওয়া চাওয়ি কথাবার্তা সব বন্ধ। আজ সাত দিনে গড়ালো সব।

ননদ সামিয়া আর তার বর হাবিব অত্যন্ত নিতান্ত অমায়িক, ভালো। বিষয়টি তারা বেশ হালকাভাবেই নিয়েছেন এবং সবাইকে বুঝিয়ে এক টেবিলে বসানোর যথেষ্ট চেষ্টা তদবির করেছেন। হাবিব পেশায় ইঞ্জিনিয়ার তিনিই মোটামুটি এ বাড়ির দ্বিতীয় অভিভাবক। বেজায় রসিক মানুষ। তিনি প্রথমেই এক হাত নিলেন তার স্নেহের শ্যালককে।

শ্যালক তুমিই যত নষ্টার মূল। কথায় আছে, ‘বাসর রাতে বধিবে বিড়াল’।

নিশ্চয়ই তুমি নববধূকে বাগে আনতে রাতে বিড়াল মারা জাতীয় কিছু করেছো। যেটা ছিলো নৃশংস। তাই ভয়ে বেচারির এই অবস্থা এখন । বিড়াল দেখলেই বা বিড়ালের ডাক শুনলেই বেচারি ‘ওমা গো বিড়াল’ বলেই মূর্ছা যায়।

বাড়ির একমাত্র দুলাভাইয়ের এমন কথাতে রস থাকলেও অযৌক্তিক নয়। কিন্তু ননদ শাশুড়ি কেউই সেটা পাত্তা দিচ্ছেন না। তাদের কথা-‘এ মেয়ে এ সংসারে থাকতে চায় না। তাই প্রথম দিনেই সবার হাত পা পুড়িয়ে এখন দোষ দিচ্ছে তাদের পোষা বিড়ালের ওপর। তার নাকি বিড়ালভীতি আছে। এ বাড়িতে হয় বিড়াল থাকবে না হয় সে থাকবে। কী স্পর্ধা বড়লোকের মেয়ের। সে নাকি বিড়ালের সঙ্গে থাকবেন না’।

বিড়াল ভীতি নিয়ে এ সাতদিনে দু’পরিবারের সম্পর্কে ফাটল দেখা দিয়েছে।

দুই.

মি. রহমান সাহেবের কাছে চেম্বারে নববধূ নিয়ে আসার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস শুনে বিষয়টা আমার কাছে খুবই ইন্টারেস্টিং লাগলো। রহমান সাহেবকে বাইরে পাঠিয়ে আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বিষয়টা খুলে বলুনতো’।

বেচারি কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো, ‘স্যার সত্যিই আমার বিড়ালে অসম্ভব ভয়। বিড়াল দেখলেই আমার গলা শুকিয়ে যায়, হাত পা কাঁপতে থাকে। অজ্ঞানের মতো অবস্থা হয়। সেটা ছোটবেলা থেকেই। সেজন্যে আমাদের বাসার চৌহদ্দিতে বিড়াল ছিল না। আমার বাবা যদিওও বলতেন, ‘মা বিড়াল অতি পোষা নিরীহ প্রাণী’, কিন্তু স্যার তাতেও আমার বিড়াল ভীতি লেগেই ছিল। স্কুল-কলেজে যেতে রাস্তায় বিড়াল দেখলে সেদিন আমি স্কুলে যেতাম না’।

‘সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে ক্যানো?, আমি হেসে জিজ্ঞেস করলাম।

সে বললো, গত তিন-চারদিন থেকে সে ইন্টারনেট ইউটিউব দেখে দেখে কোথায় যেনো পেয়েছে, কিছু কিছু মানুষের এরকম বিড়াল ভীতি থাকতে পারে। এটা এক রকমের মানসিক রোগ। তাই তিনি শ্বশুরকে নিয়ে এসেছেন।

তার শ্বশুর মি. রহমান একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ। অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ কর্মকতা। শ্বশুরকে খুলে বলায় তিনি সানন্দে রাজী হলেন। তবে কিছুটা গোপন রাখতে বললেন। তাই সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে আসাটা কেবল তিনি আর তার শ্বশুরই জানেন। এর একমাত্র কারণ সাইকয়াট্রিক কাউন্সেলিং নিতে এখনো আমাদের দেশে কিছুটা সংকোচ বা লজ্জাবোধ রয়ে গেছে। বিষয়টি শিক্ষিতজনের জন্যে হাস্যকর তথাপি দুজনকেই ধন্যবাদ দিলাম। তারা কিছুটা বুঝতে পেরেছেন, সমস্যা আসলে কোন জায়গায়।

অনেক সময় আমরা আমাদের সমস্যা ঠিক কোন জায়গায় সেটাই বুঝতে পারি না, তাই সমাধানে তালগোল পাকিয়ে ফেলি।

তিন.

পোকামাকড়, তেলাপোকা, জোঁক, সাপ,, শামুক, মাকড়শা ইত্যাদিতে অনেকের ভয় থাকতে পারে। এ ভয় অনেক সময় মারাত্মক রূপ নেয়। ভয় বা ফোবিয়া যখন আপনার দৈনন্দিন জীবনকে বাধাগ্রস্ত করবে তখনই সেটা কে বলা হয় মানসিক রোগ। শুধুমাত্র বিড়াল ভীতি থাকার কারনে এখানে নববধূর সঙ্গে তার পরিবারের সম্পর্কের অবনতি ঘটে যাচ্ছে এমন বিচ্ছেদের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। হয়তো তারা উচ্চ শিক্ষিত, তাই তারা বিষয়টি ধরতে পেরেছেন।

এসব ভয়ভীতিকে অনেকে অনেক সময় 'বাতাস লাগা', 'উপরি ধরা' ইত্যাদি মনে করে অপচিকিৎসার শিকার হয়ে সর্বস্ব হারান।

এমনকি সাইকিয়াট্রিক ইভাল্যুয়েশন না হয়েই অনেক ক্ষেত্রে ডিভোর্স হয়ে যায়। ভুক্তভোগীরা না পারেন সইতে, না পারেন কইতে। অথচ কিছু কিছু মানসিক রোগ রয়েছে যা কেবলমাত্র সাইকোথেরাপি দিলেই সমাধান হয়। তেমন ঔষধ পত্র লাগে না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, 'সন্দেহবাতিক' রোগ যাকে 'অথেলা সিনড্রোম' বলা হয়। এই "সন্দেহবাতিক" বা 'অথেলো সিনড্রোম' রোগের জন্যে অনেক পরিবারে নেমে আসে অশান্তির আগুনে। এমনকি ডিভোর্সও হয়ে যায়।

বিড়াল ভীতিকে বলা হয় এইলোরো ফোবিয়া। এটি এক ধরনের মানসিক রোগ। এ রোগে আক্রান্ত রোগী বিড়াল দেখলেই মারাত্মক প্যানিক হয়ে যান। দৌড়ে পালাতে গিয়ে লংকা কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেন। এমনকি বিড়ালের ডাক শুনলেই তার মাঝে প্যানিক ডিসওর্ডারের কিছু লক্ষণ দেখা দেয়।

একমাত্র সাইকিয়াট্রিক কাউন্সেলিং, কগনেটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি এবং মামুলী কিছু রিলাক্সেন দিলে এ রোগ বা এরকম স্পেসিফিক কোন প্রাণী বা অবজেক্টে ফোরিয়াটা চলে যায়।

পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত লোকের মধ্যে এইলোরো ফোভিয়া ছিলো তাদের মধ্যে বিশ্বজয়ী আলেকজান্ডার, নেপোলিয়ন বোনাপার্ট, জার্মান চ্যান্সেলর এডলফ হিটলার, ইতালীয় সর্বাধিনায়ক মুসোলিনি।

লেখক: ডা. মো. সাঈদ এনাম, সাইকিয়াট্রিস্ট,

মেম্বার, আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন

মেম্বার, ইউরোপিয়ান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন

লাইফ মেম্বার, বাংলাদেশ সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন।

ঘটনাপ্রবাহ : ডা. সাঈদ এনামের লেখা

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×