উন্নত দেশের স্বাস্থ্যবীমা ও বাংলাদেশের চিকিৎসকদের দুর্দশা

  ডা. তারাকী হাসান মেহেদী ০৩ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:১৪ | অনলাইন সংস্করণ

ডা. তারাকী হাসান মেহেদী
ডা. তারাকী হাসান মেহেদী

ইউরোপের সেনজেন ভিসার জন্য যখন আবেদন করলাম, তা ফ্রিতে পেলাম। মিশনে কাজ করার সুবাদে ভিসা ফি হিসেবে ৬০ ইউরো দিতে হল না। তবে ভিসা ফ্রি হলেও টাকা খরচ করে স্বাস্থ্য বীমা করতে হয়। স্বাস্থ্য বীমা করার উদ্দেশ্য হল যে, ইউরোপে গিয়ে অসুস্থ হলে যাতে চিকিৎসাসেবা পেতে পারে, যার ব্যয় বীমা কোম্পানি বহন করবে।

বিদেশে বিশেষ করে উন্নত বিশ্বে চিকিৎসা যে কতটা দুস্প্রাপ্য ও ব্যয়বহুল তা যারা থাকে তারাই জানে। যার ফলে সেখানে স্বাস্থ্য বীমা সিস্টেম চালু আছে।

এ কারণে উন্নত বিশ্বে ডাক্তারদের আলাদা মর্যাদা দিয়ে দেখা হয়। দেশের ভেতর নিজেকে ডাক্তার হিসেবে কিছু মনে না হলেও বিদেশে এসে এর গুরুত্ব বেশ ভালোই উপলব্ধি করতে পারি।

চীনে যখন গেলাম, কথা প্রসঙ্গে নিজের পরিচয় দিলাম ইসেং (ডাক্তার)। সঙ্গে সঙ্গে চাইনিজ আর আধা ইংরেজিতে বলল, কাম ফার্স্ট, কাম ফার্স্ট।

এখন জাতিসংঘের অধীনে কাজ করায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশের মানুষের সাথে পরিচয় হয়। এ পর্যন্ত জাতিসংঘের যে অফিসেই গিয়েছি, হাতের রেডক্রস আর ডাক্তার পরিচয় শুনে সবাই বেশ অন্য দৃষ্টিতে দেখেছে। যখন দেখে যে ডাক্তার হয়েও তাদের সঙ্গে হাসিখুশিভাবে মিশছি, কথা বলছি, তারা অবাক হয়।

তারা নিজেরাই বলে, তাদের দেশে ডাক্তারদের নাগালই পাওয়া যায় না। কয়েকদিন আগে থেকে এপয়েন্টমেন্ট নিতে হয় জরুরি প্রয়োজন ছাড়া। এরপর নির্দিষ্ট দিনে আগে প্যারামেডিকস দেখবে, তারপর ডাক্তারের রুমে ঢুকার সুযোগ। অনেক সময় এপয়েন্টমেন্ট পেতে এমন দেরি হয় যে রোগ এমনি ভাল হয়ে যায় ততদিনে।

প্রেসক্রিপশন ছাড়া কোন ওষুধ পাওয়া যায় না (কিছু ওভার দ্য কাউন্টার ওষুধ ছাড়া, যেমন প্যারাসিটামল ইত্যাদি)। পাতলা পায়খানা হয়েছে, সিপ্রো ফ্ল্যাজিল দেন- এই বলে দোকানে গিয়ে ইচ্ছেমত ওষুধ কেনারও সুযোগ নেই।

এতক্ষণ যে কথাগুলো বললাম, তা বলার কারণ আছে।

প্রত্যেক বছর শেষে বাংলাদেশের সরকারি চাকরিজীবীদের এসিআর নামক একটি ফরম জমা দিতে হয়। সরকারি চাকরীজীবিদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনকে সংক্ষেপে এসিআর বলা হয়।

এক ক্যালেন্ডার বছরে তার সার্ভিসের পারফরমেন্স কেমন হয়েছে, তা অনুযায়ী তার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ একশের ভেতরে মার্কস প্রদান করেন। এই মার্কস পদোন্নতির সময় দেখা হয়।

এই এসিআর ফরমের একটা পার্ট আছে মেডিকেল রিপোর্ট। সরকারি চাকরিজীবী শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ আছেন কি না, তা পরীক্ষা করে একজন রেজিস্টার্ড ডাক্তার মন্তব্য লিখে স্বাক্ষর করেন।

ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড পদে চাকরি করেন মতিউর রহমান নামের একজন কর্মকর্তা। আমাশয় হলেও যেখানে মানুষ নিজে দোকানে গিয়ে ওষুধ নিয়ে আসে, উক্ত এসিল্যান্ড গতকাল তার এসিআরের মতো মহা গুরুত্বপূর্ণ কাগজ পিয়নের মাধ্যমে উপজেলা হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই মেডিকেল ফিটের প্রত্যায়ন নিতে। তাছাড়া সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে এটা বিধিবহির্ভূত কর্মকাণ্ড।

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা তাকে ভদ্র ভাষায় কষ্ট করে হাসপাতালে আসতে বলেন। উক্ত এসিল্যান্ড তাকে হাসপাতালে আসতে বলায় ক্ষিপ্ত হন।

এরপর হাসপাতালে আসলে মেপে দেখা যায় তার উচ্চরক্তচাপ। তাই ইসিজি করতে বলায় তিনি আরো উত্তপ্ত হয়ে যান। এরপর তার নাজিরের মাধ্যমে ৮-১০ জন বহিরাগত যুবকদের ডেকে এনে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের ওপর হামলা চালায়, হাসপাতাল ভাংচুর করে।

আসলে, আমাদের দেশে সবাই মুফতে বা সহজেই চিকিৎসাসেবা পাওয়ায় ডাক্তারদের গুরুত্ব কেউ দিতে চায় না। উন্নত দেশের মত স্বাস্থ্য বীমা সিস্টেম চালু করলে ও বিনা প্রেসক্রিপশনে ওষুধ বিক্রি বন্ধের সিস্টেম এদেশে থাকলে সবাই বুঝত একজন ডাক্তারের মূল্য কতটুকু।

ঠিকভাবে মেডিকেল রিপোর্ট যদি দেওয়া হয়, অনেককেই পাওয়া যাবে যারা চাকুরীর জন্য ফিট নয়। এইজন্য মেডিকেল রিপোর্ট দেওয়ার সময় ডাক্তাররা অনেক কিছুই ওভারলুক করেন। এটা একদম ওপেন সিক্রেট।

এরপরেও যদি ডাক্তারদের এই ভদ্রতাকে দুর্বলতা মেনে নিজের ইচ্ছেমত রূঢ় আচরণ করে, আক্রমণ করে, হাসপাতাল ভাংচুর করে, তাহলে এটা শুধু দুঃখজনক নয়, বরং যে পদে থেকে তিনি এটা করেছেন, সেই পদের জন্য কলংকজনকও।

ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলায় এসিল্যান্ড মতিউর রহমানের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি, যাতে তার কারণে প্রশাসনের অন্যদের প্রতি জনগনের নেতিবাচক মনোভাব তৈরি না হয়, প্রশাসনের প্রতি আস্থা নষ্ট না হয়।

লেখক: ডা. তারাকী হাসান মেহেদী, মেডিকেল অফিসার বিসিএস (স্বাস্থ্য)

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×