তা হলে পারিবারিক চিকিৎসক কারা?

  যুগান্তর ডেস্ক ১৯ মে ২০১৯, ০০:১৮ | অনলাইন সংস্করণ

চিকিৎসক

প্রতিবছর বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে পারিবারিক চিকিৎসক দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে পালিত হয়। আমাদের দেশে পারিবারিক চিকিৎসক ধারণাটি সুস্পষ্ট না থাকায় দিবসটি অনেকটা নিরবেই চলে যায়।

বিশ্ব পারিবারিক চিকিৎসক সংস্থা (World organization of family doctors-WONCA) ২০১০ সালের ১৯ মে প্রতিবছর বিশ্ব পারিবারিক দিবস পালনের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তার প্রত্যেকটি সদস্য এবং অনুগত সংস্থাসমূহকে পালনের আহ্বান জানায়। পরবর্তীতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দিবসটি স্বীকৃতি দিয়ে তাদের সব অঞ্চলসহ সদস্য সংস্থাসমূহকে পালনের আহ্বান জানায়।

দিবসটি পালনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে পারিবারিক চিকিৎসকদের অবদান, তাদের গুরুত্ব, সর্বোপরি সারাবিশ্বের পারিবারিক চিকিৎসকদের জন্য এটি যোগসূত্র তৈরির প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে। দিবসটি পালনের ক্ষেত্রে প্রতিবছর একটি বিষয়বস্তু নির্ধারিত হয়। এই বৎসরের বিষয়বস্তু হলো “Family doctor: caring for you for the whole of your life” অর্থাৎ আপনার পারিবারিক চিকিৎসক আপনার স্বাস্থের যত্ন নেবেন এবং তা সারাজীবনের জন্য। এ বিষয়বস্তুর মধ্যে পারিবারিক চিকিৎসকের মূল কাজটি নিহিত আছে।

তা হলে পারিবারিক চিকিৎসক কারা? আমরা যদি আমাদের স্বাস্থ্যসেবার পেছনের দিকে যাই-সেখানে লক্ষ্য করবো একটা সময় ছিল যখন পারিবারের সব সদস্য স্থানীয় একজন ডাক্তারের কাছে তাদের সব অসুখ বিসুখের চিকিৎসার জন্য যেতেন। তারা পারিবারিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্মানীয় অবস্থানে থাকতেন। এ অবস্থা সারাবিশ্বেই চলমান ছিল। কিন্তু একটা সময়ে যখন স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের পরিধি বাড়তে থাকলো এবং মেডিক্যাল প্রযুক্তি জ্ঞানও উন্নত হতে থাকলো-তখন ওই চিকিৎসকরা বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংকট মোকাবেলায় আরো জ্ঞান আরোহনের প্রয়োজন বোধ করলেন। ফলশ্রুতিতে স্বাস্থ্যসেবা সুনির্দিষ্টভাবে আলাদা হওয়া শুরু হলো। বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষত্বের সংখ্যা বাড়তে লাগলো। প্রাথমিক অবস্থায় রোগীরা উৎসাহিত হলো তারা তাদের নির্দিষ্ট রোগে উচ্চ প্রশিক্ষিত চিকিৎসক পেয়ে আবার চিকিৎসকরাও খুশী হলেন সুনির্দিষ্ট বিষয়ে গভীর জ্ঞান আরোহণ করে চিকিৎসা প্রদান করতে পেরে। কিন্তু অচিরেই রোগিরা দেখতে পেলেন তাদের সেই পুরনো ভালো বন্ধু চিকিৎসকটি আস্তে আস্তে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ক্ষেত্র থেকে অদৃশ্য হতে থাকলো।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা আরো ভাগ হয়ে হয়ে শরীরের সুক্ষ্মতিসুক্ষ্ম অঙ্গের চিকিৎসক হতে থাকলো। আর তাদের বন্ধু চিকিৎসক এর জায়গা দখল করতে থাকলো বিকল্প চিকিৎসক, হাতুড়ে চিকিৎসক বা অস্থায়ী পারিবারিক চিকিৎসক যারা এ বিষয়ে যথেষ্ট উৎসর্গকৃত নয় এবং সবসময় কোনো বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়ার দৌড়ে নিয়োজিত থাকেন। তখন জনগণ আস্তে আস্তে তাদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের এই ভাগাভাগির বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ হতে থাকলো। চিকিৎসক রোগী সম্পর্ক অবনতি হতে থাকলো।

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর এ সংকট আরো ঘণীভূত হলো। তখন এই সংকট থেকে উত্তোরণের জন্য সনাতন এই পারিবারিক চিকিৎসকদেরকে আরো প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যুগোপযোগীভাবে তৈরি করে তাদেরও বিশেষজ্ঞ করার ব্যাপারে পরিকল্পনা গৃহীত হলো। যা সুনির্দিষ্ট পাঠক্রম ও প্রশিক্ষণ পদ্ধতি তৈরির মাধ্যমে বিষয় নির্ধারিত হয়- ফ্যামিলি মেডিসিন, যেখানে সার্বিক সন্ধান্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থা বিধৃত থাকবে। তাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেন প্রফেসর আর. ম্যাক উইনী-যাকে ধ্রুপদী পারিবারিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক বলা হয়।

১৯৬৯ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকায় প্রথম ফ্যামিলী মেডিসিনকে অন্যান্য বিষয়ের মতো স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞ বিষয়ের মর্যাদা দেয়া হয়। তার পর পরই কানাডাতে তা চালু হয়। এরপর দ্রুত অন্যান্য দেশে ফ্যামিলি মেডিসিনকে তাদের মেডিক্যাল পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত করে মেডিক্যাল কলেজগুলোতে আলাদা বিভাগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পারিবারিক চিকিৎসক তৈরি করতে থাকে। ফ্যামিলি মেডিসিন আরো আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে আসে ১৯৭৮ সালে, যখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-সবার জন্য স্বাস্থ্য কর্মসূচী চালু করে। যেখানে লক্ষ্য পূরণের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে পারিবারিক চিকিৎসকের মাধ্যমে শক্তিশালী করতে বলা হয়। পৃথিবীর সব দেশ পর্যায়ক্রমে-ফ্যামিলি মেডিসিনের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে তাদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদান পদ্ধতি ঢেলে সাজিয়েছেন। যেখানে জরুরি অবস্থা ছাড়া সব রোগিকে স্থানীয় পারিবারিক চিকিৎসকের নিকট প্রথমে যেতে হয়। সেখানে পরিবারের সব সদস্য শিশু থেকে বৃদ্ধ, মহিলা-পুরুষসহ নির্বিশেষে সবাই সব ধরনের রোগ নিয়ে রিপোর্ট করতে পারবে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রশিক্ষিত পারিবারিক চিকিৎসক প্রায় ৮০% রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা স্বাধীনভাবে দিতে পারেন। বাকিদের প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা হাসপাতালে পাঠান। পরবর্তীতে সেই রোগিকে বিশেষজ্ঞ নির্দিষ্ট চিকিৎসা শেষে সেই পারিবারিক চিকিৎসকের নিকট ফেরত পাঠান-পারিবারিক চিকিৎসার মাধ্যমে রোগির চিকিৎসার তদারকির জন্য। এভাবে পারিবারিক চিকিৎসক হন-তাদের সব চিকিৎসা সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু। যেখানে পারিবারিক চিকিৎসক হয়ে উঠেন একটি পারিবারের সব ধরনের চিকিৎসা পরামর্শক ও বন্ধু।

বিশ্বের প্রেক্ষাপটে আমাদের অবস্থান কোথায়? আমাদের স্বাস্থ্যখাতে অনেক অর্জন আছে। শিশুমৃত্যু হার, মাতৃমৃত্যু হার কমানো ছাড়াও যক্ষা, ম্যালেরিয়া, HIV সংক্রমণ অত্যন্ত সফলভাবে সীমিত করতে পেরেছি। কিন্তু পারিবারিক চিকিৎসক তৈরির মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাসহ, দীর্ঘমেয়াদি রোগ, মানসিক রোগ ও অন্যান্য স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের প্রক্রিয়া সুচারুরূপে শুরু করতে পারিনি। যার জন্য দরকার সাধারণ জনগনের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করাসহ সুষ্ঠু রেফারাল পদ্ধতি সৃষ্টি করা।

এ প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট পরিমাণ পারিবারিক চিকিৎসক স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য করা, প্রেসক্রিপসন ছাড়া কোনো (ওটিসি ব্যতীত) মেডিসিন বিক্রি না করা, প্রেসক্রিপসন কারা করতে পারবে তা সুনির্দিষ্ট করে দেয়াসহ ফার্মেসি, ল্যাবরেটরি ও ক্লিনিক নির্ধারিত নীতিমালা মেনে স্থাপন করার কঠোর আইন করাসহ বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। সুষ্ঠু রেফারাফ পদ্ধতি চালু করতে পারলে যেমন বিশেষজ্ঞ চেম্বারে অতিরিক্ত রোগির বোঝা কমবে তেমনই হাসপাতালে অতিরিক্ত ভর্তি রোগির সংখ্যাও কমে যাবে। চিকিৎসক রোগি সম্পর্ক উন্নতির মাধ্যমে বর্তমানে চলমান আস্থাহীনতা ও বিদেশমুখিতা ফিরিয়ে আনাও সম্ভব হবে।

লেখক: ডা. লে. কর্নেল মো. কবীর আহমেদ খান (অব:)

কনসালটেন্ট ফ্যামিলী ফিজিসিয়ান, প্রাভা হেলথ।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×