ডেঙ্গু নিয়ে যা কেউ বলেনি

  মুজতাবা তামীম আল মাহদী ২৫ আগস্ট ২০১৯, ১৭:২৪ | অনলাইন সংস্করণ

এসিড মশা
ফাইল ছবি

ডেঙ্গু নিয়ে এখন খুব আতঙ্কের মধ্যে দিনকাল কাটছে। এর মধ্যেই কিছু অদ্ভুত চিন্তা আর প্রশ্ন জেঁকে বসলো মাথায়। নিজে নিজে খুঁজে বের করলাম উত্তরও। আপনিও জেনে দেখুন। অবাক না হয়ে পারবেন না।

ছোটবেলায় পড়েছিলাম অনেক ধরনের মশার কথা। এনোফিলিস, কিউলেক্স আর এডিস মশা। প্রত্যেকটা ভিন্ন ভিন্ন রোগ সৃষ্টি করে। এই ভিন্নতার কারণ কি? যেহেতু এখন ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশি, তাই আমার জানতে ইচ্ছা হলো- ডেঙ্গু ভাইরাস কেন এডিস মশাই বহন করে?

উত্তর পেলাম, মানুষের জন্য ক্ষতিকর কোনো জীবাণু বহন করতে মশাদের কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতে হয়। যেমন,

১. তাকে মানুষের রক্ত খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

২. মানুষের বাসস্থানের জায়গায় ঘনবসতি স্থাপন করতে হবে।

অনেকগুলো মশা-ই এই বৈশিষ্ট্যগুলো পূরণ করে। কিন্তু তৃতীয় আরেকটি বিষয় আছে।

৩. মশার দেহ অবশ্যই সেই জীবাণুকে তার দেহে বসবাসের জন্য অনুমতি দিতে হয়। এবং লালায় জীবাণুটা সংক্রমিত হতে হয়।

এডিস মশার সবগুলো প্রজাতির মধ্যে Ae. aegypti এ ক্রাইটেরিয়াগুলো ভালোভাবে পূরণ করে। তাই ডেঙ্গু ভাইরাসের সর্বোত্তম বাহক হচ্ছে এডিস মশার এই প্রজাতিটি।

Ae. aegypti যে শুধু মানুষকেই কামড়ায় তা না, এটা কুকুর, বিড়াল সহ অন্যান্য সব গৃহপালিত প্রাণীকেই কামড়ায়। তাহলে কী সবারই ডেঙ্গু হতে পারে?

মালয়েশিয়াভিত্তিক একটি গবেষণায় পাওয়া গেছে, গৃহপালিত প্রাণীরাও ডেঙ্গু ভাইরাসের পোষক হতে পারে।

একটা মজার ব্যাপার আমরা সবাই জানি যে শুধুমাত্র স্ত্রী মশা কিন্তু রক্ত খায়। পুরুষ মশার রক্তের প্রয়োজন হয়না। কখনো কি ভেবেছেন এটা কেনো?

স্ত্রী মশা রক্তকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করেনা। মশার খাদ্য হচ্ছে চিনি বা কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য। যা সে ফুলের মধু থেকে সহজেই পেয়ে যায়।

কিন্তু যখন মশার ডিম পাড়ার সময় হয়, তখন তার প্রোটিন এবং লিপিডেরও প্রয়োজন হয়। সেই প্রয়োজন মেটাতে স্ত্রী মশা রক্ত গ্রহণ করে। কিন্তু পুরুষ মশার এরুপ প্রয়োজন পড়েনা বলে সে রক্ত গ্রহণ করেনা।

অনেককেই দেখলাম মশা মেরে ফেসবুকে তার ছবি দিচ্ছেন। ডেঙ্গু আতঙ্কের কবলে পড়ে এতে মারা যাচ্ছে অনেক নিরীহ মশাও। ডেঙ্গু মশা ভেবে যার ছবি ফেবুতে দিচ্ছেন, সে কি আসলেই ডেঙ্গু ভাইরাস বহনকারী এডিস মশা? এডিস মশা দেখতে কেমন হয়?

একদম সহজ ভাষায় বললে, এডিস মশার পায়ে সাদা কালো ডোরাকাটা দাগ থাকে। দেহের উপরিভাগেও সাদা-কালো দাগ দেখতে পাবেন। এইটুকু খেয়াল করলেই আপনি সহজেই এডিস মশা চিনতে পারবেন।

ফেসবুক সহ অনেক জায়গায় শুনছিলাম যে এডিস মশা পরিস্কার পানিতে জন্মায়। আমি নিজেও অনেককে বলেছি। তারপরেই আমার মাথায় প্রশ্নটা আসলো ।

কেন শুধু পরিস্কার পানিতেই জন্মাবে? ময়লা পানিতে কী সমস্যা?

উত্তর খুঁজতে ঘাঁটাঘাঁটি করলাম। International Journal of Mosquito Research এর একটা গবেষনাপত্র পড়ে জানতে পারলাম ব্যাপারটা ঠিক উল্টো। তারা ৯১ টি মশার লার্ভা দিয়ে একটা গবেষণা চালান। সেখানে প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায়, বেশিরভাগ মশাই দূষিত পানিতে বংশবৃদ্ধি করেছে।

এক্ষেত্রে যেটা বলা সর্বাপেক্ষা যুক্তিযুক্ত তা হচ্ছে, এডিশ মশা আবদ্ধ পানিতে বংশবিস্তার করতে পছন্দ করে। এখন প্রশ্ন আসবে, আবদ্ধ পানিই কেন? এটার উত্তর জানতে হলে আপনাকে জানতে হবে, মশা কেন পানিতেই ডিম পাড়ে?

টেনশনের কিছু নাই। উত্তরটা আমিই বলে দিচ্ছি। মশার জীবনচক্রের চারটি ধাপ আছে। ডিম>লার্ভা>পিউপা>পূর্ণবয়স্ক মশা। প্রথম তিনটি ধাপের জন্য পানি বাধ্যতামূলক।

মশা ডিম পাড়ার পর ডিম ফুটে লার্ভা বের হয়। এটা হচ্ছে জুভেনাইল স্টেজ। মশার লার্ভাগুলো হচ্ছে জলজ। অর্থাৎ এদের খাদ্য হচ্ছে পানিতে থাকা শৈবাল, ব্যাকটেরিয়া এবং অন্যান্য অণুজীব। তারা তাদের লেজে থাকা “সাইফন”’ নামে একধরনের টিউবের মাধ্যমে অক্সিজেন গ্রহণ করে। The New South Wales Department of Natural Resources in Australia এদেরকে ‘Hairy maggots with siphon” নাম দিয়েছে।

যেহেতু মশা ঠাণ্ডা রক্তের প্রাণী এবং দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য তারা বাইরের গরম তাপমাত্রার উপর নির্ভরশীল, তাদের বৃদ্ধিও নির্ভর করে উষ্ণ তাপমাত্রার উপর।

মশার জীবনচক্রের টিন-এজ বয়সকে বলা হয় পিউপা দশা। এই দশায় থাকাকালীন সময়ে তারা কোনো খাদ্যগ্রহণ করেনা। শুধু সাঁতার কেটে বেড়ানো ছাড়া তাদের কোনো কাজ থাকেনা। একটা সময় পর যখন এরা পূর্ণাঙ্গ মশা হয়ে বের হয়, তখন এদের মাথায় দুইটা চিন্তা ঘুরে। খেতে হবে, বংশবিস্তার করতে হবে।

এবার আসি কেন বদ্ধ পানি দরকার হয়? মশার লার্ভা খুবই দুর্বল সাঁতারু । তাই পানির স্রোতে এরা ভেসে থাকতে পারেনা। সহজেই ওয়াশ আউট হয়ে যায়। তাই নিজের অবস্থানে থেকে বংশ বিস্তার করতে মশার আবদ্ধ পানি দরকার হয়। তাছাড়া, চলমান পানির স্রোতে খাবারের অভাবেও মারা যেতে পারে।

তারপরে আরেকটা ব্যাপার আমাকে বেশ অবাক করলো যখন শুনলাম, এডিস মশা অন্ধকারে কামড়ায় না। শুধুমাত্র আলোর উপস্থিতিতে কামড়ায়। এ আবার কেমন কথা! তাহলে কি এডিস মশা রাতকানা?

এটার উত্তর পেলাম International Centre for Genetic Engineering and Biotechnology এর Vector borne disease group এর গ্রুপ লিডার Dr. Sujatha Sunil এর কাছ থেকে।

তিনি বললেন, স্ত্রী এডিস মশার বায়োলজিক্যাল ক্লক প্রাকৃতিক ভাবেই এমনভাবে নির্ধারন করা যে, সে সকালে এবং সন্ধ্যায় খাদ্যগ্রহণ করে। যেহেতু খাদ্যগ্রহনে আলো এবং তাপমাত্রার একটা প্রভাব আছে, তাই আর্টিফিশিয়াল তাপমাত্রা এবং আলোও তার এই স্বভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। বসতবাড়ি, অফিসে বদ্ধ জায়গায় মশা তার স্বাভাবিক দিন রাত্রির সাইকেল অনুসরণ করতে পারেনা। তাতে কনফিউজড হয়ে যায়। তখন আর দিন রাত্রির ব্যাপারটা থাকেনা। মুখ্য হয়ে উঠে আলোর উপস্থিতি।

সেদিন ফেসবুকে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ চোখে পড়লো, এডিস মশা নাকি হাঁটুর ওপরে উড়তে পারেনা? ব্যাপারটা পড়ে আমি হেসে উঠছিলাম। এটাও কিন্তু সত্য না। এডিস মশা হাঁটুর উপরের লেভেলেও উড়তে পারে। তাহলে এই কথাটা কিভাবে আসলো! কথায় বলে, ‘যা রটে, তার কিছুতো বটে’

হ্যাঁ, কথাটার পিছনে একটা ভিত্তি আছে। এডিস মশা মানুষের উপস্থিতি বুঝতে পারে ঘ্রাণ রিসেপ্টর এর মাধ্যমে। মানুষের দেহে উৎপন্ন কার্বন ডাই অক্সাইডের ঘ্রাণ শুঁকে এডিস মশা রক্ত খেতে আসে। ধারণা করা হয় যে আমাদের হাঁটুর নিচের জায়গাটাতে অধিক পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপন্ন হয়, তাই এখানে এডিস মশার আনাগোনা থাকে বেশি।

এইতো কয়েকদিন আগের কথা। আমার ছোটবোনের সঙ্গে কথা বলছিলাম। ও জিজ্ঞেস করে বসলো, ‘ভাইয়া, ডেঙ্গু ভাইরাস শরীরে ঢুকলে কী এমন হয় যে এত সমস্যা হয় আমাদের?’ আমিও ভাবলাম, তাই তো! কী এমন হয়?

ডেঙ্গু ভাইরাস এডিস মশার লালার সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে রক্তে চলে আসে। তারপর সে ত্বকের দুটো কোষ ক্যারাটিনোসাইট এবং ল্যাঙ্গারহ্যান্স কোষকে আক্রমন করে। সেই আক্রান্ত কোষগুলা চলে যায় লিম্ফ নোডে। যেখানে থাকে আমাদের দেহের প্রতিরক্ষাতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপুর্ণ ম্যাক্রোফেজ এবং মনোসাইট।

যারা এই আক্রমণ প্রতিরোধ করতে গিয়ে উল্টো আক্রান্ত হয় এবং এভাবেই ভাইরাস রক্তের মাধ্যমে পুরো দেহে ছড়িয়ে পড়ে এবং লক্ষণগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে।

ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে করণীয় কী, ডেঙ্গু হয়ে গেলে কী করতে হবে এসব সম্পর্কে এতদিনে নিশ্চয়ই জেনে গেছেন। আমি শুধু একটা কথাই বলবো। দয়া করে নিজের আশেপাশের পরিবেশ পরিস্কার রাখুন। পানি জমতে পারে এমন যেকোনো ধরনের পাত্র, কৌটা, টায়ার, ভাঙ্গা বালতি কিংবা যেকোনো কিছু ফেলে রাখবেন না। আসুন আমরা সবাই মিলে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করি। সুস্থ থাকি, সুস্থ রাখি।

লেখক: এম বি বি এস (চতুর্থ বর্ষ), শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ

ঘটনাপ্রবাহ : ভয়ংকর ডেঙ্গু

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×