জীবনের নতুন বিষয় প্রত্যক্ষ করলাম জাপানে

  ডা. মো. সাঈদ এনাম ৩০ আগস্ট ২০১৯, ২১:২৩ | অনলাইন সংস্করণ

জাপানের হিরোশিমায় ডা. মো. সাঈদ এনাম
জাপানের হিরোশিমায় ডা. মো. সাঈদ এনাম

প্রায় তিরিশ মিনিটের ড্রাইভে হোটেলের বাস এয়ারপোর্ট থেকে সোজা হোটেল লবিতে এসে থামলো। বাসটি অটোমেটিক। 'সোঁ....' আওয়াজে বাসের দরজা খুললে ড্রাইভার সাহেব সিট থেকে উঠে এসে ভ্যান খুলে থেকে ব্যাগ নামিয়ে দিতে গেলেন। আমি আবারো তাকে ধন্যবাদ বলে নিজেই ব্যাগগুলো নামাই। এতে তিনি বেশ পুলকিত ও অবাক দুটাই হলেন।

এর আগে বাসে উঠার সময়ও একই ঘটনা ঘটেছিল। তিনি বাস থামিয়ে ভ্যান খুলে নিজেই ব্যাগ উঠাতে গিয়েছিলেন। অতিশয় বয়োবৃদ্ধ বলে আমিই ব্যাগগুলো বক্সে তুলি। আমাদের দেশে বয়োবৃদ্ধদের আমরা খানিকটা অগ্রাধিকার দেই, সাহায্য করার চেষ্টা করি-যা ছোটবেলায় মক্তবে হুজুর বেত পিটিয়ে শিখিয়ে দিয়েছিলেন। আমরা ভোরে দলবেঁধে পাড়ার সব ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে মক্তবে আরবি পড়তে যেতাম।

জাপানে জীবনের এই প্রথম বেশ কয়েকটি নতুন বিষয় প্রত্যক্ষ করলাম। যেমন প্রায় সত্তর বয়সী কাউকে বাস চালানো, বাসে কোন হেলপার নেই, ড্রাইভার নিজে এসে হাসিমুখে উইশ করে ব্যাগ তুলছেন, আর যাত্রাপথে একবারের জন্যও হর্ণ বাজাতে হয়নি তাকে।

আমি বসেছি একেবারে সামনের সিটে। গাড়িতে কোনো শব্দ নেই। পিনপতন নিরব। নেই উচ্চশব্দে গানবাজনা, চিল্লাপাল্লা। রাজনৈতিক আলাপের একে অন্যে চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধারও দেখলাম না। যা দেখে দেখেই বড় হলাম-বাংলাদেশের হাটে, বাজারে, অফিসে, আদালতে সবাই কাজকর্ম ফেলে রাজনীতি নিয়ে আলাপে মশগুল থাকে।

ধন্যবাদ দিয়ে ড্রাইভার সাহেব স্মিত হেসে হোটেলের রিসেপশনের দিকে যেতে ইশারা করলেন। আমি নিজেকে গুছিয়ে এগুলাম রিসেপশনের দিকে।

চমৎকার হোটেল, সম্ভবত ফাইভ স্টার। সামনে একজনকে দেখলাম কথা বলছেন রিসেপশনিস্টের সঙ্গে। সম্ভবত তিনিও আমার মতো কেউ। আমি এগিয়ে গিয়ে তার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলাম। আরেকজন ভদ্রলোককে বেশ পেছনে নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম, তিন চার ফিট দূরে।

পাশের ব্যক্তি চলে গেলে রিসেপশনের মহিলার সঙ্গে কথা বলতে যেই এগুলাম, তিনি হেসে ইশারায় অপেক্ষা করতে বললেন। কিছু বুঝে উঠার আগে দেখলাম তিনি হাত নেড়ে তিন, চার ফিট দূরে পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রলোককে আগে ডাকলেন।

জীবনের এই প্রথম ‘কিউ’ বা ‘চুপচাপ লাইনে দাঁড়িয়ে’ থেকে সেবা নেয়াটা দেখলাম, শিখলাম। কাজ সেরে রিসেপশনিস্ট ভদ্রমহিলা বিনীত হয়ে আমার পাসপোর্ট আর হোটেল বুকিং চাইলেন।

হোটেল বুকিং বেশ আগেই দিয়ে রেখেছিলাম। ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়াতে এখন এসব বিষয় খুব সহজ হয়ে গেছে। বিদেশে যে কোনো হোটেলে, যে কেউ কোনোরূপ 'বুকিং মানি' ছাড়াই মুহূর্তেই বুকিং নিতে পারেন, এমনকি প্রয়োজন হলে সেটা আবার বিনা মাশুলে ক্যানসেলও করতে পারেন।

দু'জন তরুণ-তরুণী এগিয়ে এসে একজন আমার ব্যাগ ও আরেক জন রুমের চাবি নিয়ে পাশে পাশে চললেন লিফটের দিকে। আমার রুম এগারো তলায়, 112-W। বিদায় নেবার সময় রিসেপশনিস্ট মহিলাকে ইংরেজিতে বললাম, ‘দুঃখিত আমি ‘কিউ’ বিষয়টা বুঝতে পারিনি’।

তিনি আবারো স্মিত হেসে বললেন, "ইটস ও....কেই, নো প্রবলেম। প্লিজ..."

দু'জন বা তিন'জনা থাকলেও যে লাইন ধরে সুশৃঙ্খলভাবে খানিকটা থেকে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়- এ কালচার বাংলাদেশে নেই।

দুই.

মধ্যবয়সে খুব ভালো শেখা হয় না। শিখতে হয় কচি বয়সে। সেই যে মক্তবে হুজুরের কাছে শেখা কিছু সোশ্যাল নর্মস, বৃদ্ধ ও মহিলা দেখলে সিট ছেড়ে দিতে হয়, রাস্তা পারাপারে প্রতিবন্ধীদের সাহায্য করতে হয় ইত্যাদি ইত্যাদি।

তারপরও মধ্য বয়সে নতুন শিখলাম সেবা নিতে গেলে ধৈর্য ধরে একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব (৩/৪ ফুট) বজায় রেখে সুন্দর লাইন করে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। খেয়াল রাখতে হয়, কারো প্রাইভেসি যেনো নষ্ট না হয়,কেউ তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়।

লাইনে দাঁড়ানো কারো দলিল দস্তাবেজে উঁকিঝুঁকি দেয়া,আড়িপাতা ও এক ধরনের অভদ্রতা,অসভ্যতা। আমাদের মধ্য এসব ভদ্রতা, ম্যানার এটিকেট বা শিষ্টাচার জ্ঞান কম। এসব শিষ্টাচার প্রাথমিক বিদ্যালয় বা মক্তবে কচি বয়সে রপ্ত করাতে হয়, বুড়ো বয়সে নয়। বুড়ো বয়সে ব্রেইনের মেমোরি সেন্টার থাকে পূর্ণ। কিন্তু সমস্যা হলো আমাদের সমাজে যাদের যৎসামান্য অর্থকড়ি বা ক্ষমতা আছে তাদের মধ্যে এসব ‘ম্যানার- ট্যানার’ বা ‘এটিকেট’ একেবারে নেই বললে চলে। ‘তেনারা’ সব শিষ্টাচার বা শুদ্ধাচার এর উর্ধ্বে। তেনারা সমাজের ‘কি হনুরে’ বা ‘ভিভিআইপি’।

তাদের অধিকার সর্বাগ্রে। তবে তারা 'ইধার কা মাল উধার করে', নাকি আলো আধারে অন্যেরটা গাপিস করে 'ভিভিআইপি' হয়েছেন সেটা বিবেচ্য নয়।

লেখক: ডা. মো. সাঈদ এনাম, সাইকিয়াট্রিস্ট

মেম্বার, আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×