রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে যেসব খাবারে

  যুগান্তর ডেস্ক ২৫ জুন ২০২০, ১৮:২৪:২৭ | অনলাইন সংস্করণ

করোনাভাইরাস প্রতিরোধের কোনো কার্যকর ওষুধ বা ভ্যাকসিন এখন পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি তাই এ ভাইরাস মোকাবেলার একমাত্র উপায় বডির ইমিউন সিস্টেম বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করা। তবে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করার প্রক্রিয়াটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।

এটি এমন নয় যে, এর জন্য নির্দিষ্ট কিছু খাবার বা ওষুধের কথা বলা হল আর সেটি খেয়ে প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যাবে আর করোনা মোকাবেলা সহজ হবে- এমন না।

এ ভাইরাস নিয়ে আমাদের কতদিন চলতে হবে- এখন পর্যন্ত আমরা জানি না। তাই যারা এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়েছেন প্রতিটি মানুষেরই রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো ছিল বলেই সুস্থ হতে পেরেছেন। তাই প্রত্যেকেরই উচিত, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো করার দিকে জোর দেয়া।

এ ছাড়া ভবিষ্যতে কোনো ভ্যাকসিন বা ওষুধ আবিষ্কার হলেও যার বডির ডিফেন্স বেশি ভালো সে তত তাড়াতাড়ি সুস্থ হতে পারবে। তাই এখন থেকেই নজর দিতে হবে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে। তবে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য শুধু দামি খাবারই খেতে হবে- তা নয়। সহজলভ্য মৌসুমি খাবারের মাধ্যমেও তা বাড়ান সম্ভব।

আমরা এখন প্রতিনিয়তই শুনে আসছি- ভিটামিন-সি, লেবু, আদা আর গরম পানি খেয়ে বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে করোনা থেকে ভালো হওয়া যায়। আসলে পরিমিত ও সুষম খাবারের মাধ্যমেই রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ান সম্ভব। কারণ একমাত্র সুষম খাবারের মাঝেই প্রতিটি পুষ্টি উপাদান পাওয়া সম্ভব। এতে প্রোটিন, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, ভিটামিন-সি, এ, বি, ডি, ই এবং ক্যালসিয়াম, জিঙ্ক, আয়রন, পটাশিয়ামসহ সব উপাদানই থাকে। যার খাবারে প্রতিদিন এ উপাদানগুলো থাকবে তার রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তত বেশি শক্তিশালী হবে। এতে শুধু করোনা নয়- যে কোনো রোগের বিরুদ্ধে লড়তে পারবে।

সবার প্রতিদিনের খাবারে মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, ডাল বা অন্য কোনো বীজের যে কোনো একটি বা পারলে দুটি আইটেম ১৬০ গ্রামের মতো যেন থাকে- সেটি খেয়াল রাখতে হবে।

১৮০ গ্রামের মতো শস্যজাতীয় খাবার রাখতে হবে যার মাঝে ভাত, রুটি, মুড়ি, খই, ভুট্টা, বার্লি, সাগু, সুজি, ওটস ইত্যাদি থাকতে পারে। আড়াই থেকে তিন কাপ পরিমাণে রঙিন লাল, হলুদ, সবুজ শাক ও সবজি যেন থাকে যেমন টমেটো, বিট, গাজর, মিষ্টি কুমড়া, লাউ, কাঁকরোল, পটোল, চিচিঙ্গা, ঢেড়শ, চালকুমড়া, করলা, ক্যাপসিকাম। দু’কাপের মতো ফল রাখতে হবে সেটি মৌসুমি যে কোনো ফল হতে পারে আম, কাঁঠাল, লিচু, আনারস, জামরুল, সফেদা, লটকন, তাল, বেল, জাম, তরমুজ ইত্যাদি। এছাড়া খেতে হবে প্রচুর পরিমাণে পানি। কারণ শরীরে আর্দ্রতা বজায় রাখতে পানি এবং তরল খাবারের বিকল্প নেই।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে- সবাইকে চেষ্টা করতে হবে, বাইরের খাবার পরিহার করে বাসায় তৈরি স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খেতে হবে। শুধু খাবার খেলেই হবে না। সেটি অবশ্যই পরিমাণমতো খেতে হবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাওয়া যাবে না। প্রতিদিন কিছু ফ্রি হ্যান্ড ব্যায়াম করতে হবে। কমপক্ষে ৩০-৪৫ মিনিট হাঁটতে হবে। সেটি বাসা ট্রেডমিলে, ছাদে, পার্কিং বা খুব ভোরে বা রাতে ফাঁকা রাস্তায় হোক। দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে হবে।

পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমাতে হবে। কারণ অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার ফলে আমাদের শরীরে ফ্রি র্যা ডিকেল উৎপন্ন হয়, যা আমাদের শরীরে ক্যান্সার থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষতিকর রোগের সৃষ্টি করে খুব সহজেই। শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়ামের জন্যও কিছুটা সময় রাখতে হবে। কিছুক্ষণ রোদে থাকার চেষ্টা করতে হবে ভিটামিন-ডি-এর জন্য।

এ সময় যেহেতু আমাদের করোনা আক্রান্ত রোগীর কারণে হাসপাতালগুলোয় সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে সেজন্য চেষ্টা করতে হবে, অন্য রোগে আক্রান্ত রোগীরা যেন নিয়ম মেনে সুস্থ থাকতে পারেন এবং হাসপাতাল থেকে দূরে থাকতে পারেন।

ফুসফুসের জটিলতায়- করোনা রোগটি মূলত ফুসফুসের সংক্রমণের রোগ। তাই সবচেয়ে আগে চেষ্টা থাকতে হবে, আমাদের ফুসফুস যেন ভালো থাকে। প্রতিদিন কিছুক্ষণ প্রাণায়াম ও শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করতে হবে ফুসফুস ভালো রাখতে। আমরা বাঙালি হিসেবে আশীর্বাদ ভাবতে হবে আমাদের রান্নায় ব্যবহƒত বেশিরভাগ মসলা ফুসফুস ভালো রাখতে সাহায্য করে। পেঁয়াজ, রসুন, আদা, কাঁচামরিচ, গোলমরিচ ও হলুদ- এ উপাদানগুলো ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়াতে এবং সুস্থ রাখতে অনেক বড় ভূমিকা পালন করে। প্রোটিন ও পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাবারগুলোও রাখতে হবে প্রতিদিনের খাবার তালিকায়।

ডায়াবেটিসের রোগীর ক্ষেত্রে- ডায়াবেটিস রোগীর যে খাদ্য তালিকা থাকে সেটি থাকে সর্বোচ্চ পরিমাণ সুষম খাবার তালিকা। তাদের সেই খাবার তালিকা ঠিকমতো অনুসরণ করলে অন্য অনেক রোগ থেকেও ভালো থাকতে পারেন। প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনি ও মিষ্টিজাতীয় খাবার পরিহার করতে হবে সুস্থ থাকতে এবং প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে। বেশি করে আঁশসমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম এবং হাঁটা তাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

হƒদরোগীদের ক্ষেত্রে- পটাশিয়ামসমৃদ্ধ ফল ও শাক-সবজি খাবার তালিকায় অবশ্যই রাখতে হবে। ছোট মাছ ও নদীর মাছ, সামুদ্রিক মাছ, ডাল, মুরগি, ডিম, দেশীয় মৌসুমি ফল ইত্যাদি রাখতে হবে। আর গরু, খাসির মাংস, অর্গান মিট, অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার, অতিরিক্ত তেলের খাবার বর্জন করতে হবে।

কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে- কিডনি রোগী করোনাভাইরাসের আক্রান্ত হলে সেটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফরাসসমৃদ্ধ খাবার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং প্রোটিনজাতীয় খাবার পরিমাণে কম খেতে হবে। কিন্তু তাদেরও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হবে। তাই উদ্ভিজ উৎস থেকে তাদের জন্য খাবার বাছাই করতে হবে বেশি। ডিমের সাদা অংশ, চামড়া ছাড়া মুরগি, ক্যাপসিকাম, পেঁয়াজ, রসুন, শালগম, বাঁধাকপি, মাশরুম, লাল আঙ্গুর, আনারস, অলিভ ওয়েল কিডনি রোগীদের উপকারী খাবার যা তাদের সুস্থ রাখবে এবং তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করবে।

গর্ভাবস্থায় রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে- যদিও গর্ভাবস্থা কোনো অসুস্থতা নয় কিন্তু এ করোনা মহামারীর সময় তারা খুব অবহেলিত হচ্ছেন। ভয়ে অনেকে ডাক্তার বা কোনো স্বাস্থ্যসেবা নিতে যাচ্ছেন না। তাই তাদের উচিত, খাবার গ্রহণের মাধ্যমে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে সুস্থ থাকা। তাদের প্রতিদিনের খাবার তালিকায় প্রোটিন- যেমন দুধ, দই, ডিম, মাছ, মুরগি, বাদাম, ভিটামিন-সি, ডি, ক্যালসিয়াম, আয়রন, জিঙ্কসমৃদ্ধ খাবার রাখতে হবে। পানি খেতে হবে কমপক্ষে ২ লিটার। অনেকে ভাত ও শর্করাজাতীয় খাবারের পরিমাণ বাড়িয়ে দেন। এটি না করে অন্য খাবারগুলোও রাখতে হবে প্রতিদিনের খাবার তালিকায়। হাঁটা ও কিছুটা হালকা ব্যায়াম অর্থাৎ একদম শুয়ে-বসে না থেকে কর্মক্ষম থাকতে হবে।


শওকত আরা সাঈদা (লোপা)
ডায়েটিশিয়ান অ্যান্ড ইনচার্জ
পারসোনা হেল্থ, ধানমণ্ডি, ঢাকা।

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত