করোনায় শিশু-কিশোরদের মানসিক অবসাদ যেভাবে দূর করবেন

  ডা. মোহাম্মাদ আরিফ হোসেন ০৮ আগস্ট ২০২০, ১৮:০০:০৮ | অনলাইন সংস্করণ

এ বছরের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া করোনাভাইরাস আতঙ্কে সারা পৃথিবীই কার্যত থমকে গেছে। প্রতিদিন শারীরিকভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ, শুরুতে কেবলমাত্র বয়স্করা আক্রান্ত হলেও শিশু-কিশোরদের সংখ্যাও দিন দিন বেড়েই চলেছে। এরই মধ্যে নতুন আতঙ্ক সারা পৃথিবীর বাবা-মাকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে, আর তা হল কিশোর-কিশোরীদের মানসিক ভারসাম্যহীনতা।

গবেষণা বলছে, করোনায় লকডাউনের কারণে শিশু- কিশোরদের স্কুল-কলেজ এবং বিনোদন কেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকায় ঘরে বদ্ধ থাকতে থাকতে তাদের মানসিক অবসাদ চরম রূপ ধারণ করেছে। আর তাই আজ শিশু- কিশোরদের মানসিক অবসাদ নিয়ে কথা বলে চাই।

চলুন প্রথমেই জেনে নিই কিশোর-কিশোরীদের মানসিক অবসাদ (Childhood Depression in Adolescents) কী?

যদিও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বয়স ভেদে কিশোর-কিশোরীদের বিভিন্ন ভাবে ভাগ করে থাকে, তবে সাধারণভাবে ১০-১৮ বছর পর্যন্ত বয়সীদেরকেই কিশোর-কিশোরী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মেডিকেল গবেষণা বলছে, এই বয়সিদের যত প্রকার শারীরিক ও মানসিক অসুখ-বিসুখ দেখা যায়, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় মানসিক অবসাদ। শতকরা ২৪% কিশোর-কিশোরীদের জীবনে কোন না কোন সময় এই অসুখ চরম রূপ ধারণ করে যেটাকে বলা হয় Major Depressive Disorder (MDD)। কখনও কখনও সেই মানসিক অবসাদ আত্মহত্যা পর্যন্ত গড়ায়। DSM5 (Diagnostic and Statistical Manual of Mental Disorders) এর সংজ্ঞা মতে MDD যখন ২ বছরের অধিক সময় স্থায়ী হয়, তখন সেটাকে বলে স্থায়ী মানসিক অবসাদ (Persistent Depressive Disorder)।

কিভাবে বুঝবেন আপনার সন্তান মানসিক অবসাদে ভুগছে?

মানসিক অবসাদ বুঝার দুটি প্রধান লক্ষণ হল, ব্যাপকভাবে বাচ্চার মানসিক উৎফুল্লতা নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং সবকিছুতে আনন্দ বা উৎসাহ হারিয়ে ফেলা। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, আপনার সন্তান আগে যে খেলনাটি পছন্দ করত বা যে খাবারটি অধিক প্রিয় ছিল, এখন ঘুরে ও সেদিকে আর তাকাচ্ছে না। যখন এই দুটি লক্ষণ ২ সপ্তাহের অধিক স্থায়ী হবে, আপনি ধরেই নিবেন আপনার সন্তান চরম মানসিক অবসাদ (MDD) এ ভুগছে। উপরোক্ত লক্ষণের পাশাপাশি কিশোর-কিশোরীদের ঘুমের সমস্যা, যেমন অতিরিক্ত ঘুম অথবা একেবারেই না ঘুমানো, দ্রুত দুর্বল হয়ে যাওয়া, অমনোযোগিতা এবং নিজেকে অপদার্থ মনে করা। মানসিক অবসাদ কখনও কখনও শারীরিক অসুবিধা হিসেবে ও প্রকাশ পেতে পারে, যেমন মাথা ব্যথা, বমি বমি ভাব বা খাওয়ার পরপরই বমি হয়ে যাওয়া, শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ব্যথা অনুভব হওয়া।

কিভাবে বুঝবেন আপনার সন্তান আত্মহত্যার পথে হাঁটছে?

যদিও পৃথিবী ব্যাপী কিশোর-কিশোরীদের প্রধানতম মেডিকেল সমস্যা হল মানসিক অবসাদ, তারপরেও এই অসুখকে অধিকাংশ পিতামাতাই তেমন গ্রাহ্য করেন না, বিশেষ করে আমাদের দেশের মতো স্বল্পন্নত দেশে তো মানসিক অবসাদ কে কোন অসুখই মনে করা হয়না। আর তাই তো প্রতিবছর হাজার হাজার কিশোর-কিশোরী আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হল প্রতি সাতজন মানসিক অবসাদে ভোগা রোগীদের একজন আত্মহত্যা করে।

নিম্নে বর্ণিত লক্ষণ যদি আপনার সন্তানের মধ্যে দেখতে পান, তাহলে বুঝবেন সে আত্মহত্যার কথা ভাবছে, আচার-ব্যবহারে হঠাৎ পরিবর্তন আসা যেমন, জীবনের ঝুঁকি আছে সেই কাজ গুলোর দিকে আগ্রহী হওয়া, নিজেকে একাকী করে ফেলানো বা সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে ফেলা। সবকিছুতে চরম হতাশা অনুভব করা অথবা নিজেকে সব ব্যাপারে দোষী অনুভব করা। মৃত্যু সম্পর্কিত বা আত্মহত্যার ব্যাপারে অতিরিক্ত কথা বলা। অতিরিক্ত অসহনিয়তা, ছোট-খাট ব্যাপারে মেজাজ হারানো। সবচেয়ে ভয়াবহ লক্ষণ হল, উপরোক্ত লক্ষণগুলির পর পুরোপুরি চুপচাপ হয়ে যাওয়া।

জেনে নিন কিশোর-কিশোরীদের মানসিক অবসাদের চিকিৎসা পদ্ধতি কি?

মানসিক অবসাদের চিকিৎসা নির্ভর করছে, কিশোর-কিশোরীটি কি পরিমাণ আক্রান্ত হয়েছে তার উপর। প্রথমেই আপনাকে নির্ধারণ করতে হবে তার আক্রান্তের মাত্রা কতটা গভীর। সমস্যা স্বল্প (Mild) হলে শুধু মানসিক চিকিৎসা এবং মধ্যম থেকে চরম পর্যায় (Moderate to Severe) হলে মানসিক চিকিৎসার পাশাপাশি ঔষধ ও সেবন করতে হবে। কোন কোন ক্ষেত্রে Electroconvulsive therapy (এক ধরণের বৈদ্যতিক শক যা মস্তিস্কে দেয়া হয়) ও লাগতে পারে। চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করবেন ডাক্তার, তবে পিতামাতা মানসিক চিকিৎসায় যেভাবে সহযোগিতা করবেন তা সংক্ষেপে বর্ণনা করা হল। প্রথমত জীবনে বৈচিত্র আনতে হবে যেমন দৈনন্দিন রুটিনে পরিবর্তন।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, যেসকল পিতামাতা নিয়ম নীতিতে অত্যন্ত কঠোর, তাঁদেরকে একটু নমনীয় হতে হবে, আবার যেসকল বাবা-মা একেবারেই রুটিনের ধার ধারেন না, তাঁদের প্রাত্যহিক জীবনে একটা রুটিন প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

বিশেষ করে ছুটিতে সবাই যখন বাড়িতে অবস্থান করেন। সন্তানের সমস্যা পরম আদরের সাথে শুনতে হবে, সে যদি তার সমস্যা বাবা-মা কারো সাথেই শেয়ার করতে না চায়, সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রেসার পরিহার করতে হবে। পড়াশোনা, খেলাধুলা বা কোন প্রতিযোগিতার কারণে অতিরিক্ত প্রেসার অনুভূত হলে, যথা সাধ্য এগিয়ে আসতে হবে। সহযোগিতার সক্ষমতা না থাকলে ও তাকে এই নিশ্চয়তা দিতে হবে যে তুমি কোনভাবেই একা নও।

আমাদের সমাজে অনেক বড় একটা সমস্যা হল অন্য বাচ্চাদের সাথে সক্ষমতার তুলনা। সেটা বন্ধ করতে হবে, বরং তার ভাল দিক গুলোকে তুলে ধরে জীবনকে অর্থবহ করতে হবে। ডাক্তারের চিকিৎসার পাশাপাশি সার্বিকভাবে পিতামাতাকেই প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। যদি আত্মহত্যার বিশেষ কোন লক্ষণ প্রকাশ পায় অথবা চিকিৎসক মনে করেন, হাসপাতালে ভর্তি রেখে ও চিকিৎসা করা যেতে পারে।

পরিশেষে, মানসিক অবসাদ একসময় ধনিক শ্রেণীর অসুখ মনে করা হলেও, অতিরিক্ত নগরায়ন, পিতামাতার অতিরিক্ত ব্যস্ততা, বর্তমান সময়ের লকডাউনের মতো বদ্ধ অবস্থার কারণে স্বল্পন্নত দেশ সমূহে ও মানসিক অবসাদ ব্যাপকভাবে জেকে বসেছে।

শিশুদের জীবনের শুরু থেকেই ইসলামের নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা, রুটিন মাফিক নিয়ন্ত্রিত জীবন ব্যবস্থা এবং অহেতুক প্রতিযোগিতাকে পরিহার করতে পারলে মানসিক অবসাদের মত অসুখকে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব এবং বাঁচান সম্ভব আপনার সন্তানের মূল্যবান জীবন।

লেখক: ডা. মোহাম্মাদ আরিফ হোসেন

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসা বিজ্ঞানী, টোকিও, জাপান

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও
আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত