মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় উচ্চ রক্তচাপ
jugantor
মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় উচ্চ রক্তচাপ

  অধ্যাপক অমল কুমার চৌধুরী  

০৮ অক্টোবর ২০২০, ১৩:১৪:১৯  |  অনলাইন সংস্করণ

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস দ্রুতবেগে বিস্তার লাভ করছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন বয়সের মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে এবং এদের মধ্যে কিছু মানুষ মৃত্যুবরণ করছেন। ভাইরাসটি এখন মানুষের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে, যাদের উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগজনিত সমস্যাসহ অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদী রোগ রয়েছে তাদের মধ্যে ভয়ের মাত্রাটা একটু বেশি পরিমাণে বিরাজ করছে।

শরীরে বিভিন্ন রোগের উপসর্গ ও মৃত্যুঝুঁকি বিবেচনায় জনস্বাস্থ্যের অন্যতম প্রধান সমস্যা উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যমতে, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ১৭.৯ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ বা হৃদরোগ। বিভিন্ন রোগের মধ্যে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি।

এটি মস্তিষ্কের রক্তনালীর রোগ (সেরিব্রোভাসকুলার ডিজিজ), করোনারি হার্ট ডিজিজ এবং হৃৎপিণ্ড ও কিডনিজনিত রোগের অন্যতম ঝুঁকির কারণ। রক্তচাপ সঠিক চিকিৎসা ৩৫ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায় এবং ২০ থেকে ২৫ শতাংশ মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশনের (হার্ট অ্যাটাক) ঝুঁকি কমায়।

উচ্চ হৃদরোগের ঝুঁকিতে থাকা বেশ কয়েকজন রোগীর ওপর পরীক্ষা চালিয়ে এ পর্যবেক্ষণমূলক তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে। যাদের রক্তচাপ ১৬০ এমএমএইচজি সিস্টোলিক এবং ৯০ এমএমএইচজি ডায়াস্টোলিকের নিচে থাকে তাদের মাঝে হৃদরোগজনিত সমস্যা এবং মৃত্যুর হাম কম।

যেসব রোগীর রক্তচাপ ১৪০-১৬০ এমএমএইচজি (সিস্টোলিক) এবং ৯০-১০০ এমএমএইচ (ডায়াস্টোলিক) থাকে তাদের হৃদরোগের উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। রক্তচাপ কম থাকলে হৃদরোগে আক্রান্তের সংখ্যা হ্রাস পায়। উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসাটা রক্তচাপ যখন কম থাকে তখন থেকেই শুরু করা উচিৎ, এ পরীক্ষার ফলাফলগুলো তাই নির্দেশ করেছে।

রক্তচাপ সংক্রান্ত কিছু তথ্য:
১. একজন ব্যক্তির দেহে হৃৎপিণ্ড যতটুকু রক্ত পাম্প করে এবং ধমনীতে রক্ত প্রবাহে বাধার পরিমাণ দ্বারা রক্তচাপ নির্ণীত হয়। হৃৎপিণ্ড যত বেশি রক্ত পাম্প করে ধমনী তত সরু হয়ে যায়। এর ফলে, উচ্চরক্তচাপের সৃষ্টি হয়।
২. রক্তচাপ সবসময় একরকম থাকে না। উত্তেজনা ও চাপের কারণে এর পরিবর্তন ঘটে এবং দ্রুতই এটি স্বাভাবিক হয়ে যায়। ঘুমন্ত অবস্থায় এর পরিমাণ কম থাকে এবং ঘুম থেকে জেগে উঠলে এর পরিমাণ বেড়ে যায়।
৩. উচ্চ রক্তচাপকে নীরব ঘাতক বলা হয়। কারণ, ব্যক্তির শরীরে এর কোন লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা যায় না।
৪. উচ্চ রক্তচাপ স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ায়।

উচ্চ রক্তচাপ নির্ণয় ও উপসর্গ:
যখন কোনো ব্যক্তির রক্তের চাপ সব সময়েই স্বাভাবিকের চেয়ে ঊর্ধ্বে থাকে, তখন ধরে নেওয়া হয় তিনি হাইপারটেনশনে ভুগছেন। কারো রক্তচাপ যদি উভয় বাহুতে ১৪০/৯০ মি.মি. বা তার ওপরে থাকে, তাহলে তার উচ্চ রক্তচাপ হয়েছে বলা যেতে পারে। উচ্চ রক্তচাপের কোন লক্ষণ বা উপসর্গ না থাকায় অধিকাংশ মানুষ জানেন না যে তিনি উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। প্রাথমিকভাবে, উচ্চরক্তচাপের কারণে মাথাব্যথা ও অবসাদের সৃষ্টি হবে। যখন উচ্চ রক্তচাপ তীব্রতর পর্যায়ে চলে যাবে তখন এর লক্ষণ প্রকাশ পায়।

আগে যা বলা হয়েছে, হাইপারটেনশনই কার্ডিওভাসকুলার রোগের অন্যতম কারণ। যদি সঠিক সময়ে এর উপসর্গগুলো চিহ্নিত করা না যায় তাহলে হার্ট ফেইলিউর বা হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে পারকুটেনিয়াস করোনারি ইন্টারভেনশন (পিসিআই) অথবা অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি করা হয়। ধমনীর ব্লকের চিকিৎসায় অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি একটি কার্যকর ও নন-ইনভেসিভ চিকিৎসা পদ্ধতি।

বিশেষত, নতুন প্রজন্মের ড্রাগ-ইলিউটিং স্টেন্ট এখন সহজলভ্য, যা দীর্ঘ, জটিল এবং সরু ধমনীর মধ্য দিয়ে কার্যকরভাবে চলাচল করতে পারে এবং এটি ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে আছে এমন রোগীদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে বলে জানিয়েছে ইউএসএফডিএ।

উচ্চ রক্তচাপরোধে করণীয়:
১. কম লবণ ও ফ্যাটযুক্ত স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে।
২. শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
৩. অ্যালকোহল পান থেকে বিরত থাকতে হবে।
৪. শরীরচর্চা করতে হবে।
৫. ধূমপান ছাড়তে হবে।
৬. মানসিক চাপ ও রাগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
৭. প্রতিনিয়ত রক্তচাপ পরীক্ষা করতে হবে।

তথ্যসূত্র:
1. https://www.who.int/health-topics/cardiovascular-diseases/#tab=tab_1
2. Antonakoudis G, Poulimenos L, Kifnidis K, Zouras C, Antonakoudis H. Blood pressure control and cardiovascular risk reduction. Hippokratia. 2007;11(3):114-119.
3. https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC3838588/

[ডিসক্লেইমার: এই প্রতিবেদনে উপস্থাপিত সকল তথ্য অধ্যাপক অমল কুমার চৌধুরী, অধ্যাপক, কার্ডিওলজি বিভাগ, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ (এনআইসিভিডি) এর নিজস্ব মতামত, যা সাধারণ পরিদর্শন বা শিক্ষামূলক কার্যক্রমের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।]

লেখক: অধ্যাপক অমল কুমার চৌধুরী, অধ্যাপক, কার্ডিওলজি বিভাগ, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ (এনআইসিভিডি)

মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় উচ্চ রক্তচাপ

 অধ্যাপক অমল কুমার চৌধুরী 
০৮ অক্টোবর ২০২০, ০১:১৪ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস দ্রুতবেগে বিস্তার লাভ করছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন বয়সের মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে এবং এদের মধ্যে কিছু মানুষ মৃত্যুবরণ করছেন। ভাইরাসটি এখন মানুষের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে, যাদের উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগজনিত সমস্যাসহ অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদী রোগ রয়েছে তাদের মধ্যে ভয়ের মাত্রাটা একটু বেশি পরিমাণে বিরাজ করছে।

শরীরে বিভিন্ন রোগের উপসর্গ ও মৃত্যুঝুঁকি বিবেচনায় জনস্বাস্থ্যের অন্যতম প্রধান সমস্যা উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যমতে, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ১৭.৯ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ বা হৃদরোগ। বিভিন্ন রোগের মধ্যে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি। 

এটি মস্তিষ্কের রক্তনালীর রোগ (সেরিব্রোভাসকুলার ডিজিজ), করোনারি হার্ট ডিজিজ এবং হৃৎপিণ্ড ও কিডনিজনিত রোগের অন্যতম ঝুঁকির কারণ। রক্তচাপ সঠিক চিকিৎসা ৩৫ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায় এবং ২০ থেকে ২৫ শতাংশ মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশনের (হার্ট অ্যাটাক) ঝুঁকি কমায়। 

উচ্চ হৃদরোগের ঝুঁকিতে থাকা বেশ কয়েকজন রোগীর ওপর পরীক্ষা চালিয়ে এ পর্যবেক্ষণমূলক তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে। যাদের রক্তচাপ ১৬০ এমএমএইচজি সিস্টোলিক এবং ৯০ এমএমএইচজি ডায়াস্টোলিকের নিচে থাকে তাদের মাঝে হৃদরোগজনিত সমস্যা এবং মৃত্যুর হাম কম। 

যেসব রোগীর রক্তচাপ ১৪০-১৬০ এমএমএইচজি (সিস্টোলিক) এবং ৯০-১০০ এমএমএইচ (ডায়াস্টোলিক) থাকে তাদের হৃদরোগের উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। রক্তচাপ কম থাকলে হৃদরোগে আক্রান্তের সংখ্যা হ্রাস পায়। উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসাটা রক্তচাপ যখন কম থাকে তখন থেকেই শুরু করা উচিৎ, এ পরীক্ষার ফলাফলগুলো তাই নির্দেশ করেছে।
  
রক্তচাপ সংক্রান্ত কিছু তথ্য: 
১. একজন ব্যক্তির দেহে হৃৎপিণ্ড যতটুকু রক্ত পাম্প করে এবং ধমনীতে রক্ত প্রবাহে বাধার পরিমাণ দ্বারা রক্তচাপ নির্ণীত হয়। হৃৎপিণ্ড যত বেশি রক্ত পাম্প করে ধমনী তত সরু হয়ে যায়। এর ফলে, উচ্চরক্তচাপের সৃষ্টি হয়। 
২. রক্তচাপ সবসময় একরকম থাকে না। উত্তেজনা ও চাপের কারণে এর পরিবর্তন ঘটে এবং দ্রুতই এটি স্বাভাবিক হয়ে যায়। ঘুমন্ত অবস্থায় এর পরিমাণ কম থাকে এবং ঘুম থেকে জেগে উঠলে এর পরিমাণ বেড়ে যায়।
৩. উচ্চ রক্তচাপকে নীরব ঘাতক বলা হয়। কারণ, ব্যক্তির শরীরে এর কোন লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা যায় না।
৪. উচ্চ রক্তচাপ স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ায়। 

উচ্চ রক্তচাপ নির্ণয় ও উপসর্গ:
যখন কোনো ব্যক্তির রক্তের চাপ সব সময়েই স্বাভাবিকের চেয়ে ঊর্ধ্বে থাকে, তখন ধরে নেওয়া হয় তিনি হাইপারটেনশনে ভুগছেন। কারো রক্তচাপ যদি উভয় বাহুতে ১৪০/৯০ মি.মি. বা তার ওপরে থাকে, তাহলে তার উচ্চ রক্তচাপ হয়েছে বলা যেতে পারে। উচ্চ রক্তচাপের কোন লক্ষণ বা উপসর্গ না থাকায় অধিকাংশ মানুষ জানেন না যে তিনি উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। প্রাথমিকভাবে, উচ্চরক্তচাপের কারণে মাথাব্যথা ও অবসাদের সৃষ্টি হবে। যখন উচ্চ রক্তচাপ তীব্রতর পর্যায়ে চলে যাবে তখন এর লক্ষণ প্রকাশ পায়। 
 
আগে যা বলা হয়েছে, হাইপারটেনশনই কার্ডিওভাসকুলার রোগের অন্যতম কারণ। যদি সঠিক সময়ে এর উপসর্গগুলো চিহ্নিত করা না যায় তাহলে হার্ট ফেইলিউর বা হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে পারকুটেনিয়াস করোনারি ইন্টারভেনশন (পিসিআই) অথবা অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি করা হয়। ধমনীর ব্লকের চিকিৎসায় অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি একটি কার্যকর ও নন-ইনভেসিভ চিকিৎসা পদ্ধতি। 

বিশেষত, নতুন প্রজন্মের ড্রাগ-ইলিউটিং স্টেন্ট এখন সহজলভ্য, যা দীর্ঘ, জটিল এবং সরু ধমনীর মধ্য দিয়ে কার্যকরভাবে চলাচল করতে পারে এবং এটি ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে আছে এমন রোগীদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে বলে জানিয়েছে ইউএসএফডিএ।
     
উচ্চ রক্তচাপরোধে করণীয়:
১. কম লবণ ও ফ্যাটযুক্ত স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে। 
২. শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
৩. অ্যালকোহল পান থেকে বিরত থাকতে হবে।
৪. শরীরচর্চা করতে হবে। 
৫. ধূমপান ছাড়তে হবে। 
৬. মানসিক চাপ ও রাগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। 
৭. প্রতিনিয়ত রক্তচাপ পরীক্ষা করতে হবে।  

তথ্যসূত্র: 
1. https://www.who.int/health-topics/cardiovascular-diseases/#tab=tab_1
2.  Antonakoudis G, Poulimenos L, Kifnidis K, Zouras C, Antonakoudis H. Blood pressure control and cardiovascular risk reduction. Hippokratia. 2007;11(3):114-119. 
3. https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC3838588/   

[ডিসক্লেইমার: এই প্রতিবেদনে উপস্থাপিত সকল তথ্য অধ্যাপক অমল কুমার চৌধুরী, অধ্যাপক, কার্ডিওলজি বিভাগ, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ (এনআইসিভিডি) এর নিজস্ব মতামত, যা সাধারণ পরিদর্শন বা শিক্ষামূলক কার্যক্রমের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।]

লেখক: অধ্যাপক অমল কুমার চৌধুরী, অধ্যাপক, কার্ডিওলজি বিভাগ, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ (এনআইসিভিডি)