বাতজ্বরের জটিলতা
jugantor
বাতজ্বরের জটিলতা

  প্রফেসর (ডা.) মো. তৌফিকুর রহমান (ফারুক)  

২৪ জুলাই ২০২১, ০৩:৩৪:৩৫  |  অনলাইন সংস্করণ

মাস্টার আবির ১৪ বছর বয়স, মাঝে মাঝে গলা ব্যথা হয়, তিনদিন ধরে বাম হাঁটুর গিরা ফুলেছে এবং হাঁটতে পারে না। সাতদিন আগে তার ডান হাঁটুর ব্যথা হয়েছিল এবং ব্যথার ওষুধ খাবার পর এখন ডান হাঁটুর ব্যথা কম। আবিরের বাতজ্বর সংক্রান্ত পরীক্ষা করা হলো।

আবিরকে ২১ দিন অন্তর অন্তর বাতজ্বরের প্রতিরোধমূলক পেনিসিলিন ইনজেকশন দিতে বলা হয় ১৯ বছর বয়স পর্যন্ত এবং মাঝে মাঝে ফলো-আপের জন্য আসতে বলা হলো। আবিরের অভিভাবক প্রশ্ন করলেন যে আবিরের কি বাতজ্বর গিরা ছাড়াও হৃদপিণ্ড আক্রমণ করতে পারে কি না?

ডা. মো. তৌফিকুর রহমান : হ্যাঁ বাতজ্বরে আবিরের প্রথম যেমন হাঁটু আক্রান্ত হয়েছে, তেমনি অন্য গিরাগুলো সাধারণত: বড় গিরাগুলো আক্রান্ত হতে পারে। সেই সঙ্গে হৃদপিণ্ডের ভাল্ব মাংশপেশিতে এবং বাইরের পর্দাও আক্রান্ত হতে পারে। সে জন্যই আবিরকে প্রতি ৩/৬ মাস অন্তর অন্তর ফলোআপে আসতে হবে এবং মাঝে মাঝে ইকোকার্ডিওগ্রাম পরীক্ষা করার প্রয়োজন হতে পারে।

মাস্টার লিমন, ১৫ বছর বয়স, মাঝে মাঝে গলা ব্যথা করে, এখন ৪ দিন ধরে প্রচণ্ড জ্বর বুক ধড়পড় ও নিঃশ্বাসের কষ্ট হচ্ছে। লিমনকে শারীরিক পরীক্ষার পাশাপাশি বাতজ্বর সংক্রান্ত রক্ত পরীক্ষা ইকোকার্ডিওগ্রাম ও অন্য পরীক্ষা করা হলো। লিমনের বাতজ্বর রোগ ধরা পড়ার পাশাপাশি বাতজ্বর হৃদপিণ্ডের ভাল্ব আক্রান্ত হওয়া ধরা পড়ল। লিমনকে বাতজ্বরের ওষুধ দেওয়ার পাশাপাশি পরবর্তীতে বাতজ্বর আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমানোর প্রতিরোধ পেনিসিলিন ইনজেকশন ২১ দিন পরপর নিতে বলা হলো এবং বাতজ্বরে ভাল্ব আক্রান্ত হওয়ার বিশ্রামের পরামর্শ দেওয়া হলো।

লিমনের অভিভাবক প্রশ্ন করলেন, লিমনের কি আবার ও ভবিষ্যতে বারবার বাতজ্বরে আক্রান্ত হতে পারে?

ডা. মো. তৌফিকুর রহমান : হ্যাঁ, লিমন বারবার বাতজ্বরে আক্রান্ত হতে পারে, তবে যাতে ভবিষ্যতে আর আক্রান্ত না হয় সে জন্যই লিমনকে প্রতি ২১ দিন পরপর ইনজেকশন নিতে হবে।

অভিভাবক : ওষুধ নিয়মিত না খেলে ভবিষ্যতে লিমনের কি কোনো জটিলতা হতে পারে?

ডা. মো. তৌফিকুর রহমান : হ্যাঁ, নিয়মিত বাতজ্বরের ট্যাবলেট বা ইনজেকশন না নিলে ভবিষ্যতে লিমনের ভাল্ব মোটা হয়ে যেতে পারে। তাতে ভাল্বের মুখ অত্যন্ত সরু হতে পারে, যাকে আমরা স্টেনোসিস বলি, অথবা ভাল্ব বেশি নষ্ট হয়ে ভাল্বের কাজ নষ্ট হতে পারে, ফলে ভাল্ব লিক্ করতে পারে। একে রিগারজিটেশন বলে। ভাল্বের বেশি পরিমাণ নষ্ট হলে ভবিষ্যতে ভাল্ব কৃত্রিম ভাল্ব দ্বারা পরিবর্তন করার প্রয়োজন হতে পারে অথবা বেলুন দিয়ে ভাল্ব এর মুখ বড় করার প্রয়োজন হতে পারে, অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও রোগীর জন্য কষ্টদায়ক। এ ছাড়াও বারবার ভাল্ব আক্রান্ত হলে হৃদপিণ্ডের মাংশপেশি আক্রান্ত হলে অথবা ভাল্ব আক্রান্ত হলে রোগীর হার্ট ফেইলার হতে পারে অথবা হৃদপিণ্ডের চারপাশে পর্দা আক্রান্ত হলে হৃদপিণ্ডের চারপাশে পানি জমতে পারে। যাকে পেরিকার্ডিয়াল ইফিওশান বলে।

মিস ফারিয়া ১৬ বছর বয়স, গত ৫ দিন ধরে প্রচণ্ড জ্বর, গিরা ব্যথা, বুক ধড়পড় ও শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। ফারিয়াকে বাতজ্বরের ও অন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করার পর ইকোকার্ডিওগ্রামে ধরা পড়ল ফারিয়ার হৃদপিণ্ডের ভাল্ব মারাত্মকভাবে আক্রান্ত ও হৃদপিণ্ডের মাংশপেশি আক্রান্ত হয়ে হৃদপিণ্ডের কার্যক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। ফারিয়াকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো এবং পূর্ণ বিশ্রামসহ অন্য ওষুধ দেওয়া হলো। ১ সপ্তাহ পর ফারিয়ার শ্বাসকষ্ট ও বুক ধড়পড় কমে গেল। ফারিয়ার অভিভাবকরা কতগুলো প্রশ্নের উত্তর জানতে চান ও কিছু পরামর্শ চান-

অভিভাবক : ফারিয়ার বর্তমান হৃদপিণ্ডের যে ক্ষতি হলো তা কি ভালো হবে?

ডা. মো. তৌফিকুর রহমান : হ্যাঁ, ফারিয়ার হৃদপিণ্ডে ভাল্ব ও মাংশপেশিতে আক্রান্ত হওয়ার ফলে যে হার্ট ফেইলার হয়েছে তা আস্তে আস্তে উন্নতি হবে এমনকি হƒদপিণ্ডের কার্যক্ষমতা যে হ্রাস পেয়েছে তা আস্তে আস্তে উন্নতি হয়ে স্বাভাবিক হয়ে আসতে পারে, নিয়মিত ওষুধ খেলে।

মিসেস খাতুন, ৩০ বছর বয়স গত ২ মাস ধরে শ্বাসকষ্ট হয় একটু বেশি পরিশ্রম করলে, সিড়ি দিয়ে উঠতে গেলে। তার প্রয়োজনীয় পরীক্ষায় ধরা পড়ল যে, তার হৃদযন্ত্রের মাইট্রাল ভাল্ব সরু হয়েছে এবং সে কারণে রক্ত পরিমাণ মতো ভাল্ব দিয়ে অতিক্রম করতে না পারায় রক্ত ফুসফুসে জমা হয়ে ফুসফুসের রক্তনালির রক্তচাপ বেড়ে গেছে। রোগীকে আর ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার পর কিছু ওষুধ প্রদান করা হলো। রোগীর ১০ দিন পর শ্বাসকষ্ট কমে গেল এবং নিয়মিত ওষুধ খাবার পরামর্শ দেওয়া হলো। মিসেস খাতুন কিছু প্রশ্নের উত্তর জানতে চান ও কিছু পরামর্শের জন্য বলেন।

মিসেস খাতুন : ভাল্ব কেন সরু হলো?

ডা. মো. তৌফিকুর রহমান : বাতজ্বর বারবার আক্রান্ত হলে ভাল্ব সরু হতে পারে।

মিসেস খাতুন : কিন্তু আমার তো কখনই বাতজ্বর বা গিরা ব্যথা ছিল না।

ডা. মো. তৌফিকুর রহমান : সাধারণত ৫০ ভাগ ক্ষেত্রে যাদের হার্টের ভাল্ব আক্রান্ত হয়েছে কোনো সুনির্দিষ্ট বাতজ্বরের ইতিহাস পাওয়া যায় না। তাই যদি কারও গিরা ব্যথা বা গিরা ফুলা নাও থাকে কিন্তু ঘন ঘন জ্বর ও গলা ব্যথা হয় তাদের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ও ফলোআপে থাকা উচিত।

মিসেস খাতুন : ভবিষ্যতে কি এ রোগের জন্য অপারেশন লাগতে পারে?

ডা. মো. তৌফিকুর রহমান : নিয়মিত ওষুধ খেলে সাধারণত: এ রোগ আর বাড়ে না, তখন নিয়মিত ভাবে ফলোআপে থাকা উচিত যে হৃদপিণ্ডের ভাল্বের সরু হওয়ার পরিমাণ বা মাত্রা ক্রমশ : বাড়ছে কি না। যদি পর্যাপ্ত ওষুধ খাওয়ার পরও রোগীর শ্বাসকষ্ট হয় এবং ভাল্বের সরু হওয়ার মাত্রা বেশি হয় তবে সে ক্ষেত্রে ইন্টারভেনশনের মাধ্যমে ভালভুলোপ্লথি বা ভাল্ব মোটা করা অথবা অপারেশনের মাধ্যমে ভাল্বের মুখ মোটা করা বা ভাল্ব পরিবর্তন করে কৃত্রিম ভাল্ব সংযোজন করা লাগতে পারে।

মিসেস আ. বেগম, ৫০ বছর বয়স, থাকেন কুড়িগ্রামে, এসেছেন গত ৫ মাস ধরে বুক ধড়পড় করে ও দু’মাস ধরে শ্বাসকষ্ট হয়। কিন্তু গত ৩ দিন আগে হঠাৎ করে বামপাশে দুর্বল ও অবশ হয়ে গেছে। মিসেস আ. বেগমকে প্রয়োজনীয় পরীক্ষার পাশাপাশি ইকোকার্ডিওগ্রামে ধরা পড়ল যে রোগীর হৃদপিণ্ডের বামপাশের একটি ভাল্ব মাইট্রাল ভাল্বের মুখ সরু হয়ে গিয়েছে এবং হৃদপিণ্ডের বাম অলিন্ডে রক্তের জমাট বেধে এবং ইসিজি তে দেখা গেল রোগীর অনিয়মিত হৃদস্পন্দন। ব্রেইনের সিটি স্ক্যান পরীক্ষার দেখা গেল ডানপাশে ব্রেইন স্ট্রোক হওয়ার পাশাপাশি অবশ হয়ে গেছে। তাই রোগীর রোগগুলো হলে মাইট্রাল স্টেটোনোফ সঙ্গে লেফ্ট এট্রিয়াল থ্রোম্বাস আছে এট্রিয়াল ফিব্রিলেশন ও ইস্কোমিক স্ট্রোক। মিসেস আ. বেগম কিছু প্রশ্নের উত্তর জানতে চান ও এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরামর্শ চান-

আ. বেগম : তার কেন হৃদপিণ্ডের ভাল্ব সরু হলো?

ডা. মো. তৌফিকুর রহমান : বাতজ্বর বারবার হƒদপিণ্ডের ভাল্ব আক্রান্ত হলে ভাল্ব সরু হতে পারে।

আ. বেগম : বাম পাশ অবশ কেন হলো?

ডা. মো. তৌফিকুর রহমান : অনেক সময় বাতজ্বর হৃদপিণ্ডের ভাল্ব আক্রান্ত হয়ে বেশি সরু হয়ে গেছে বাম অলিন্ডে বড় হয়ে অলিন্দের কার্যক্ষমতা কমে গিয়ে অলিন্ডের অনিয়মিত হৃদস্পন্দন হতে পারে ফলে বাম অলিন্ডে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে এবং এ জমাট বাঁধা রক্ত আলিন্দ থেকে ব্রেইনে চলে যেতে পারে এবং ব্রেইনের রক্তনালিতে জমাট রক্ত আটকে গিয়ে ব্রেইনে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হতে পারে ফলে ব্রেইন স্ট্রোক হতে পারে।

লেখক : এমবিবিএস (ডিএমসি), এমডি(কার্ডিওলজি), এফসিপিএস (মেডিসিন), এফএসিসি (আমেরিকা), এফএসিপি, এফএএসই, এফআরসিপি, এফসিসিপি, এফইএসসি, এফএএইচএ, এফএপিএসআইসি, অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি; চেম্বার : মেডিনোমা, মালিবাগ মোড়, সোহাফ টাওয়ার।

বাতজ্বরের জটিলতা

 প্রফেসর (ডা.) মো. তৌফিকুর রহমান (ফারুক) 
২৪ জুলাই ২০২১, ০৩:৩৪ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

মাস্টার আবির ১৪ বছর বয়স, মাঝে মাঝে গলা ব্যথা হয়, তিনদিন ধরে বাম হাঁটুর গিরা ফুলেছে এবং হাঁটতে পারে না। সাতদিন আগে তার ডান হাঁটুর ব্যথা হয়েছিল এবং ব্যথার ওষুধ খাবার পর এখন ডান হাঁটুর ব্যথা কম। আবিরের বাতজ্বর সংক্রান্ত পরীক্ষা করা হলো।

আবিরকে ২১ দিন অন্তর অন্তর বাতজ্বরের প্রতিরোধমূলক পেনিসিলিন ইনজেকশন দিতে বলা হয় ১৯ বছর বয়স পর্যন্ত এবং মাঝে মাঝে ফলো-আপের জন্য আসতে বলা হলো। আবিরের অভিভাবক প্রশ্ন করলেন যে আবিরের কি বাতজ্বর গিরা ছাড়াও হৃদপিণ্ড আক্রমণ করতে পারে কি না?

ডা. মো. তৌফিকুর রহমান : হ্যাঁ বাতজ্বরে আবিরের প্রথম যেমন হাঁটু আক্রান্ত হয়েছে, তেমনি অন্য গিরাগুলো সাধারণত: বড় গিরাগুলো আক্রান্ত হতে পারে। সেই সঙ্গে হৃদপিণ্ডের ভাল্ব মাংশপেশিতে এবং বাইরের পর্দাও আক্রান্ত হতে পারে। সে জন্যই আবিরকে প্রতি ৩/৬ মাস অন্তর অন্তর ফলোআপে আসতে হবে এবং মাঝে মাঝে ইকোকার্ডিওগ্রাম পরীক্ষা করার প্রয়োজন হতে পারে।

মাস্টার লিমন, ১৫ বছর বয়স, মাঝে মাঝে গলা ব্যথা করে, এখন ৪ দিন ধরে প্রচণ্ড জ্বর বুক ধড়পড় ও নিঃশ্বাসের কষ্ট হচ্ছে। লিমনকে শারীরিক পরীক্ষার পাশাপাশি বাতজ্বর সংক্রান্ত রক্ত পরীক্ষা ইকোকার্ডিওগ্রাম ও অন্য পরীক্ষা করা হলো। লিমনের বাতজ্বর রোগ ধরা পড়ার পাশাপাশি বাতজ্বর হৃদপিণ্ডের ভাল্ব আক্রান্ত হওয়া ধরা পড়ল। লিমনকে বাতজ্বরের ওষুধ দেওয়ার পাশাপাশি পরবর্তীতে বাতজ্বর আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমানোর প্রতিরোধ পেনিসিলিন ইনজেকশন ২১ দিন পরপর নিতে বলা হলো এবং বাতজ্বরে ভাল্ব আক্রান্ত হওয়ার বিশ্রামের পরামর্শ দেওয়া হলো।

লিমনের অভিভাবক প্রশ্ন করলেন, লিমনের কি আবার ও ভবিষ্যতে বারবার বাতজ্বরে আক্রান্ত হতে পারে?

ডা. মো. তৌফিকুর রহমান : হ্যাঁ, লিমন বারবার বাতজ্বরে আক্রান্ত হতে পারে, তবে যাতে ভবিষ্যতে আর আক্রান্ত না হয় সে জন্যই লিমনকে প্রতি ২১ দিন পরপর ইনজেকশন নিতে হবে।

অভিভাবক : ওষুধ নিয়মিত না খেলে ভবিষ্যতে লিমনের কি কোনো জটিলতা হতে পারে?

ডা. মো. তৌফিকুর রহমান : হ্যাঁ, নিয়মিত বাতজ্বরের ট্যাবলেট বা ইনজেকশন না নিলে ভবিষ্যতে লিমনের ভাল্ব মোটা হয়ে যেতে পারে। তাতে ভাল্বের মুখ অত্যন্ত সরু হতে পারে, যাকে আমরা স্টেনোসিস বলি, অথবা ভাল্ব বেশি নষ্ট হয়ে ভাল্বের কাজ নষ্ট হতে পারে, ফলে ভাল্ব লিক্ করতে পারে। একে রিগারজিটেশন বলে। ভাল্বের বেশি পরিমাণ নষ্ট হলে ভবিষ্যতে ভাল্ব কৃত্রিম ভাল্ব দ্বারা পরিবর্তন করার প্রয়োজন হতে পারে অথবা বেলুন দিয়ে ভাল্ব এর মুখ বড় করার প্রয়োজন হতে পারে, অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও রোগীর জন্য কষ্টদায়ক। এ ছাড়াও বারবার ভাল্ব আক্রান্ত হলে হৃদপিণ্ডের মাংশপেশি আক্রান্ত হলে অথবা ভাল্ব আক্রান্ত হলে রোগীর হার্ট ফেইলার হতে পারে অথবা হৃদপিণ্ডের চারপাশে পর্দা আক্রান্ত হলে হৃদপিণ্ডের চারপাশে পানি জমতে পারে। যাকে পেরিকার্ডিয়াল ইফিওশান বলে।

মিস ফারিয়া ১৬ বছর বয়স, গত ৫ দিন ধরে প্রচণ্ড জ্বর, গিরা ব্যথা, বুক ধড়পড় ও শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। ফারিয়াকে বাতজ্বরের ও অন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করার পর ইকোকার্ডিওগ্রামে ধরা পড়ল ফারিয়ার হৃদপিণ্ডের ভাল্ব মারাত্মকভাবে আক্রান্ত ও হৃদপিণ্ডের মাংশপেশি আক্রান্ত হয়ে হৃদপিণ্ডের কার্যক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। ফারিয়াকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো এবং পূর্ণ বিশ্রামসহ অন্য ওষুধ দেওয়া হলো। ১ সপ্তাহ পর ফারিয়ার শ্বাসকষ্ট ও বুক ধড়পড় কমে গেল। ফারিয়ার অভিভাবকরা কতগুলো প্রশ্নের উত্তর জানতে চান ও কিছু পরামর্শ চান-

অভিভাবক : ফারিয়ার বর্তমান হৃদপিণ্ডের যে ক্ষতি হলো তা কি ভালো হবে?

ডা. মো. তৌফিকুর রহমান : হ্যাঁ, ফারিয়ার হৃদপিণ্ডে ভাল্ব ও মাংশপেশিতে আক্রান্ত হওয়ার ফলে যে হার্ট ফেইলার হয়েছে তা আস্তে আস্তে উন্নতি হবে এমনকি হƒদপিণ্ডের কার্যক্ষমতা যে হ্রাস পেয়েছে তা আস্তে আস্তে উন্নতি হয়ে স্বাভাবিক হয়ে আসতে পারে, নিয়মিত ওষুধ খেলে।

মিসেস খাতুন, ৩০ বছর বয়স গত ২ মাস ধরে শ্বাসকষ্ট হয় একটু বেশি পরিশ্রম করলে, সিড়ি দিয়ে উঠতে গেলে। তার প্রয়োজনীয় পরীক্ষায় ধরা পড়ল যে, তার হৃদযন্ত্রের মাইট্রাল ভাল্ব সরু হয়েছে এবং সে কারণে রক্ত পরিমাণ মতো ভাল্ব দিয়ে অতিক্রম করতে না পারায় রক্ত ফুসফুসে জমা হয়ে ফুসফুসের রক্তনালির রক্তচাপ বেড়ে গেছে। রোগীকে আর ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার পর কিছু ওষুধ প্রদান করা হলো। রোগীর ১০ দিন পর শ্বাসকষ্ট কমে গেল এবং নিয়মিত ওষুধ খাবার পরামর্শ দেওয়া হলো। মিসেস খাতুন কিছু প্রশ্নের উত্তর জানতে চান ও কিছু পরামর্শের জন্য বলেন।

মিসেস খাতুন : ভাল্ব কেন সরু হলো?

ডা. মো. তৌফিকুর রহমান : বাতজ্বর বারবার আক্রান্ত হলে ভাল্ব সরু হতে পারে।

মিসেস খাতুন : কিন্তু আমার তো কখনই বাতজ্বর বা গিরা ব্যথা ছিল না।

ডা. মো. তৌফিকুর রহমান : সাধারণত ৫০ ভাগ ক্ষেত্রে যাদের হার্টের ভাল্ব আক্রান্ত হয়েছে কোনো সুনির্দিষ্ট বাতজ্বরের ইতিহাস পাওয়া যায় না। তাই যদি কারও গিরা ব্যথা বা গিরা ফুলা নাও থাকে কিন্তু ঘন ঘন জ্বর ও গলা ব্যথা হয় তাদের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ও ফলোআপে থাকা উচিত।

মিসেস খাতুন : ভবিষ্যতে কি এ রোগের জন্য অপারেশন লাগতে পারে?

ডা. মো. তৌফিকুর রহমান : নিয়মিত ওষুধ খেলে সাধারণত: এ রোগ আর বাড়ে না, তখন নিয়মিত ভাবে ফলোআপে থাকা উচিত যে হৃদপিণ্ডের ভাল্বের সরু হওয়ার পরিমাণ বা মাত্রা ক্রমশ : বাড়ছে কি না। যদি পর্যাপ্ত ওষুধ খাওয়ার পরও রোগীর শ্বাসকষ্ট হয় এবং ভাল্বের সরু হওয়ার মাত্রা বেশি হয় তবে সে ক্ষেত্রে ইন্টারভেনশনের মাধ্যমে ভালভুলোপ্লথি বা ভাল্ব মোটা করা অথবা অপারেশনের মাধ্যমে ভাল্বের মুখ মোটা করা বা ভাল্ব পরিবর্তন করে কৃত্রিম ভাল্ব সংযোজন করা লাগতে পারে।

মিসেস আ. বেগম, ৫০ বছর বয়স, থাকেন কুড়িগ্রামে, এসেছেন গত ৫ মাস ধরে বুক ধড়পড় করে ও দু’মাস ধরে শ্বাসকষ্ট হয়। কিন্তু গত ৩ দিন আগে হঠাৎ করে বামপাশে দুর্বল ও অবশ হয়ে গেছে। মিসেস আ. বেগমকে প্রয়োজনীয় পরীক্ষার পাশাপাশি ইকোকার্ডিওগ্রামে ধরা পড়ল যে রোগীর হৃদপিণ্ডের বামপাশের একটি ভাল্ব মাইট্রাল ভাল্বের মুখ সরু হয়ে গিয়েছে এবং হৃদপিণ্ডের বাম অলিন্ডে রক্তের জমাট বেধে এবং ইসিজি তে দেখা গেল রোগীর অনিয়মিত হৃদস্পন্দন। ব্রেইনের সিটি স্ক্যান পরীক্ষার দেখা গেল ডানপাশে ব্রেইন স্ট্রোক হওয়ার পাশাপাশি অবশ হয়ে গেছে। তাই রোগীর রোগগুলো হলে মাইট্রাল স্টেটোনোফ সঙ্গে লেফ্ট এট্রিয়াল থ্রোম্বাস আছে এট্রিয়াল ফিব্রিলেশন ও ইস্কোমিক স্ট্রোক। মিসেস আ. বেগম কিছু প্রশ্নের উত্তর জানতে চান ও এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরামর্শ চান-

আ. বেগম : তার কেন হৃদপিণ্ডের ভাল্ব সরু হলো?

ডা. মো. তৌফিকুর রহমান : বাতজ্বর বারবার হƒদপিণ্ডের ভাল্ব আক্রান্ত হলে ভাল্ব সরু হতে পারে।

আ. বেগম : বাম পাশ অবশ কেন হলো?

ডা. মো. তৌফিকুর রহমান : অনেক সময় বাতজ্বর হৃদপিণ্ডের ভাল্ব আক্রান্ত হয়ে বেশি সরু হয়ে গেছে বাম অলিন্ডে বড় হয়ে অলিন্দের কার্যক্ষমতা কমে গিয়ে অলিন্ডের অনিয়মিত হৃদস্পন্দন হতে পারে ফলে বাম অলিন্ডে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে এবং এ জমাট বাঁধা রক্ত আলিন্দ থেকে ব্রেইনে চলে যেতে পারে এবং ব্রেইনের রক্তনালিতে জমাট রক্ত আটকে গিয়ে ব্রেইনে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হতে পারে ফলে ব্রেইন স্ট্রোক হতে পারে।

লেখক : এমবিবিএস (ডিএমসি), এমডি(কার্ডিওলজি), এফসিপিএস (মেডিসিন), এফএসিসি (আমেরিকা), এফএসিপি, এফএএসই, এফআরসিপি, এফসিসিপি, এফইএসসি, এফএএইচএ, এফএপিএসআইসি, অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি; চেম্বার : মেডিনোমা, মালিবাগ মোড়, সোহাফ টাওয়ার।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন