ধূমপায়ী যেভাবে নিজেকে বিষাক্ত করে

  ডা. মো. সাঈদ এনাম, সাইকিয়াট্রিস্ট ২৪ মে ২০১৮, ২২:১৬ | অনলাইন সংস্করণ

সিগারেট

একটি সিগারেটের দৈর্ঘ্য প্রায় ৭ থেকে ৮ সেমি। এই ৭ বা ৮ সেমি দৈর্ঘ্যের সিগারেটের সবটুকু নিকোটিন গ্রহণ করতে একজন ধূমপায়ীর জ্বলন্ত সিগারেটে প্রতি ১০ সেকেন্ড অন্তর অন্তর মোট ৮ থেকে ১০ বার টান দিতে হয়। এতে ৫ মিনিটে তিনি প্রায় ২ মি. গ্রাম নিকোটিনের সবটুকুই গ্রহণ করেন।

এই গৃহীত নিকোটিন প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট ধরে ধূমপায়ীর ব্রেইনে তার বিষক্রিয়া চালাতে থাকে। সিগারেটের ধোঁয়া নিঃশ্বাসের সঙ্গে নেয়ার সেকেন্ডের মধ্যে তা অন্তঃক্যারোটিড ধমনী বা ইন্টারনাল ক্যারোটিড আর্টারি দিয়ে ব্রেইনের গুরুত্বপূর্ণ এরিয়াগুলোতে পৌঁছে যায় এবং তার বিষক্রিয়া শুরু করে।

সিগারেট এর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকারক উপাদান নিকোটিনের গঠন ধূমপায়ীর ব্রেইনের ডোপামিন নির্গমনকারী কোষগুলো গায়ে লেগে থাকা নিকোটিন-এসিটাইল কলিন রিসেপটরের সঙ্গে জোট বেঁধে তার বিষক্রিয়া শুরু করে। ফলে ব্রেইনে অস্বাভাবিক পরিমাণে ডোপামিন তৈরি হয়। এই ডোপামিন হরমোনের আরেক নাম "ভালোলাগা হরমোন" বা "আনন্দ হরমোন যা মানুষের দেহে মনে ক্ষণিক পরিমাণ ভালোলাগা বা আনন্দ-ফুর্তির আবহ তৈরি করে।

ডোপামিনের প্রভাবে ধূমপায়ী প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট কিছুটা প্রশান্তি ও ভালোলাগা অনুভব করেন। কিন্তু অল্প সময় পর ব্রেইনে নিঃসরিত এই ডোপামিন ফুরিয়ে যায় ফলে ধূমপায়ী পুনরায় অবসাধ, ক্লান্তি, অমনোযোগিতা, হতাশাবোধ করেন এবং তা থেকে মুক্তি পেতে তিনি পাগলের মতো সিগারেট খুঁজতে থাকেন। এটাকে বলে নিকোটিন ডিপেনডেন্স। অর্থাৎ আনন্দের জন্য তিনি সিগারেটের প্রতি অযথা নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

এভাবে ভালোলাগার অনুভূতি বজায় রাখতে অর্থাৎ আর্টিফিশিয়ালি ডোপামিন নিঃসরণ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে সারা দিনে একজন নিকোটিন ডিপেনডেন্ট ধূমপায়ীর গড়ে ৩০টির অধিক পরিমাণে সিগারেটের স্টিক গ্রহণ করতে হয়। একে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলে "নিকোটিন ডিপেনডেন্স ডোপামিন ফ্ল্যাশ", বা "নিকোটিননির্ভর "ডোপামিন নিঃসরণ"

নিকোটিনের টলারেন্সি বৈশিষ্ট্যের জন্য ধূমপায়ী কে ধিরে ধিরে সিগারেট গ্রহণের পরিমাণ বাড়াতে হয়। অর্থাৎ আগে যে পরিমাণ সিগারেট খেলে আনন্দ-ফুর্তি বা ভালোলাগার অনুভূতি পেতেন, ক্রমাগত ধূমপানের ফলে তার ব্রেইনে এমন কিছু পরিবর্তন চলে আসে যে দিন দিন তাকে একই পরিমাণ আনন্দ পেতে আরও বেশি পরিমাণে সেগারেট খেতে হয়। অর্থাৎ প্রথম প্রথম একজন ধূমপায়ী যে পরিমাণ সিগারেট নিতেন মাস বা বছর পর দেখা তাকে তার চেয়ে দ্বিগুণ পরিমাণসংখ্যক সিগারেট নিতে হয়।

আর এভাবে ধূমপান করতে করতে সিগারেটে থাকা নিকোটিন ও অন্যান্য মারাত্মক রোগ সৃষ্টিকারী উপাদানের ক্ষতিকারক বিষক্রিয়ায় ধূমপায়ীর ব্রেনের ডোপামিন নির্গমনকারী নিউরন নিঃশেষ হয়ে যায় এবং ক্রমাগত ধূমপায়ী স্থায়ী ডিপ্রেশন, তীব্র যৌন অক্ষমতা, মানসিক রোগ, মরণঘাতী ক্যান্সারসহ ডায়াবেটিস, হাইপ্রেশার, ব্রেইন স্ট্রোক এবং হার্ট এটাকের ঝুঁকিতে পড়েন।

এছাড়াও নিকোটিনের প্রভাবে দেহে এন্টিঅক্সিডেন্ট (E&C) ও এন্টিক্যান্সার( A & B5) ভিটামিন কমে যায় ফলে ধূমপায়ীর সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা প্রায় এক যুগের অধিক কমে যায় এবং ফুসফুসসহ দেহের অন্যান্য অঙ্গ ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ৯০ শতাংশ বেড়ে যায়।

নিকোটিনের ডিপেনডেন্স, টলারেন্স ও এডিকশন বৈশিষ্ট্যের জন্য একজন ধূমপায়ীর পক্ষে ধূমপান ত্যাগ করা একসময় দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। তবুও চাইলেই একজন ধূমপায়ী ধূমপান ত্যাগ করতে পারেন। এর জন্য প্রথমত, প্রয়োজন ধূমপান ত্যাগের প্রতিজ্ঞা।

দ্বিতীয়ত, ধূমপায়ী সঙ্গীকে বর্জন করা। যেহেতু ধূমপায়ীয় গায়ে লেগে থাকা নিকোটিনের গন্ধ আর সিগারেটের প্যাকেটের দৃশ্য ব্রেইনের হিপোক্যাম্পাল এবং নিউক্লিয়াস একুমবেন্স এরিয়া কে নিকোটিন নিতে পুনরায় স্টিমুলেশন বা তাগাদা দেবে।

তৃতীয়ত, প্রয়োজন ১৫-২০ মিনিট পরপর সাপ্লিমেন্টারি ভিটামিন এ, ই ও সি সমৃদ্ধ ফল (কমলা লেবু বা লেবুর শরবত) খাওয়া, যেহেতু নতুন করে সিগারেট এর মাধ্যমে নিকোটিন না নেয়ায় ১৫-২০ মিনিট পর নিকোটিন এর ঘাঠতির জন্যে উইথড্রল সিমটম দেখা দেয় এতে ধূমপায়ী পুনরায় নিকোটিন নেয়ার জন্য তার ব্রেইন উদগ্রীব হয়ে যায়।

এভাবে একজন ধূমপায়ী ২-৩ সপ্তাহ সহ্য করে চললে তার জন্য ধূমপান স্থায়ীভাবে ত্যাগ করা যায়। কারণ ২ থেকে ৩ সপ্তাহ পর নিকোটিনের প্রতি আগ্রহ ব্রেইন থেকে প্রায় মুছে যায়, এবং ব্রেনের ডোপামিন নির্গমনকারী কোষগুলো পুনরায় তার আগের মতো স্বাভাবিক পরিমাণে ডোপামিন নির্গমন করতে থাকে।

আরেকটি ব্যাপার লক্ষ রাখতে হবে একজন ধূমপায়ী ধূমপানের ফলে নিজে যে পরিমাণে ক্ষতির সম্মুখীন হন, তার চেয়ে দ্বিগুণ পরিমাণে ক্ষতির শিকার হন তার পাশে থাকা ব্যক্তি। একে বলে পেসিভ স্মোকিং। তাই নিজের অফিস, ঘরে, বেডরুমে, সহকর্মী, স্ত্রী, পুত্র-কন্যাদের সামনে ধূমপান করে তাদের জীবনকে ক্যানসার, ডায়াবেটিস, ডিপ্রেশনসহ নানান রোগের জন্যে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবেন না।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা। ইসলাম ধর্মে পরিষ্কার বলা আছে যে দ্রব্য জীবন ধারণের জন্যে ক্ষতিকর এবং যে দ্রব্য আপনার মধ্যে আসক্তি বা নেশা তৈরি করে তা থেকে আপনাকে বিরত থাকতেই হবে। আর ধূমপান ছাড়ার জন্য রোজার মাস খুবই উপযোগী সময়। কারণ এ মাসে ইবাদত বন্দেগিতে মন ব্যস্ত থাকায় যে কোনো ভালো সিদ্ধান্ত সহজেই শক্তভাবে বাস্তবায়ন করা যায়।

লেখক: ডা. মো. সাঈদ এনাম, সাইকিয়াট্রিস্ট।

ঘটনাপ্রবাহ : ডা. সাঈদ এনামের লেখা

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter