নিষ্ঠুর সময়

  ডা. শেখ মোহাম্মদ নূর-ই-আলম ডিউ ২৫ মে ২০১৮, ২০:১০ | অনলাইন সংস্করণ

ডা. শেখ মোহাম্মদ নূর-ই-আলম ডিউ
ডা. শেখ মোহাম্মদ নূর-ই-আলম ডিউ

সার্জারি ভবনের এখানটায় বাতাস এত দমকা করে আসে যে চুল সামলে রাখা দায়। এখানে বসে থেকে নদী দেখতে দেখতে সারা দিন চলে যেতে চায়। আকাশে মেঘ করেছে। নদীর এক ধারের জল নিকষ কালো। আরেক ধারে আলো ঝলমল।

বুকের ভেতর থেকে কান্নার একটি দমকা হাওয়া নিশ্বাস হয়ে বুক ফেটে চোখ ফেটে বের হয়ে আসতে চায়।

ঘষা কাচের মত সব ঝাপসা হয়ে আসে।

বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে জানালার গ্রিলে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে থাকে অনামিকা। এ ক্যাম্পাস এ নদী এ বাতাসের দমকা টান সব তার মুখস্থ।

গ্রিলে চিবুক ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে বাতাসের শব্দ শুনতে বেশ লাগে। কেমন ঠাণ্ডা বাতাস। দূরে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে। কতদিন বৃষ্টির ঝাপটা মুখে মাখা হয় না।

মাকে খুব মনে পড়ছে। ঝড় আসার আগে হাঁস মুরগি ঘরে আনার জন্য কত চিৎকার করতেন তিনি। কত ধরনের শব্দ মুখে যে আনতে পারতেন। মনে পড়লে হাসি পায়।

বৃষ্টি হলেই ঘরে খিচুড়ি হত। বাবার খিচুড়ি খুব পছন্দ। বৃষ্টির দিনে খিচুড়ি না হলে বাবার মেজাজ সপ্তমে উঠে যেত। ঘরের সামনের লেবু গাছ থেকে মাথায় গামছা দিয়ে লেবু পেড়ে নিয়ে আসতেন।

একবার বাবা বললেন, লাবু নিয়ে আসি।

বৃষ্টি ভেজা উঠানে একবার পা পিছলে পড়ে গেলেন বাবা।

ও বাবাগো গেছি গো।

মা দৌড়ে গেলেন। দৌড়ে আর বেশী দূর যেতে পারলেন না। তিনিও চিতপটাং।

ও মাগো গেছি গো।

আমাদের হাসি আর থামে না। কোন রকমে উঠে দুজনে অনেকক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজে কাদা ময়লা পরিষ্কার করলেন।

তোরা দাঁড়িয়ে কী দেখিস। সিনেমা? ফাজিল কোথাকার..!

আয় বৃষ্টিতে ভিজ সবাই।

সবাই মিলে সেদিন খুব মজা হল। মায়ের মুখে কী যে এক হাসি ফুটেছিল। ঠাণ্ডায় যখন ঠোট নীল হল তখন ক্ষান্তি দিলেন।

অনেক কষ্ট করে স্কুল কলেজ পেরিয়েছে সে। কত ঈদে বাবা-মা কাপড় নেননি। তাকে ঘিরেই ছিল সব কিছু। সে ডাক্তার হয়ে বাবাকে অনেক দামি একটি পাঞ্জাবি কিনে দেবে।

মাকে দিবে জামদানি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরনের একটি জামদানি তার খুব পছন্দ হয়েছে। বেশি দাম নয়। সে খবর নিয়েছে। ইন্টার্নশীপের টাকা দিয়েই কেনা যাবে।

কলেজে প্রথম যেদিন পা রাখে বাবার হাত ধরে এসেছে সে। লঞ্চে করে সদরঘাট সেখান থেকে মিটফোর্ড। বাবার হাত শক্ত করে ধরে রিকশায় বসেছে। বাবার হাত একদমই ছাড়তে মন চাচ্ছে না। ছাড়লে যদি বাবা চলে যান। যদি বলে বসেন, মা তুই থাক, আমি চললাম।

ক্যাম্পাসে পা রেখে মনটাই ভালো হয়ে গেল। এপ্রোন পরা ভাইয়া আপুরা ছুটোছুটি করছেন। একদিন তার গলাতেও শোভা পাবে স্টেথোস্কোপ।

ভাবতেই শরীরে কাটা দিয়ে উঠে। আসবে তো সেদিন। ভর্তির কাজ শেষ। ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। বড় আপুদের বেশ ক'জন এপ্রোন পরে ভিজছেন।

বাবা আমি নামি?

নারে মা ঠাণ্ডা লাগবে।

নামি বাবা... দেখো নতুনরাও নেমেছে।

আচ্ছা নাম।

এমন বৃষ্টির ঝাপটা কবে এসেছে মনে পড়ে না। এমন স্বাধীনতা কবে গায়ে মেখেছে মনে নেই। নতুন বান্ধবীদের সাথে হাতে হাত ধরে গোল হয়ে ঘুরছে। এমন হাসি এ ক্যাম্পাস অনেক দিন দেখেনি। বৃষ্টির ঝাপটা মুখে এসে তীরের মত লাগছে।

জানালার গ্রিলে চিবুক রেখে চোখ বন্ধ করে বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করে আছে অনামিকা। বাবা বিছানায় শুয়ে এক দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছেন।

প্যানক্রিয়াসে ক্যান্সার দানা বেঁধে উঠেছে। মেয়েটার জন্য কিছুই রেখে যেতে পারেননি। মেয়ে ডাক্তার হবে, বড় হবে, কত স্বপ্ন। ঝড়ের আগের নিকষ কালো আকাশের মত এক আকাশ চার পাশ ছেয়ে আছে।

মা সরে আয় বৃষ্টিতে ভিজে ঠাণ্ডা লাগবে।

লাগবে না বাবা।

অনামিকার দু'চোখ বেয়ে বৃষ্টি। বাবার বুকে মাথা রেখে জড়িয়ে ধরে।

মারে বুকটাই তো ভাসিয়ে দেলি। কাঁদিস না।

কাঁদবো না বাবা তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যেও না।

নারে মা কোন বাবা কি মেয়েকে ছেড়ে যেতে চায়? চায় না।

বর্ষণমুখর বিকালে নিষ্ঠুর সময় এক অসহায় বাবা-মেয়ের পাশে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সময়ের কাছে একমুঠো সময়ের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা।।

লেখক: ডা. শেখ মোহাম্মদ নূর-ই-আলম ডিউ

১৯তম ব্যাচ, স্যার সলিমুল্লাহ্ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল, ঢাকা।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter