প্রতিটি প্রেগন্যান্সিই ঝুঁকিপূর্ণ

  অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম ২৮ মে ২০১৮, ২১:২৮ | অনলাইন সংস্করণ

অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম
অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম

দেশের বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসার অগ্রজ প্রখ্যাত ইনফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম। নিরাপদ মাতৃত্ব নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। এছাড়াও বন্ধ্যাত্ব সমস্যা, নিরাপদ মাতৃত্ব নিয়ে বিভিন্ন খোলামেলা আলোচনা করেছেন। মেডিকেল মুখপত্র মেডিভয়েসকে দেয়া ওই সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ যুগান্তর পাঠকদের সামনে তুলে ধরা হল।

নিরাপদ মাতৃত্ব বলতে কী বুঝায়?

অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম: একজন গর্ভবতী মা তার গর্ভকালীন সময়ে সম্পূর্ণ সুস্থ ও নিরাপদে থেকে কোনো বিপদ বা ঝুঁকি ছাড়া সুস্থ সন্তান জন্ম দিতে পারাটাকেই আমরা নিরাপদ মাতৃত্ব বলি।

একজন গর্ভবতী মাকে কতবার চেকআপ করাতে হয়? এগুলো কখন করাতে হয়?

অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম: একজন গর্ভবতী যখন তার গর্ভধারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হন, তখন থেকেই রেগুলার চেকআপ করানো উচিত। গর্ভাবস্থার প্রথম তিনমাসে একবার, ২৮ সপ্তাহের পর থেকে ১৫ দিনে একবার এবং ৩৬ সপ্তাহের পর থেকে ৭ দিনে একবার চেকআপ করাতে হবে। তবে WHO এর সুপারিশ অনুযায়ী গর্ভবতী মায়েদের অন্তত ৪টা ভিজিট হওয়া দরকার। ভিজিটগুলো হচ্ছে ১২-১৬ সপ্তাহে একবার, ২৪-২৮ সপ্তাহে একবার এবং ৩২ সপ্তাহের পরে দু'বার।

এই চেকআপগুলো কোথায় কোথায় করানো হয়?

অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম: যেকোন এমবিবিএস ডাক্তারই চেকআপ করতে পারেন। প্রতিটি প্রেগন্যান্সিই ঝুঁকিপূর্ণ-এটা সব ডাক্তারই জানেন। এছাড়া যেখানে সাব-সেন্টার রয়েছে, সেখানে হেলথ ভিজিটররাও চেকআপ করতে পারেন। কারণ তাদের এ বিষয়ে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা রয়েছে। তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যদি মনে করেন ডাক্তারদের জানাতে হবে, সেক্ষেত্রে তারা রেফার করে দেন। এরপর উপজেলা বা জেলা পর্যায়ে অভিজ্ঞ চিকিৎসকরাই চেকআপ করেন।

গর্ভাবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষণগুলো কী কী?

অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম: অবশ্যই ঝুঁকিপূর্ণ কিছু সাইন বা লক্ষণ আছে, যেমন গর্ভাবস্থায় যদি রক্তপাত হয়। প্রথম দিকে এবরশন, মোলার প্রেগন্যান্সি এবং একটোপিক প্রেগন্যান্সির জন্য হয়। ২৮ সপ্তাহের পরে গর্ভফুল জরায়ুর নীচের দিকে থাকলে রক্তপাত হয়। গর্ভফুল স্বাভাবিক জায়গায় থাকলেও কখনও জরায়ুগাত্র থেকে ছুটে গেলে রক্তপাত হয়। এগুলো সাংঘাতিক ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া প্রেগন্যান্সির সময় অতিরিক্ত বমি হওয়া, রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া, হাত-পা ফুলে যাওয়া, চোখে ঝাপসা দেখা, উপর পেটে ব্যথা করা, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, খিচুনী হওয়া যা প্রিএকলাম্পসিয়া একলাম্পসিয়াতে হয় এগুলো। পেট বেশি বড় বা খুব ছোট হওয়া, বাচ্চা কম নড়াচড়া করা, পানি ভেঙ্গে যাওয়া, রক্তে সুগার বেড়ে যাওয়া এগুলোও ঝুঁকিপূর্ণ কিছু লক্ষণ।

গর্ভাবস্থায় কী কী টিকা নিতে হয় এবং কখন নিতে হয়?

অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম: গর্ভাবস্থায় টিটেনাস ইনজেকশান দেয়া হয়। সাধারণত দুটি ইনজেকশান নেয়া হয়, বিশ সপ্তাহের পর থেকে একমাসের ব্যবধানে দুটি ইনজেকশন নেয়া হয়। যাদের পাঁচটা ডোজ কমপ্লিট আছে, তাদের আর ইনজেকশন দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

অনেক সময় দেখা যায় গর্ভবতী মায়েরা অপুষ্টিতে ভুগেন, সেক্ষেত্রে করণীয় কী?

অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম: প্রেগন্যান্সিতে যেহেতু বাচ্চাটা মায়ের কাছ থেকে পুষ্টি নিয়ে বড় হয়, এসময় মায়ের অতিরিক্ত ক্যালরি দরকার। একজন স্বাভাবিক মায়ের যে পরিমাণ পুষ্টি প্রয়োজন, একজন গর্ভবতী মায়ের তার চেয়ে বেশি পুষ্টি প্রয়োজন হয়। গর্ভবতী মায়ের প্রতিদিন প্রায় ৩০০ ক্যালরি বেশি দরকার হয়। এই অতিরিক্ত ক্যালরির প্রয়োজন মেটানোর জন্য সব খাবারই কিছু কিছু করে বেশি খেতে হবে। মা যদি না খান, সেক্ষেত্রে মা অসুস্থ হয়ে যাবেন৷ আর বাচ্চাতো মায়ের শরীর থেকে খাবার নিয়ে বড় হয়। যদি মা সুস্থ না থাকেন, সেক্ষেত্রে বাচ্চাও তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিতে পারবে না। বাচ্চার গ্রোথ বা বৃদ্ধি কম হবে। এমনকি নিউরোলজিক্যাল সমস্যাও হতে পারে। কাজেই গর্ভকালীন সময়ে পুষ্টির কোন বিকল্প নেই।

এসময় গর্ভবতী মায়ের প্রতি পরিবারের কর্তব্য বা করণীয় কী?

অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম: পরিবারের করণীয় অনেক বিষয় আছে। প্রেগন্যান্সি মোটেও সহজ জিনিস নয়। প্রতিটি প্রেগন্যান্সিই কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এসময় একটা মানুষের মধ্যে আরেকটা মানুষ তৈরি হয়। এসময়টাতে মায়ের পুরো দৈহিক কাঠামোতেই পরিবর্তন ঘটে। এসময় তার শারীরিক পরিবর্তন হয়, যেমন তার পেট বড় হয়। এছাড়া, এসময় কারো কারো ব্লাড-সুগার কিংবা ব্লাড-প্রেশার বেড়ে যেতে পারে।

গর্ভবতীদের এসময়ে স্বাভাবিক গৃহস্থালি কাজ করতেও কষ্ট হয়। এটা স্বাভাবিক বিষয়। পরিবারের উচিত, এসময়ে তাদেরকে গৃহস্থালি কাজ থেকে বিরত রাখা। একজন মায়ের পর্যাপ্ত বিশ্রাম দরকার।

চাকরিজীবী মায়েদের ব্লাড সার্কুলেশনের সমস্যা দেখা দিতে পারে, যদি তারা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করেন। যার ফলে বাচ্চার গ্রোথও কম হতে পারে। এসময় অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করা যাবে না। বাসার কাজেও তাদেরকে রিলিফ দেয়া উচিত, যাতে তারা বিশ্রাম নিতে পারে।

দুপুরে খাওয়ার পর কমপক্ষে দুঘন্টা বিশ্রাম নেয়া উচিত। না ঘুমালেও অন্তত শুয়ে বিশ্রাম নিতে হবে। হঠাৎ কোন সমস্যা দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত।

ইদানিং বন্ধ্যাত্বের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণ কী? বাচ্চা নেয়ার উপযুক্ত সময় কখন?

অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম: বিশের পরেই যে কেউ বাচ্চা নিতে পারে। বিশের আগে বাচ্চা নেয়া ঝুঁকিপূর্ণ। আবার পয়ত্রিশ বছর বয়সের পর প্রেগন্যান্সি ঝুঁকিপূর্ণ হয়। তখন মা ও বাচ্চার ঝুঁকি বেড়ে যাবে। ইদানিং দেখা যাচ্ছে, অল্পবয়স্ক মেয়েদেরও বন্ধ্যাত্ব দেখা যাচ্ছে। এর কারণ পরিবেশগত হতে পারে, আবার খাবারও অনেকখানি দায়ী। কারণ আজকাল কোন খাবারই ঠিক নেই। সবকিছুতেই ভেজাল। যেকোন খাবারেই আজকাল কেমিক্যাল থাকে।ফল বা খাবারে প্রিজারভেটিভ থাকে। এই কেমিক্যাল দায়ী হতে পারে। পুরুষের বন্ধ্যাত্ব বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ পরিবেশগত দুষণ। এছাড়া বেশি বয়সে বিয়ে এবং ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্টও বন্ধ্যাত্ব বেড়ে যাওয়ার উল্লেখযোগ্য কারণ।

মায়েদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আমাদের দেশের স্বাস্থ্যখাতের পরিবেশ কেমন?

অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম: সরকার তো চেষ্টা করছেন কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে তৃণমূলে সেবা পৌঁছে দেয়ার। সবপর্যায়ে যদি পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা থাকে এবং সেগুলো সবাই পায়, তাহলে সমস্যা নেই। কিন্তু ধরুন, ভবন আছে কিন্তু লজিস্টিক সাপোর্ট নেই, সেক্ষেত্রে তো সমস্যা। শুধু ডাক্তার থাকলে তো আর হবে না। সেবা দিতে হলে দরকার পর্যাপ্ত ঔষধপত্র, যন্ত্রপাতি, রোগ নির্ণয়ের পর্যাপ্ত সুবিধা। কিন্তু তৃণমূলে এসব কি পর্যাপ্ত আছে? ডাক্তারদের নিজেদেরই কাজের উপযুক্ত পরিবেশ নেই। কাজেই পেরিফেরিতে ডাক্তার ঠিকমত থাকতে পারেন না। এটি একটি জটিল সমস্যা।

মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে চিকিৎসকদের ভূমিকা কতটুকু?

অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম: চিকিৎসকদের ভূমিকা অনেক। তাদের কাজ হচ্ছে নিজেদের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি করে যথোপযুক্ত চিকিৎসা দেওয়া। চিকিৎসকরা উপজেলায় থাকবে আর সরকারের উচিত জনগণের স্বার্থে ডাক্তারদের ভাল এবং নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে দেয়া। কাজের পরিবেশ তৈরি করা ডাক্তারদের কাজ নয়, সেটা কিন্তু নীতি-নির্ধারকদের কাজ। কাজেই ডাক্তারদের ডেডিকেশন এবং সরকারের উপযুক্ত সাপোর্ট মিলেই কমবে। যেমন আগের তুলনায় অনেক কমেছে পেরিফেরিতে ডাক্তারদের সাপোর্ট আছে বলেই।

বলা হচ্ছে, সম্প্রতি সিজারের পরিমাণ বেড়ে গেছে, কারণ কী?

অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম: এটা ন্যাশনাল ওয়াইজ বাড়েনি। বিশেষ কিছু জায়গায় বেড়েছে। আমার চিকিৎসায় যাদের প্রেগন্যান্সি হয় সেগুলো বলা যায় শতভাগই সিজার। মনে করুন, কোন দম্পতির বাচ্চা হচ্ছে বিয়ের ১২/১৪ বছর পরে বা আইভিএফ করে। লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে তারা একটা বাচ্চা নেয়। সেক্ষেত্রে রোগী নিজেই চায় না একটা কঠিন পরিস্থিতি (নরমাল ডেলিভারি) মোকাবেলা করতে বা ঝুঁকি নিতে। ভেজাইনাল ডেলিভারি, সিজারের চেয়ে অবশ্যই উত্তম। কিন্তু ভ্যাজাইনাল ডেলিভারী কখনো কখনো বাচ্চার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ভারত-পাকিস্তানের চেয়ে আমাদের দেশে সিজারের পরিমান কিন্তু বেশি নয়। সিজারের মূল কারণ হচ্ছে, নিরাপদ ডেলিভারি। যেকোন ভ্যাজাইনাল ডেলিভারিতেই কিছু ঝুঁকি আছে। যেমন বাচ্চাটা কেমন অবস্থায় আছে তা পুরোপুরি বোঝা যায় না।

সাধারনত টাকার জন্য কেউ সিজার করে না। এমন অনেক ডাক্তার আছেন যারা বিপদ এড়ানোর জন্য সিজার করে থাকেন। রোগী হাসপাতালে রেখে বাসায় গেলেও টেনশন কাজ করে। কারণ বাসায় গিয়ে মনে হবে, বাচ্চার হার্ট সাউন্ড কেমন আছে? পানির রং কেমন আছে? বাচ্চাটা আটকে যাচ্ছে কিনা? এসব নিয়ে সারাক্ষণ টেনশনে থাকতে হবে। ৎ

আর যার কাছে রেখে যায় সে যদি ওই লেভেলের না হয় তাহলে তার কাছে রেখে যাওয়া মুশকিল। আমাদের যথেষ্ট ঘাটতি আছে। এজন্য ওইরকম এক্সপার্টের কাছে রেখে না গেলে নরমাল ডেলিভারি আসলেই কষ্টসাধ্য। এজন্য এক্সপার্ট মিডওয়াইফ দরকার। অনৈতিক ডাক্তারদের জন্য কোথাও কোথাও অপ্রয়োজনীয় সিজার হয়ে থাকে। তবে রোগী ও চিকিৎসক উভয়পক্ষের ধৈর্য্যের অভাব কিছুটা দায়ী। এই কারণেই দক্ষ মিডওয়াইফের কোন বিকল্প নেই। অবিরাম মনিটরিং, এপিডুরাল এনেস্থেশিয়া এবং প্রয়োজনে কনসালট্যান্ট যদি মনে করেন, মিডওয়াইফই যথেষ্ট, সেক্ষেত্রে পেশেন্টের সেটা মেনে নেওয়ার মানসিকতা, সিজারের হার কমাতে পারে।

সিজারের নেতিবাচক কোন দিক আছে কি না? সিজারের পরে মায়ের কী কী সমস্যা দেখা দিতে পারে?

অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম: নরমাল ইজ নরমাল। সবকিছুই যদি নরমাল হয় তাহলে এর বিকল্প কিছুই নেই। সেটাতো বেস্ট। সিজারের সময় এনেস্থেটিক হ্যাজার্ড, কাটা জায়গায় ইনফেকশন, ব্যথা ইত্যাদি হতে পারে। স্বাভাবিক ডেলিভারির পরে সাথে সাথেই পেশেন্ট হেঁটে বেড়াতে পারে, কিন্তু সিজারের পর অন্তত সাতদিন সে কিছুটা হলেও অসুস্থ থাকে। সিজারের পর যদি কমপ্লিকেশন হয়, তাহলে অন্যান্য আরও কিছু সমস্যা হতে পারে। কমপ্লিকেশন না হলে কোন অসুবিধাই হয় না। তবে ৩-৪বারের বেশি প্রেগন্যান্সি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter