ক্লিয়ার

  ডা. শেখ মোহাম্মদ নূর-ই-আলম (ডিউ) ০৪ জুন ২০১৮, ২০:৪৫ | অনলাইন সংস্করণ

মেডিকেল লেডিস হোস্টেল

রায়হান ফরিদ ভাই ক্যাম্পাসে ব্যাপক জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। তার আকাশ ছোঁয়া জনপ্রিয়তায় যে কেউ ঘায়েল হয়ে যাবার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। জনপ্রিয়তার মূল শক্তি লেডিস হোস্টেল। জুনিয়র মেয়েরা তাকে দারুণ ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে। আমরা মাঝে মধ্যে যে আচারটা, ফিরনিটা পেয়ে থাকি তা ফরিদ ভাইয়ের কাছে আসা জিনিসপত্রের ছিটেফোঁটা। সেই ফরিদ ভাইয়ের কিনা বুকে ব্যথা।

বুকটা কেমন খাঁ খাঁ করছে রে। চিন চিন ব্যাথা। চিন চিন তো করবেই। এত মেয়ের লোড এক হার্ট আর কত নিতে পারে!

-এক কাজ করেন সিসিইউ থেকে একটা ইসিজি করান। দেখেন কার লোড বেশি। চলেন করিয়ে নিয়ে আসি।

-ফাজলামো রাখ। ক্লাসে যা।

-না ভাই খারাপ লাগলে গাফিলতি করবেন না। সোজা সিসিইউতে চলে যাবেন। কাউকে দিয়ে খাবর পাঠাবেন। তারচেয়ে বরং এখন চলেন ঘুরে আসি।

- না দেখি।

ক্লাস থেকে বের হয়ে দেখি ক্যাম্পাস ভারাক্রান্ত। ফরিদ ভাই সিসিইউতে ধবধবে সাদা বিছানায় শুয়ে আছেন। বুকে পেটে বিভিন্ন বল্টু, তার প্যাঁচানো।

সিসিইউর সামনে জুনিয়র মেয়েদের ব্যাপক উপস্থিতি। বড় ভাইয়ের জন্য এমন উদ্বিগ্নতা এর আগে মিটফোর্ডে আর দেখিনি। ১৭তম ব্যাচের মোস্তফা রাশেদুস সামাদ বাপিন- আনিসুর রহমান এলিস-আসাদুজ্জমান খান রিন্টু-জাহিদ হোসেন-আহমেদ চৌধুরী হারুন-বাবরুল আলম-মাহফুজুর রহমান ভূঁইয়া টারজান বাবু-আরশাদ রুবেল- আহমেদ শরীফ-এহসানুল হক সুমি-ফয়েজুর রহমান ভুইঞা টিপু-নাসির উদ্দিন মিঠু ভাই সবাই দৌঁড়ে এলেন। আগে থেকেই জুলফিকার আলী লেনিন, রেজাউল আমিন টিটু ভাই উপস্থিত।

লেনিন ভাই ছিলেন আমাদের সংগঠনের সভাপতি এবং টিটু ভাই সাধারন সম্পাদক। লেনিন ভাই ভেতরে গেলেন। ম্যাডাম-স্যারদের সাথে কথা বললেন। বের হয়ে আমাদের বললেন, জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট হাসপাতালে নিয়ে যেতে পরামর্শ দিয়েছেন। তোমরা রাস্তা ক্লিয়ার কর। খবর পেয়ে ছুটে এলেন সামিউল ইসলাম সাদি-কায়সার নসরুল্লাহ্ খান-শাহিদ আনোয়ার রুমি-রাব্বান তালুকদার লুলু ভাইরা।

এ সময়টা ভয়ানক জ্যামের সময়। বাবুবাজার থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত তিল ধারনের জায়গা থাকবার কথা নয়। বাপিন ভাই এসে বললেন, পোলাপাইন নাইমা পড়। রাস্তা ক্লিয়ার কর।

-অই রিক্সা থাম। এক পা আগাবি না। ভাই যাইবো।

ভাই যাইবো…! কোন ভাই যাইবো…?

-সাহস তো কম না… আবার জিজ্ঞেস করিস কোন ভাই যাইবো। এই এলাকার ভাই কয়টা?

-বুঝছি।

অই ট্রাক থাম কইতাছি। ব্রেক। উপ উপ। ব্রেক ব্রেক। ভাই যাইবো এক চাকা আগাবি তো উষ্ঠা মাইরা ফেলায় দিবো।

-কোন ভাই যাইবো...?

-আবার বেয়াদবি। আবার জিজ্ঞেস করিস কোন ভাই যাইবো… ভাই কয়টা এ এলাকায়...!

-ও বুঝছি। কিন্তু আমারটা ছাইড়া দিয়া আটকান।

-এমন থাবড়া খাবি যে ট্রাক ছাইড়া ভাগবি। এতগুলা পোলাপাইন রাস্তায় চোখে দেখতাছোস না। আবার কয় ছাইড়া দেন। এক্কেবারে জায়গা মত দিমু। গাড়ি ছাইড়া দিয়া কানবি।

-বুঝছি। ওই বুলেট সাইডে দেখ। আর একটা সিগ্রেট আন।

-অই ভ্যান , আবে অই! চুপ কইরা বাতাস খা। কোন শব্দ করবি না। ভাই যাইবো...

গুলিস্থান পর্যন্ত রাস্তা একপাশে ক্লিয়ার করা হল। অ্যাম্বুলেন্স হুইসেল দিতে দিতে পার হয়ে যাচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে দৌঁড়াচ্ছেন ১৭তম ব্যাচের এলিস-জাহিদ ভাইরা। অ্যাম্বুলেন্স পার হতেই অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। ভাই যদি আর না ফিরেন। সে যাত্রায় ফরিদ ভাই ফিরলেন। কিন্তু আমরা চাই তার আরো যা যা লাগে তা যেন করা হয়। সবাই মিলে ফরিদ ভাইয়ের পাশে দাঁড়ালেন। ১৭তম ব্যাচের বড় ভাইরা নেতৃত্ব দিলেন।

শোন পোলাপাইন ফরিদ আমাদের বন্ধু ওর জন্য যা যা করা লাগবে করতে হবে ক্লিয়ার।

-ক্লিয়ার?

-ফরিদ ভাই আমাদের বড় ভাই, লেডিস হোস্টেলের বড় ভাই। যা যা করতে বলবেন তাই তাই করতে হবে। তাই করবো । ক্লিয়ার?

-ক্লিয়ার।

সিএনজিতে উঠেছি। তুমুল বৃষ্টি শুরু হল। রাস্তার ধারে সিএনজি থামিয়ে ড্রাইভার একটি ক্লিয়ার শ্যাম্পু কিনে এনে উন্ডশিল্ড এ মাখিয়ে দিয়ে আকর্ণ বিস্তৃত হাসি দিয়ে বললেন, স্যার সব ময়লা ধুইয়া যাইবো। দেখেন কী ফকফকা গ্লাস। সব ক্লিয়ার।

দুই.

২২তম ব্যাচ ক্যাম্পাসে পা রাখতেই মেয়েটি সবার খুব নজর কেড়েছে। হাসিতে বিমুগ্ধ সবাই। বড়ই সুমিষ্ট গলা। এক বড় ভাই তার প্রেমে মশগুল। কিন্তু বলতে আর পারেন না। সেই ব্যাচেরই এক জুনিয়র ছেলেকে পটানোর দায়িত্ব দিলেন। টাকা পয়সা কোন সমস্যা নয়। চাইনিজ, সিনেমা, বিরিয়ানি, নিউমার্কেট কোন সমস্যা নয়। শুধু তাকে জানাতে হবে উনি ভালোবাসেন। বিধিবাম চাইনিজ খেতে খেতে ওই ছেলেটিই মেয়ের প্রেমে পড়ে গেল!

একদিন দুজনে কমিউনিটি মেডিসিনের বিদ্যুৎ সাশ্র্যয়ী বারান্দায় গল্প শেষে হাওয়া খেতে বের হয়েছে। আমতলায় আমাদের সাথে দেখা।

-কিরে খবর কি?

-খুব ভালো।

-বড় ভাইয়ের খবর কি?

-ভাইকে ক্লিয়ার করে দিছি। আর ঝামেলা করবে না। মন খারাপ করছে। লাভ কী? একটু সান্তনা দিয়েন।

-আচ্ছা। তাহলে রাস্তা ক্লিয়ার।

-জ্বী বস। দোয়া করবেন। পথের কাঁটা ক্লিয়ার।

‌‌তিন.

এটি অবশ্য অন্য মেডিকেলের গল্প। এক বড় ভাই সঙ্গদোষে ‌‌কিছু একটা সেবন করে হোস্টেলে এসেছেন। যতটা সম্ভব দুই পা দুদিকে ছড়িয়ে হেটে হেঁটে টয়লেটে ঢুকলেন। অনেকক্ষণ টয়লেটে কাটানোর পর রুমে আসলেন।

বুঝলে … একটা সমস্যায় পড়েছি। অনেকক্ষণ ত্যাগ করবার চেষ্টা করছি কিন্তু প্যানে তো কিছু পড়ছে না। তাহলে গেল কোথায়। কিছু তো খুঁজে পাচ্ছি না। আচ্ছা বলো তো এতগুলো জিনিষ গেল কোথায়। কে নিল?

নাকে মুখে গামছা বেঁধে বড় ভাইয়ের জিন্সের প্যান্ট খুলে বালতির পর বালতি পানি ঢেলে ধোলাই করা হল। সাবান মাখিয়ে আবার রি-ধোলাই করা হল। এতটা বাদে তার হুঁশ ফিরল।

তাই তো বলি প্যান্ট খুলি নাই বুঝতেই পারলাম না। আমি তো ভাবি জিনিসগুলো যাচ্ছে কোথায়। ঘুরে ঘুরে অনেকক্ষণ খুঁজেছি কিন্তু কোথাও পেলাম না। ছোট ভাই তোমাদের কাছে তো ইজ্জত রইল না। ইজ্জতের চৌদ্দগোষ্ঠী চলে গেল। কিন্তু প্যান্টটা না খুললে পারতে না। সব তো দিলে শেষ করে।

জ্বী ভাই, ইজ্জতের সব শেষ। আপনার আমাদের সবার। এরপর যদি ওই পথে যান প্যান্ট খুলে যাবেন নইলে কিন্তু সব ক্লিয়ার।

ওকে ক্লিয়ার!

লেখক: ডা. শেখ মোহাম্মদ নূর-ই-আলম (ডিউ)

১৯তম ব্যাচ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল, ঢাকা।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter