সুপারবাগ নিয়ে কেন এত শঙ্কা?

  ডা. সাইফুদ্দীন একরাম ২৭ জুন ২০১৮, ২২:১৫ | অনলাইন সংস্করণ

সুপারবাগ নিয়ে কেন এত শঙ্কা?

স্যার জিম ও’নীলের নেতৃত্বে প্রণীত ব্রিটিশ সরকারের অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রিভিউ রিপোর্টে সুপারবাগদের ভবিষ্যৎ দৌরাত্ম্যের যে ছবি তুলে ধরা হয়েছে, তা রীতিমতো ভীতিকর। রিপোর্টটির নাম হলো ‘রিভিউ অন অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (review on antimicrobial resistance)৷’

আগেই আলোচনা করা হয়েছে যে, রিপোর্টটি সুপারবাগ নিয়ে, প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে যাদের কাবু করা যায় না। ফলে ছোটখাটো ইনফেকশন থেকেও রোগীর প্রাণসংশয় ঘটতে পারে, বড় বড় অপারেশনের তো কথাই নেই। এমনকি সন্তানের জন্মদানকালে প্রসূতির পক্ষেও অতীতের মতো একটা মরা-বাঁচার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াতে পারে; কারণ কোনো অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করবে না। হিসাবে বলা হচ্ছে এখন বছরে ৭ লাখ মানুষ সুপারবাগ অর্থাৎ রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে মারা যাচ্ছে।

২০৫০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা বেড়ে বছরে ১০ মিলিয়ন বা ১ কোটি মানুষ সুপারবাগের কারণে প্রাণ হারাবে। আর এর ফলে সারা দুনিয়ায় বার্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ১০০ ট্রিলিয়ন ডলার হতে পারে।

বর্তমানে আমরা যেসব অগ্রগতি নিয়ে গর্ব করি, এই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণে তা সব অর্থহীন হয়ে যেতে পারে। কয়েকটি পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরা যাক-

১. আবুল সাহেব একজন হৃদরোগী। তার হার্টে তিনটি ব্লক ধরা পড়েছে। একজন বিখ্যাত কার্ডিয়াক সার্জন তার বাইপাস সার্জারি করেছেন। অপারেশন খুব ভালো হয়েছে। কিন্তু অপারেশনের পরে দেখা গেল তার ইনফেকশন হয়েছে। প্রথমে ইনফেকশন তেমন মেজর কোনো সমস্যা বলে মনে হয়নি। কিন্তু তিন দিনের মাথায় দেখা গেল আবুল সাহেবের রক্তে ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়েছে এবং অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন দিয়েও তা বাগে আনা সম্ভব হচ্ছে না। অপারেশনের সাত দিন পরে তিনি সেপটিসিমিয়া অর্থাৎ রক্তে মারাত্মক ব্যাকটেরিয়ার অস্বাভাবিক সংক্রমণের কারণে মৃত্যুবরণ করলেন। হার্টের সাকসেসফুল অপারেশন করেও সুপারবাগ অর্থাৎ রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের কারণে তার জীবন রক্ষা করা গেল না।

২. মরিয়ম বেগমের ডান হাঁটুতে জটিল বাতের সমস্যা। একজন বিশিষ্ট অর্থোপেডিক সার্জন তার হাঁটুতে জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট সার্জারি করলেন। খুব সুন্দর এবং সফল অপারেশন হলো। কিন্তু অপারেশনের পরে মরিয়ম বেগমের অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট নিউমোনিয়া ধরা পড়ল। অনেক চেষ্টা করেও তা নিরাময় করা সম্ভব হলো না। সফল জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট সার্জারি হওয়া সত্ত্বেও অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের ফলে মরিয়ম বেগমের জীবন রক্ষা করা গেল না।

৩. রফিকের লিম্ফোমা ধরা পড়েছে। তাকে খুব উন্নতমানের কেমোথেরাপি এবং রেডিওথেরাপি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু থেরাপির কয়েক সপ্তাহ পরে তার শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ ধরা পড়ল। থেরাপি দিয়ে রফিকের লিম্ফোমা নিয়ন্ত্রণে আনা গেলেও, ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ আর ভালো করা গেল না। কারণ কোনো অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েই তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল না।

৪. জরিনা বেগমের প্রথম সন্তান প্রসবের আগে কিছু জটিলতা দেখা দিল। ধাত্রী ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ তার সিজারিয়ান সেকশন করার সিদ্ধান্ত নিলেন। সব কিছুই চমৎকারভাবে শেষ হলো। কিন্তু জরিনার সিজারিয়ানের ক্ষত আর নিরাময় হতে চাইল না। পরে দেখা গেল সেখানে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ হয়েছে এবং তা ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। সফল সিজারিয়ান অপারেশন হওয়া সত্ত্বেও অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের কারণে জরিনা অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন।

এমন অগণিত ঘটনার বর্ণনা শেষ করা যাবে না। অর্থাৎ চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতি সত্ত্বেও সুপারবাগ অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ আমাদের আবার সেই অসহায় প্রাক-অ্যান্টিবায়োটিক যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

লেখক: ডা. সাইফুদ্দীন একরাম, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ কনটেন্ট ক্রেডিট: মেডিভয়েস।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter