শিশু রাইফার মৃত্যু নিয়ে কিছু কথা

  সাবরিনা আরজুমান ০৩ জুলাই ২০১৮, ২২:০৫ | অনলাইন সংস্করণ

শিশু রাইফার মৃত্যু নিয়ে কিছু কথা
শিশু রাইফা। ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রামে ম্যাক্স হসপিটালে ছোট শিশু রাইফার প্যাথেটিক ডেথ নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই। ওই রকম একফোটা বাচ্চা হুট করে নাই হয়ে যাবে, এ জিনিস যেমন বেদনাদায়ক, তেমনি মেনে নেয়া ব্যাখ্যাতীত কষ্টকর, অসম্ভব মা-বাবার জন্য। এ জন্য মা-বাবার জন্য দুনিয়া উল্টে দেয়া বা অসংলগ্ন আচরণ করাও অদ্ভুত বা অন্যায় কিছু না। বরং এই রকমটাই স্বাভাবিক। এমনকি তারা নিজেরা ডাক্তার হলেও, সব বুঝেও মন খচখচ করা বিস্ময়ের নয়।

অতএব, আমি মনে করি, ডাক্তাররা যখন এ নিয়ে বলবেন বা লিখবেন, তখন আবেগের এই দিকটা অবশ্যই লক্ষ্য রাখবেন।

আচরণটা তাহলে কোথায় আপত্তিকর? আপত্তিকর হচ্ছে পুলিশের আচরণ। তদন্ত ছাড়া পুলিশ কোনো ডাক্তারকে হয়রানি করতে পারে না, গ্রেফতার করা বা থানায় নেয়া, কোনোটাই করতে পারে না। এবং এই তদন্তের ভার সংশ্লিষ্ট তথা চিকিৎসক পরিষদের। তা না হলে ভুল/সঠিক বিচার অন্য পেশার কারও পক্ষে সম্ভব নয়।

এখন আসি, ঘটনাটায়। সংক্ষেপে, গলাব্যথা সমস্যায় বাচ্চা নিয়ে এসে ওষুধের দেয়ার পর বাচ্চার খিঁচুনি এবং খিঁচুনি কন্ট্রোল করতে বাচ্চাকে দেয়া ওষুধ, এই দুটো ইস্যু।

একটা, সেডিল ইনজেকশন, সেটা দেখা যাচ্ছে, ডোজ মেনেই দেয়া হয়েছে, খিঁচুনির জন্য। এ ই সারা বিশ্বে প্রথাগত ট্রিটমেন্ট এবং ইমার্জেন্সি। হুট করে এখানে রোগীর একটা স্যাড রেসপন্স, ভাবনার খোরাক জোগায়, কিন্তু কারণ সব সময়ই সরাসরি পরিষ্কার নাও হতে পারে।

জানা নিয়মের বাইরেও যে কোনো পরিণতি যে কোনো রোগীর ক্ষেত্রে হওয়া সম্ভব এবং অবশ্যই ছোট রাইফার ক্ষেত্রে এ রকম কিছু ঘটাটা ভয়ানক হৃদয়বিদারক। ভাবতেই হতাশ লাগছে আমার।

ডাক্তাররা মানুষ, সব কিছুর ব্যাখ্যা পৃথিবীর সবচেয়ে জ্ঞানী লোকের পক্ষেও সম্ভব না। তবে, আবারও বলি, যে কোনো কমপ্লিকেশন এরাইজ করলে যে কোনো ওষুধ, তা যত প্রথাগতই হোক না কেন, কিছু স্ক্রুটিনির দাবি তো রাখেই, অবশ্যই।

দুই নম্বর হচ্ছে, ড্রাগ রিঅ্যাকশন অর আদার কজেজ অব কনভালশন, সেটা বোঝার চেষ্টা। (সব ক্ষেত্রে প্রেসার কমে যাওয়া, এবং ব্রঙ্কোস্পাজম, এসপিরেশন, ইমিডিয়েট অক্সিজেনেশন ফেইলিওর হওয়া খুবই সম্ভব, সঙ্গে আরও অনেক কিছু। যা কিনা চট করে মৃত্যু ডেকে আনতে পারে। আর দুঃখজনক হলো বাচ্চাদের বেলায় অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটে যেতে সময় লাগে না বললেই চলে এসব ক্ষেত্রে। সেখানে আমাদের হাত-পা অনেকটা বাঁধা। সম্ভবত একে আমরা নিয়তি বলে ডাকি। জানি না। আর রাইফার প্রথম থেকেই ছিলো ইনফেকশন, যেটা কিনা স্প্রেড করতে পারে যখন তখন, যত্রতত্র)। সেজন্য দ্বিতীয়বার ফলোআপের জন্য সতর্কতা এবং প্রস্তুতির সঙ্গে একই ওষুধ ব্যবহার অনৈতিক কিছু নয়। কিন্তু আই রিপিট, যথাযথ প্রস্তুতিসহ সতর্কতার সঙ্গে। এখানে আরেকটা জিনিস সিরিয়াসলি ওষুধের এক্সপায়ারি ডেট এবং ইনগ্রাজিয়েন্ট, কোয়ালিটি, ওষুধটা কোন কোম্পানির, সেসব দেখা এবং ও নিয়ে আলাদা তদন্ত করাও জরুরি ছিল। আপাতদৃষ্টিতে সেই জরুরি বিষয়টা প্রতিবেশীদের এক্সাইটমেন্টের কারণে হয়ে উঠছে না বলেই প্রতীয়মান। এসব বিষয়ের উত্তর শুধুমাত্র রাইফার দায়িত্বে থাকা ডাক্তাররাই দিতে পারবেন।

আমাদের মতো করাপটেড একটা দেশে এই বিষয়গুলো কখনোই আলোর মুখ দেখতে পায় না, হয় ইগো এবং ক্ষমতা প্রদর্শনের নির্মম চাপে পড়ে চিড়ে চ্যাপটা। মধ্যে আছে ডাক্তার, যাকে নিয়ে টানাটানি করাটা এদেশে সব শ্রেণিপেশার লোকজনের বড় একটি অংশ গৌরবের এবং যথেষ্ট মনে করে থাকেন। আগেই বলেছি, হসপিটালে জেনারেটর ফেইল হলেও এরা অনায়াসে ডাক্তার পেটায়, দাবি করে তারাই ভদ্র এবং মনে করে সব ধরনের আজেবাজে ব্যবহারের আইনগত ও সামাজিক অধিকার ধারণ করে। ভুলটা এখানে।

এই বিষয়গুলো কখনোই সমাধান হবে না যদি না পারস্পরিক সমঝোতা থাকে।

আপনাকে মনে রাখতে হবে যে আপনার ডাক্তার সব সময়ই আপনার প্রতি সমবেদনা পোষণ করে, অবশ্যই করে, সেটাকে ভেঙে ফেললে সমাধান সম্ভব না। দ্বিতীয়ত হারিয়েছে আপনার, আপনার পেশাজীবী সংগঠনের নয় বা প্রতিবেশীর নয়। অতএব, এসব এক্সট্রার উপদেশ এবং অংশগ্রহণ বিষয়কে ঘোলাটে করা ছাড়া কার্যত কোনো সাহায্য আসলেই করবে না। শোকটা হয়ে যাবে প্রাতিষ্ঠানিক ইস্যু, অথচ ও ছিল একান্তই ব্যক্তিগত, প্রচণ্ড সেনসিটিভ। সতর্ক থাকা দরকার, এটা যেন ভ্যালু না হারায় রোষ বা রেষারেষির মধ্যে পড়ে।

আবারও আসি ঘটনায়। সাংবাদিক কেন, রিকশাচালকের বাচ্চার মৃত্যুর বিষয়টিও ভালো করে পর্যালোচনার দাবি রাখে, দাবি রাখতে পারে জবাবদিহির।

আপনারা জানেন না, এমন একটি বিষয় হলো, সব সরকারি এবং মানসম্মত মেডিকেল কলেজভিত্তিক হাসপাতালে রোগীর এই রকম পরিণতি এবং কেইস কমপ্লিকেশন নিয়ে একটা আলোচনা পর্যালোচনার ব্যবস্থা চালু আছে, এমনকি এটা এথিকসের মধ্যেও পড়ে। অর্থাৎ, কী হলে কী হতে পারত, সে নিয়ে পোস্ট অ্যাডমিশন, পোস্ট অকারেন্স এবং উইকলি মিটিং। (অবশ্য সেসব জায়গায় একটা সমস্যা হচ্ছে ডক্টর পেশেন্ট প্রপরশন এবং সরকারি সাধারণ অব্যবস্থাপনা, যেটা নিয়ে ডাক্তাররা ব্যথিত, ক্ষুব্ধ, কিন্তু সাধারণ জনগণ সেসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। তাদের সব মাথাব্যথা ডাক্তারকে নিয়ে টানাটানিতে। তা না হলে অবস্থার উন্নতি হতে পারত অনেকখানি।)

তো, সেই ব্যবস্থা সব হাসপাতালে বাধ্যতামূলকভাবেই চালু থাকা উচিত। তাহলে বোধয় অনেক ইমপ্রুভমেন্ট সম্ভব। রোগীর পরিবারও যথাযথ একটা সান্ত্বনা পেতে পারে।

আবার এথিকসে কিন্তু জবাবদিহির বিষয়টি স্পষ্টভাবেই আছে, যেটা কিনা রোগী, রোগীর পরিবারের ক্ষতিসমূহ নিয়ে ব্যাখ্যা ইনক্লুড করে। আমাদের দেশে এই বিষয়টার প্র্যাকটিস নেই, থাকা দরকার। এবং এই ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা সাধারণ মানুষের। আবেগ ঠিক আছে, কষ্টও; কিন্তু সেটার যথাযথ প্রয়োগের চেষ্টা না করে দৌড়ে পুলিশ বা প্রতিবেশী/সঙ্গী সাথী নিয়ে হই-হট্টগোল বাঁধানো; ডাক্তারদের সেই সুযোগটা দিচ্ছে নাকি সম্পূর্ণ বদলে দিচ্ছে অবস্থা এবং অবস্থান, তার দিকে নজর দেয়া একমাত্র জরুরি করণীয় এখানে। তাহলেই সম্ভব আমার ক্ষতির বা অঘটনের একটা মোটামুটি ধারণা পাওয়া। সুযোগটা তৈরি করুন।

আরেকটা বিষয় ছোট করে বলে নিই, সেটা হচ্ছে, ইমার্জেন্সি রোগী শুধু ইমার্জেন্সি এটেন্ড করতে পারবেন, এমন ডাক্তারকে দেখানো অভ্যেস করুন, প্রয়োজন অনুযায়ী সিলেক্ট এবং চেইঞ্জ করুন (কথায় কথায় বা ক্রনিক নয়)। অন্যদিকে কল এটেন্ড করবার সময় অন্তত প্রতিটি রোগীর জন্য আলাদা কিছু সময় বরাদ্দ রাখাও বাঞ্ছনীয় একজন ডাক্তারের জন্য, যেন কোনো একটি আপাতদৃষ্টিতে ছোট, সহজ কিন্তু বস্তুতঃ খুব জরুরি, তেমন কিছু কোনোভাবেই তারাহুড়োর কারণে বাদ না পড়ে যায়, যেন আমি ডাক্তারও মানুষ, কিন্তু ডাক্তারের করণীয় কর্তব্যের কোন জায়গায় আপত্তিকর কোনো গ্যাপ না থেকে যায়।

আমাদের উভয়পক্ষেই কিছু ঘাটতি আছে, আছে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত জাতিগত আচরণজনিত ইনএপ্রোপ্রিয়েটনেস। আমাদের দরকার এমন একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি যেখানে উভয়পক্ষের যৌক্তিক অবস্থান এবং সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা হবে। শোধরাতে হবে উভয়পক্ষকে।

আসুন বদলাই (মি টু!)!

সহনশীলতা খুবই জরুরি সব অসম্ভবের মধ্যেও।

মানবতার অবশ্যই জয় হোক।

ছোট্ট রাইফার জন্য আন্তরিক ভালোবাসা আর দোয়া!

লেখক: সাবরিনা আরজুমান, প্রবাসী চিকিৎসক কনটেন্ট ক্রেডিট: মেডিভয়েস

ঘটনাপ্রবাহ : ভুল চিকিৎসায় রাইফার মৃত্যু

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter