চিকিৎসকের পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনে সেক্রিফাইসের গল্প

  ডা. শুভ প্রসাদ দাস ২৮ জুলাই ২০১৮, ১৮:০৩ | অনলাইন সংস্করণ

চিকিৎসকের পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনে সেক্রিফাইসের গল্প
ডা. শুভ প্রসাদ দাস। ছবি: সংগৃহীত

সম্ভবত খুব সচ্ছল পরিবারের লোক ছাড়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখাটা অন্যায়। জানি না, ঠিক আমি ভুল কিনা। নিজেকে নিয়ে ভীষণ ক্লান্ত আমি। টানা দুটি বছর প্রাকটিস করলাম না। সরকারি চাকরির জবান দেয়া, কোর্সে থাকা অবস্থায় প্রাকটিস অনুচিত। আমি আবার জাত গোঁয়ার। যেটা করতে মন সায় দেয় না, আয়ত্তের মধ্যে থাকলে করি না। কীভাবে যে চলছি এই দুটি বছর আমি, আমার পরিবার জানে।

প্রত্যেক মাস শেষ না হতেই বাবা-মাকে ফোন দিয়ে বলা, মাসের এখনো ৪-৫ দিন বাকি আর টাকা নাই হাতে। কীভাবে চলব। বাসায় মাছ শেষ, মেয়ের দুধ শেষ। ৩৯ হাজার ৭১৫ টাকায় ঢাকা শহরে একটা বাসা নিয়া পরিবার চালানো যে কি কষ্টের তা হাড়ে হাড়ে বুঝছি। বাজারে গিয়ে এই দুই বছর কোনো দামি মাছ কিনি নাই। ইচ্ছে হতো বড় এক কেজি বাগদা চিংড়ি বা বড়

একটা শোল মাছ কিনি, বড় সাইজের একটা ইলিশ কিনি। অথচ গ্রামে থাকতে পরিচিত জেলেরা ঘাটে বড় মাছ আসলে ফোন দিতো, স্যার বাসায় পাঠায়া দেই। সেই আমি বাজারে যেয়ে খুঁজতাম ১৫০-২০০ টাকা কেজির মধ্যে মাছ আছে কিনা। মেয়ের জন্য একটা ভালো জামা, বউয়ের জন্য একটা দামি শাড়ি কিনতে পারি নাই এ দুই বছরে।

সবচেয়ে মন খারাপ হয়েছে মেয়ের জন্মদিনে। জন্মদিন আর মাত্র ৫ দিন বাকি। হাতে মাত্র এক হাজার টাকা। মেয়েটা কেকের জন্য পাগল হয়ে যায়। কেক কাটবে, পরী ড্রেস পড়ে জন্মদিন করবে। ভাগ্য ভালো আমি খুব ভালো সাপোর্টিভ বাবা-মা পেয়েছি। ৮ হাজার টাকা পাঠিয়ে বললেন মেয়ের জন্মদিন করো। সানন্দে নিয়েছি। কিন্তু কুঁকড়ে গেছি মনে মনে। তা-ও ভাগ্য ভালো এই সময়েই দীপু ভাই একটা ওটিতে ডাকলেন। কোনো

রকমে মেয়ের জন্মদিন টা সামলালাম। কিন্তু খুব ছোট লাগত নিজের কাছে নিজেকে, খারাপ লাগত পরিবারের জন্য। এ রকম গরিব ডাক্তার কি কেউ চেয়েছিল? আমি একজন বিসিএস ডাক্তার। প্রত্যেক মাসে ঢাকা শহরের খরচ জোগাতে বাবা মায়ের মুখের দিকে এখনো তাকাতে হয়।

এটার কোনো দরকার ছিল না আমার। যেই প্রাকটিস ছিল গ্রামে রাজার হালে দিন কাটাতে পারতাম। কিন্তু কিছু শেখার নেশায় বা আশায়, নিজের এলাকার মানুষকে আরেকটু ভালো কিছু সাপোর্ট দিতে পারার আশায় পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের ট্রাই করা।

খুব জোর চেষ্টা করেছি । দুটি বছর কোনো প্রাকটিস করি নাই, খুব অল্পই বাড়ি গেছি, লাস্টের ৪-৫টা মাস দিনে এটলিস্ট ১৪ ঘণ্টা পড়ছি। পরীক্ষা যেমনই হোক এই কষ্ট আবার করতে হলে আর পারব কিনা জানি না। একেকটা ডাক্তারের পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করার পেছনে কতটা স্যাক্রিফাইসের গল্প জড়ানো থাকে সেটা একমাত্র ডাক্তাররাই জানে।

ডাক্তারি, হেইয়া কত্ত মজাগো যারা ভাবেন, তারা ভাবতেও পারবেন না কতটা পরিশ্রম করতে হয় একজন ডাক্তারকে রাতদিন। যাক সেটা একান্তই যার যার ইভালুয়েশন। মানুষের ভাবনা তো আর চেঞ্জ করা যাবে না। রাত ১টার সময় এই গল্পগুলা বলে হয়তো কারো বিরক্তিভাব তৈরি করতেই পারি। প্লিজ ইগ্নোর ইট ইফ ইউ ওয়ান্ট টু।

কিন্তু গল্পগুলো নিজের জন্যই সংরক্ষণ করা। পাতা উল্টানোর মতো সামনের বছর বা তার পরের বছর ফেসবুক যদি মনে করিয়ে দেয়। একটা সময় হয়তো এই অসচ্ছলতা থাকবে না জীবনে। কিন্তু দিনের পর দিন একটা ভালো কিছুর আশায় অমানুষের মতো খেটে যাওয়ার স্মৃতিগুলো নিশ্চয়ই জীবনে একটা লেসন হয়ে থাকবে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter