চিকুনগুনিয়া জ্বরের ভয়াবহতা!

প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০১৮, ২২:৩৩ | অনলাইন সংস্করণ

  ডা. সাঈদ এনাম

ডা. সাঈদ এনাম

বশির ভাই সরকারি উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। আমার বিসিএস ব্যাচমেট। কিন্তু বয়সে সিনিয়র তাই আমি উনাকে ভাই বলেই সম্বোধন করি। মাঝে মধ্যে আশপাশ দিয়ে যাওয়া-আসা হলে আমার অফিসে উঠেন, আমি প্রেসার-ট্রেসার দেখে দেই ‘গল্প-গুজব’ করি। ভিজিট টিজিট লেনদেন হয় না। তিনি প্রায়শ প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে কিছু একটা নাড়াচাড়া করে বলেন, 'ভিজিট ভিজিট'। 

আমিও সৌজন্য হাসি দিয়ে বলি, 'তার আর দরকার কী'। সহ্যাস্যে শুন্য হাত চালাচালি, বন্ধুদের মধ্যে যেটা হয় আরকি।

আমারও ওদিক যাওয়া আসা থাকলে তার অফিসে যাই। অনেক পাইক পেয়াদা বরকন্দাজ। স্যালুটের পর স্যালুট। তাঁর বডার লাইন ডায়াবেটিস আর হাইপারটেনশন হেয়ালীচ্ছলে আমার হাতেই শনাক্ত হয়। 

সেই থেকে পরামর্শ মতো কঠিন নিয়ম কানুনে চলে ডায়াবেটিস আর প্রেশার চমৎকার নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। যদিও তার যে জব ডেসক্রিপশন আছে, তাতে এমনিতেই তাকে খুবই নিয়ম মাফিক চলাফেরা উঠাবসা করতে হয়।

এক সকালে তার ফোন। 'কী ব্যাপার বশির ভাই, সাত সকালে ফোন?। তিনি জানালেন, 'তাদের বাসায় কেয়ামত চলছে। সবার গায়ে জ্বর। জ্বর মানে ভীষণ জ্বর যাকে বলে 'খই ফোটা' বা 'ডিম পোচ' জ্বর। অর্থাৎ গায়ে চালের দানা বা ডিম পরলে সেটা সাথে সাথে খই বা পোচ হয়ে যাবে। সেই সাথে প্রচণ্ড গা ব্যাথা। যেন কয়েকটা সাপ সাপ কামড় দিয়েছে'। 

আমি বললাম, 'বশির ভাই চিন্তা করেন না। আমি আমার অফিস যাবার আগে আপনাকে দেখে যাবো। সাথে চাল ডিম আর বিষ নামানোর ওযাও নিয়ে আসবো'। 
তিনি বললেন, 'কেনো ভাই, চাল ডিম আর ওযা কেন?'। 

আমি বললাম, 'আরে ভাই আপনিই না বললেন, খই ফোটা আর ডিম পোচ জ্বর, সাথে 'সাপে কাটা বিষ'। আমি নাস্তা করিনি, তাই ওসব নিয়েই আসছি, আপনার গায়ে চড়িয়েই.....হা হা হা'।

বশির ভাইও হাসলেন, 'সাঈদ ভাই আপনি পারেন ও..'।

আসলে আমি উনার ভয়, শংকা কাটাতেই রসিকতা করলাম। আমাদের দেশে মামুলি রোগেও অনেক সময় রোগী প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যায়।

যাইহোক, পাঠকদের সচেতনতার জন্যে বলে রাখি, এরকম হঠাৎ 'খই-ফোটা' বা 'ডিম-পোচ' জ্বর আর সেই সাথে 'সাপে কাটা বিষ' থাকলে মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে বলা যায় জ্বরটি ভাইরাসজনিত। সেই সঙ্গে  যদি তা 'জামাতের' রূপ নিয়ে আসে তবে সেটা নিশ্চিত। 'জামাত' মানে সবাইকে একসাথে আক্রান্ত করে ফেলা। 

ভাইরাসজনিত জ্বরের এটাই কার্ডিনাল ফিচার বা প্রধান লক্ষণ। তাই এতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। ভাইরাস জ্বর অনেক ধরনের তবে যেহেতু হঠাৎ জ্বর সেই সঙ্গে প্রচণ্ড গা ব্যাথা, সুতরাং নিশ্চিত হয়ে বলা যায় চিকুনগুনিয়া বা ডেঙ্গু জ্বর তাদের হয়েছে।

চিকুনগুনিয়া কিংবা ডেঙ্গু  রোগ আসলে খুব একটা মারাত্মক নয়। কিন্তু ভয়, অসচেতনতা ও অপচিকিৎসায় এসব রোগ অনেক সময় মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে। 
প্রাথমিকভাবে কেবল প্যারাসিটামল এবং ঠাণ্ডা পানি দিয়ে গা মুছে দেয়া আর প্রচুর পরিমাণে পানি ও শরবত পান করাই মূল ঔষধ।

চিকুনগুনিয়া জ্বর আমাদের দেশে নতুন। ডেঙ্গু বলা যায় প্রায় দেড় দুই যুগ ধরে বেশি পরিমাণে দেখা দিচ্ছে।  আমরা মোটামুটি সফলতার সঙ্গেই মোকাবেলা করছি, সচেতন হয়েছি, কিন্তু চিকনগুনিয়া নতুন হওয়ায় এ সম্পর্কে আমাদের অনেক ভুল ধারণা ও আতংক রয়েছে। 

চিকুনগুনিয়া কীভাবে হয়?

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া দুই রোগই ছড়ায় মশার মাধ্যমে তাই মশক প্রবণ এলাকায় মশক অনুকূল আবহাওয়ায় এ রোগ বেশি দেখা যায়।  চিকুনগুনিয়া সম্পর্কে আসুন কিছুটা জেনে নেই।

যেভাবে ছড়ায় চিকুনগুনিয়া

শুরুতেই বলেছি এটা ভাইরাস গঠিত রোগ। তবে সাধারণ ভাইরাস রোগের মতো ছোঁয়াচে না। মশার মাধ্যমেই ছড়ায়। প্রথমে চিকুনগুনিয়া আক্রান্ত রোগীকে মশা কামড় দেয়, পরে সেই মশাটি পরিবারের সুস্থ মানুষকে কামড় দিয়ে রোগটি ছড়ায়। মশার কামড় খাবার এক সপ্তাহ/দশ দিনের মধ্যেই এ রোগ দেখা দেয়। 
চিকনগুনিয়া রোগীর সংস্পর্শে আসলে বা হাঁচি, কাশিতে  রোগটি ছড়ায় না। মায়ের দুধের মাধ্যমে শিশুতে রোগটি ছড়ায় না। এমনকি ব্লাড ট্রান্সফিউশনে ও এ রোগটি ছড়ানোর প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

লক্ষণ

ইমিউনোজেনিক রিঅ্যাকশনের ফলে এ রোগে প্রচণ্ড জ্বরের সঙ্গে জোড়ায় জোড়ায় খুবই ব্যথা হয় এবং এ ব্যথার ফলে রোগী "কুকড়ে" যায় এজন্য এর নাম "চিকুনগুনিয়া"। চিকুনগুনিয়া শব্দটির অর্থই হলো কুঁচকে যাওয়া। সেই সঙ্গে গায়ে ঘামাচির মতো লালচে দানা ববা র‍্যাশ থাকতে পারে। এর ব্যথা কয়েকদিন থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে! শুরুতেই প্রচণ্ড জ্বর এবং প্যারাসিটামলে জ্বর কমে না তারপরও প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনো ওষুধ খাওয়া যাবে না।

সতর্কতা

শিশু, বয়োবৃদ্ধ, ডায়াবেটিস, প্রেশার, ক্যান্সার ও গর্ভবতী মায়েরা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই পরিবারের কারো এ জ্বর দেখা দিলে অবশ্যই রোগী ও অন্যরা মশা মুক্ত থাকতে হবে। একবার এ রোগ হলে দ্বিতীয়বার আর হয় না। 

কেউ কেউ বলেছেন, আমার হয়নি কিন্তু আমার বাচ্চাদের হয়েছে, আবার কেউ বলেন আমার হয়েছে কিন্তু বাচ্চাদের হয়নি। এটা কেনো? আসলে অজান্তে অতীতে এ রোগটি হয়ত আপনার কিংবা আপনার বাচ্চার হয়ে গেছে যা শনাক্তই হয়নি। তাই দ্বিতীয়বার হয়নি। এ রোগে সব সময় যে প্রচণ্ড জ্বর, ব্যথা আর র‍্যাস (লালচে দানা) হবে তা কিন্তু না।

করণীয়

এ রোগের বাহক মশা দিনে ও রাতে সব সময় কামড়ায় এবং মশা জমে থাকা পানিতে বাস করে। তাই মশারি, এন্টি মসকিউটো লোশন, ঢিলেঢালা লম্বা পোশাক পরতে হবে এবং আশপাশ জমাট পানিমুক্ত পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। যেহেতু মশার মাধ্যমেই ছড়াচ্ছে সেহেতু মশা দূর করতে সরকার, সিটি কর্পোরেশন,  পৌর কর্পোরেশন এর অপেক্ষা না করে নিজের পালিত আশের পাশের মশার বসতভিটা নিজেই সচেতন হয়ে ধ্বংস করতে হবে।

লেখক: ডা. সাঈদ এনাম (ডিএমসি-কে-৫২)

সাইকিউয়াট্রিস্ট অ্যান্ড ইউ এইচ এফ পি ও, সিলেট।