শুচিবায়ু রোগীর কথা

প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০২:৩৩ | অনলাইন সংস্করণ

  ডা. সাঈদ এনাম, সাইকিয়াট্রিস্ট

ডা. সাঈদ এনাম

'স্যার সোজাই বলি। আম্মুকে বাইরে রেখে আসছি। কখন আবার চলে আসবেন। আমার না, মাথায় সব সময় খুব খারাপ চিন্তা আসে। এমনকি ধর্মকর্ম করতে গেলেও আসে। রাজ্যের সব কুচিন্তা। কখনো মনে হয় সৃষ্টিকর্তা বলে কেউ নেই। সব মিথ্যা। মাঝেমধ্যে তাই সৃষ্টিকর্তাকে গালি দেই। অশ্রাব্য ভাষায় গালি। পরে ভাবি এ আমি কি করলাম!

সৃষ্টিকর্তাকে গালি দিলাম! আমার এখন কী হবে। আমার মতো পাপিষ্ঠা এ ধরণীতে আর নেই। সৃষ্টিকর্তাকে গালি দিয়েছি, আমার এখন মরে যাওয়া উচিৎ। তাই আত্মহত্যা করার কথা মনে হয়...'

‘...আর চিন্তা মানে, রাজ্যের সব কুচিন্তা। একটা ছেলে সামনে দিয়ে গেল অমনি তাকে নিয়ে মনে আসতে থাকে খারাপ খারাপ চিন্তা। এতো খারাপ স্যার বলতে পারব না। তারপর মাথায় ঝিমঝিম শুরু হয়। চিন্তাগুলো সরাতে চাই প্রাণপণ। কিন্তু পারি না। বারবার চলে আসে।

অবশেষে চিন্তা সরাতে না পেরে মাথার চুল ধরে টানি। এ আমি কত ধার্মিক, কত খোদাভীরু, কত রুচিশীল। অথচ আমার মাথায় যুবক ছেলেপুলে দেখলে কী সব বাজে চিন্তা আসে। বলার মতো না...’

‘...আবার মাঝেমধ্যে সামনে কেউ থাকলে মনে হয় তাকে কষে গাল দেই। পৃথিবীর তাবৎ সব গালি তখন জিহ্বায় আগায় কিলবিল করতে থাকে। গালি দিলেই শান্তি পাবো। গালি দিতে গিয়ে আর পারি না। তখন মনে হয়, ‘না না, এ আমি কী করছি। আমি কেন একে গালি দেবো। এতো আমারই ভাই, বাবা, মা, না হয় বোন।’

তখন চিৎকার করে উঠি, ‘না না না’ বলে। সামনে থাকা মানুষটি তখন ভয় পেয়ে যায় কিংবা হেসে উঠে!

বলে, 'এই কী করছো তুমি, কী এত চিন্তা করো, ধ্যানে মগ্ন থাকো ঘন্টার পর ঘন্টা?....'

'...স্যার শুধু খারাপ চিন্তা নয়। ভয়ংকর চিন্তাও আসে। এই যেমন ছোট বাচ্চা একটা সামনে আসলো। মনে হয় তাকে ধরে একটা আছাড় দেই। এগিয়ে যাই আছাড় দিতে। তখনি শুরু হয় নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধ। এ আমি কী করতে যাচ্ছি। না না না এ অন্যায়। আমি কেনো একটা বাচ্চাকে হত্যা করবো। তখন শক্ত হয়ে বসে থাকি। নিজেকে কন্ট্রোল করি, ঘামতে থাকি। তখন হঠাৎ কেউ ডাকলে  সম্ভিত ফিরে পাই।

কেউ তখন আমাকে বলে,  ‘এই ন্যান্সি তুমি এতো ঘামছো কেনো?- আমি তখন চিন্তার জগত থেকে বাস্তবে ফিরে আসি....’’

‘কেন এমন খারাপ আর ভয়ংকর চিন্তা আমার মনে আসে বারবার, যা শত  চেষ্টায় ও সরাতে পারি না?',  স্যার প্লিজ বলুন আমার কী হয়েছে?’

নিজের মনের কথাগুলো বলতে বলতে তরুণী প্রায় ঘেমেই গেলেন। টিস্যু বের করে কপাল মুছলেন। ব্যাগ থেকে মিনারেল ওয়াটার বের করে 'সরি' বলে ঢক ঢক করে পুরোটা খেলেন। আমি কিছু বলছিলাম না, বাধাও দিলাম না, চুপচাপ শুনে যাচ্ছিলাম তার কথা। শুনা উচিৎ, সাইকিয়াট্রিস্টদের কাজই হলো শোনা।

 

দুই.

স্মার্ট তরুণী ন্যান্সী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশুনো শেষ করেছেন সদ্য। দু চারটে প্রাইভেট ফার্ম থেকে চাকরির অফার এসেছে। করবেন কি করবেন না, ভেবে পাচ্ছেন না। এর মধ্যে রোজ রোজ বিয়ের আলাপ। বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে।

বাবা ইউরোপ থাকেন। তারা ‘মা-মেয়ে’ মাঝেমধ্যে যাওয়া আসা করেন বাবার কাছে। শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত ধনী পরিবারের মেয়ে তার ওপর ইউরোপ সিটিজেন। দেখতেও ভালো। তাই রোজ রোজ বিয়ের আলাপ।

এমন পাত্রী বাগাতে সুযোগ সন্ধানী পাত্র বা তাদের অভিভাবকরা তো ঝাপিয়ে পড়বেই।

‘আচ্ছা ন্যান্সি, আপনি বলেন এ চিন্তাগুলো কি আপনি সরাতে চান’

‘জ্বী আমি সরাতে চাই, কিন্তু পারি না। বারবার চলে আসে। মারাত্মক বিব্রত হই। চিন্তাগুলো এতো খারাপ যে, কাউকে বলতে পারি না, নিজের প্রতি ঘিন্না চলে আসে।’

'আমাকে একটি কথা বলুনতো, এক কাজ আপনি বার বার করেন? এই যেমন মোবাইল ভ্যানেটি ব্যাগে নিয়েছেন, কিন্তু মনে হলো নেননি। ব্যাগ খুলে দেখলেন। না ঠিকই আছে, নিয়েছেন। কিংবা ঘর লক করে বেরিয়েছেন, মাঝপথে মনে হলো, দরজা লক করেন নাই। আবার ফিরে গেলে চেক করতে। দেখলেন, না ঠিকই আছে। ঘর লক করা আছে। অথবা চাবির গোছা, কলম, বই ইত্যাদি ব্যাগে নিয়েও কিছুক্ষণ পরপর মনে আসে নেন নাই। বারবার খুলে দেখতে ইচ্ছে করে?'

'জ্বী স্যার, জ্বী জ্বী। একদম এরকমই। শুধু তাই না এক কাজ বারবার করি। যেমন একটা হ্যান্ডনোট তৈরি করলাম। কিছুক্ষণ পর মনে হলো, না ঠিক হয় নাই। আবার নোট তৈরি করতে বসি। টাকা গুনতে গুনতে খেই হারিয়ে বসি। বারবার মনে হয় ভুল করলাম। তাই আবার গুনি, গুনতে গুনতে শেষ'

'ঠিক আছে।  দেখিতো আপনার হাত'

'স্যার হাত কেনো..?' তরুণী দেখাতে চাইলেন না।

'দেখি, লুকাচ্ছেন কেনো?' আমি আবার বললাম।

তিনি ধীরে ধীরে হাতটি টেবিলে উপর রাখলেন। সারা হাত মেহদী মাখা। আঙুলের গোড়ায় গোড়ায়ও মেহদী। আসলে আমি সেটাই দেখতে চাইছিলাম। আঙুলের গোড়া। এধরনের রোগী দের বার বার সাবান দিয়ে হাত ধুবার অভ্যাস থাকে তাই এদের হাতের আঙুলের গোড়ায় ঘা থাকে। মেয়েটি ঘা ঢেকে রাখার জন্যে গাঢ় করে মেহদী দিয়ে রেখেছে।

চেম্বারের দরজায় ঠক ঠক আওয়াজ হলো। এসিস্ট সিস্টার এগিয়ে দরজা খুলে দিলে মাঝবয়সী এক ভদ্রমহিলা প্রবেশ করে বললেন, 'স্যার আমি ন্যান্সীর আম্মু'।

'ওহ আসুন। বসুন',  আমি বললাম।

'স্যার, ন্যান্সী বারন করায় আমি এতক্ষণ বাহিরে ছিলাম। ও বললো কি সব প্রাইভেট কথা, আমার সামনে নাকি বলবেনা'

'ঠিক আছে আপনি বসুন। এসেছেন ভালো হয়েছে। উনার কথা শেষ বলা যায়। আচ্ছা একটা কথা আমাকে বলুনতো, ন্যান্সী কি খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে চান?'

'স্যার, আর বলবেন না। সপ্তাহে চারটি সাবান লাগে ওর। আর বাথরুমে গেলে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা আগে বের হবার নাম নেই। কাপড় বারবার ধুয়। নিজেরটা নিজেই ধুয়। কাজের লোকদের হাত দিতে দেয় না। নিজের বিছানায় কাউকে বসতে দেয়। আমি তার মামনি, এমনকি আমাকেও সে তার ঘরে ঢুকতে দেয় না। তার কাপড় ধুতে দেয় না, ধরতে দেয় না। আমার কান্না আসে মেয়েটির এমন কান্ড আর খাটা খাটুনি দেখে। আমিতো তার মামনি। দ্যাখেন দ্যাখেন তার দুহাত, ধুতে ধুতে কেমন ঘা হয়ে গেছে'।

'আগে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাননি কখনো?'

'না স্যার। ওতো ভালো। মানসিক কোন সমস্যা নয় ওর'

'ওর যে মানসিক কোন সমস্যা নয় সেটা আপনি কিভাবে ভাবলেন?'

'স্যার একে তো আমরা শুচিবায়ু বলি। মানে অধিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা থাকা আর কি। কিন্তু ইদানিং গভীর চিন্তা ধ্যানে থাকে। তারপর  হঠাৎ 'না না' বলে চিৎকার দিয়ে উঠে। তাই ভাবলাম সম্ভবত কোন দুশ্চিন্তায় পেয়েছে। হয়তো পেয়েছেও।

বিয়ে-শাদীর আলাপ চলছে। বিয়েশাদীর  আলাপ চললেতো মেয়েদের এরকম কিছু উল্টাসিধা আচরণ দেখা যায়।

ভাবলাম ডাক্তারের কাছে যাই। গেলাম আমাদের পাড়ার এক ডাক্তারের কাছে। তিনি সব শুনে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানোর পরামর্শ দিলেন।

‘স্যার ওর কী হয়েছে?’

‘ভয় নেই, আপনার মেয়ে ন্যান্সী অবসেসিব কমপালসিভ ডিসওর্ডারের রোগী। একই চিন্তা বারবার আসা, একই কাজ বারবার করা, বারবার হাত ধুয়া, গোসল করা, কাপড়, বিছানা, বালিশ বারবার ধুয়া, কাউকে শেয়ার করতে না দেয়া এগুলোই এর লক্ষণ'

‘জ্বী জ্বী স্যার এর সবই তার মধ্যে আছে। সেকি ভালো হবে না। ভেবেছিলাম বিয়ে দিয়ে দেবো। কিন্তু হঠাৎ মনে হলো, যে নিজের মাকে কোন কিছু শেয়ার করতে দেয় না, সে স্বামী,শ্বশুর-শাশুড়ি এসব কিভাবে সামাল দিবে?’

‘খুব ভালো কাজ করেছেন। বিয়ে না দিয়ে মেয়েকে ভয়াবহ বিপদ থেকে বাঁচিয়েছেন।’

'স্যার আরেকটা কথা। কিছু মনে করবেন না। ওর হাতের আঙুলে খুব  ঘা। এর জন্যে অনেক ডাক্তার দেখিয়েছি, কিন্তু যায় না। বারবার আসে। তাই বিরক্ত হয়ে এই যে এক ডজন পাগলা মলম আনিয়েছি মেয়েটার জন্যে।

বাসায় কাজের বুয়ারা অনেকদিন থেকে বলছিল , ফুটপাতের এই পাগলা মলম নাকি খুবই ভালো। তারা সবাই ভালো ফল পেয়েছে। আমিও ভাবলাম দেখিনা ট্রাই করে। হাজার হাজার টাকাতো খরচ করলাম তার আঙুলের জন্যে। এবার দেখি দুই টাকার পাগলা মলমে কি হয়। ওই যে কথায় আছে না, যেখানে দেখিবে ছাই...',।

তিনি একটু হাসলেন,  ন্যান্সী ও হেসে উঠলেন মায়ের কাণ্ড দেখে।

পাগলা মলম এই আমি প্রথম দেখলাম, তাও আবার ভ্যানেটি ব্যাগে। আরেকবার আরেক ভদ্রমহিলা তার পার্স থেকে গুলের কৌটা বের করে বললেন, যখন মাথা ঝিনঝিন করে তখন দাঁতের গোড়ায় গুল লাগাই।

এতোগুলো পাগলা মলম দেখে আমি বললাম, আন্টি, অসুখতো তার আঙুলে নয়; অসুখটা মনে। পাগলা মলম রেখে দেন বা বুয়াদের দিয়ে দেন। আমি মনের অসুখের ওষুধ লিখে দিই। মন তার ভালো হয়ে গেলে, চিন্তা সব সরে গেলে, হাতের ঘা এমনিতেই সেরে যাবে।

লেখক: ডা. সাঈদ এনাম  (ডিএমসি-কে-৫২) সাইকিউয়াট্রিস্ট এন্ড ইউ এইচ এফ পি ও, সিলেট।