হার্ট অ্যাটাক কাদের হয়, কী করবেন?

  প্রফেসর ডা. রাকিবুল ইসলাম লিটু ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২২:৪৭ | অনলাইন সংস্করণ

হার্ট অ্যাটাক
প্রতীকী ছবি

বিভিন্ন কারণে হার্টের রক্তনালীতে চর্বি ও রক্ত জমাট বেধে রক্তনালীতে বøক সৃষ্টি করে হার্টের কোষের মৃত্যু ঘটায়-চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে হার্ট এ্যাটাক বলে। যেমন ডিপ টিউবয়েলের পানি চৌবাচ্চায় জমা হয়ে নালা/ড্রেইন দিয়ে ধান ক্ষেতের পথে বাধাপ্রাপ্ত হলে ধান মারা যায়-ওকে আমরা ধান এ্যাটাক বলি। ঠিক তেমনি হার্ট এ্যাটাকও তাই।

হার্ট অ্যাটাকের কারণ সাধারনত উচ্চরক্ত চাপ, ডায়াবেটিস, ধুমপান, রক্তে খারাপ চর্বি অতিরিক্ত মাত্রা ((LDL, Total Cholesterol, Triglyceride), ভালো চর্বির কম মাত্রা (HDL), বংশগত কারন (মায়ের বয়স ৫০ এর নিচে অথবা বাপের বয়স ৪৫ এর নিচে -থাকা অবস্থায় হার্ট এ্যাটাক হলে ওই পরিবারের সন্তানদের অল্প বয়সে হার্ট এ্যাটাকের প্রবনতা বেশি থাকে)। এছাড়া অলস জীবন যাপন, মানসিক চাপ ইত্যাদিও কারনে হার্ট এ্যাটাক বেশি হয়।

হার্ট এ্যাটাক হলে সাধারনত বুকের মাঝখানে ব্যাথা, ভারি ভারি ভাব- যা গলা, ঘাড়, পিঠ, হাতের বাম হাত বেয়ে ছোট আঙ্গুল, বুকের বাম দিক বা ডান দিক হয়েও ডান হাতের আঙুল, এমনকি পেটের উপরিভাগ পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে (অনেকে এ ব্যাথাকে গ্যাস্ট্রিকের ব্যাথা মনে করেন), সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত ঘাম, বমি, শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড়সহ অস্থির ভাব হতে পারে। এমনকি রোগী সাথে সাথে মৃত্যুবরণও করতে পারে।

হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি হার্ট এ্যাটাকের শুরু থেকে প্রথম এক ঘন্টার মধ্যে শতকরা ২৫ জন রোগীর মৃত্যু হয়। পরবর্তী ২৪ ঘন্টার মধ্যে আরও ২৫ জনের মৃত্যু হয়। অর্থাৎ প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শতকরা ৫০ ভাগ রোগীর মৃত্যুবরন করতে পারে।

হার্ট অ্যাটাকে করণীয় কেউ হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হলে প্রথমেই ৩০০ মিলিগ্রাম ইকোসপিরিন, ৩০০ মিলিগ্রাম ক্লোপিডেগ্রেল, ২০ মিলিগ্রাম এ্যট্রোভাষ্টেটিন ২০ মিলিগ্রাম প্যান্টোপ্রাজল খেয়ে নিকটস্থ হাসপাতালে পৌছে ইনজেকশন স্টেপটোকাইনেজ দিয়ে দিতে পারলে প্রায় শতকরা ২৫ জন রোগী মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে। পরবর্তীতে করোনারী এ্যানজিওগ্রাম করে হার্টের বøকের পরিমাণ ও সংখ্যা নির্ধারন করে নিয়ে নিম্নোক্ত তিনটি চিকিৎসার মধ্যে একটি নির্ধারন করতে হয়।

১। ছোট ছোট ব্লকের ক্ষেত্রে প্রধান রক্তনালীতে ৪০ ভাগের নিচে বা শাখা রক্তনালীতে ৭০ ভাগের নিচে থাকলে শুধুমাত্র ঔষধ দ্বারাই চিকিৎসা নিয়ে রোগী ভাল থাকতে পারে।

২। কিন্তু ব্লকের পরিমাণ প্রধান রক্তনালীতে ৪০% ও শাখা রক্তনালীতে ৭০% বা তার অধিক হলে বøকগুলোকে বেলুন দিয়ে পরিষ্কার করে ওইখানে (Stent)(যাহা কালভার্টের মত দেখতে) বসিয়ে দেওয়া হয় অনেকে এই পদ্ধতিকে রিং বসানো বলে থাকে। হার্ট এ্যাটাকের প্রথম ৯০ মিনিট থেকে ৩-ঘন্টার মধ্যে এই পদ্ধতি বøক ছুটিয়ে রিং(Stent)বসিয়ে দিলে সবচেয়ে বেশি উপকার পাওয়া যায়-একেই প্রাইমারি পিসিআই (Primary PCI) বলে-যা বর্তমান বিশ্বে হার্ট এ্যাটাকের সর্বাধুনিক চিকিৎসা, যা আমরাই এদেশের চিকিৎসকরা অহরহই করে চলেছি।

৩। যেসব ক্ষেত্রে রিং(Stent)বসানো সম্ভব হয় না, সেক্ষেত্রে বøকগুলোকে পাশ কাটিয়ে নতুন রাস্তা বানিয়ে রক্ত সামনে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয় -এই পদ্ধতিকে বাইপাস সার্জারি বলা হয়। মোদ্দা কথা হল হার্ট এ্যাটাকের ফলে রক্তনালীতে সৃষ্ট বøকের কারনে হার্টের যে অংশ অপর্যাপ্ত রক্ত পায়-সে অংশে উপরোক্ত যে কোন একটি পদ্ধতিতে সঠিক সময়ে পর্যাপ্ত পরিমান রক্ত সরবরাহ করাই মূলকথা।

হার্ট অ্যাটাক পরবর্তী রোগীদের করণীয়

পুনরায় যেন ব্লক না হয়-সেই জন্যে ওষুধ খাওয়াসহ প্রতিদিন বিকাল অথবা সকালে এক ঘন্টা হাঁটতে হবে। চতুস্পদী জন্তু, ঘি, পামওয়েল খাওয়া বন্ধ করতে হবে। খেতে হবে ইলিশ মাছসহ সামুদ্রিক মাছ, শাক-সবজি, চামড়া ছাড়া হাস-মুরগী, রসুন ইত্যাদি। সর্বোপরি মানসিক চাপ পরিহার করে সহজ জীবন ধারন করে চলতে পারলে হার্টকে সুস্থ রাখা সম্ভব।

হার্ট অ্যাটাক হলে সারা বিশ্বব্যাপী উপরোক্ত তিনটি চিকিৎসার যে কোন একটি চিকিৎসাই বিজ্ঞান সম্মত- শুধুমাত্র ওষুধ ও জীবন ধারন পরিবর্তন করে এই চিকিৎসা করার বিজ্ঞান সম্মত নয়তো বটে বরং এই তত্ব অবাস্তব ও সমাজে ভূল বার্তা প্রেরণ ছাড়া আর কিছুই নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রানঘাতি রোগ হার্ট এ্যাটাক নিয়ে সমাজে ভূল বার্তা প্রেরণ করা শাস্তিযোগ্য অপরাধও বটে।

আসুন আমরা এই প্রানঘাতি রোগ থেকে বাচতে সঠিক চিকিৎসার ব্যাপারে সবাই যত্নবান হই।

লেখক: প্রফেসর ডা. রাকিবুল ইসলাম লিটু বিভাগীয় প্রধান, হৃদরোগ বিভাগ, উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ, ঢাকা

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×