বাদামতলী ফলের বাজারে প্রতিদিন বিক্রি শতকোটি
মো. মোস্তাকিম আহমেদ, পুরান ঢাকা
প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২৬, ০৮:৪০ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাজারে সারা বছরই দেশি-বিদেশি নানা ধরনের ফল থাকে। পবিত্র রমজান মাসে সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতারে পুষ্টিকর ফলের চাহিদা থাকে সবচেয়ে বেশি। রাজধানীসহ সারা দেশের মানুষের ফলের চাহিদার প্রায় সবটুকুই জোগান দিয়ে থাকেন রাজধানীর শতবর্ষী ফলের বাজার বাদামতলির আড়তদাররা। দেশে ফল বিক্রির সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার এটি।
বিশ্বের ৪৬টি দেশ থেকে খেজুর, আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙুর, নাশপাতি, ডালিমসহ বিভিন্ন ফল আমদানি হয় এখানকার আমদানিকারকদের মাধ্যমে। এখান থেকেই পণ্য কিনে সরবরাহ করা হয় সারা দেশে।
মঙ্গলবার (৩ মার্চ) সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ছাড়িয়ে আহসান মঞ্জিল পর্যন্ত যেতেই শোনা গেল অনেক মানুষের হাঁকডাক। রাস্তার এক পাশে সারি সারি কাভার্ড ভ্যান থামানো, অন্য পাশে আড়ত। দুই পাশেই চলছে ফল বেচাকেনা। কেউ পাইকারি দামে ফল বিক্রি করছেন, কেউ ব্যস্ত ফলের নিলাম নিয়ে। একদিকে লেবাররা কার্টন নামাচ্ছেন, গদিতে সাজাচ্ছেন অন্যদিকে পাইকাররা ক্রেতার অর্ডার অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করছেন।
বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত বাদামতলী বাজারের এই চিত্র যেন নিত্যদিনের। রমজানের শুরু থেকেই প্রাণবন্ত পুরান ঢাকার বাদামতলী ফলের বাজার। আমদানিনির্ভর ফলের দাম চড়া থাকলেও বেশ চাঙা ভাব লক্ষ্য করা গেছে বাদামতলিতে। ভোর রাত থেকেই শুরু হয় এই বাজারের কর্মযজ্ঞ, যেখানে প্রতিদিনই প্রায় শতকোটি টাকার বেচাকেনা হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রমজান মাসকে কেন্দ্র করে এই বাজারের নিয়মিত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মৌসুমি ব্যবসায়ীরাও। তারা দুই-তিন মাস আগে থেকেই দোকান বা স্লট বুক করে রেখেছিল। উদ্দেশ্য একটাই—ইফতারের প্রধান পণ্য খেজুর এবং বিদেশি ফল বিক্রি করা। এবার আমদানিনির্ভর ইফতার সামগ্রীর দাম তুলনামূলকভাবে চড়া।
খেজুর, বিদেশি ফল, ড্রাই ফ্রুটস এবং প্যাকেজড খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক ক্রেতাই তাদের বাজেট নিয়ে ভাবছেন। রমজানে খেজুরের চাহিদা সাধারণ সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ব্যবসায়ীরা জানান, সারা বছর যা বিক্রি হয় তার চেয়ে এক মাসে বেশি খেজুর বিক্রি হয়। ইফতারের অপরিহার্য পণ্য হিসেবে খেজুর ক্রেতাদের প্রধান পছন্দ।
মৌসুমি ব্যবসায়ী মো. নোমান বলেন, রমজান এলেই বাজারের চিত্র বদলে যায়। ছোট দোকান চালানোর মানুষেরা এই সময় বেশি খেজুর কিনে রাখেন। ইফতারে খেজুরের গুরুত্ব এতটাই বেশি যে, এক মাসে সারা বছরের তুলনায় বেশি বিক্রি হয়।
বাদামতলীর ব্যবসায়ী সাথী ফ্রেশ ফ্রুটসের পরিচালক মো: সাইফুল ইসলাম শান্ত জানান, গত বছর প্রথম রোজা থেকেই বাজার কিছুটা পড়ে গিয়েছিল। এবার ক্রেতাদের উপস্থিতি ভালো, সবাই দরদাম করছেন, দোকান যাচাই করছেন, তারপর পছন্দমতো খেজুর নিচ্ছেন। অন্তত ১৫ রোজা পর্যন্ত বাজারের গতি ধরে রাখা যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। কিছু খেজুরের দাম বেড়েছে, আবার কিছু কমেছে। সামগ্রিকভাবে বাজারের অবস্থা ইতিবাচক। রমজানে বিদেশি ফলের চাহিদাও কম নয়। আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙুর, নাশপাতি—সবই ক্রেতাদের নজর কাড়ছে।
বাদামতলির ব্যবসায়ী মো. জুয়েল হাওলাদার জানান, খেজুরের কার্টনগুলো সাধারণত ৫/১০ কেজির হয়ে থাকে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ১ কেজির কার্টন হয়। ৫ কেজির মেডজুল ৫,৫০০ টাকা, প্রিমিয়ার জার্বো মেডজুল ৭,০০০ টাকা, মরিয়ম ৪,০০০–৫,০০০ টাকা, আজওয়া ৩,০০০–৫,০০০ টাকা, মাবরুম ৪,০০০–৫,০০০ টাকা, মাশরুখ ২,০০০–২,৫০০ টাকা, কালমি ২,৫০০–৩,৫০০ টাকা, সুগাই ২,৮০০–৩,৫০০ টাকা, ছড়া ২,৫০০–২,৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
১০ কেজির কার্টন দাবাস খেজুর ৪০০০-৫০০০ টাকা, তিন কেজি ওজনের সুক্কারি ১৮০০-২৪০০ টাকা, টপ দাবাস ২৫০০-২৭০০ টাকা ধরে কেনাবেচা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে জিহাদি খেজুরের। গত বছর ১০ কেজি কার্টনের দাম ছিল ১৭০০ টাকা, এবার তা হয়েছে ২৭০০ টাকা। তিনি আরও জানান, দামের পার্থক্য আসে মান, সাইজ এবং আমদানির উৎস অনুযায়ী। ক্রেতারা বাজেট অনুযায়ী বাছাই করছেন। অনেকেই একাধিক জাত একসাথে কিনছেন।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ৩৭ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর এবং বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাজী মোহাম্মদ ফরহাদ রানা বলেন, ঢাকার প্রধান আড়তগুলোর মধ্যে বাদামতলী অন্যতম। বাদামতলী ফলের বাজারের গোড়াপত্তন ব্রিটিশ আমলে, ১৯৩৫ সালের দিকে। এই বাজার থেকে সরকার শতকোটি টাকা রাজস্ব পাই। সরকারের উচিৎ এই সম্ভাবনাময়ী বাজারকে যানজটমুক্ত করে আধুনিক এবং ব্যাবসায়ী বান্ধব করা। ফলের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা হয়।
বাকি ৩০ শতাংশ আমদানি হয় ভারত থেকে স্থলপথে; যা সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বুড়িমারী ও হিলি স্থলবন্দর দিয়ে এনে পুরান ঢাকার বাদামতলীতে নিলাম ডেকে বিক্রি করা হয়। এখানে প্রতিদিন দুই থেকে তিনশত ফলের ট্রাক, কন্টিনার এসে জড়ো হয়। শত বছরের পুরোনো এই ফল বাজারে প্রতিদিন বেচাকেনা হয় প্রায় দুইশত থেকে তিনশত কোটি টাকার। তিনি মনে করেন, দীর্ঘ অস্থিরতার পর রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করেছে। এখন নতুন সরকার এখনই বাজারের লাগাম টানতে না পারে তাহলে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ফল কিনতে আসা শাহাদাৎ হোসেন খান শরীফ বলেন, এবার ফলের দাম কিছুটা বাড়তি। তবে খুচরা বাজারের তুলনায় এখানে দাম কিছুটা কম এবং এক জায়গায় এত ধরনের খেজুর পাওয়া যায়। রমজান উপলক্ষে একসঙ্গে বেশি খেজুর কিনছি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ফল কিনতে আসা মো: নয়ন মিয়া বলেন, দেশি ও মৌসুমি ফলের দামও বেড়েছে। তরমুজ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১০০–১২০ টাকায়। পেঁপে প্রতি কেজি ১৭০–১৮০ টাকায়, পেয়ারা ১৬০ টাকায়। দেশি কুল ১৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে, ছোট বরই ৭০ টাকায়। বিদেশি ফলের মধ্যে বেদানা বিক্রি হচ্ছে ৫২০–৫৬০ টাকায় এবং রসালো স্ট্রবেরি ৬০০–৭০০ টাকায়। আনারসের দাম প্রতি পিস ৫০ টাকা এবং বেলের দাম ১২০–১৫০ টাকায় ওঠানামা করছে। সফেদা বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকা কেজিতে।
ফল ব্যাবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, বাদামতলী ফল মার্কেটসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে আমদানিনির্ভর ও দেশি ফলের দাম বেড়েছে। অন্যদিকে ক্রেতাদের ভিড় ও চাহিদা থাকায় ব্যবসায়ীরা তুলনামূলকভাবে বেশি কেনাবেচা করতে পারছে। রোজায় অনেক খেজুরের প্রয়োজন পড়ে। এলাকার বাজারের চেয়ে এখানে অনেক সাশ্রয়ী দামে খেজুর বেচা-কেনা হত। তাই রোজার মাসে সারাদিনই এখানে লোকের সমাগম থাকে।
তিনি নিশ্চিত করছেন, বাজারে মান বজায় রাখতে মেয়াদোত্তীর্ণ বা পচা খেজুর বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। খেজুরকে মেঝেতে সরাসরি রাখা যাবে না; কাঠের তক্তা বা চাঁটাই বাধ্যতামূলক। বস্তাবন্দি খেজুর পিপি পলিথিনে ঢেকে রাখতে হবে। পরিমাপের স্কেল ব্যবহার, মূল্য তালিকা প্রদর্শন এবং বিক্রির মেমো সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক এখানে।
