রেমিটেন্স বাড়ানোই মূল লক্ষ্য

প্রবাসীদের বন্ডে বিনিয়োগ নীতিমালা শিথিল হচ্ছে

  দেলোয়ার হুসেন ০৮ মে ২০১৯, ০৫:৩১ | অনলাইন সংস্করণ

প্রবাসীদের বন্ডে বিনিয়োগ নীতিমালা শিথিল হচ্ছে

প্রবাসীদের জন্য চালু করা বিভিন্ন বন্ডে বিনিয়োগ নীতিমালা শিথিল করা হচ্ছে। পাশাপাশি তাদের ব্যাংক হিসাবে বিনিয়োগের নীতিমালায়ও আসছে বিশেষ ছাড়। প্রবাসীদের কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এতে প্রবাসীরা সহজে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিয়োগ করতে পারবেন। ফলে বাড়বে রেমিটেন্স প্রবাহ। জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতর ও বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিমালা শিথিলের বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

প্রবাসীদের জন্য এখন পর্যন্ত তিন ধরনের বন্ড চালু রয়েছে। এগুলো হচ্ছে- ৫ বছর মেয়াদি ওয়েজ আর্নার্স ডেভেলপমেন্ট বন্ড, ৩ বছর মেয়াদি ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ড ও ৩ বছর মেয়াদি ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ড। ব্যাংকে সঞ্চয়ী হিসাবের মধ্যে রয়েছে- অনিবাসী বৈদেশিক মুদ্রা মেয়াদি আমানত বা নন রেসিডেন্ট ফরেন কারেন্সি ডিপোজিট অ্যাকাউন্ট (এনএফসিডিএ) এবং শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য রয়েছে অনিবাসী বিনিয়োগ টাকা হিসাব বা নন রেসিডেন্ট ইনভেস্টরস টাকা অ্যাকাউন্ট (নিটা)। এসব হিসাবে প্রবাসীরা বৈদেশিক মুদ্রায় বিনিয়োগ করতে পারেন।

সূত্র জানায়, প্রবাসীরা বিদেশে থাকেন বলে দেশে তারা এসব বন্ড কিনতে বা ব্যাংক হিসাব পরিচালনা করতে পারেন না। এছাড়া বিদেশেও হাতের কাছে এসব উপকরণ কেনার মতো ব্যাংক বা এক্সচেঞ্জ হাউস নেই। যে কারণে এগুলোয় প্রবাসীদের বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। এ সমস্যা দূর করতে বিধিমালায় দেশে প্রবাসীদের নমিনি এসব বন্ড বা হিসাবে বিনিয়োগ এবং এগুলো পরিচালনা করার সুযোগ দেয়া হচ্ছে। প্রবাসীদের কোনো নমিনি না থাকলে স্বয়ং ব্যাংকই নমিনির ভূমিকা পালন করতে পারবে।

বর্তমানে সব ব্যাংক শাখায় এসব বন্ড পাওয়া যায় না, আবার হিসাবও খোলা যায় না। এ কারণে এগুলো সম্পর্কে যাতে সব ব্যাংক শাখা থেকে তথ্য পাওয়া যায় সে বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে কোন শাখা থেকে কেনা যাবে, সেটি সব শাখায় পাওয়া যাবে। বিধিমালায় এমন বিধানও যুক্ত করা হচ্ছে।

বর্তমানে শুধু দেশে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়কারী ব্যাংকের শহরকেন্দ্রিক শাখায় ও ওয়েজ আর্নার্স শাখায় এসব বন্ড পাওয়া যায়। অন্য শাখাগুলোয় পাওয়া যায় না। ওইসব বন্ড ও বিশেষ হিসাবগুলোর তথ্য ব্যাংকের সব শাখা থেকে গ্রাহকদের দেয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়কারী সব শাখা থেকে এসব বন্ড বিক্রি এবং হিসাব খোলার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

বিদেশে বাংলাদেশের সব শাখা, এক্সচেঞ্জ হাউস এবং বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যাংকের শাখাগুলো থেকেও যাতে এসব বন্ড ক্রয় ও হিসাব খোলা যায় সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। এসব তালিকা ব্যাংকের ওয়েবসাইটেও দিতে হবে। ফলে প্রবাসীরা বিদেশে থেকেও তাদের নিকটস্থ ব্যাংকের শাখা থেকে এগুলো কিনতে বা হিসাব খুলতে পারবেন।

এ বিষয়ে জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের নীতি বিভাগের উপপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, প্রবাসীদের জন্য চালু সঞ্চয়ী উপকরণগুলো যাতে সহজে কেনা যায়, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এগুলো নিয়ে কাজ হচ্ছে। যেটা সম্ভব সেগুলো প্রয়োগ করা শুরু হয়েছে।

পর্যায়ক্রমে এগুলো কাঠামোগত রূপ পাবে। সূত্র জানায়, ওইসব বন্ড বা হিসাবে প্রবাসীদের বিনিয়োগের এবং এগুলো থেকে পাওয়া মুনাফার ওপর বর্তমানে কোনো কর নেই। আগামী দিনেও এগুলো করমুক্ত রাখা হবে। এগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রায় বিনিয়োগ করতে হবে। মূল বিনিয়োগ যে কোনো সময় যে কোনো দেশে ফেরত নেয়া যাবে। কিছু ক্ষেত্রে মুনাফার অর্থও ফেরত নেয়া যাবে।

ওয়েজ আর্নার্স ডেভেলপমেন্ট বন্ড, ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ড ও ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ড বন্ধক রেখে অভিহিত মূল্যের ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ নেয়া যাবে। তবে এই ঋণ নিতে হবে দেশের ভেতর থেকে দেশীয় মুদ্রায়। বৈদেশিক মুদ্রায় কোনো ঋণ নেয়া যাবে না।

ঋণের অর্থ দেশে বিনিয়োগ করতে হবে। বিদেশে নেয়া বা বিনিয়োগ করা যাবে না। যে নামে কেনা, শুধু ওই নামেই ঋণ নেয়া যাবে। নমিনি বা অন্য কেউ বন্ধক রেখে ঋণ নিতে পারবে না। বিদেশের ব্যাংক বা এক্সচেঞ্জ হাউস থেকে কেনা এসব বন্ড বাংলাদেশের যে কোনো ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ নেয়া যাবে।

বিধিমালা শিথিল করে বন্ড কেনার আওতা বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে শুধু প্রবাসীরাই এ বন্ড কিনতে পারেন। নতুন বিধিমালায় বিদেশে কর্মরত প্রবাসী, দেশে চাকরি লিয়েন রেখে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশের সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের এসব বন্ড কেনার সুযোগ দেয়া হচ্ছে।

বিদেশে বাংলাদেশি দূতাবাসে বা বৈদেশিক মুদ্রায় বেতনভাতাদি পেয়ে থাকেন তারাও এই বন্ড কিনতে পারবেন। এছাড়াও দেশে থেকেও যারা বিদেশ থেকে বৈধভাবে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেন এবং এগুলো ব্যাংক হিসাবে জমা থাকে, তারাও এসব বন্ড কিনতে পারবেন। ওইসব ক্যাটাগরির যে কোনো ব্যক্তির পক্ষের কোনো লোক বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রয়োজনীয় দালিলিক প্রমাণ দেখিয়ে এসব বন্ড কিনতে পারবেন।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রবসীদের বিনিয়োগের সহজ ও নিরাপদ সুবিদা দিলে বিনিয়োগ বাড়বে। ফলে বাড়বে রেমিটেন্স। সরকারি বন্ড ছাড়া প্রবাসীদের বিনিয়োগের সুযোগ খুব সীমিত। এ কারণে বন্ডে বিনিয়োগ নীতিমালা যত সহজ হবে, তত বেশি বিনিয়োগ বাড়বে।

এদিকে, কয়েক বছর ধরেই রেমিটেন্স প্রবাহে নিম্নগতি চলছে। গত অর্থবছরে রেমিটেন্স বেড়েছে ১৭ দশমকি ৩২ শতাংশ। গত অর্থবছরের জুলাই-মার্চে বেড়েছিল ১৭ দশমিক ০৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছে ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ।

প্রবাসীদের জন্য চালু বন্ডগুলোর মধ্যে ওয়েজ আর্নার্স ডেভেলপমেন্ট বন্ড বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে দেশীয় টাকায় কিনতে হয়। ৫ বছর মেয়াদি এ বন্ডে মুনাফার হার ১২ শতাংশ। ৬ মাস পর পর মুনাফা তোলার সুযোগ রয়েছে।

ছয় মাস পর পর মুনাফা না তুললে তা চক্রবৃদ্ধি হারে দেয়া হয়। এই বন্ড কেনার কোন ঊর্ধ্বসীমা নেই। বন্ড কেনার পর থেকে মেয়াদ পূর্তির আগ পর্যন্ত সময়ে গ্রাহকের মৃত্যু হলে মনোনীত নমিনি মৃত্যুঝুঁকি সুবিধার আওতায় এককালীন ৫ লাখ টাকা পাবেন। গ্রাহকের বয়স ৫৫ বছরের বেশি হলে এ সুবিধা পাওয়া যাবে না। ৮ কোটি বা এর বেশি বিনিয়োগ করলে সিআইপি সুবিধা পাওয়া যাবে।

ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ড অনিবাসী হিসাবধারীর নামে বৈদেশিক মুদ্রায় কিনতে হবে। যে হিসাবে রেমিটেন্স আসে সে হিসাবেই কিনতে হবে। অন্য কোনো হিসাবে কেনা যাবে না। তিন বছর মেয়াদি এ বন্ডে মুনাফা দেয়া হয় সাড়ে ৭ শতাংশ সরল সুদে। ছয় মাস পর পর মুনফা তোলার সুযোগ রয়েছে। মুনাফা দেয়া হবে টাকায়। এতে প্রাথমিকভাবে কমপক্ষে ১০ হাজার ডলার বিনিয়োগ করলে মৃত্যুঝুঁকি সুবিধা পাওয়া যাবে।

বন্ড ক্রয় করার পর থেকে মেয়াদ পূর্তির আগে গ্রাহকের মৃত্যু হলে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ হারে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা সুবিধা পাওয়া যাবে। গ্রাহকের নমিনি এ সুবিধা পাবেন। বন্ডের মূল অর্থ বাংলাদেশি মুদ্রা বা বৈদেশিক মুদ্রায় বিদেশে নেয়া যাবে।

এই বন্ড কিনতে হলে ক্রেতার বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব থাকতে হবে। ওই হিসাব থেকে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে বন্ড কেনা যাবে। বৈদেশিক মুদ্রার চেক বা ব্যাংক ড্রাফট দিয়েও এই বন্ড কেনা যাবে। তবে তা গ্রাহকের নামে হতে হবে। ১০ খাল ডলারের বন্ড কিনলে দেশে সিআইপি সুবিধা পাওয়া যাবে। যত খুশি এ বন্ড কেনা যাবে।

ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ড প্রবাসীর বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবের বিপরীতে কিনতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রায় ব্যাংক চেক বা ব্যাংক ড্রাফট দিয়েও কেনা যাবে। মুনাফার হার সরল সুদে সাড়ে ৬ শতাংশ। মুনাফা দেয়া হয় বৈদেশিক মুদ্রায়। ১০ হাজার ডলার বন্ড কিনলে মৃত্যুঝুঁকি সুবিধা পাওয়া যাবে বন্ডের ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ। তবে ২০ লাখ টাকার বেশি নয়। ১০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করলে সিআইপি সুবিধা পাওয়া যাবে।

অনিবাসী বৈদেশিক মুদ্রা মেয়াদি আমানত হিসাব বা নন রেসিডেন্ট ফরেন কারেন্সি ডিপোজিট হিসাব বাংলাদেশের কার্যরত দেশি-বিদেশি যে কোনো ব্যাংকর বৈদেশিক মুদ্রা শাখায় বিভিন্ন মেয়াদে খোলা যায়।

কমপক্ষে ১ হাজার ডলার বা ৫০০ পাউন্ড জমা দিয়ে হিসাব খুলতে হয়। এ ছাড়াও জার্মানির মুদ্রা মার্ক, জাপানি মুদ্রা ইয়েন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুদ্রা ইউরোতেও সমপরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা জমা দিয়ে হিসাব খোলা যায়। এতে ইউরো কারেন্সি হিসাবের ভিত্তিতে সুদ দেয়া হয়। এর হার ওঠানাম করে। বর্তমানে এ হার ৫ থেকে ৬ শতাংশ। মুনাফাসহ বিনিয়োগের অর্থ যে কোনো দেশে নেয়া যায়।

প্রবসাীদের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য রয়েছে অনিবাসী বিনিয়োগ টাকা হিসাব বা নন রেসিডেন্ট ইনভেস্টরস টাকা অ্যাকাউন্ট (নিটা)। এ হিসাব খুলতে আগে এনএফসিডিএ হিসাব খুলতে হবে। ওই হিসাবে বৈদেশিক মুদ্রা রেখে সমপরিমাণ অর্থ নিটা হিসাবে নিতে হবে। এ অর্থ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা যাবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×