পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে সতর্কতা জরুরি
jugantor
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে সতর্কতা জরুরি

  রকিবুর রহমান  

০৫ জানুয়ারি ২০২১, ২০:৫৮:৪৫  |  অনলাইন সংস্করণ

বড় হচ্ছে দেশের পুঁজিবাজার। বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে। দেশি বিদেশি বড় বড় বিনিয়োগকারী বাজারে নতুন তহবিল নিয়ে আসছে।

সরকারের বিভিন্ন পলিসি পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনছে। অপরদিকে, বিএসইসির বিভিন্ন কঠোর পদক্ষেপে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোতে সুশাসন ফিরে আসতে শুরু করেছে। বিভিন্ন কোম্পানির উপর বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরে আসছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ও বিদেশ থেকে যাতে সহজে বিনিয়োগকারীরা লেনদেন করতে পারেন, তার জন্য দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ব্রোকার হাউজের শাখা অফিস খোলার অনুমতি দেয়া হয়েছে।

আমি মনে করি, বাজারের এই গতিশীল অবস্থা ধরে রাখতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সঠিক সময়ে সঠিক এই সিদ্ধান্তটি নিয়েছে। শিল্পায়নে অর্থায়নের উৎস হবে পুঁজিবাজার। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান শুধু স্টার্ট-আপ মানি, ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল এবং এসএমইতে স্বল্প মেয়াদী ঋণ দেবে। এতে ব্যাংকের উপর টাকা নেয়ার চাপ কমবে। ভালো থাকবে ব্যাংক ব্যবস্থা। ব্যাংকে আমানতদারীদের টাকা নিরাপদ থাকবে এবং ব্যাংকের লুটপাট বন্ধ হবে।

এর আগে আমি একটি লেখায় বলেছিলাম- সঠিক পথে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার, যেতে হবে বহুদূর। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, পুঁজিবাজার যখন চাঙ্গা থাকে, তখন বড় বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি ছোট অনেক বিনিয়োগকারী বিনিয়োগে উৎসাহিত হয়। বড়, প্রাতিষ্ঠানিক এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কখনো লাভ এবং কখনো লোকসান দেয়। তাদের নিজস্ব বিনিয়োগ অ্যাডভাইজার এবং রিসার্চ টিম আছে। পুঁজি হারালে তারা কাউকে দোষ দিতে পারে না। তাই বিনয়ের সঙ্গে বলছি, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে সতর্কতার সঙ্গে বিনিয়োগ করতে হবে।

এখানে উল্লেখ করতে চাই, ২০১০ সালে বাজার যখন বড় হচ্ছিল, আমি বলেছিলাম- ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা যেন জমি জমা বিক্রি করে এখানে না আসে। জমি, স্বর্ণালংকার বন্ধক রেখে, ঋণ নিয়ে, বিদেশে থাকা আত্মীয়-স্বজনের কষ্টার্জিত আয় বা অতিরিক্ত মার্জিন ঋণ নিয়ে আসা উচিত নয়। আর বিনিয়োগের আগে কোম্পানিগুলোকে ভালোভাবে বিশ্লেষণ এবং মৌলভিত্তি যাচাই অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে অতিরিক্ত লোভে কারো দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিনিয়োগ করা একেবারেই ঠিক নয়। এতে বিনিয়োগ ঝুঁকি থেকে যাবে।

পুঁজিবাজার শুধু লাভের না লোকসানেরও। বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী শেয়ার ধরে রাখার ক্ষমতা রাখে, তাই তাদের লোকসানের পরিমাণটা অনেক কম হয়। অপরদিকে, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন তাদের বিনিয়োগ ধরে রাখতে পারেন না। তাই লাভের সঙ্গে সঙ্গে লোকসানের আশঙ্কাও সবসময়ই থাকে। বিনিয়োগকারীদের বলব, টাকা এবং বিনিয়োগটা যেহেতু আপনার, তাই দিন শেষে লাভ-লোকসান আপনাকেই নিতে হবে। এখানে কারো উপর দায় চাপানোর সুযোগ নেই।

বাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতের জন্য বিএসইসি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। যারা এই মার্কেটের সঙ্গে জড়িত, তাদেরকে সম্পূর্ণ কমপ্লায়েন্স মেনে কাজ করতে হচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে অনেক অনিয়ম ছিল, আইনের কঠোর প্রয়োগ ছিল না। রুলস-রেগুলেশনসের কোনো তোয়াক্কা না করে, যে যার মতো ব্যবসা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর নির্দেশ না অনুযায়ী সবাইকে শতভাগ কমপ্লায়েন্স মেনে পুঁজিবাজারে থাকতে হচ্ছে। বিএসইসির বর্তমান কমিশনের বিভিন্ন নির্দেশনা তারই প্রতিফলন। এর মধ্যে রয়েছে কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ এবং ব্যক্তিগতভাবে ২ শতাংশ শেয়ার ধারণ। তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর্পোরেটকালচার ও কর্পোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দ্রুত স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ, আইনের কঠোর প্রয়োগ, জেড গ্রুপের শেয়ারের ক্ষেত্রে যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নেয়া, মার্জিন ঋণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। সার্কুলার ট্রেড, ইনসাইডার ট্রেডিং ও মার্কেট ম্যানিপুলেশনকে আইনের আওতায় নিয়ে এসে পুঁজিবাজারে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জোড় পদক্ষেপ নিয়েছে বর্তমান কমিশন। লিস্টেড কোম্পানিগুলো মিথ্যা তথ্য দিয়ে নিজ কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়িয়ে নিজেদের শেয়ার বিক্রির দিন শেষ। ভালো ভালো কোম্পানির শেয়ার বাজারে আসছে। তাতে বিনিয়োগকারীরা পছন্দ মতো শেয়ার কেনার সুযোগ পাচ্ছেন। এর ফলে বাজার বাড়বে, শেয়ারের দাম উঠানামা করবে এটাই স্বাভাবিক। বিনিয়োগকারীদের বারবার বলছি, আপনার পোর্টফোলিওতে মৌলভিত্তির শেয়ার থাকলে ধরে রাখেন। সেই শেয়ার বেশি কিনলেও সমস্যা নেই। কারণ এখানে লাভ নাও হলেও অন্তত লোকসান হবে না।

নতুন আইপিও আসার ক্ষেত্রে নির্ধারিত মূল্য বা বুকবিল্ডিং পদ্ধতি যেটিই হোক বিএসইসি এবং এক্সচেঞ্জকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হবে। আইনের ফাঁক দিয়ে অথবা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাবে বাজারে দুর্বল কোম্পানি বাজারে আসতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে অবশ্যই কঠোর অবস্থানে থাকতে হবে। সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে হবে বিএসইসির। অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলামের নেতৃত্বে নতুন কমিশন আইপিও অনুমোদনের ক্ষেত্রে শক্ত অবস্থানে আছে। তারপরও দু’একটি কথা বলতে হয়, আমরা যেন বাজারকে নিয়ন্ত্রণ না করি। সূচক নিয়ন্ত্রিত বাজার যেন না হয়। শেয়ারের দাম বাড়লে সূচক বাড়বে। আর দাম কমলে সূচকও কমবে- এটাই স্বাভাবিক। তবে লেনদেন বেশি কমলে, তার কারণ নির্ধারণ করতে হবে।

পুঁজিবাজারের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রেগুলেটর হলো বিএসইসি। যার হাতে পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার অসীম ক্ষমতা দেয়া আছে। পৃথিবীর সব দেশে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে এ ক্ষমতা দেয়া আছে। বিএসইসিকে কারো কাছে জবাবদিহিতা করতে হয় না। বাজার সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিএসইসির কাছে জবাবদিহিতা করতে বাধ্য। অতএব বিএসইসিকে এটা নিশ্চিত করতে হবে, বাজারে যারা যেভাবেই সংশ্লিষ্ট থাকুক না কেন, লিস্টেড কোম্পানি, ব্রোকার, ইনস্টিটিউশন, আন্ডার রাইটার, উদ্যোক্তা, মিউচুয়াল ফান্ড, সম্পদ মূল্যায়ন কোম্পানি, বন্ড মার্কেট এবং স্টক এক্সচেঞ্জসহ সবাই কমপ্লায়েন্স মেনে চলছে। বিএসইসিকে একটা মেসেজ সবাইকে দিতে হবে যে, আইন ও বিধিবিধান মেনে সবাইকে ব্যবসা করতে হবে। বিভিন্ন তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো উদ্যোক্তা পরিচালক বা গোষ্ঠী তাদের ইচ্ছে মতো কোম্পানি পরিচালনা করতে পারবেন না।

বিএসইসি কমিশনের যে কোনো সিদ্ধান্ত সবসময় সঠিক। বিএসইসি কখনো বলবে না আমাদের ভুলত্রুটি থাকতে পারে। সংস্থাটির কোনো ভুল সিদ্ধান্তে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে এর দায় কে নেবে? অতএব বিএসইসি ভুল করতে পারে না। তাদেরকে সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে সঠিক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে হবে। বিএসইসি যত কঠোর অবস্থানে থাকবে, পুঁজিবাজার তত গতিশীল হবে, ভাল ভাল আইপিও আসবে। বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন আইন করা হয়েছে, আইন সংশোধন করা হয়েছে, রুলস, রেগুলেশন্স তৈরি করা হয়েছে। আর সেসব আইন ইচ্ছে মতো ব্যবহার করে বাজারকে সব সময় নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয়েছে।

বিএসইসিকে এটা নিশ্চিত করতে হবে যে প্রতিটা আইন, বিধি-বিধান আন্তর্জাতিক মানের হয়। আইপিও আসার ক্ষেত্রে সকল অনিয়ম ইতোমধ্যে দূর করা হয়েছে। ভালো ভালো প্রাইভেট শিল্প প্রতিষ্ঠান বাজার থেকে টাকা তুলে তাদের শিল্প প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। ইতিমধ্যে যার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাচ্ছি। পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ থেকে বের হয়ে প্রাইভেট কোম্পানিগুলো কর্পোরেট কালচারে আসতে শুরু করেছে। তবে এজন্য সবাইকে একটু সময় দিতে হবে। কোম্পানি বড় হলে সবাইকে পুঁজিবাজারে আসতে হবে। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সিন্ডিকেট করে, ভুল তথ্য দিয়ে টাকা ঋণ নেয়ার দিন শেষ। সরকার এবং জনগণ এখন অনেক সচেতন। এক্সচেঞ্জগুলোকে পরিপূর্ণ ডিজিটালাইজেশন করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে দক্ষ ম্যানেজমেন্ট। ব্রোকার হাউজগুলোকে ধীরে ধীরে আইটিভিত্তিক করতে হবে। বিনিয়োগকারীরা যাতে সাচ্ছন্দে বিনিয়োগ করতে পারে। সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করতে হবে ডিএসইর ওয়েবসাইটে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সব তথ্য নির্ভুল থাকতে হবে। যাতে করে বিনিয়োগকারী কোম্পানির সঠিক তথ্য দেখে শেয়ার কিনার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

যার যার ব্যর্থতা তার নিজের। বিএসইসি কারো কোনো ব্যর্থতার দায়িত্ব নেবে না বলে আমি বিশ্বাস করি। সকল অংশীজন তাদের সংস্কার কার্যক্রম যাতে সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারে, তার জন্য বিএসইসি থেকে যুক্তিসঙ্গত সময় দিতে হবে। তবে কেউ যেন মনে না করে, বিএসইসির এই সময় দেয়াটা একটা দুর্বলতা। সময় নিয়ে কেঊ যদি ব্যর্থ হয়, তবে অবশ্যই তার দায়িত্ব ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে নিতে হবে। আমাদেরকে আর ভুল করা বা বেশি সময়ও দেয়া যাবে না।

দেশজুড়ে অবকাঠামো উন্নয়নে বিশাল কাজ চলছে। বড় বড় সেতু, রোড, হাইওয়ে, পর্যটন, হোটেল, মোটেল, সেবাখাতসহ বড়বড় সব প্রকল্পের সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ত করতে হবে। সরকারি ভালো ভালো শেয়ার পর্যায়ক্রমে তালিকাভুক্ত করে বাজারকে আরও গতিশীল করতে হবে।

আগেও বলেছি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা, শিল্প প্রতিষ্ঠানে অর্থায়নের মূল উৎস হবে পুঁজিবাজার। নতুন নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, অনেক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে এবং সর্বোপরি দেশ আরও এগিয়ে যাবে। এটাই বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রী বাজেটে যে সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন, তার একটি মাত্র লক্ষ্য হলো জনগণের সঞ্চয়ের একটি বড় অংশ পুঁজিবাজারে আসুক। সরকারি বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ক্রয়ের মাধ্যমে বিনিয়োগ করুক।

সরকারের পলিসির কারণে বাজারকে গতিশীল করতে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বিএসইসি এক সঙ্গে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও গতিশীল করতে যাদের উপর দায়িত্ব দিয়েছেন, তাদের ব্যর্থতার কোনো সুযোগ নাই। বাজার যে বড় হচ্ছে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসছে, দেশি বিদেশি সকলে বিনিয়োগে উৎসাহিত হচ্ছেন। আগামী বছরগুলোতে আমরা ৫ হাজার কোটি টাকা লেনদেনের স্বপ্ন দেখছি। ইক্যুইটি মার্কেটের বাইরে, বন্ড, সুকুক (ইসলামী বন্ড), এসএমই এবং ডেরিভেটিভস চালুর যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তার সব কৃতিত্বই প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনা এবং অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামালের। এখানে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট নেয়ার সুযোগ নেই।

লেখক : সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান
পরিচালক, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে সতর্কতা জরুরি

 রকিবুর রহমান 
০৫ জানুয়ারি ২০২১, ০৮:৫৮ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

বড় হচ্ছে দেশের পুঁজিবাজার। বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে। দেশি বিদেশি বড় বড় বিনিয়োগকারী বাজারে নতুন তহবিল নিয়ে আসছে।

সরকারের বিভিন্ন পলিসি পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনছে। অপরদিকে, বিএসইসির বিভিন্ন কঠোর পদক্ষেপে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোতে সুশাসন ফিরে আসতে শুরু করেছে। বিভিন্ন কোম্পানির উপর বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরে আসছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ও বিদেশ থেকে যাতে সহজে বিনিয়োগকারীরা লেনদেন করতে পারেন, তার জন্য দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ব্রোকার হাউজের শাখা অফিস খোলার অনুমতি দেয়া হয়েছে।

আমি মনে করি, বাজারের এই গতিশীল অবস্থা ধরে রাখতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সঠিক সময়ে সঠিক এই সিদ্ধান্তটি নিয়েছে। শিল্পায়নে অর্থায়নের উৎস হবে পুঁজিবাজার। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান শুধু স্টার্ট-আপ মানি, ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল এবং এসএমইতে স্বল্প মেয়াদী ঋণ দেবে। এতে ব্যাংকের উপর টাকা নেয়ার চাপ কমবে। ভালো থাকবে ব্যাংক ব্যবস্থা। ব্যাংকে আমানতদারীদের টাকা নিরাপদ থাকবে এবং ব্যাংকের লুটপাট বন্ধ হবে।

এর আগে আমি একটি লেখায় বলেছিলাম- সঠিক পথে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার, যেতে হবে বহুদূর। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, পুঁজিবাজার যখন চাঙ্গা থাকে, তখন বড় বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি ছোট অনেক বিনিয়োগকারী বিনিয়োগে উৎসাহিত হয়। বড়, প্রাতিষ্ঠানিক এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কখনো লাভ এবং কখনো লোকসান দেয়। তাদের নিজস্ব বিনিয়োগ অ্যাডভাইজার এবং রিসার্চ টিম আছে। পুঁজি হারালে তারা কাউকে দোষ দিতে পারে না। তাই বিনয়ের সঙ্গে বলছি, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে সতর্কতার সঙ্গে বিনিয়োগ করতে হবে।

এখানে উল্লেখ করতে চাই, ২০১০ সালে বাজার যখন বড় হচ্ছিল, আমি বলেছিলাম- ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা যেন জমি জমা বিক্রি করে এখানে না আসে। জমি, স্বর্ণালংকার বন্ধক রেখে, ঋণ নিয়ে, বিদেশে থাকা আত্মীয়-স্বজনের কষ্টার্জিত আয় বা অতিরিক্ত মার্জিন ঋণ নিয়ে আসা উচিত নয়। আর বিনিয়োগের আগে কোম্পানিগুলোকে ভালোভাবে বিশ্লেষণ এবং মৌলভিত্তি যাচাই অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে অতিরিক্ত লোভে কারো দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিনিয়োগ করা একেবারেই ঠিক নয়। এতে বিনিয়োগ ঝুঁকি থেকে যাবে।

পুঁজিবাজার শুধু লাভের না লোকসানেরও। বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী শেয়ার ধরে রাখার ক্ষমতা রাখে, তাই তাদের লোকসানের পরিমাণটা অনেক কম হয়। অপরদিকে, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন তাদের বিনিয়োগ ধরে রাখতে পারেন না। তাই লাভের সঙ্গে সঙ্গে লোকসানের আশঙ্কাও সবসময়ই থাকে। বিনিয়োগকারীদের বলব, টাকা এবং বিনিয়োগটা যেহেতু আপনার, তাই দিন শেষে লাভ-লোকসান আপনাকেই নিতে হবে। এখানে কারো উপর দায় চাপানোর সুযোগ নেই।

বাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতের জন্য বিএসইসি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। যারা এই মার্কেটের সঙ্গে জড়িত, তাদেরকে সম্পূর্ণ কমপ্লায়েন্স মেনে কাজ করতে হচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে অনেক অনিয়ম ছিল, আইনের কঠোর প্রয়োগ ছিল না। রুলস-রেগুলেশনসের কোনো তোয়াক্কা না করে, যে যার মতো ব্যবসা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর নির্দেশ না অনুযায়ী সবাইকে শতভাগ কমপ্লায়েন্স মেনে পুঁজিবাজারে থাকতে হচ্ছে। বিএসইসির বর্তমান কমিশনের বিভিন্ন নির্দেশনা তারই প্রতিফলন। এর মধ্যে রয়েছে কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ এবং ব্যক্তিগতভাবে ২ শতাংশ শেয়ার ধারণ। তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর্পোরেটকালচার ও কর্পোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দ্রুত স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ, আইনের কঠোর প্রয়োগ, জেড গ্রুপের শেয়ারের ক্ষেত্রে যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নেয়া, মার্জিন ঋণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। সার্কুলার ট্রেড, ইনসাইডার ট্রেডিং ও মার্কেট ম্যানিপুলেশনকে আইনের আওতায় নিয়ে এসে পুঁজিবাজারে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জোড় পদক্ষেপ নিয়েছে বর্তমান কমিশন। লিস্টেড কোম্পানিগুলো মিথ্যা তথ্য দিয়ে নিজ কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়িয়ে নিজেদের শেয়ার বিক্রির দিন শেষ। ভালো ভালো কোম্পানির শেয়ার বাজারে আসছে। তাতে বিনিয়োগকারীরা পছন্দ মতো শেয়ার কেনার সুযোগ পাচ্ছেন। এর ফলে বাজার বাড়বে, শেয়ারের দাম উঠানামা করবে এটাই স্বাভাবিক। বিনিয়োগকারীদের বারবার বলছি, আপনার পোর্টফোলিওতে মৌলভিত্তির শেয়ার থাকলে ধরে রাখেন। সেই শেয়ার বেশি কিনলেও সমস্যা নেই। কারণ এখানে লাভ নাও হলেও অন্তত লোকসান হবে না।

নতুন আইপিও আসার ক্ষেত্রে নির্ধারিত মূল্য বা বুকবিল্ডিং পদ্ধতি যেটিই হোক বিএসইসি এবং এক্সচেঞ্জকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হবে। আইনের ফাঁক দিয়ে অথবা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাবে বাজারে দুর্বল কোম্পানি বাজারে আসতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে অবশ্যই কঠোর অবস্থানে থাকতে হবে। সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে হবে বিএসইসির। অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলামের নেতৃত্বে নতুন কমিশন আইপিও অনুমোদনের ক্ষেত্রে শক্ত অবস্থানে আছে। তারপরও দু’একটি কথা বলতে হয়, আমরা যেন বাজারকে নিয়ন্ত্রণ না করি। সূচক নিয়ন্ত্রিত বাজার যেন না হয়। শেয়ারের দাম বাড়লে সূচক বাড়বে। আর দাম কমলে সূচকও কমবে- এটাই স্বাভাবিক। তবে লেনদেন বেশি কমলে, তার কারণ নির্ধারণ করতে হবে।

পুঁজিবাজারের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রেগুলেটর হলো বিএসইসি। যার হাতে পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার অসীম ক্ষমতা দেয়া আছে। পৃথিবীর সব দেশে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে এ ক্ষমতা দেয়া আছে। বিএসইসিকে কারো কাছে জবাবদিহিতা করতে হয় না। বাজার সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিএসইসির কাছে জবাবদিহিতা করতে বাধ্য। অতএব বিএসইসিকে এটা নিশ্চিত করতে হবে, বাজারে যারা যেভাবেই সংশ্লিষ্ট থাকুক না কেন, লিস্টেড কোম্পানি, ব্রোকার, ইনস্টিটিউশন, আন্ডার রাইটার, উদ্যোক্তা, মিউচুয়াল ফান্ড, সম্পদ মূল্যায়ন কোম্পানি, বন্ড মার্কেট এবং স্টক এক্সচেঞ্জসহ সবাই কমপ্লায়েন্স মেনে চলছে। বিএসইসিকে একটা মেসেজ সবাইকে দিতে হবে যে, আইন ও বিধিবিধান মেনে সবাইকে ব্যবসা করতে হবে। বিভিন্ন তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো উদ্যোক্তা পরিচালক বা গোষ্ঠী তাদের ইচ্ছে মতো কোম্পানি পরিচালনা করতে পারবেন না।

বিএসইসি কমিশনের যে কোনো সিদ্ধান্ত সবসময় সঠিক। বিএসইসি কখনো বলবে না আমাদের ভুলত্রুটি থাকতে পারে। সংস্থাটির কোনো ভুল সিদ্ধান্তে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে এর দায় কে নেবে? অতএব বিএসইসি ভুল করতে পারে না। তাদেরকে সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে সঠিক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে হবে। বিএসইসি যত কঠোর অবস্থানে থাকবে, পুঁজিবাজার তত গতিশীল হবে, ভাল ভাল আইপিও আসবে। বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন আইন করা হয়েছে, আইন সংশোধন করা হয়েছে, রুলস, রেগুলেশন্স তৈরি করা হয়েছে। আর সেসব আইন ইচ্ছে মতো ব্যবহার করে বাজারকে সব সময় নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয়েছে।

বিএসইসিকে এটা নিশ্চিত করতে হবে যে প্রতিটা আইন, বিধি-বিধান আন্তর্জাতিক মানের হয়। আইপিও আসার ক্ষেত্রে সকল অনিয়ম ইতোমধ্যে দূর করা হয়েছে। ভালো ভালো প্রাইভেট শিল্প প্রতিষ্ঠান বাজার থেকে টাকা তুলে তাদের শিল্প প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। ইতিমধ্যে যার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাচ্ছি। পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ থেকে বের হয়ে প্রাইভেট কোম্পানিগুলো কর্পোরেট কালচারে আসতে শুরু করেছে। তবে এজন্য সবাইকে একটু সময় দিতে হবে। কোম্পানি বড় হলে সবাইকে পুঁজিবাজারে আসতে হবে। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সিন্ডিকেট করে, ভুল তথ্য দিয়ে টাকা ঋণ নেয়ার দিন শেষ। সরকার এবং জনগণ এখন অনেক সচেতন। এক্সচেঞ্জগুলোকে পরিপূর্ণ ডিজিটালাইজেশন করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে দক্ষ ম্যানেজমেন্ট। ব্রোকার হাউজগুলোকে ধীরে ধীরে আইটিভিত্তিক করতে হবে। বিনিয়োগকারীরা যাতে সাচ্ছন্দে বিনিয়োগ করতে পারে। সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করতে হবে ডিএসইর ওয়েবসাইটে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সব তথ্য নির্ভুল থাকতে হবে। যাতে করে বিনিয়োগকারী কোম্পানির সঠিক তথ্য দেখে শেয়ার কিনার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

যার যার ব্যর্থতা তার নিজের। বিএসইসি কারো কোনো ব্যর্থতার দায়িত্ব নেবে না বলে আমি বিশ্বাস করি। সকল অংশীজন তাদের সংস্কার কার্যক্রম যাতে সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারে, তার জন্য বিএসইসি থেকে যুক্তিসঙ্গত সময় দিতে হবে। তবে কেউ যেন মনে না করে, বিএসইসির এই সময় দেয়াটা একটা দুর্বলতা। সময় নিয়ে কেঊ যদি ব্যর্থ হয়, তবে অবশ্যই তার দায়িত্ব ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে নিতে হবে। আমাদেরকে আর ভুল করা বা বেশি সময়ও দেয়া যাবে না।

দেশজুড়ে অবকাঠামো উন্নয়নে বিশাল কাজ চলছে। বড় বড় সেতু, রোড, হাইওয়ে, পর্যটন, হোটেল, মোটেল, সেবাখাতসহ বড়বড় সব প্রকল্পের সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ত করতে হবে। সরকারি ভালো ভালো শেয়ার পর্যায়ক্রমে তালিকাভুক্ত করে বাজারকে আরও গতিশীল করতে হবে।

আগেও বলেছি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা, শিল্প প্রতিষ্ঠানে অর্থায়নের মূল উৎস হবে পুঁজিবাজার। নতুন নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, অনেক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে এবং সর্বোপরি দেশ আরও এগিয়ে যাবে। এটাই বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রী বাজেটে যে সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন, তার একটি মাত্র লক্ষ্য হলো জনগণের সঞ্চয়ের একটি বড় অংশ পুঁজিবাজারে আসুক। সরকারি বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ক্রয়ের মাধ্যমে বিনিয়োগ করুক।

সরকারের পলিসির কারণে বাজারকে গতিশীল করতে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বিএসইসি এক সঙ্গে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও গতিশীল করতে যাদের উপর দায়িত্ব দিয়েছেন, তাদের ব্যর্থতার কোনো সুযোগ নাই। বাজার যে বড় হচ্ছে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসছে, দেশি বিদেশি সকলে বিনিয়োগে উৎসাহিত হচ্ছেন। আগামী বছরগুলোতে আমরা ৫ হাজার কোটি টাকা লেনদেনের স্বপ্ন দেখছি। ইক্যুইটি মার্কেটের বাইরে, বন্ড, সুকুক (ইসলামী বন্ড), এসএমই এবং ডেরিভেটিভস চালুর যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তার সব কৃতিত্বই প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনা এবং অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামালের। এখানে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট নেয়ার সুযোগ নেই।

লেখক : সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান
পরিচালক, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ