বাংলাদেশের ডিজিটাল আর্থিক সেবা বিশ্বের কাছে আইকন: মারিয়া

প্রকাশ : ২৩ মে ২০১৮, ১৮:৫৫ | অনলাইন সংস্করণ

  এম. মিজানুর রহমান সোহেল

মারিয়া গেব্রিয়েলা রোয়াস ভারগাস

বাংলাদেশে সম্প্রতি শেষ হলো ঢাকা হাব অব গ্লোবাল শেপারস কমিউনিটির আয়োজনে চার দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘শেপ সাউথ এশিয়া ২০১৮’। শতাধিক উদ্ভাবক যারা কিনা গ্লোবাল শেপারস নামে পরিচিত এ সম্মেলনে অংশ নিয়েছে। 

উদ্ভাবনী ধারণা নিয়ে তারা সবার মাঝে আলো ছড়িয়ে গেছেন যা বাংলাদেশের শেপারদের অনুপ্রাণিত করেছে। এমনই একজন শেপার কোস্টারিকার  মারিয়া গেব্রিয়েলা রোয়াস ভারগাস। তিনি ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্সিয়াল কপোরেশনের স্পেশালিস্ট। তার সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা যায় তার উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প এবং ঢাকায় আয়োজিত এবারের সম্মেলন সম্পর্কে।

যুগান্তর: শুরুতেই আপনার বাংলাদেশ অভিজ্ঞতা জানতে চাই।
মারিয়া:
বাংলাদেশ আমাকে মুগ্ধ করেছে। এখানে আসা একটা সময় আমার স্বপ্ন ছিলো। আমি ডিজিটাল আর্থিক সার্ভিস ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কাজ করি। আর আপনি তো জানেন, এই শিল্প ব্যবসায় বাংলাদেশ গোটা বিশ্বের কাছে এখন আইকন। গ্রামীণ ব্যাংক, বিকাশ, ব্র্যাক এই কোম্পানিগুলোর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। বাংলাদেশে এসে এত সব কোম্পানি সম্পর্কে একটা ধারণা হয়েছে আমার, যেটা সত্যিই আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া। 

যুগান্তর: আর্থিক সেক্টরে আপনি কতদিন ধরে কাজ করছেন?
মারিয়া:
প্রায় ৮ বছর হয়েছে। আমি আইএফসিতে ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল স্পেশালিস্ট হিসেবে আছি। 

যুগান্তর: বাংলাদেশের ৩০ শতাংশ মানুষ ব্যাংকিং কার্যক্রমের সঙ্গে পরিচিত, বাকিরা এখনো ঠিক তেমনভাবে জড়িত হতে পারেনি। এই অবস্থার পরিবর্তন কিভাবে সম্ভব আপনি মনে করেন?
মারিয়া:
এটা আসলে একেকটা দেশে একেক রকম। বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে আমার তেমন স্পষ্ট ধারণা নেই। কিন্তু যদি আমি গোটা বিশ্বের পরিস্থিতি বিবেচনায় আনি, তাহলে বলাই যায় একমাত্র আর্থিক শিক্ষায় মানুষকে শিক্ষিত করেই এই অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব। 

যুগান্তর: একজন গ্লোবাল শেপার হিসেবে বিশ্বের উন্নয়নে আপনি কিভাবে অবদান রাখতে পারেন?
মারিয়া:
প্রথমত আমি মনে করি একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা সবচেয়ে জরুরি। সফলতা পাওয়ার জন্য এটা সবার আগে প্রয়োজন। আমার সকল কষ্ট, সব পরিশ্রম আমি উৎসর্গ করি ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মান বাড়াতে। মানুষের ক্ষমতায়নের গ্রাফ উর্ধ্বমূখী করে, তাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে এটা সাহায্য করে। আমাদের আশে পাশের মানুষ জনকে আর্থিক সেবা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বিষয়ে সচেতন করাই গ্লোবাল শেপারদের লক্ষ্য। আপনি সমাজের অধিকাংশ মানুষের সাহায্য ছাড়া কখনোই সামনে এগিয়ে যেতে পারবেন না। 

বাংলাদেশি হাবস কিংবা এর সাথে জড়িতদের কথাই ধরুন, তারা কিন্তু সমাজের নানা কল্যাণমূলক কাজ করেই আজকে গ্লোবাল শেপারস কনফারেন্স আয়োজন করতে পারছে। যার ফলাফল কিন্তু বাংলাদেশের জন্যই ভালো হচ্ছে। আমরা এখানে এসেছি, ব্যবসার সুযোগ বাড়ছে ইত্যাদি। আপনি যদি বিশ্বায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চান, তাহলে কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন দেশ সম্পর্কে আপনার পরিষ্কার ধারণা থাকতেই হবে। আর দেশ ভ্রমণ করে, সেই দেশের মানুষের কাছে গিয়েই আপনি আপনার জ্ঞান বাড়াতে পারবেন। আমি মনে করি গ্লোবাল শেপার হিসেবে দেশ বিদেশ ঘুরে আমি আর্থিক অবস্থান সম্পর্কে নানা দেশের ব্যাপক ধারণা পাচ্ছি।

যুগান্তর: দক্ষিণ আমেরিকা ও দক্ষিণ আফ্রিকার দারিদ্র্য সংকট একই রকম। নারীর ক্ষমতায়ন ওইসব জায়গায় একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই সমস্যার সমাধানে আপনার মতামত কি?
মারিয়া:
এক্ষেত্রে অনেক কিছু করার আছে। আমি যেটা শুরু থেকেই বলে আসছি, আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্মে পরিবর্তন আনতে হবে এবং নারীদের সম্মান জানাতে হবে। আমি মনে করি, পুরুষদের নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ে আলোকপাত করতে হবে। প্রত্যেক পুরুষের উচিত এই ব্যাপারটা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা বহন করা। একই সাথে পুরুষদের ক্ষমতায়ন নিয়েও আমাদের কাজ করতে হবে। 

একটা উদাহরণ দেই, একটা ফুটবল ম্যাচই ধরা যাক। মাঠে শুধুমাত্র একটি দল থাকলে কিন্তু ম্যাচ হওয়া সম্ভব না। ম্যাচ মাঠে গড়াতে দুই দলের উপস্থিতি থাকা লাগবেই। আমাদের সমাজের অগ্রগতির জন্যও কিন্তু নারী-পুরুষের সমান অবদান থাকা জরুরি। এই বিষয়ে আমার একটা কাজও আমি শুরু করেছি, যেটায় আমাকে আমার স্বামী নিজেই সাহায্য করছে। পরিবার, সন্তান লালন পালনে আমাদের দুজনের দায়িত্ব আমরা ভাগাভাগি করে নিয়েছি। কারণ, মা হিসেবে আমাকে মাঝে মধ্যেই অনেক বেশি দায়িত্ব নিতে হয়, যেটা আমার স্বামীর নিতে হয় না। তাই আমরা নিজেরাই ঠিক করেছি কে কোনটা করবো।

 মারিয়া গেব্রিয়েলা রোয়াস ভারগাস

যুগান্তর: আপনার দৃষ্টিতে গ্লোবাল শেপাররা কিভাবে বিশ্বের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখবে?
মারিয়া:
আপনি তো জানেন, আধুনিক যুগে এখন আমরা ইন্টারনেট কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মাধ্যমে একে অন্যের সঙ্গে সহজেই যোগাযোগ করতে পারি। কিন্তু বিভিন্ন দেশের জীবন যাত্রার মান, মানুষের চাল চলন, তাদের ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে কিন্তু আমাদের স্পষ্ট ধারণা খুব কমই আছে। দেশ-বিদেশ ঘুরে অভিজ্ঞতা সঞ্চার না করলে, আপনার জ্ঞান বাড়বে না। গ্লোবাল শেপার হিসেবে নানা দেশে গিয়ে কনফারেন্স করার মাধ্যমে আমি মনে করি, আমাদের বিশ্বের নানা প্রান্তে মানুষের আর্থিক অবস্থান সম্পর্কে আমার ধারণা হয়েছে, যেটা আমার সামনের পথচলায় সাহায্য করেছে। 

কী করলে, কীভাবে করলে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থানের গ্রাফ উর্ধ্বমূখী হবে তা নিয়েই কাজ করতে হয় আমার। নানান মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে পারি, যেমন বাংলাদেশে এসেই কিন্তু আমার বেশ কয়েকজন উদ্যোক্তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। তাদের সবার কাজের মাধ্যমে একটা ধারণা আমার পরিষ্কার হয়েছে আর তা হলো বাংলাদেশ ভবিষ্যতে অনেক ব্যবসা সফল নেতা পাচ্ছে। তাদের কাজই সবার কাছে জানান দিচ্ছে, বর্তমান বিশ্বের নানা খাতে বাংলাদেশ কিভাবে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে। গ্লোবাল শেপারের মত কনফারেন্স আমাদেরকে এই সুযোগ ও সম্ভাবনা সৃষ্টি করে দিচ্ছে। আশা করি, এর মাধ্যমে বিশ্বের অর্থনীতি, রাজনীতি নানা দিকে আমরা অবদান রাখতে পারবো।