সিপিডির বাজেট পর্যালোচনা

নৈরাজ্য বন্ধ না করে কর্পোরেট কর হার কমানোর সিদ্ধান্ত অনিয়ম উসকে দেবে

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৮ জুন ২০১৮, ১২:০২ | অনলাইন সংস্করণ

সিপিডি
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ- সিপিডির সংবাদ সম্মেলন। ফাইল ছবি

নৈরাজ্য বন্ধ না করে ব্যাংক ব্যবসায়ীদের চাপে কর্পোরেট করহার কমানোর সিদ্ধান্ত অনিয়ম উসকে দেবে বলে মন্তব্য করেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ- সিপিডি।

শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর গুলশানে একটি হোটেলে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পর্যালোচনা পেশকালে বেসরকারি গবেষণা সংস্থাটি এ মন্তব্য করে।

সংস্থাটির সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সামগ্রিক বিবেচনায় তাদের মনে হয়েছে, ‘নবীন বাংলাদেশের জন্য একটি প্রবীণ বাজেট তৈরি করা হয়েছে।’

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য চার লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

বর্তমান সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের এটিই শেষ বাজেট। গত অর্থবছরের বাজেট ছিল চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকা।

বাজেট পর্যালোচনায় সিপিডি বলেছে, বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ধরে রাখা কঠিন। গেল পাঁচ বছরে ভালো প্রবৃদ্ধি বাড়লেও আয়ের বৈষম্য বেড়েছে। গরিব মানুষের সঞ্চয় করার ক্ষমতা কমেছে।

সংবাদ সম্মেলনে সিপিডি বলেছে, আগে এক হাজার ১০০ বর্গফুটের ছোট ফ্ল্যাটের দামের ওপর দেড় ভাগ হারে কর দিতে হতো। আর এক হাজার ৬০০ বর্গফুটের জন্য যা ছিল আড়াই শতাংশ। এখন দুটোকে গড়ে ২ শতাংশ করা হয়েছে। যাতে মধ্যবিত্ত এবং বিকাশমান মধ্যবিত্তের ওপর করের চাপ বাড়বে।

সংস্থাটি জানায়, ব্যক্তি খাতের করের সীমা তিন লাখ টাকা করার সিপিডির প্রস্তাব আমলে না নেয়ার সমালোচনা করে বলা হয় এতে মধ্যবিত্তর ওপর চাপ কমত। কিন্তু তা করা হয়নি।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সংস্থাটির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান, গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এবং গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খানসহ সংগঠনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সিপিডি বলেছে, একদিকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট দেশের উন্নত এলাকা, অন্যদিকে খুলনা, বরিশাল এবং রাজশাহী অনুন্নত এলাকা। এই বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে কোনো পদক্ষেপ বাজেটে গ্রহণ করা হয়নি।

এ ছাড়া অলনাইনে কেনাকাটায় ভ্যাট আরোপের বিষয়টি সঠিক হয়নি। জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৭.৮ শতাংশ ধরা হয়েছে। এ জন্য ১১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ করতে হবে, যা গত বছরের তুলনায় ৩০ হাজার কোটি টাকা বেশি। এই অর্থ বিনিয়োগকে বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি ৫.৬ শতাংশের মধ্যে রাখা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত এই হার ঠিক রাখা যাবে কিনা তা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছে সিপিডি।

সিপিডির সংবাদ সম্মেলনে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নবীন বাংলাদেশের জন্য এটি একটি প্রবীণ বাজেট করা হয়েছে। ই-কমার্সের ক্ষেত্রে তরুণদের সুবিধা দেয়ার ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ কর আরোপ করা হয়েছে। তাদের ওপর করের বোঝা চাপানোতে বিকশমান কর্মসংস্থানে ধাক্কা লাগতে পারে। এ ছাড়া উবার, পাঠাওয়ের ক্ষেত্রে কর আরোপ করা হয়েছে, যা ভোক্তাদের ঘাড়ে পড়বে।

তিনি বলেন, মধ্যমেয়াদি অবকাঠামোর জন্য বিনিয়োগ বাড়লেও ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কমেছে। মানুষের দরিদ্র বিমোচনের হার কমেছে। দেশে ভোগ আয় এবং সম্পদের বৈষম্য বেড়েছে। প্রবৃদ্ধির হার উঁচু বা নিচু হতে পারে। কিন্তু এর মধ্যে সামগ্রিক দারিদ্র্য বিমোচনের বিষয়টিকেও প্রাধান্য দিতে হবে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, আমরা দেখেছি ৫ শতাংশ অতিদরিদ্র মানুষের আয় ৬০ শতাংশের ওপর কমেছে। আবার উচ্চবিত্ত শ্রেণির মধ্যে ৫৭.৫ শতাংশ মানুষের আয় বেড়েছে। এই অর্থনীতিতে শ্রম এবং উদ্যোগের তুলনায় পুঁজি বিনিয়োগে আয়ের সুযোগ অনেক বেশি। এতে উন্নয়নের সুবিধা গরিব মানুষ পাচ্ছে না।

বাজেট পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, এখন দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকার ৬০ শতাংশ ঋণ নিয়েছে। এতে সরকারের টেকসই ঋণগ্রহণের সক্ষমতা বিনষ্ট হওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়। বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া ঋণের জন্য ১৩ হাজার কোটি টাকা সুদ দিতে হবে।

সঞ্চয়পত্রের ঋণের জন্যও সরকারকে ১৩ হাজার কোটি টাকা সুদ দিতে হবে। সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ না নিতে, অন্যদিকে ব্যাংকঋণ গ্রহণ করতে গেলেও তারল্য সংকট দেখা দেবে। বিষয়টি সরকারের জন্য অনেকটা শাখের করাতের মতোই বলে মনে করছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বাজেটে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার ডলার প্রতি ৮২ টাকা দেখানো হয়েছে। কিন্তু এখনই ডলারের দাম ৮৪ টাকা। বাজেটে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ের হার ঠিক রাখা হয়নি। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ১৫ হাজার কোটি টাকার বাড়তি বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে, যার মধ্যে বিদ্যুৎ খাত এবং প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের জন্য ৪৫ হাজার কোটি টাকা। আর বাকি ৫৫ শতাংশ অন্য ২২ মন্ত্রণালয় এবং বিভাগের জন্য। এই পরিমাণ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সিপিডি।

এতে বলা হয়েছে, বাজেটে ২২ হাজার কোটি টাকা পুঁজি হিসেবে রাখা হয়েছে। কিন্তু এই পুঁজি কোথায় বিনিয়োগ করা হবে তা পরিষ্কার করা হয়নি। সরকারকে পরিষ্কার করতে হবে বিপুল পরিমাণ এই অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করা হবে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের ক্ষমতার সমালোচনা করে সিপিডি বলছে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ৫৩ শতাংশ প্রকল্পকেই চলমান প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর এক-চতুর্থাংশ প্রকল্প শেষ হয়েছে বলে দেখানো হচ্ছে। বাকিটা প্রকল্প গ্রহণ বর্জনের মধ্যে রয়েছে। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) ১৪ প্রকল্পের কোনো অগ্রগতি নেই।

এডিপির ৬৪ প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, এখানে মাত্র এক লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে প্রকল্পগুলো আটকে রাখা হয়েছে। এ ধরনের আরও ৯০টি প্রকল্প আছে, যার বরাদ্দের পরিমাণ এক কোটি টাকার মধ্যে। প্রকল্পগুলোর বয়স ৪.৬ বছর। কিন্তু এসব প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ছিল এক থেকে দুই বছরের মধ্যে।

বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের পদক্ষেপের সমালোচনা করে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, এ মুহূর্তে বাস্তবায়নাধীন পদ্মা সেতুর সময় বাড়ানো হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় এ বছর প্রকল্পটি শেষ হবে জানালেও আদৌ শেষ হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে সিপিডি।

তারা বলছেন, প্রকল্পটিতে ৩ শতাংশ হারে সময় বেড়েছে। আর ব্যয় বেড়েছে ১.৮৩ শতাংশ হারে। ব্যয় আরও বৃদ্ধির শঙ্কা রয়েছে। এডিপি বাস্তবায়নে কোনো নতুন পদক্ষেপ নেই উল্লেখ করে বলা হয়। যেভাবে এডিপি চলছিল এখনও সেভাবেই চলছে।

ব্যাংক খাতের কর্পোরেট ট্যাক্স আড়াই শতাংশ কমানোর সমালোচনা করে বলা হয়, ব্যাংকের লুটপাট ঠিক না করে কর কমানো উচিত হয়নি। এতে মালিকপক্ষ এককভাবে লাভবান হবে। ঋণগ্রহীতা এবং আমানতকারী কোনো সুবিধা পাবে না।

শিক্ষা খাতে জিডিপির ২ শতাংশ ব্যয়ের সমালোচনা করে বলা হয়, সপ্তম-পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতেই ৭.৮ শতাংশ বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। এই পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে উন্নত প্রতিযোগিতামূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলা দূরূহ হবে। স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের হার মাত্র ১ শতাংশ, যা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

ঘটনাপ্রবাহ : বাজেট ২০১৮

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter