অতিরিক্ত ভ্যাট দেশীয় হ্যান্ডসেট উৎপাদনকে নিরুৎসাহিত করবে

প্রকাশ : ২৬ জুন ২০১৮, ১৬:২৬ | অনলাইন সংস্করণ

  আমিনুর রশীদ

আমিনুর রশীদ, চেয়ারম্যান, সিম্ফনি মোবাইল।

গত অর্থবছরে সরকারের আন্তরিকতা ও সময় উপযোগী সিদ্ধান্তর কারণে সিম্ফনিসহ অনেকগুলো কোম্পানি দেশেই তাদের পণ্য উৎপাদনের জন্য কারখানা স্থাপন করার উদ্যেগ গ্রহণ করেছে। 

আমরা দুইটি কারখানা স্থাপন করার ঘোষণা দিয়েছিলাম। ইতিমধ্যে একটি কারখানার যাবতীয় কাজ শেষ হয়েছে ও অন্যটির কাজ শেষের পথে। 

সদ্য প্রস্তাবিত অর্থবাজেটে দেশের উৎপাদিত মোবাইল ফোনের ওপর অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ ভ্যাট নির্ধারণ রীতিমতো আমাদেরকে অবাক করে দিয়েছে।  

মোবাইল ফোনের ওপর এই অতিরিক্ত ভ্যাট নির্ধারনের ফলে আমদানী থেকে দেশীয় উৎপাদিত ফোনের মূল্য বেশি হবে। 

তাছাড়া দেশে সিম্ফনি ছাড়াও স্যামসাং, উই মোবাইল, ট্রানশান হোল্ডিংস লিমিটেডও কারখানা করার ঘোষণা দিয়েছে এবং কয়েকশ কোটি টাকা ইতিমধ্যে বিনিয়োগ করেছে। 

উৎপাদনেই যদি আমাদের খরচ বেশি হয় তাহলে আমরা কমদামে কী করে পণ্য সরবরাহ করবো! 

তাছাড়া মোবাইল ফোনের দাম যখন বেড়ে যাবে তখন অসাধু ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ভাবে অসুদপায়ে ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মোবাইল ফোন বাজারজাত শুরু করতে পারে। 

এখান থেকেও সরকার হারাতে পারে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। আমাদের দেশে প্রায় ৯৩ ভাগ মানুষ মোবাইল ফোন দিয়ে ইন্টারনেট ব্যাবহার করছে। 

মোবাইল ফোনের সংগে শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনসহ অনেক সেবা জড়িত। 

এ অবস্থায় যদি মোবাইল উৎপাদন শিল্পের উপর অতিরিক্ত ভ্যাট আরোপ করা হয় তাহলে তো পুরো শিল্পই হুমকির সম্মুখীন হবে। 

তাছাড়া সব গুলো কোম্পানিই কারখানার কাজ শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে; প্রায় ১ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানও এখন হুমকির মধ্যে পড়েছে। 

যদি মোবাইলে ফোনের দাম বেড়ে যায় তাহলে রাতারাতি মানুষের ভেতরে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারের আগ্রহ কমে যাবে। 

অপারেটররাও ফোরজিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। কারণ মানুষ যদি মোবাইল হ্যান্ডসেট না কেনে তাহলে ফোরজির সুফল পাওয়া যাবে না। 

যন্ত্রাংশ উৎপাদন করতে হলে বাজার অনেক বড় হতে হবে। বাংলাদেশে এখন মোবাইল ফোনের চাহিদা ৩ কোটির মতো। এটা আসলে খুব কম। 

বিশ্বের দ্বিতীয় মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী দেশ হলো ভারত। ভারতের মতো দেশও এখন পর্যন্ত মোবাইলের যাবতীয় যন্ত্রাংশ তৈরি করতে পারছে না। 

ভারত এখনো চায়না থেকে অনেক পার্টস আমদানী করে। সেখানে আমাদের মাত্র শুরু হতে যাওয়া অবস্থায় কী করে মোবাইলের যন্ত্রাংশ তৈরি করা সম্ভব! 

ভারতে প্রতিবছর ৩০ কোটি মোবাইল ফোন উৎপাদন হয় এবং আমাদের এখানে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা এর ১০ ভাগের এক ভাগ। 

বিশ্ববাজারকে হাতে না নিয়ে এই ধরনের উৎপাদনে গেলে আমাদের লাভের তুলনায় লোকসানই বেশি হবে। উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন কোয়ান্টিটি। 

আমাদের এখনো সে সময় আসেনি যে আমরা মোবাইলের যন্ত্রাংশ উৎপাদনে যাবো। প্রতিনিয়ত মোবাইল ফোনের মডেল পরিবর্তন হচ্ছে। 

স্ক্রিনের সাইজ অনুযায়ী ব্যাটারির সাইজ নির্ভর করে। দেখা গেলো আগামী ২ মাস যে সেটটির চাহিদা রয়েছে তা পরে আর থাকবে না এবং নতুন মডেলের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। 

সেক্ষেত্রে ২ মাস পরপর যদি মডেল পরিবর্তন হয় তাহলে এর আনুসঙ্গিক যন্ত্রাংশ উৎপাদনের জন্য ২ মাস পরপর প্রস্তুতি নিতে হবে যা বর্তমান পরিস্থিতিতে মোটেই সম্ভব নয়। 

এছাড়াও চার্জার বা অন্যান্য যেসব যন্ত্রাংশের কথা বলা হচ্ছে সেগুলোর জন্যও সময় প্রয়োজন। এজন্য দরকার রপ্তানিতে আরো জোড় দেয়া। 

যখন আমরা আরও বেশি পণ্য উৎপাদনের নিশ্চয়তা পাবো তখন যন্ত্রাংশ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেয়াটাই আমি যৌক্তিক বলে মনে করি।

এই অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করা হলে আমাদের মতো দেশীয় কোম্পানির জন্য খুব ভালো হয়। 

দেশে মোবাইল ফোন আমদানিতে গত অর্থ বাজেটে অ্যাডভান্স ট্যাক্স নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫ শতাংশ। 

এই ৫ শতাংশ ট্যাক্সকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা হলে হ্যান্ডসেট কোম্পানিগুলোর জন্য ভালো হবে। এটা আমাদের এক ধরনের দাবি বলতে পারেন।
   
আমাদের সঙ্গে এ বিষয়ে রাজস্ব বোর্ডের কোনো মতবিনিময় হয়নি। পার্শবর্তী দেশ ভারতে এ সংক্রান্ত বিষয়ে একটি টাস্ক ফোর্সই গঠন করা হয়েছে। 

রাজস্ব সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো আইন বা সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে টাস্ক ফোর্সের মাধ্যমে মতবিনিময় করা হয়। 

আমাদের এখানেও ঠিক তেমনি আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিৎ বলে আমি মনে করি। শুধু মোবাইল ইন্ডাস্ট্রিইর জন্যই না; সব ক্ষেত্রেই আমার মনে হয় এই ধরণের টাস্ক ফোর্স গঠন করা জরুরী। 

যারা বিশষজ্ঞ এবং উদ্যেক্তা সবার সাথে আলোচনা করে একটি সময় উপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে সরকারকে সাহায্য করতে পারবেন।
     
সিম্ফনি দীর্ঘদিন ধরে নাম্বার ওয়ান ব্র্যান্ড হিসেবে জায়গা দখল করে আছে। দেশে প্রচুর পরিমানে সিম্ফনি সেটের চাহিদা রয়েছে। 

আমাদের বিক্রয়োত্তর সেবার মান নিয়ে কারো কোনো প্রশ্ন নেই। সারা দেশে আমাদের নিজস্ব ৮১টি বিক্রয়োত্তর সেবাদানকারী পয়েন্ট রয়েছে। আমরা আমাদের পণ্যে ১২ মাস বিক্রয়োত্তর সেবা প্রদান করে থাকি স্বচ্ছতার সঙ্গে। 

লেখক: আমিনুর রশীদ, চেয়ারম্যান, সিম্ফনি মোবাইল।