কেন বছরের পর বছর ঝুলে আছে খেলাপি ঋণের সাড়ে ৬ হাজার মামলা
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:০২ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মামলার জালে আটকা খেলাপি ঋণের অঙ্ক ৩৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। বিশেষ মনিটরিংয়ের মাধ্যমে মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে অর্থ উপদেষ্টা, আইন উপদেষ্টা ও অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে কার্যকর রোডম্যাপ তৈরির চিন্তা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
ইতোমধ্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) থেকে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইওদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে এ নিয়ে চার দফা বৈঠকও হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় মনে করছে, দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি জটিলতায় হাজার হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আটকে আছে মামলার ফাঁদে। বর্তমান খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা সাড়ে ছয় হাজার। যার মধ্যে সাড়ে চার হাজারের বেশি মামলা সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের।
খেলাপি ঋণের সাড়ে ৬ হাজার মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের (এফআইডি) সচিব নাজমা মোবারেক যুগান্তরকে বলেন, আমরা বোঝার চেষ্টা করছি কেন মামলাগুলো নিষ্পত্তি হচ্ছে না। এগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য কী করতে হবে। কী করলে দ্রুত সমাধান পেতে পারি। তিনি বলেন, খেলাপিদের রিট করতে কোনো অগ্রিম অর্থ জমা দিতে হয় না। এক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা জমা দিয়ে রিটের বিধান রাখা গেলে উচ্চ আদালতে রিট করার প্রবণতা কমে আসবে এবং ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অগ্রিম কিছু অর্থ আদায়ও হবে।
এফআইডির সচিব বলেন, পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ব্যাংক ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে মামলা করলেও তা শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত হচ্ছে না, মাসের পর মাস পড়ে থাকছে। মামলায় গতি আনতে বাদী হিসাবে সরকারের আইনানুগ এখতিয়ার অনুযায়ী কাজ করা হবে।
সূত্রমতে, শীর্ষ ১০০ ঋণখেলাপির মামলার মধ্যে জনতা ব্যাংকের ১০টি মামলায় খেলাপি ঋণের অঙ্ক ১৫ হাজার ১৫১ কোটি টাকা। সোনালী ব্যাংকের ১০টি মামলায় খেলাপি ঋণের অঙ্ক ৫ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংকের ১০টি মামলায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। এছাড়া সাধারণ বীমা করপোরেশনের ৩৭১৯ কোটি, রূপালী ব্যাংকের ৩৭৪৮ কোটি, বেসিক ব্যাংকের ২৪০০ কোটি এবং বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ১৫৭৫ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ মামলা রয়েছে। তালিকা পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ১০টি মামলায় ৮৭৬ কোটি, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) ৮৬০ কোটি, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ২৯৪ কোটি এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ৮৪ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের মামলা আছে।
সূত্রমতে, মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চার দফায় বৈঠক করেছে এফআইডি। বৈঠকগুলোর পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, অর্থঋণ আদালতে কোনো মামলার রায় বা আদেশ পাওয়ার পর খেলাপি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান আদেশের বিরুদ্ধে রিট করে দিচ্ছে। যদিও অর্থঋণ আদালত আইনে বলা আছে, মামলার চূড়ান্ত রায় চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে যাওয়া যাবে না। এ নির্দেশ কেউ মানছে না। মূলত রিট করে মামলাগুলোয় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করাই মূল লক্ষ্য, যেন দ্রুত নিষ্পত্তি না হয়।
পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, শীর্ষ ঋণখেলাপির অধিকাংশ মামলা ঘিরে উচ্চ আদালতে একাধিক রিট আছে। এমন তথ্যও মিলছে একটি মামলার বিপরীতে সর্বোচ্চ ৮টি রিট করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চারটি-পাঁচটি রিট আছে। আবার আদালতে শুনানির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলেও দেখা গেছে মামলার নম্বর তালিকার অনেক নিচে।
এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের যুগ্মসচিব ফরিদা ইয়াসমিন যুগান্তরকে বলেন, আমরা দেখছি মামলাগুলোর নিষ্পত্তির ব্যাপারে বিভিন্ন ব্যাংক সঠিক পদক্ষেপ নিচ্ছে কি না, তাদের কোথায় সহায়তা দরকার। উচ্চ আদালতে অনেক মামলা হচ্ছে। সেগুলো তালিকা সামনের দিকে নিয়ে আসতে অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে প্রয়োজনে যোগাযোগ করা হবে।
সরকারের এ উদ্যোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বেসিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. কামরুজ্জামান খান যুগান্তরকে জানান, এফআইডি হচ্ছে ব্যাংক খাতের কর্তৃপক্ষ। কর্তৃপক্ষ কোনো সিদ্ধান্ত দিলে সেটি প্রতিপালন করতে আমাদের সুবিধা হয়। কারণ, নিজ থেকে এসব কাজ করতে গেলে এফআইডির অনুমতি নিতে হয়। এখন সে অনুমতির প্রয়োজন হবে না। শীর্ষ ১০ মামলা নিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ যে মনিটরিংয়ের উদ্যোগ নিয়েছে, সে বিষয়ে আমি অবহিত হয়েছি। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ব্যাংক খাতে শীর্ষ খেলাপিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে মাহিন এন্টারপ্রাইজ, খেলাপি ঋণ ১২৫১ কোটি টাকা। এফএমসি ডকইয়ার্ড লি., খেলাপি ঋণের অঙ্ক ১১৭৫ কোটি টাকা। গ্লাক্সি সুয়েটার অ্যান্ড ইয়ার্ন ডায়িং লি., যার খেলাপি ঋণ ১১৪৬ কোটি টাকা। এছাড়া ১০৮৪ কোটি টাকার ঋণখেলাপি রিমেক্স ফুটওয়্যার লি., প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেডের খেলাপি ঋণ ১০৭১ কোটি এবং মেরিন ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেড (১০৫৭.৪০ কোটি টাকা)।

