আমরা কেঁদেছি হেসেছি, ভালোবাসায় ভেসেছি...

  বিনোদন ডেস্ক ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ১২:০৯ | অনলাইন সংস্করণ

মেহের আফরোজ শাওন ও হুমায়ূন আহমেদ
মেহের আফরোজ শাওন ও হুমায়ূন আহমেদ। ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

ফেলে আসা দিনের স্মৃতিচারণ করছেন মেহের আফরোজ শাওন। তার স্বামী হূমায়ুন আহমেদের সঙ্গে শেষ বিবাহবার্ষিকীর স্মৃতিগুলো তিনি লিখেছেন তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে।

তিনি লিখেছেন-২০১১ সালের ১২ ডিসেম্বর ছিল হূমায়ুনের ৫ম কেমোথেরামির দিন।

আমরা তখন নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় ১৪৮-০১ নম্বর বাসার দোতলায় থাকি। নিচতলাটা খালি। দোতলার ওপরে ছোট্ট একটা অ্যাটিক। অর্ধেক উচ্চতার ওই অ্যাটিকে হূমায়ুন সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না। কিন্তু জায়গাটা তার খুব পছন্দের।

তার ট্যানটা বাবা নিষাদ হূমায়ুনকে সঙ্গে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তিনি সেখানে ছবি আঁকেন। সারা অ্যাটিক রঙে মাখামাখি হয়ে যায়-বাধা দেয়ার কেউ নেই। কোনো ছবির নীল আকাশটায় তুলো তুলো মেঘগুলো সাদা রং করতে করতে কোমল গলায় পুত্রকে জিজ্ঞেস করেন 'ছবিটা কেমন হয়েছে বাবা?'

ছবিতে গাছের নিচে দাঁড়ানো একাকি এক নারীকে দেখিয়ে ভাঙা ভাঙা গলায় পুত্র নিষাদ বলে, 'এখানে নিষাদ একে দিলে আরও ভালো হবে বাবা। ছবির ভেতরে মা একা একা দাঁড়িয়ে আছে, ভয় পাবে।'

হূমায়ুন ছেলের হাতে রংতুলি তুলে দেন। নিষাদ নিজেই একটা ছোট বাচ্চা একে দেয় ছবির মেয়েটির পাশে। এভাবে চলতে থাকে পিতা-পুত্রের রঙের খেলা। কোনো কোনো ছবি দেখে পুত্র হঠাৎ বলে ওঠে-'এই ছবিটা একদম পচা হয়েছে বাবা।'

পুত্রের সমালোচনায় কপাল কুচকে মনোযোগী হয়ে কিছুক্ষণ ছবির দিয়ে তাকিয়ে থাকেন হূমায়ুন। তারপর ঘ্যাচাং করে ছিঁড়ে ফেলেন সেই ছবি! গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা নাড়তে নাড়তে বলেন, 'আসলেই ছবিটা ভালো হয়নি বাবা। পচা হয়েছে।'

মাঝে মাঝে একা আমি অ্যাটিকে যাই, ছেঁড়া টুকরোগুলো হাতে করে জুড়ে দেখি। আমার বড় ভালো লাগে।

১১ ডিসেম্বর রাতে আমাকে অ্যাটিকে ডাকলেন হূমায়ুন। তার সামনে একটা সাদা কাগজ-পানিতে ভেজানো। তিনি পানি থেকে কাগজটা তুললেন। তার পর একটু একটু করে জলরঙের ছোপ পড়তে লাগল ভিজে পাতায়।

হূমায়ুন টুকটুক করে আমার সঙ্গে গল্প করছেন। সাত বছর আগের সেই একই দিনের গল্প। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি তার হাতের কাগজটার দিকে! কি সুন্দর জলছবি তৈরি হয়ে গেছে মুহূর্তের মধ্যে!

ছবিখানা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে হূমায়ুন বললেন এই নাও-তোমার বিয়েবার্ষিকীর উপহার...

১২ ডিসেম্বর বেলা ১১টা। হূমায়ুন আর আমি বসে আছি মেমোরিয়াল স্লোন কেটারিং হাসপাতালের গ্যাস্ট্রো অংকোলজি ডিপার্টমেন্টের সাজানো লবিতে।

অল্পক্ষণের মধ্যেই ডক্টর স্টিফেন আর ভিচ আমাদের ডেকে নিলেন তার ঘরে। পরিচিত হাসিখানা ছুড়ে দিয়ে বললেন-How are you doin’ Dr. Ahmed? You are looking happy today! Is there anything that I missed..! হালকা রসিকতায় ভ্রু নাচালেন তিনি।

'হুম তুমি রসিকতা করছ! একটু পরেই তো আমাকে গাদাখানেক সুঁই ফোটাবে! আজ আমার বিয়েবার্ষিকী, কোথায় দুজন মিলে একটু ঘুরব ফিরব! তা না... আমি বসে আছি কেমোথেরাপির অপেক্ষায়!'

সরু চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন ডক্টর ভিচ! হাতের কাগজটায় খসখস করে লিখলেন কি যেন! তার পর বললেন- 'তোমাদের আজ ছুটি দিয়ে দিলাম। কেমোথেরাপি কাল হবে। যাও সুন্দর করে বাঁচো আজকের দিনটা।'

আমরা সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম। ম্যানহাটনের রাস্তায় এলোমেলো হেঁটে বেড়ালাম! শুধু আমরা দুজন! পথচারীদের জিজ্ঞেস করে করে চায়না টাউন খুঁজে বের করে দুপুরের খাবার খেলাম।

দৌড়ে গিয়ে বাস ধরলাম-টিকিট ছাড়া সাবওয়েতে ঢুকে পড়লাম!!! সে কি পাগলামি আমাদের দুজনের...! সে কি ছেলেমানুষী...!!!

হ্যাঁ... আমরা দুজন...

আমরা কেঁদেছি-আমরা হেসেছি,

আমরা ভালোবাসায় ভেসেছি...

আমরা ছোট ছোট চাহনিতে মুহূর্তটা বেঁধেছি— ১২ ডিসেম্বর ২০১১... একসঙ্গে আমাদের শেষ বিয়েবার্ষিকী।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×