নাচে স্বর্ণপদক বিজয়ী মিল্কি রেজার গল্প

  হাসান শাহরিয়ার সুমন ২১ জুন ২০১৯, ১৯:০৬ | অনলাইন সংস্করণ

মিল্কি রেজা। ছবি: বাপ্পি খান
মিল্কি রেজা। ছবি: বাপ্পি খান

মিল্কি রেজা। খুবই ছোট্ট একটি নাম। তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন (এনডিএফ) আয়োজিত এক বিতর্ক প্রতিযোগিতায় গিয়ে। জানলাম, প্রাণশক্তিতে ভরপুর কর্মতৎপর এই মানুষটি এনডিএফ-এর সংস্কৃতি বিভাগের পরিচালক। এনডিএফ-এর ইতিহাসে সেই সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তি যিনি এই পদে দায়িত্ব পেয়েছেন। অবসরে নানা বিষয়ে কথা হয়েছিল তার সঙ্গে। আলাপের সময়েই জানতে পারলাম, নামটা যেমন খুব ছোট্ট, ঠিক ততটাই বিস্তৃত পরিসরে তার বিচরণ।

বিতর্ক, নাচ, উপস্থিত বক্তৃতা, জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠান আয়োজন ও পরিচালনা, অভিনয়, লেখালেখি, মিডিয়া ডিরেকশন– কী করেনি জীবনে! যেটাই করেছে সেখানেই পেয়েছে সাফল্যের পাশাপাশি অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা।

শুরুটা হয়েছিল সেই ২০০০ সালে। যখন তার বয়স মাত্র ৬ বছর। বাবা মো. মোহসিন রেজা, যিনি ছিলেন বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার শিল্প-সংস্কৃতির একজন পৃষ্ঠপোষক। তিনি মেয়ের জন্য একজন নাচের শিক্ষক নিযুক্ত করেন। সে আমলে একটু পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী হিসেবে চিতলমারী উপজেলায় তেমন কোন নাচের শিক্ষক ছিলেন না।

বাবা মো. মোহসিন রেজা তাই পার্শ্ববর্তী বিভাগীয় শহর খুলনাতে একজন নাচের শিক্ষক, দিপক দত্তকে অনুরোধ করেন যাতে তিনি প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার চিতলমারীতে এসে ওনাদের বাড়িতে দুদিন থেকে ওনার মেয়েকে নাচের প্রশিক্ষণ দেবেন।

অতঃপর সেভাবেই মিল্কি রেজার নাচের পথচলা শুরু। এরপর বাগেরহাট জেলা শিল্পকলা অ্যাকাডেমি থেকে তালিম নেয় ক্লাসিক্যাল ড্যান্সের ওপর। সব মিলিয়ে দুবছর টানা প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর প্রথম প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতা ২০০২ সালে।

ওই প্রতিযোগিতায় সে থানা পর্যায়ে বিজয়ী হয়। এরপর নানা সময়ে আয়োজিত বিভিন্ন সরকারি প্রতিযোগিতায় সে জেলা ও বিভাগ সকল পর্যায়েই প্রথম হয়। আর তারই পরিক্রমায় সে ২০১৬ সালে জাতীয় আন্তঃকলেজ পুরস্কার প্রতিযোগিতায় বিজয় লাভ করে। তৎকালীন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের উপস্থিতিতে এমেরিটাস অধ্যাপক ডঃ আনিসুজ্জামানের হাত থেকে গ্রহণ করে স্বর্ণপদক।

নাচের পাশাপাশি সে সবসময়ই ছিল ডিরেকশনে আগ্রহী। আর সেই আগ্রহের হাত ধরেই কলেজ পর্যায়ে নির্দেশনা দিয়েছে নকশী কাঁথার মাঠ, মহুয়া এবং চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্যে। কেমন ছিল সেই দিনগুলো? জানার জন্য কথা বলেছিলাম তার প্রাক্তন কলেজ শিক্ষক, খুলনা সরকারি মহিলা কলেজের প্রখ্যাত ইংরেজি প্রভাষক আহমেদুল কবির চাইনিজ স্যারের সঙ্গে।

তিনি বলেন, “কলেজে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসমূহে মিল্কি প্রতিবারই নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করত। জাতীয় পর্যায়ে সে একাধিকবার কলেজের প্রতিনিধিত্ব করেছে। কলেজের ছাত্রী থাকাকালীন সে বিভিন্ন গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্যে নির্দেশনা প্রদানসহ অভিনয় করেছে; যেগুলো সকলের দ্বারা ভূয়সী প্রশংসিত হয়েছে। আমাদের কলেজ সাংস্কৃতিক দিক থেকে অনেক অগ্রসর। সেখানে মিল্কির মতো একজন গুণী মানুষ পেয়ে আমরা গর্বিত।”

শুধু কলেজ পর্যায়েই নয়। এরপরেও তার ডিরেকশনের গল্পভান্ডার অনেকটাই সমৃদ্ধ। কাজ করেছে সিসিমপুর সিজন-সিক্সের লাইভ অ্যাকশনে। এছাড়াও চ্যানেল আই ও বাংলাভিশনের মতো চ্যানেলগুলোর কিছু টেলিফিল্মে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেছে।

নাচ এবং ডিরেকশনের বাইরে তার রয়েছে আরও একটি পরিচয়। সে একজন লেখিকা। সৃজনশীল লেখালেখির সঙ্গে জড়িত বহু বছর ধরেই। প্রাতিষ্ঠানিক হাতেখড়ি প্রখ্যাত অভিনেতা ও চ্যানেল আইয়ের নির্মাতা শহিদুল আলম সাচ্চুর কাছে এবং লেখিকা হিসেবে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায় দৈনিক যুগান্তরের অনলাইন বিভাগের প্রধান মিজানুর রহমান সোহেলের কাছে।

এরপর থেকেই তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সময়ের পরিক্রমায় আজ সে প্রিয়লেখা ডটকম নামক একটি অনলাইন পত্রিকার এডিটর হিসেবে কর্মরত রয়েছে। প্রসঙ্গত, প্রিয়লেখা ডটকম ক্রিয়েটিভ আইটি ইন্সটিটিউতের একটি গবেষণামূলক প্রচেষ্টা।

বেশিরভাগ সময় ক্যামেরার পেছনে থেকে কাজ করলেও ইদানীং সে ক্যামেরার সামনেও কাজ করার জন্য আমন্ত্রণ পাচ্ছে। এ পর্যন্ত অভিনয় করেছে ৪টি নাটক ও ১টি টেলিফিল্মে। এ ব্যাপারে তার সঙ্গে কথা বললে সে জানায়, “মিডিয়ার সঙ্গেই যেহেতু আছি, ভালো এবং অর্থবহ কাজের সুযোগ পেলে অবশ্যই নিজের সেরাটা দেবার চেষ্টা করবো।”

এই যে এতগুলো ক্ষেত্রে নিজেকে আবিষ্কার করার ইচ্ছা, এক্ষেত্রে কে বা কারা আপনাকে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছে? এ সম্পর্কে জানতে চাইলে সে বলে, দীর্ঘ পথচলায় আসলে অনেককে দেখেই উদ্বুদ্ধ হয়েছি। তবে জীবনের প্রথম উৎসাহগুলো আসে অবশ্যই বাবা-মায়ের কাছ থেকে। একটা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হবার পাশাপাশি আমার বাবা একজন নজরুল সঙ্গীত শিল্পী।

আর আমার নাচের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন আমার মা। তিনি একজন সমাজসেবিকা। চিতলমারী উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী এবং মহিলা পরিষদের সভানেত্রীর মতো দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে দায়িত্ব পালনের পরেও তিনি আমার নাচের দিকে বিশেষভাবে মনোযোগ রেখেছেন।

তিনি বলেন, সেই ছোটবেলায় যখন আমি ঠিকমতো কথাও হয়ত বলতে পারি না, তখন থেকেই আমাকে প্রস্তুত করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া এবং পুরোটা সময় আমার সঙ্গে থেকে উৎসাহ দেয়ার কাজটা আমার বাবা-মা দুজনেই করেছেন।

এছাড়া আমার বড় দুই ভাইয়েরাও আমাকে এ ব্যাপারে পুর্ণাঙ্গ সহযোগিতা করেছেন। আসলে আমাদের সমাজে পরিবারের সহায়তা না পেলে একা একটা মেয়ের পক্ষে কোনদিনই এতদূর আসা সম্ভব হয় না। আমি খুবই সৌভাগ্যবতী যে আমি এমন একটি সংস্কৃতিমনা পরিবার পেয়েছি।

“বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়াটাকে নিজের ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে অন্তরায় মনে করেন কিনা?” এমন প্রশ্নের জবাবে তার উত্তর, “দেখুন, একেকটা সম্পর্কের সংজ্ঞা এবং বাস্তবতা একেকরকম। তাই সার্বজনীন জায়গা থেকে এই প্রশ্নের উত্তর দেয়াটা খুবই কষ্টকর। তবে ব্যক্তিগত জায়গা থেকে বলতে পারি, বৈবাহিক সম্পর্কটাকে আমি কখনোই বন্ধন হিসেবে মনে করি না। নিজের ভেতর এই বিশ্বাসটুকু গড়ে উঠেছে আমার স্বামীর সহায়তায়।

যেকোনো কাজের ব্যাপারে আমি ঠিক একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসাবে ওর সঙ্গে আলোচনা করি। নিজেও আমাকে প্রতিটা কাজের ব্যাপারে বুদ্ধি দিয়ে এবং প্রচেষ্টা দিয়ে সহযোগিতা করে। আমার কাজের সবচেয়ে বড় প্রশংসাকারী যেমন সে, ঠিক তেমনি আমার কাজের সবচেয়ে বড় সমালোচকও সেই। এতে আমি কাজের প্রতি আরও মনযোগী হই। ওর সহযোগিতাতেই আমি আমার কাজে প্রতিনিয়ত আরও পরিণত হচ্ছি।

ভবিষ্যতে নিজেকে কোথায় দেখতে চান? জানতে চাইলে তিনি বলেন, যতটুকু জানি সেটাকে আরও পরিণত করে অর্থবহ কিছু কাজের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনে নিজের ক্ষুদ্র প্রয়াসটুকু যদি রাখতে পারি, তাতেই মানুষ হিসেবে আমার সার্থকতা।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×