Logo
Logo
×
   

ইউরোপ

ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন

অভিবাসন নীতিকে ঘিরে ক্ষমতার সমীকরণে নতুন উত্তাপ

Icon

হাসান ইলিয়াছ তানিম, প্যারিস (ফ্রান্স) থেকে

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০২:৪৪ এএম

অভিবাসন নীতিকে ঘিরে ক্ষমতার সমীকরণে নতুন উত্তাপ

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আলোচিত প্রার্থীরা

ফ্রান্সে ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক পরিবেশ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র ফ্রান্সে এই নির্বাচন শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তনের বিষয় নয় বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অভিবাসন নীতি, অর্থনৈতিক দিক নির্দেশনা এবং সামাজিক কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ টানা দুই মেয়াদ পূর্ণ করায় সংবিধান অনুযায়ী তিনি আর ২০২৭ সালের নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। ফলে ক্ষমতার শীর্ষ পদে নতুন নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার জন্য ফ্রান্স এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এই পরিবর্তনের সম্ভাবনা ঘিরে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের অবস্থান, কৌশল এবং নীতিগত অগ্রাধিকার পুনর্গঠন করছে।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সাধারণত দুই দফায় অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম দফায় একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং কোনো প্রার্থী সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট না পেলে শীর্ষ দুই প্রার্থীর মধ্যে দ্বিতীয় দফা ভোট হয়। সেই ভোটেই চূড়ান্তভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এই কাঠামো ফ্রান্সের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে আরও জটিল এবং বহুমাত্রিক করে তোলে।

বর্তমান সাংবিধানিক সময়সূচি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের প্রথম দফা ভোট ১৮ এপ্রিল এবং দ্বিতীয় দফা ভোট ২ মে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণ প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হয়নি, তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে জল্পনা-কল্পনা এবং জরিপভিত্তিক বিশ্লেষণ ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।

নির্বাচনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে অভিবাসন ইস্যু। ফ্রান্সে দীর্ঘদিন ধরেই অভিবাসন একটি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়। 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপ জুড়ে অভিবাসন প্রবাহ বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক চাপ এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ এই ইস্যুকে আরও জোরালো করেছে।

সরকারি পর্যায়ে ইতোমধ্যেই অভিবাসন ব্যবস্থায় কঠোরতা দেখা গেছে। ভিসা প্রক্রিয়া আরও যাচাইভিত্তিক করা, আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়ায় কড়াকড়ি এবং অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধে নজরদারি বৃদ্ধি পেয়েছে। 

ইউরোপীয় বিশ্লেষকদের মতে, এসব পদক্ষেপ কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয় বরং রাজনৈতিক চাপ এবং জনমতের প্রতিফলনও।

এই প্রেক্ষাপটে ডানপন্থি রাজনৈতিক শক্তি ন্যাশনাল র‍্যালি অভিবাসন ইস্যুকে তাদের প্রধান নির্বাচনি এজেন্ডা হিসেবে সামনে এনেছে। দলটি নতুন অভিবাসন কমানো, পরিবার পুনর্মিলনের শর্ত কঠোর করা, নাগরিকত্ব অর্জনের প্রক্রিয়া আরও জটিল করা এবং অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। 

তাদের যুক্তি অনুযায়ী, রাষ্ট্রের সামাজিক ভারসাম্য এবং অর্থনৈতিক চাপ নিয়ন্ত্রণে এসব পদক্ষেপ প্রয়োজন।

অন্যদিকে মধ্যপন্থি রাজনৈতিক শিবির তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখার কথা বলছে। তারা দক্ষ কর্মী, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এবং বৈধ অভিবাসীদের জন্য ফ্রান্সের শ্রমবাজার উন্মুক্ত রাখার পক্ষে, তবে একই সঙ্গে অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তাও স্বীকার করছে। বামপন্থি দলগুলো আবার অভিবাসনকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার পক্ষে অবস্থান নিয়ে সামাজিক সুরক্ষা ও শ্রম অধিকারের ওপর জোর দিচ্ছে।

রাজনৈতিক অঙ্গনে ডানপন্থি শিবিরের নেতৃত্ব নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মেরিন ল্য পেন বর্তমানে একটি আইনি আপিল প্রক্রিয়ার রায়ের অপেক্ষায় আছেন। ওই রায়ের ওপর নির্ভর করছে তিনি ২০২৭ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না। যদি আদালত তাকে অযোগ্য ঘোষণা করে, তাহলে দলটির সম্ভাব্য নেতৃত্ব হিসেবে জর্দান বারদেলার নাম সামনে আসছে।

এই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ফ্রান্সের নির্বাচনি সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, প্রার্থী নির্ধারণ এবং দলীয় কৌশল চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনের প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র স্পষ্ট হবে না।

ফ্রান্সে বসবাসরত অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যেও এই নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ ও আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে রেসিডেন্স পারমিট, নাগরিকত্ব, পরিবার পুনর্মিলন এবং কর্মসংস্থান সংক্রান্ত নীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে আলোচনা চলছে। 

তবে প্রশাসনিক সূত্রগুলো স্পষ্ট করে বলছে, বর্তমানে কার্যকর অভিবাসন নীতি অব্যাহত রয়েছে এবং কোনো পরিবর্তন হলে তা আইন প্রণয়ন, সংসদীয় অনুমোদন এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে।

বিশ্লেষকদের মতে ফ্রান্সের ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এখন কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয় বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নীতি কাঠামো নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যেখানে অভিবাসন ইস্যু রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .