শুভ জন্মদিন মোনালিসার স্রষ্টা চিত্রশিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৫ এপ্রিল ২০১৮, ১৪:৫৯ | অনলাইন সংস্করণ

শুভ জন্মদিন মোনালিসার স্রষ্টা চিত্রশিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি
চিত্রশিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি ও তার বিখ্যাত চিত্রকর্ম

‘অশ্রু কখনই মস্তিষ্ক থেকে আসে না, বরং তা আসে হৃদয় থেকে’ – বলেছিলেন লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি। ইতালীয় রেনেসাঁর কালজয়ী মোনালিসাখ্যাত চিত্রশিল্পী।

তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি ছিলেন ভাস্কর, স্থপতি, সঙ্গীতজ্ঞ, সমরযন্ত্রশিল্পী এবং বিংশ শতাব্দীর বহু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের নেপথ্যে।

আজ এ মহান গুণী শিল্পীর শুভ জন্মদিন। ১৪৫২ সালের ১৫ এপ্রিল তুসকানের পাহাড়ি এলাকা ভিঞ্চিতে, আর্নো নদীর ভাটি অঞ্চলে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

ফ্লোরেন্সের এক নোটারি পিয়েরে দ্য ভিঞ্চি এবং এক গ্রাম্য মহিলা ক্যাটরিনার সন্তান। তার মা সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা দাসী। ভিঞ্চি নগরী থেকে এসেছেন বিধায় তার নামের শেষে ‘দ্য ভিঞ্চি’লেখা হয়েছে।

তার পুরো নাম ‘লিওনার্দো দাই সের পিয়েরো দ্য ভিঞ্চি’-এর অর্থ হল পিয়েরোর পুত্র লিওনার্দো এবং সে জন্মেছে ভিঞ্চিতে।

লিওনার্দোর জীবনের প্রথম ৫ বছর কেটেছে আনসিয়ানোর একটি ছোট্ট গ্রামে। তারপর তিনি চলে যান ফ্রান্সিসকোতে তার বাবা, দাদা-দাদি ও চাচার সঙ্গে থাকতে।

ষোড়শ শতাব্দীর জীবনী লেখক ভাসারি রেনেসাঁর চিত্রশিল্পীদের জীবনী লিখেছিলেন। তিনি বলেছেন- লিওনার্দোর বাবাকে স্থানীয় একজন লোক বলেছিলেন তিনি যেন ছেলেকে একটি ছবি আঁকতে বলেন। লিওনার্দো এই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে একটি ছবি এঁকেছিলেন।

এতে ছিল একটি সাপের মুখ থেকে আগুন বের হচ্ছে। ছবিটি এত সুন্দর হয়েছিল যে পিয়েরো তা স্থানীয় চিত্র ব্যবসায়ীদের কাছে বেশ ভালো দামে বিক্রি করেছিলেন। আর যে লোকটি এ ছবিটি আঁকিয়ে নিতে বলেছিলেন, তিনি তাকে একটি হৃদয়ের ছবি আঁকা ফলক উপহার দিয়েছিলেন। তার শৈল্পিক মেধার বিকাশ ঘটে খুব অল্প বয়সেই।

আনুমানিক ১৪৬৯ সালে রেনেসাঁসের অপর বিশিষ্ট শিল্পী ও ভাস্কর আন্দ্রেয়া ভেরোচ্চিয়োর কাছে ছবি আঁকায় ভিঞ্চির শিক্ষানবিস জীবনের সূচনা। এ শিক্ষাগুরুর অধীনেই তিনি ১৪৭৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে, বিশেষত চিত্রাঙ্কনে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। ১৪৭২ সালে তিনি চিত্রশিল্পীদের গিল্ডে ভর্তি হন এবং এ সময় থেকেই তার চিত্রকর জীবনের সূচনা হয়।

আনুমানিক ১৪৮২ সালে তিনি মিলানে চলে যান এবং সেখানে অবস্থানকালে তার বিখ্যাত দেয়ালচিত্র দ্য লাস্ট সাপার অঙ্কন করেন। আনুমানিক ১৫০০ সালে তিনি ফ্লোরেন্সে ফিরে আসেন এবং সামরিক বিভাগে প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পান। এ সময়েই তিনি তার বিশ্বখ্যাত চিত্রকর্ম মোনালিসা অঙ্কন করেন। জীবনের শেষকাল তিনি ফ্রান্সেই কাটান। ভাসারির মতে লিওনার্দো সে সময়ের সেরা সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। ১৪৮২ সালে তিনি ঘোড়ার মাথার আকৃতির একটি বীণা তৈরি করেছিলেন।

লরেঞ্জো দ্য মেডিসি লিওনার্দোর হাতে এই বীণা উপহারস্বরূপ মিলানের ডিউক লুদোভিকো এলের কাছে পাঠিয়েছিলেন শান্তিচুক্তি নিশ্চিত করার জন্য। এ সময় লিওনার্দো ডিউকের কাছে একটি চিঠি লিখেন, যাতে ছিল তার উদ্ভাবিত বিভিন্ন চমকপ্রদ যন্ত্রের বর্ণনা।

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি প্রকৌশলী হিসেবেও অনেক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। লুভোডিকো মুরো নামের এক ব্যক্তিকে তিনি একটি চিঠি দিয়ে দাবি করেছিলেন, তিনি একটি শহরের সুরক্ষা এবং নিরাপত্তার জন্য স্বয়ংক্রিয় কিছু যন্ত্র আবিষ্কারে সক্ষম হয়েছেন।

তারপর যখন তিনি ভেনিসে স্থানান্তরিত হলেন, তখন সেখানে এক ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিতে চাকরি পান। সেখানে তিনি শহরকে বহিরাগত আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য একটি স্থানান্তরযোগ্য ব্যারিকেড তৈরিতে সক্ষম হন এবং অনেক খ্যাতি অর্জন করেন।

লিওনার্দো তার পত্রিকায় বিভিন্ন বাস্তব এবং অবাস্তব যন্ত্রের বর্ণনা দিয়েছিলেন। যার মধ্যে রয়েছে নানা রকম বাদ্যযন্ত্র, একটি যান্ত্রিক সৈন্য, হাইড্রোলিক পাম্প, ডানার মর্টার শেল এবং একটি বাষ্প কামান।

তিনি জীবনের একটি বড় সময় উড্ডয়ন সক্ষম যন্ত্র তৈরিতে ব্যয় করেন। তারই প্রদত্ত ডিজাইনে বর্তমানে আধুনিক বিমান নির্মাণ সম্ভব হয়েছে। লিওনার্দো আঁকলেন তার জগৎ বিখ্যাত মোনালিসা। এই ছবিটি আঁকতে তার তিন বছর সময় লেগেছিল। কে এই মোনালিসা- এ বিষয়ে ভিন্নমত আছে। কয়েকজনের অভিমত মোনালিসার প্রকৃত নাম ছিল লিজা। তিনি ছিলেন ফ্লোরেন্সের এক অভিজাত ব্যক্তির স্ত্রী।

ভিন্নমত অনুসারে মোনালিসা ছিলেন জিয়োকোন্ত নামে এক ধনী বৃদ্ধের তৃতীয় স্ত্রী। নাম মাদোনা এলিজাবেথ। লিওনার্দো দিনের পর দিন অসংখ্য ভঙ্গিতে মুখের ছবি এঁকেছেন। আরেকটি মত হল, লিওনার্দো নিজের চেহারার আড়ালে ফুটিয়ে তুলেছেন মোনালিসার অমর চিত্রকর্ম। আজও মোনালিসার রহস্য উদ্ধার করা যায়নি।

চিত্রশিল্পী হিসেবে লিওনার্দোর খ্যাতি জগৎ বিখ্যাত হলেও তার মৃত্যুর পর পাওয়া গেছে প্রায় পাঁচ হাজার পাতার হাতের লেখা পাণ্ডুলিপি। এই পাণ্ডুলিপিতে তিনি সারা জীবন ধরে যেসব পর্যবেক্ষণ করেছিলেন এবং পরীক্ষা করেছিলেন- তারই বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন।

এ পাণ্ডুলিপি লেখা হয়েছিল ইতালিয়ান ভাষায় এবং সারা পাণ্ডুলিপিটাই লেখা হয়েছিল উল্টো করে। ফলে সোজাসুজি পড়া যেত না। পড়তে হতো আয়নার মাধ্যমে। প্রতিটি লেখার সঙ্গে আছে অসংখ্য ছবি।

তার বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা এত গভীর ছিল যে গোপনে বেশকিছু মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করে দেহের গঠন দেখেছিলেন।

লিওনার্দোর মৃত্যুর প্রায় আড়াইশ বছর পর একজন পণ্ডিত তার পাণ্ডুলিপির সম্পূর্ণ পাঠ উদ্ধার করে চৌদ্দটি খণ্ডে প্রকাশ করেন। ৬৭ বছর বয়সে ২ মে ১৫১৯ সালে চিরদিনের জন্য পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি- ইতালীয় রেনেসাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ।

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.