প্রচার বিমুখ নিভৃতচারী লালন সাধক রব ফকিরের জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি
jugantor
প্রচার বিমুখ নিভৃতচারী লালন সাধক রব ফকিরের জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

  রুবেল সাইদুল আলম  

২০ জানুয়ারি ২০২১, ১১:০৮:২৮  |  অনলাইন সংস্করণ

বাউল আব্দুর রব ফকির

লালনকে নতুন করে চিনতে শেখানো রব ফকির ছিলেন লালনের মতই বাউলসাধক। ১৯৫৫ সালের ২০ জানুয়ারি কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার মিনিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন বাউল আব্দুর রব ফকির। তার বাবার নাম সিরাজ জোয়ার্দার। রব ফকিরের মা ছিলেন ওই গ্রামের বিখ্যাত ধাত্রী। তার একছেলে, দুই মেয়ে। ছেলের নাম পরান। রব ফকিরের পাড়াকে ফকির পাড়াও বলা হয়।

ফকির পাড়ার নামকরণ নিয়ে শুরুতে ধোঁয়াশা থাকলেও পরে বুঝা গেলো ওই পাড়ার প্রায় সবাই ফকির লালন শাহের অনুসারী বাউল; তাই এমন নামকরণ। ছোটবেলা থেকেই রব ফকির সাদা পাঞ্জাবি পরতেন। তার বাবা সাধুগুরুদের ভালোবাসতেন। ছোট বেলায় ১৯৭২ সালের দিকে বাবা সিরাজ জোয়ার্দারের হাত ধরে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালন সাঁইয়ের আখড়ায় যেতেন। বাবার সাইকেলে চড়ে রব লালনের আখড়ায় যেতেন। সেখানেই ওস্তাদের সাথে পরিচয় ভাব বিনিময়। আব্দুর রহিম বয়াতি ছিলেন রব ফকিরের গুরু। রব ফকির ছোটবেলা থেকেই সাদা পাঞ্চাবি গায়ে সাইকেল চালিয়ে আঁখরাবাড়ীতে আসতেন, পিঠে ঝুলানো থাকতো সালু কাপড়ে মোড়ানো দোতারা।

রব ফকির ছিলেন একজন সুরস্রষ্টা। কালো রংয়ের খর্বকায় রব ফকির গলায় দোতারা ঝুলিয়ে অপূর্ব ভঙ্গিমায় গান করতেন। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের কাছে রব ফকির কে? এমন একটি প্রশ্ন মনের ভেতর উঁকি দিতে পারে। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এ প্রজন্ম রব ফকিরকে না চেনারই কথা। কারণ তিনি ছিলেন প্রচার বিমুখ নিভৃতচারী একজন মানুষ। রব ফকির শারীরিকভাবে ছিলেন শীর্ণকায়। গ্রামের মানুষদের সাথে তেমন একটা মেলামেশা করতেন ন। কাজ করতেন কুষ্টিয়া সুগারমিলে। কাজের বাইরে সারাক্ষণ দোতরা নিয়ে পরে থাকতেন। ওনার কথাবার্তা ছিল অনেক ধীরস্থির এবং নীচুস্বরের।


রব ফকিরের বাবা সিরাজ জোয়ার্দার ছিলেন কুষ্টিয়া সুগার মিলের শ্রমিক। পিতার কর্মসূত্রে রব ফকির কুষ্টিয়া সুগার মিলে চাকরি শুরু করলে পরিচয় হয় উনার আরেক গুরুর সাথে। তার নামও ছিল রব ফকির। রব ফকিরের ভাষায়- লালন শাহ সবসময় কর্মকে ভালবেসেছেন। কর্মহীন জীবনে কোন ভজন সাধন নাই। কর্ম ছাড়া জীবন ছন্নছাড়া। ধর্মের একটা অংশ হচ্ছে কর্ম। কর্ম শেষে অবসর সময়ে যতটুকু সাধনা করা যাবে সেই সময়টুকুই সাধনার কাজে ব্যস্ত থাকতে হবে।

তিনি আরও বলেন, যারা লালন সাঁইজির মুরিদ, তাদের কোন জাতি ভেদাভেদ নাই। সব মানুষই তাদের কাছে মানুষ। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট প্রকৃতি দেখে যেন আমরা সৃষ্টিকর্তাকে ভুলে না যাই। যারা আধ্যাত্মিক গান সম্পর্কে আগ্রহী, এক-আধটু খবর রাখেন, তাদের কাছে রব ফকির পরিচিত নাম। লালন-পরবর্তী সময়ে যারা লালনের ভাবাদর্শে দীক্ষিত হয়ে বিশ্বব্যাপী লালনের বানীকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে রব ফকির অন্যতম। লালনের গান নতুনভাবে উপস্থাপন করে সমাজে ছড়িয়ে দিয়ে এক অহিংস সমাজ গড়তে চেয়েছিলেন।

ছোটবেলা থেকে বাবা সিরাজ জোয়ার্দারের হাত ধরেই লালনের আখড়ায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন। সেখানেই তিনি লালনের ভাবাদর্শে প্রভাবিত হন। চর্চা আরম্ভ করেন লালনসংগীত। কালো রংয়ের খর্বকায় রব ফকির গলায় দোতারা ঝুলিয়ে অপূর্ব ভঙ্গিমায় গান করতেন। একসময়ে তিনি লালনের ভাবাদর্শে এতটাই প্রভাবিত হন যে তিনি বলতেন- ‘আমার দেহটাই দোতারা/লালনের গানই আমার ধর্ম।’ তিনি আরও বলতেন, চোখ বুজলেই দোতারার সুর শুনতে পাই। দোতারার সুরের সঙ্গে দেহের সুর মিশে গেছে। যত দিন বাঁচব, দোতারার সুর বাজিয়েই বাঁচব।

রব ফকির দোতারা বাজাতে পারদর্শী ছিলেন। সুর নিয়ে খেলা করতেন প্রতিনিয়ত। তিনি যখন গলায় দোতারা ঝুলিয়ে মঞ্চে উঠতেন, তখন তার দোতারার সুরে মানুষ নিজেকে অন্য জগতে আবিষ্কার করত। দোতারা বাজানোর তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। তখন বেতারে আব্বাসউদ্দিনের গান শুনে দোতারা বাজানোর প্রতি আকৃষ্ট হন। বাজার থেকে কিনে আনেন দোতারা। সেই দোতারায় তোলা সুর তার কাছে ভালো লাগত না। তাই নিজেই তৈরি করেন দোতারা। কাঁঠাল কিংবা নিমগাছের কাঠ এবং ছাগল অথবা গুই সাপের চামড়া আর পিতলের প্লেট দিয়ে মনের মাধুরী মিশিয়ে তৈরি করতেন দোতারা।

দোতারার তারগুলো পিতল বা রেশমে পাকানো সুতা দিয়ে তৈরি করতেন। তার পর তিনি দোতারার মাধ্যমে এমন সব সুর সৃষ্টি করেছেন, যা তাকে দোতারা জাদুকর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। লালন, রবীন্দ্র, নজরুল— কোনো সংগীতই তার দোতারার সুর থেকে বাদ যায়নি। রব ফকির গুরুর গুরুর কাছে লালনের দেহতত্ত্ব দর্শনসহ বিভিন্ন বিষয়ে তালিম দেন। খলিসাকুণ্ডিতে তার আখড়ায় চলত তালিম দেওয়ার কাজ। ওস্তাদের কাছ থেকে লালনের যে দর্শন তিনি অন্তরে গেঁথে নিয়েছেন, তা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অন্তরে ধারণ করেছেন। ছড়িয়ে দিয়েছেন লালনের বাণী সর্বত্র।


মানুষ হিসেবে রব ফকির ছিলেন স্বল্পভাষী। কথা প্রায় বলতেনই না। কিন্তু দোতারা হাতে সুরের মঞ্চে লালন সাধক রব ফকির ছিলেন অনবদ্য এক শিল্পী। লালনের গানকে তিনি অন্তরের খোরাক করে নিয়েছিলেন।পুরোদমে বাউল সাধনায় মগ্ন থাকতেন রব ফকির। নিভৃতচারী এই বাউলের সাথে আমার সর্বশেষ কথা হয় ১৯১৬ সালে (তার মৃত্যুর বছর) বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটের একটি অনুষ্ঠানে। আলাপরিতায় উনি বলে যাচ্ছিলেন ওনার সাধনার কথা, যাপিত জীবনের কথা, দোতরার কথা, সাধু সঙ্গের কথা, বাউল সাধক হয়ে ওঠার গল্প। তার কথাগুলো ছিল অনেক বেশি আধ্যাত্মিক ও তথ্যবহুল।

তিনি বলেন, মানুষের মাথায় লাঠি মেরে কিছু হবে না। মানুষকে ভালবেসেই সবকিছু করতে হবে। এজন্য একজন মানুষগুরু দরকার। জীবনে একজন শিক্ষাগুরু থাকা প্রয়োজন। বাউল আসলে অনেক সাধনার পর হওয়া যায়। আর একজন বাউলের কর্তব্য বা করণীয় কি সেটাও উনার বক্তব্য থেকে পরিষ্কার বুঝা যায়। আর অবধারিতভাবেই তার মুখে উঠে আসে লালনের জীবন এবং জীবন দর্শনের কথা।


এই মানুষগুলোই প্রকৃত বাউল সাধক যারা শুধুমাত্র নিজেদের কল্যাণের জন্য চিন্তা না করে সমগ্র মানবজাতির কথা চিন্তা করে যাচ্ছেন। কিন্তু আজ বাউলদের গান, সুর, দর্শন আর তাদের ভাবের বাণিজ্যিকীকরণ করে অনেকেই আর্থিক ভাবে লাভবান হচ্ছেন কিন্তু বাউলদের ঘরের খোঁজ কেউ রাখেন না। এরকম বাণিজ্য করা বহুলোক ও প্রতিষ্ঠান এই কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে কোন বাউলদের খোঁজ নেননি। এতে বুঝা যায় যে, তারা বাউলদেরকে নিয়ে শুধু বাণিজ্য করেছেন কিন্তু তাদের দর্শন কিছুই বুঝেননি, ধারণ করেননি কিংবা বুঝতে চাননি।

বর্তমান যুগে বাউল গান আর বাউল দর্শন শুধু সাধনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখন সেটা শহুরে মানুষদের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার ফলে বাউল জীবনের যে দর্শন সেটার দেখা পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। লালন তার সঙ্গীত রচনায় কুষ্টিয়ার আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেছিলেন যার সন্ধান পাওয়া যায় প্রকৃত বাউলদের গায়কিতে কিন্তু বর্তমানের আধুনিক শহুরে বাউলদের গাওয়া বাউল সঙ্গীত একেবারে শুদ্ধ বাংলায়। তারা হয়তো জানেও না যে আসল শব্দ কোনটি ছিল।

বাউলেরা হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে মরমী ও আধ্যাত্মবাদী। মুসলমান বাউলদের উপর সূফী প্রভাব পড়ায় তারা বিশেষভাবে তত্ত্বান্বেষী। তারা সচেতনভাবে নিজেকে জানার ভিতর দিয়ে আল্লাহকে জানতে চায়।

লালন এক সিদ্ধ বাউল। অন্তর্দৃষ্টির সাহায্যে তিনি তত্ত্বজ্ঞ হন। লালন ফকির সাধনায় সিদ্ধি লাভ করে তত্ত্বজ্ঞ হয়ে উঠেন বলে জীবন ও জগতের পরিচিত পরিবেশ সম্পর্কে গভীর ধ্যান-ধারণা জাত উপলব্ধির কথা সহজ সাবলীল ভঙ্গিতে বলতে পারতেন। তার কাছে মানুষই সবচেয়ে বড়। বাউলেরা মানুষকে পূজা করেন না কিন্তু মানুষকে জানাই তার সবচেয়ে বড় সাধনা। বাউল খোদাকে ছেড়ে খোদার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষকে ভজে তার রহস্য উদ্ঘাটনে ব্যাপৃত। তারা সে রহস্য উদঘাটন কইরেন এ দেহ সাধনার মধ্য দিয়ে। তাদের মতে যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে, তা আছে দেহ ভাণ্ডে। দেহকে জরিপ করেই তারা তাদের দেহের অধিকারী মনের মানুষ মনের মাঝে অন্বেষণ করেন।


একজন রব ফকির যিনি সারাজীবন লালনের তথা মানুষের হিতসাধনের সাধনা করে নিভৃতে মৃত্যুবরণ করেন। বাউল রব ফকিরের ব্যক্তিগত জীবন পাঠ করলে পরিষ্কারভাবে যা বুঝা যায় সেটা হচ্ছে একজন বাউল সাধকের জীবন হলো অনাড়ম্বর জীবন। তিনি যে মাপের বাউল সাধক ছিলেন, যদি উনি চাইতেন তাহলে জাগতিক জশ, খ্যাতি ও ধনসম্পদ অনেক কিছুই অর্জন করতে পারতেন কিন্তু উনি সেগুলো না করে নিজেকে জাগতিক মহামায়া থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন আর নিবিষ্ট মনে করে চলেছেন বাউল সাধনা।


শাস্ত্রীয় সংগীতের সুর খেলা করত তার দোতারায়। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দোতারা বাজিয়ে গান করেছেন। আমৃত্যু লালনের তত্ত্বজ্ঞান ও নিগূঢ় কথা গানে গানে প্রচার করে গেছেন দুই বাংলায়ই সমান জনপ্রিয় এই শিল্পী। লালনের অসংখ্য গান তিনি গেয়ে বেড়িয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় বিভিন্ন টিভিতে গান গেয়ে শ্রোতাদের মন জয় করেছেন তিনি। রব ফকির ভারত, নেপাল, লন্ডন, শ্রীলংকা, সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের বহু দেশে গান করেছেন। বর্তমান প্রজন্মের সাহাবুল বাউল, আনুশেহ আনাদিল, শাহানাজ বেলী, শাহানা বাজপেয়ী, অর্ণবসহ অনেককেই হাতে কলমে গান শিখিয়েছিলেন রব ফকির। ১৯১৬ সালের ৭ আগস্ট, বাংলা ২৩ শে শ্রাবণ ১৪২৩, মধ্যরাতে শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভুগে এই লালন সাধক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

লেখক: রুবেল সাইদুল আলম, ডেপুটি কমিশনার, বাংলাদেশ কাস্টমস

প্রচার বিমুখ নিভৃতচারী লালন সাধক রব ফকিরের জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

 রুবেল সাইদুল আলম 
২০ জানুয়ারি ২০২১, ১১:০৮ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ
বাউল আব্দুর রব ফকির
বাউল আব্দুর রব ফকির

লালনকে নতুন করে চিনতে শেখানো রব ফকির ছিলেন লালনের মতই বাউলসাধক। ১৯৫৫ সালের ২০ জানুয়ারি কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার মিনিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন বাউল আব্দুর রব ফকির। তার বাবার নাম সিরাজ জোয়ার্দার। রব ফকিরের মা ছিলেন ওই গ্রামের বিখ্যাত ধাত্রী। তার একছেলে, দুই মেয়ে। ছেলের নাম পরান। রব ফকিরের পাড়াকে ফকির পাড়াও বলা হয়। 

ফকির পাড়ার নামকরণ নিয়ে শুরুতে ধোঁয়াশা থাকলেও পরে বুঝা গেলো ওই পাড়ার প্রায় সবাই ফকির লালন শাহের অনুসারী বাউল; তাই এমন নামকরণ। ছোটবেলা থেকেই রব ফকির সাদা পাঞ্জাবি পরতেন। তার বাবা সাধুগুরুদের ভালোবাসতেন। ছোট বেলায় ১৯৭২ সালের দিকে বাবা সিরাজ জোয়ার্দারের হাত ধরে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালন সাঁইয়ের আখড়ায় যেতেন। বাবার সাইকেলে চড়ে রব লালনের আখড়ায় যেতেন। সেখানেই ওস্তাদের সাথে পরিচয় ভাব বিনিময়। আব্দুর রহিম বয়াতি ছিলেন রব ফকিরের গুরু। রব ফকির ছোটবেলা থেকেই সাদা পাঞ্চাবি গায়ে সাইকেল চালিয়ে আঁখরাবাড়ীতে আসতেন, পিঠে ঝুলানো থাকতো সালু কাপড়ে মোড়ানো দোতারা। 

রব ফকির ছিলেন একজন সুরস্রষ্টা। কালো রংয়ের খর্বকায় রব ফকির গলায় দোতারা ঝুলিয়ে অপূর্ব ভঙ্গিমায় গান করতেন। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের কাছে রব ফকির কে? এমন একটি প্রশ্ন মনের ভেতর উঁকি দিতে পারে। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এ প্রজন্ম রব ফকিরকে না চেনারই কথা। কারণ তিনি ছিলেন প্রচার বিমুখ নিভৃতচারী একজন মানুষ। রব ফকির শারীরিকভাবে ছিলেন শীর্ণকায়। গ্রামের মানুষদের সাথে তেমন একটা মেলামেশা করতেন ন। কাজ করতেন কুষ্টিয়া সুগারমিলে। কাজের বাইরে সারাক্ষণ দোতরা নিয়ে পরে থাকতেন। ওনার  কথাবার্তা ছিল অনেক ধীরস্থির এবং নীচুস্বরের।


রব ফকিরের বাবা সিরাজ জোয়ার্দার ছিলেন কুষ্টিয়া সুগার মিলের শ্রমিক। পিতার কর্মসূত্রে রব ফকির কুষ্টিয়া সুগার মিলে চাকরি শুরু করলে পরিচয় হয় উনার আরেক গুরুর সাথে। তার নামও ছিল রব ফকির। রব ফকিরের ভাষায়- লালন শাহ সবসময় কর্মকে ভালবেসেছেন। কর্মহীন জীবনে কোন ভজন সাধন নাই। কর্ম ছাড়া জীবন ছন্নছাড়া। ধর্মের একটা অংশ হচ্ছে কর্ম। কর্ম শেষে অবসর সময়ে যতটুকু সাধনা করা যাবে সেই সময়টুকুই সাধনার কাজে ব্যস্ত থাকতে হবে। 

তিনি আরও বলেন, যারা লালন সাঁইজির মুরিদ, তাদের কোন জাতি ভেদাভেদ নাই। সব মানুষই তাদের কাছে মানুষ। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট প্রকৃতি দেখে যেন আমরা সৃষ্টিকর্তাকে ভুলে না যাই। যারা আধ্যাত্মিক গান সম্পর্কে আগ্রহী, এক-আধটু খবর রাখেন, তাদের কাছে রব ফকির পরিচিত নাম। লালন-পরবর্তী সময়ে যারা লালনের ভাবাদর্শে দীক্ষিত হয়ে বিশ্বব্যাপী লালনের বানীকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে রব ফকির অন্যতম। লালনের গান নতুনভাবে উপস্থাপন করে সমাজে ছড়িয়ে দিয়ে এক অহিংস সমাজ গড়তে চেয়েছিলেন। 

ছোটবেলা থেকে বাবা সিরাজ জোয়ার্দারের হাত ধরেই লালনের আখড়ায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন। সেখানেই তিনি লালনের ভাবাদর্শে প্রভাবিত হন। চর্চা আরম্ভ করেন লালনসংগীত। কালো রংয়ের খর্বকায় রব ফকির গলায় দোতারা ঝুলিয়ে অপূর্ব ভঙ্গিমায় গান করতেন। একসময়ে তিনি লালনের ভাবাদর্শে এতটাই প্রভাবিত হন যে তিনি বলতেন- ‘আমার দেহটাই দোতারা/লালনের গানই আমার ধর্ম।’ তিনি আরও বলতেন, চোখ বুজলেই দোতারার সুর শুনতে পাই। দোতারার সুরের সঙ্গে দেহের সুর মিশে গেছে। যত দিন বাঁচব, দোতারার সুর বাজিয়েই বাঁচব।

রব ফকির দোতারা বাজাতে পারদর্শী ছিলেন। সুর নিয়ে খেলা করতেন প্রতিনিয়ত। তিনি যখন গলায় দোতারা ঝুলিয়ে মঞ্চে উঠতেন, তখন তার দোতারার সুরে মানুষ নিজেকে অন্য জগতে আবিষ্কার করত। দোতারা বাজানোর তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। তখন বেতারে আব্বাসউদ্দিনের গান শুনে দোতারা বাজানোর প্রতি আকৃষ্ট হন। বাজার থেকে কিনে আনেন দোতারা। সেই দোতারায় তোলা সুর তার কাছে ভালো লাগত না। তাই নিজেই তৈরি করেন দোতারা। কাঁঠাল কিংবা নিমগাছের কাঠ এবং ছাগল অথবা গুই সাপের চামড়া আর পিতলের প্লেট দিয়ে মনের মাধুরী মিশিয়ে তৈরি করতেন দোতারা। 

দোতারার তারগুলো পিতল বা রেশমে পাকানো সুতা দিয়ে তৈরি করতেন। তার পর তিনি দোতারার মাধ্যমে এমন সব সুর সৃষ্টি করেছেন, যা তাকে দোতারা জাদুকর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। লালন, রবীন্দ্র, নজরুল— কোনো সংগীতই তার দোতারার সুর থেকে বাদ যায়নি। রব ফকির গুরুর গুরুর কাছে লালনের দেহতত্ত্ব দর্শনসহ বিভিন্ন বিষয়ে তালিম দেন। খলিসাকুণ্ডিতে তার আখড়ায় চলত তালিম দেওয়ার কাজ। ওস্তাদের কাছ থেকে লালনের যে দর্শন তিনি অন্তরে গেঁথে নিয়েছেন, তা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অন্তরে ধারণ করেছেন। ছড়িয়ে দিয়েছেন লালনের বাণী সর্বত্র।


মানুষ হিসেবে রব ফকির ছিলেন স্বল্পভাষী। কথা প্রায় বলতেনই না। কিন্তু দোতারা হাতে সুরের মঞ্চে লালন সাধক রব ফকির ছিলেন অনবদ্য এক শিল্পী। লালনের গানকে তিনি অন্তরের খোরাক করে নিয়েছিলেন।পুরোদমে বাউল সাধনায় মগ্ন থাকতেন রব ফকির। নিভৃতচারী এই বাউলের সাথে আমার সর্বশেষ কথা হয় ১৯১৬ সালে (তার মৃত্যুর বছর) বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটের একটি অনুষ্ঠানে। আলাপরিতায় উনি বলে যাচ্ছিলেন ওনার সাধনার কথা, যাপিত জীবনের কথা, দোতরার কথা, সাধু সঙ্গের কথা, বাউল সাধক হয়ে ওঠার গল্প। তার কথাগুলো ছিল অনেক বেশি আধ্যাত্মিক ও তথ্যবহুল। 

তিনি বলেন, মানুষের মাথায় লাঠি মেরে কিছু হবে না। মানুষকে ভালবেসেই সবকিছু করতে হবে। এজন্য একজন মানুষগুরু দরকার। জীবনে একজন শিক্ষাগুরু থাকা প্রয়োজন। বাউল আসলে অনেক সাধনার পর হওয়া যায়। আর একজন বাউলের কর্তব্য বা করণীয় কি সেটাও উনার বক্তব্য থেকে পরিষ্কার বুঝা যায়। আর অবধারিতভাবেই তার মুখে উঠে আসে লালনের জীবন এবং জীবন দর্শনের কথা।


এই মানুষগুলোই প্রকৃত বাউল সাধক যারা শুধুমাত্র নিজেদের কল্যাণের জন্য চিন্তা না করে সমগ্র মানবজাতির কথা চিন্তা করে যাচ্ছেন। কিন্তু আজ বাউলদের গান, সুর, দর্শন আর তাদের ভাবের বাণিজ্যিকীকরণ করে অনেকেই আর্থিক ভাবে লাভবান হচ্ছেন কিন্তু বাউলদের ঘরের খোঁজ কেউ রাখেন না। এরকম বাণিজ্য করা বহুলোক ও প্রতিষ্ঠান এই কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে কোন বাউলদের খোঁজ নেননি। এতে বুঝা যায় যে, তারা বাউলদেরকে নিয়ে শুধু বাণিজ্য করেছেন কিন্তু তাদের দর্শন কিছুই বুঝেননি, ধারণ করেননি কিংবা বুঝতে চাননি।  

বর্তমান যুগে বাউল গান আর বাউল দর্শন শুধু সাধনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখন সেটা শহুরে মানুষদের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার ফলে বাউল জীবনের যে দর্শন সেটার দেখা পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। লালন তার সঙ্গীত রচনায় কুষ্টিয়ার আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেছিলেন যার সন্ধান পাওয়া যায় প্রকৃত বাউলদের গায়কিতে কিন্তু বর্তমানের আধুনিক শহুরে বাউলদের গাওয়া বাউল সঙ্গীত একেবারে শুদ্ধ বাংলায়। তারা হয়তো জানেও না যে আসল শব্দ কোনটি ছিল। 

বাউলেরা হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে মরমী ও আধ্যাত্মবাদী। মুসলমান বাউলদের উপর সূফী প্রভাব পড়ায় তারা বিশেষভাবে তত্ত্বান্বেষী। তারা সচেতনভাবে নিজেকে জানার ভিতর দিয়ে আল্লাহকে জানতে চায়। 

লালন এক সিদ্ধ বাউল। অন্তর্দৃষ্টির সাহায্যে তিনি তত্ত্বজ্ঞ হন। লালন ফকির সাধনায় সিদ্ধি লাভ করে তত্ত্বজ্ঞ হয়ে উঠেন বলে জীবন ও জগতের পরিচিত পরিবেশ সম্পর্কে গভীর ধ্যান-ধারণা জাত উপলব্ধির কথা সহজ সাবলীল ভঙ্গিতে বলতে পারতেন। তার কাছে মানুষই সবচেয়ে বড়। বাউলেরা মানুষকে পূজা করেন না কিন্তু মানুষকে জানাই তার সবচেয়ে বড় সাধনা। বাউল খোদাকে ছেড়ে খোদার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষকে ভজে তার রহস্য উদ্ঘাটনে ব্যাপৃত। তারা সে রহস্য উদঘাটন কইরেন এ দেহ সাধনার মধ্য দিয়ে। তাদের মতে যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে, তা আছে দেহ ভাণ্ডে। দেহকে জরিপ করেই তারা তাদের দেহের অধিকারী মনের মানুষ মনের মাঝে অন্বেষণ করেন।


একজন রব ফকির যিনি সারাজীবন লালনের তথা মানুষের হিতসাধনের সাধনা করে নিভৃতে মৃত্যুবরণ করেন। বাউল রব ফকিরের ব্যক্তিগত জীবন পাঠ করলে পরিষ্কারভাবে যা বুঝা যায় সেটা হচ্ছে একজন বাউল সাধকের জীবন হলো অনাড়ম্বর জীবন। তিনি যে মাপের বাউল সাধক ছিলেন, যদি উনি চাইতেন তাহলে জাগতিক জশ, খ্যাতি ও ধনসম্পদ অনেক কিছুই অর্জন করতে পারতেন কিন্তু উনি সেগুলো না করে নিজেকে জাগতিক মহামায়া থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন আর নিবিষ্ট মনে করে চলেছেন বাউল সাধনা।


শাস্ত্রীয় সংগীতের সুর খেলা করত তার দোতারায়। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দোতারা বাজিয়ে গান করেছেন। আমৃত্যু লালনের তত্ত্বজ্ঞান ও নিগূঢ় কথা গানে গানে প্রচার করে গেছেন দুই বাংলায়ই সমান জনপ্রিয় এই শিল্পী। লালনের অসংখ্য গান তিনি গেয়ে বেড়িয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় বিভিন্ন টিভিতে গান গেয়ে শ্রোতাদের মন জয় করেছেন তিনি। রব ফকির ভারত, নেপাল, লন্ডন, শ্রীলংকা, সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের বহু দেশে গান করেছেন। বর্তমান প্রজন্মের সাহাবুল বাউল,  আনুশেহ আনাদিল, শাহানাজ বেলী, শাহানা বাজপেয়ী, অর্ণবসহ অনেককেই হাতে কলমে গান শিখিয়েছিলেন রব ফকির। ১৯১৬ সালের ৭ আগস্ট, বাংলা ২৩ শে শ্রাবণ ১৪২৩, মধ্যরাতে শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভুগে এই লালন সাধক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

লেখক: রুবেল সাইদুল আলম, ডেপুটি কমিশনার, বাংলাদেশ কাস্টমস