ইতালিতে শীতল বসন্তের রমজান, অপেক্ষা শুধু ঈদ
জমির হোসেন, ইতালি থেকে
প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৬, ০৫:১১ এএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইতালিতে এ বছর ১৮ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) থেকে পবিত্র রমজান শুরু হয়েছে। প্রতি বছরের মতো এবারও রোজা শুরুর তারিখ নিয়ে ‘ইতালীয় ইসলামিক কালচারাল সেন্টার’ এবং ‘হিলাল কমিটি’র মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য দেখা দিয়েছিল।
এক পক্ষ শাবান মাস ৩০ দিন পূর্ণ হওয়ার পক্ষে থাকলেও, হিলাল কমিটির ঘোষণা অনুযায়ী সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে বুধবার থেকেই ইতালিতে প্রবাসীরা সিয়াম সাধনা শুরু করেন। এই তর্কের কারণে কিছু মসজিদে প্রথম রাতে তারাবিহ না হলেও পরদিন থেকে তা স্বাভাবিক হয়ে যায়। মূলত ইতালিতে সর্বজনগ্রাহ্য কোনো কেন্দ্রীয় চাঁদ দেখা কমিটি না থাকায় প্রতি বছরই এমন সাময়িক বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
ইতালিতে `এক টুকরো বাংলাদেশ'
ইতালিতে বর্তমানে প্রায় দুই লাখেরও বেশি বাংলাদেশি বসবাস করছেন। কর্মব্যস্ততার মাঝেও এখানে রোজার আমেজ চোখে পড়ার মতো। প্রথম রমজানের আগেই গ্রোসারি ও সুপারশপগুলোতে কেনাকাটার ধুম পড়ে যায়। বিশেষ করে রোমে বাংলাদেশিদের আধিক্য বেশি হওয়ায় মনে হয় যেন প্রবাসের বুকে এটি `অঘোষিত এক টুকরো বাংলাদেশ'।
দুই দশকের রেকর্ড ভাঙা `শীতল রোজা'
এবারের রমজান ইতালিতে প্রায় ১৯-২০ বছরের রেকর্ড ভেঙেছে। গত কয়েক বছর (২০১০-২০১৮) আমাদের প্রখর গ্রীষ্মে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা রোজা রাখতে হয়েছে। প্রচণ্ড গরমে শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ত। কিন্তু ২০২৪ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত রোজা পর্যায়ক্রমে শীত ও বসন্তের দিকে চলে আসায় আবহাওয়া এখন বেশ সহনীয়। প্রায় দুই দশক পর রোজা আবার ফেব্রুয়ারি-মার্চে ফিরে আসায় দিনের দৈর্ঘ্য কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ ঘণ্টায়। এই শীতল আবহাওয়া ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য বয়ে এনেছে বিশেষ প্রশান্তি।
কর্মব্যস্ততা ও ইফতারের আনন্দ
ইতালিতে একেকজনের কাজের সূচি একেক রকম। যারা রেস্টুরেন্ট সেক্টরে কাজ করেন, তাদের জন্য রোজা রাখা কিছুটা সহজ হলেও যারা ডাবল শিফটে কাজ করেন, তাদের জন্য এটি বেশ কষ্টসাধ্য। বিশেষ করে যারা ভ্রাম্যমাণ দোকান (বাংকার) তারা সেহরি খেয়ে ভোরে কাজে বের হওয়া এবং কাজ শেষে ফেরার পথেই ইফতারের সময় হয়ে যাওয়া—এমন সংগ্রাম অনেক শ্রমজীবী প্রবাসীর নিত্যদিনের সঙ্গী।
তবে কষ্টের মাঝেও আনন্দের কমতি নেই। ইতালির প্রতিটি মসজিদে,মসজিদ কমিটির উদ্যোগে ৪শ থেকে ৫শ মানুষের ইফতারের আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন দেশের মুসলিমদের সাথে একই কাতারে বসে ইফতার করা প্রবাসীদের জন্য এক অনন্য পাওয়া। যারা পরিবার ছাড়া থাকেন, তাদের জন্য বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টগুলো ভরসা। সেখানে পেঁয়াজু, আলুর চপ, বেগুনিসহ সব দেশি ইফতারি পাওয়া যায়।
খোলা মাঠে ইফতার
এ বছর রোমে ‘ইল ধূমকেতু অ্যাসোসিয়েশন’ খোলা মাঠে এক বিশাল ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে। বিভিন্ন জেলাভিত্তিক সংগঠনের সহযোগিতায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে কয়েকশ প্রবাসীর সরব উপস্থিতি ছিল। বিশেষ করে ৮ মার্চ ‘বিশ্ব নারী দিবস’ হওয়ায় ইফতারে নারীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
আয়োজক নুরে আলম সিদ্দিকী বাচ্চু জানান, তারা কেবল মুসলিম নয়, স্থানীয় গির্জার ফাদার, মন্দিরের পুরোহিত এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদেরও এই আয়োজনে আমন্ত্রণ জানান। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ইতালীয় প্রশাসনের কাছে আমাদের ধর্মীয় সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সহাবস্থানের চিত্রটি তুলে ধরা। খোলা মাঠে একসাথে এত মানুষের ইফতার করার দৃশ্য স্থানীয় ইতালীয়দের মাঝেও বেশ কৌতূহল ও প্রশংসার জন্ম দেয়।
ইতালীয়দের মাঝে ইসলামের প্রতি আগ্রহ
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি, আমার কর্মস্থলে আমিই একমাত্র বাংলাদেশি। কিন্তু ইতালীয় সহকর্মীরা রোজা শুরুর অনেক আগে থেকেই জানতে চান—কবে থেকে রোজা শুরু হচ্ছে। তারা আমাদের ঈদ সম্পর্কেও বেশ অবগত। এই যে আমাদের সংস্কৃতি ও ধর্মের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা এবং আগ্রহ, তা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের ও আনন্দের।
রহমতের ১০ দিন এবং মাগফেরাতের ৯ দিন পার হয়ে ইতালিতে ইতিমধ্যে ১৯তম রোজা শেষ হয়েছে (৮ মার্চ)। চোখের পলকেই হয়তো বাকি দিনগুলো কেটে যাবে। নাজাতের দিনগুলো শেষে ঈদের চাঁদ উঠলে বিশ্ব মুসলিমের সাথে ইতালির প্রবাসীরাও মেতে উঠবেন প্রাণের উৎসবে।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ইউরোপ বাংলাদেশ প্রেস ক্লাব।
