Logo
Logo
×
   

পরবাস

ফিরে দেখা ৩৬ জুলাই

প্যারিসের আকাশে বাংলাদেশের পতাকা: জুলাই বিপ্লবের আন্তর্জাতিক প্রতিধ্বনি

Icon

হাসান ইলিয়াছ তানিম, প্যারিস (ফ্রান্স) থেকে

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬, ০৪:০০ পিএম

প্যারিসের আকাশে বাংলাদেশের পতাকা: জুলাই বিপ্লবের আন্তর্জাতিক প্রতিধ্বনি

ফ্রান্সের ইতিহাসে রিপাবলিক চত্বর যেমন সাধারণ মানুষের দাবি ও প্রতিবাদের প্রতীক, তেমনি সেদিন এটি হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের পরিবর্তনের প্রত্যাশায় একত্রিত মানুষের মিলনস্থল।

প্যারিসের ঐতিহাসিক রিপাবলিক চত্বর। ফ্রান্সের বিপ্লব, নাগরিক আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই স্থানটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রত্যক্ষ করেছিল এক ভিন্ন দেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। সেদিন ফ্রান্সের রাজধানীর এই চত্বরে বাংলাদেশের পতাকা হাতে জড়ো হয়েছিলেন হাজারো প্রবাসী বাংলাদেশি। তাদের কণ্ঠে ছিল স্লোগান, চোখে ছিল প্রত্যাশা, আর মনে ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা আবেগ।

ঢাকা থেকে প্যারিসের দূরত্ব প্রায় সাড়ে চার হাজার মাইল। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টের উত্তাল ৩৬ দিনে সেই দূরত্ব যেন হারিয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশের রাজপথে যে আন্দোলন চলছিল, তার প্রতিটি খবর, প্রতিটি পরিবর্তন এবং প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত পৌঁছে যাচ্ছিল প্যারিসের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে।

সেই সময় প্যারিসের অনেক বাংলাদেশির দিন শুরু হতো দেশের খবর দিয়ে, আর রাত শেষ হতো নতুন কোনো আপডেটের অপেক্ষায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং স্বজনদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করেই তারা অনুসরণ করছিলেন বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ।

জুলাইয়ের শুরু থেকেই ফ্রান্সের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে আন্দোলন নিয়ে সক্রিয়তা বাড়তে থাকে। শিক্ষার্থী, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ নিজ নিজ জায়গা থেকে সংহতি প্রকাশ করেন। দেশের বাইরে থেকেও দেশের মানুষের পাশে থাকার তাগিদ থেকেই অনেকে বিভিন্ন কর্মসূচিতে যুক্ত হন।

প্যারিস ছাড়াও ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশিদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ এবং সংহতি কর্মসূচি। রেন, গ্রেনোবল, লিওঁ, লিল ও নন্তসহ বিভিন্ন শহরের প্রবাসীরাও বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের অবস্থান জানান।

এই সময় প্রবাসীদের একটি অংশ শুধু রাজপথের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকেননি। কেউ তথ্য সংগ্রহ ও প্রচারে কাজ করেছেন, কেউ আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন, কেউ আবার সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।

৫ আগস্টের কর্মসূচি ঘিরে প্যারিসে আগে থেকেই প্রস্তুতি চলছিল। ঐতিহাসিক রিপাবলিক চত্বরকে বেছে নেওয়া হয়েছিল সমাবেশের স্থান হিসেবে। ফ্রান্সের ইতিহাসে এই চত্বর যেমন সাধারণ মানুষের দাবি ও প্রতিবাদের প্রতীক, তেমনি সেদিন এটি হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের পরিবর্তনের প্রত্যাশায় একত্রিত মানুষের মিলনস্থল।

বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের সময়ের ব্যবধান ছিল চার ঘণ্টা। ঢাকায় যখন ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছিল, প্যারিসে তখন শুরু হচ্ছিল সকাল। প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে সেই সকাল ছিল অন্য সব দিনের চেয়ে আলাদা। অনেকেই ঘুম থেকে উঠেই দেশের খবর জানতে শুরু করেন।

কেউ টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখছিলেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপডেট অনুসরণ করছিলেন, আবার কেউ অপেক্ষা করছিলেন পরিচিতজনদের ফোনের জন্য। বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি ছিল একটি নতুন সম্ভাবনার অপেক্ষা।

দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর প্যারিসের প্রস্তুত করা কর্মসূচির আবহও বদলে যায়। প্রতিবাদের উদ্দেশ্যে যে জমায়েতের আয়োজন করা হয়েছিল, তা রূপ নেয় বিজয় ও স্বস্তির এক সমাবেশে।

স্থানীয় সময় বিকালে রিপাবলিক চত্বরে জড়ো হতে শুরু করেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। কেউ এসেছিলেন জাতীয় পতাকা হাতে, কেউ প্ল্যাকার্ড নিয়ে। কেউ স্লোগানে অংশ নেন, কেউ আবার দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর সেই মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে সেখানে উপস্থিত হন।

তরুণ সমাজকর্মী ওবায়দুল্লাহ কয়েস এবং সমাজকর্মী শহিদুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত ওই সমাবেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দশ হাজার মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় এই বিজয় সমাবেশ। বিএনপিসহ জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মী এবং সাধারণ প্রবাসী বাংলাদেশিরা এতে অংশ নেন।

সেদিন রিপাবলিক চত্বরের দৃশ্য ছিল বাংলাদেশের একটি প্রতিচ্ছবি। রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয়ের ভিন্নতা থাকলেও অনেক মানুষ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন একটি পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে।

তবে প্যারিসের জুলাই অধ্যায় কোনো একক ব্যক্তির গল্প নয়। এর পেছনে ছিলেন অসংখ্য মানুষ, যারা কখনো সামনে থেকে, আবার কখনো নেপথ্যে থেকে কাজ করেছেন। সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, সংগঠক এবং সাধারণ প্রবাসীদের সম্মিলিত অংশগ্রহণেই তৈরি হয়েছিল এই প্রবাসী অধ্যায়।

এই সময় প্যারিসের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহের আরেকটি বিশেষ যোগসূত্র তৈরি হয় অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতির কারণে। ২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিক উপলক্ষে তিনি ফ্রান্সের রাজধানীতে অবস্থান করছিলেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়ে তার প্যারিস অবস্থান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের আগ্রহের একটি বিষয় হয়ে ওঠে।

পরবর্তীতে ৮ আগস্ট অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্যারিস থেকে ঢাকায় ফিরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনার সঙ্গেও প্যারিসের একটি বিশেষ সম্পর্ক তৈরি হয়।

৫ আগস্টের পরদিন প্যারিসে বাংলাদেশ দূতাবাসকে ঘিরেও নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিভিন্ন পক্ষের মানুষ সেখানে উপস্থিত হন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা এবং স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়েছে, প্রবাসীরা শুধু দেশের অর্থনৈতিক অংশীদার নন। সংকটের সময়ে তারা তথ্য, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, গণমাধ্যম, মানবাধিকার এবং জনমত গঠনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

প্যারিসের রিপাবলিক চত্বরে বাংলাদেশের পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর সেই মুহূর্ত তাই শুধু একটি সমাবেশের ছবি নয়। এটি ছিল এমন এক সময়ের দলিল, যখন হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেছিলেন।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .