সুশিক্ষার জন্য শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পরিবর্তন করা দরকার

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ১১ জানুয়ারি ২০১৯, ১৫:২১ | অনলাইন সংস্করণ

সচারাচর

বিশ্বের নাম করা বড় বড় কোম্পানীতে একটি জিনিস সচারাচর ঘটে থাকে তা হলো রি-অর্গানাইজেশন। কোম্পানী যখন শেয়ার হোল্ডারদের কথা দিয়ে একটি নির্দিষ্ট লাভের কথা বলে এবং যখন তা ডেলিভারি দিতে ব্যর্থ হয় ঠিক তখন তারা স্বল্পমেয়াদী সমাধান হিসাবে রি-অর্গানাইজেশন করে থাকে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় সমস্যার সমাধান না করে বা মূল কারণ না খুঁজে শ্রমিকদের এবং পুরো কোম্পানীর মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং শ্রমিক ছাঁটাই থেকে শুরু করে ম্যানেজমেন্টের রদবদল করে থাকে কোম্পানী টিকিটে রাখার তাগিদে।

জাপান পৃথিবীর মধ্যে বেশি পারদর্শি ‘গুঁড টু গ্রেট কনসেপ্টে’। তারা তাদের কাজে সব সময় বিশ্বাস করে ‘টু ডু রাইট ফ্রম মি -কনসেপ্টে’। যার কারণে তারা দিনে দিনে পৃথিবীর সেরাদের মধ্যে সৃষ্ট হতে চলেছে। ছোটবেলা পড়েছিলাম জুতা আবিষ্কার কবিতা যা আজও মনে রয়েছে। তার কয়েকটি লাইন আজ না লিখলেই নয়। কহিলা হবু, শুন গো গোবুরায়, মলিন ধূলা লাগিবে কেন পায়, ধরণী মাঝে চরণ-ফেলা মাত্র? তোমরা শুধু বেতন লহ বাঁটি, রাজার কাজে কিছুই নাহি দৃষ্টি। রাজ্যে মোর একি এ অনাসৃষ্টি! শীঘ্র এর করিবে প্রতিকার নহিলে কারো রক্ষা নাহি আর। তখন মন্ত্রী বলে -যদি না ধুলা লাগিবে তব পায়ে, পায়ের ধুলা পাইব কী উপায়ে!

শুনিয়া রাজা ভাবিল দুলি দুলি, কহিল শেষে, কথাটা বটে সত্য--কিন্তু আগে বিদায় করো ধুলি, ভাবিয়ো পরে পদধুলির তত্ত্ব। তারপর নানা কাহিনী শেষে এল এক চামার-কুলপতি, কহিল এসে ঈষৎ হেসে বৃদ্ধ, বলিতে পারি করিলে অনুমতি, নিজের দুটি চরণ ঢাকো, তবে ধরণী আর ঢাকিতে নাহি হবে।

রাজার পদ চর্ম-আবরণে, ঢাকিল বুড়া বসিয়া পদোপান্তে। সেদিন হতে চলিল জুতা পরা এবং সমস্যার হলো সমাধাণ। এখন প্রশ্ন কী ভাবে আমরা পেতে পারি কলুষিত মুক্ত শিক্ষা প্রশিক্ষণ? কে দেবে আমাদের সমাধাণ? বাংলাদেশের শিক্ষার করুণ অবনতির পেছনে রয়েছে অনেক যুক্তি। দুর্বল শিক্ষা প্রশিক্ষণের কারণে জাতি আজ অন্ধকারে আচ্ছন্ন।

নতুন মন্ত্রী প্রশাসনের রদ বদল করা হয়েছে। মনে হচ্ছে নতুন বোতলে পুরনো বিষ বা পুরনো বোতলে নতুন বিষ। যাই হোক না কেন বিষ রয়েছে বোতলে সে বিষয়ে আমরা সবাই অবগত। কী ভাবে সম্ভব এ বিষ সরানো!

এটাই হোক নতুন শিক্ষামন্ত্রীর মূল লক্ষ্য। শরীর যখন ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত হয় এবং তা যেমন সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে ঠিক তেমনি করে শিক্ষায় ঢুকেছে কলুষতা। সচারচার আমরা যখন সমস্যা কি এবং তা সনাক্ত করতে সক্ষম হই তখন সমস্যা আর সমস্যা থাকে না।

কিভাবে তার সমাধান করতে হবে সেটাই হয়ে দাড়ায় সমস্যা। পুরো শিক্ষাঙ্গনে দূর্নীতি, নকল একেবারে শুরু থেকে শেষ মানে স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত। কথা উঠতে পারে শিক্ষার্থীরা ২৪ ঘন্টার মধ্যে মাত্র ৩/৪ ঘন্টা তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাটায়। বাকী সময় তারা তাদের পরিবার ও সমাজে কাটায় এবং তারা সেখানেও শিক্ষা ও নানা অভিজ্ঞতা অর্জন করে যার মধ্যে কুশিক্ষাও থাকে। সমাজ দূর্নীতিগ্রস্থ হলে শিক্ষার্থীরা তার দ্বারা অবশ্যই প্রভাবিত হবে।

সেটা ঠেকানোর কাজ করবে রাষ্ট্র ও রাজনীতিবিদরা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠরত শিক্ষার্থীরা এবং শিক্ষকরা অনৈতিক ও দূর্নীতিতে জড়িত তাদের অধিকাংশই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তার মানে এটা সাইক্লিক আকারে ঘুরছে আমাদের সমাজে।

দূর্নীতি, অরাজকতা তিলে তিলে গড়ে উঠেছে সমাজে এবং মনুষত্ব্যের অবক্ষয় শুরু হয়েছে আমাদের মনে, প্রাণে, ধ্যানে ও ধানে। যার ফলাফল গড়ে উঠছে সমাজের চারিপাশে। মিথ্যা, নকল ও দূর্রলীতির মধ্যদিয়ে গড়ে উঠা শিক্ষা, যা দিয়ে শুরু চাকরির জীবন। চাকরিতে ঢুকতে ঘুষ বা ধরাধরি করা। প্রমোশনে ধরাধরি বা ঘুষ দেওয়া, কারো জন্য কিছু করা বিনিময়ে ঘুষ নেয়া, তার মানে শুরু থেকে শেষ দূর্নীতির পদ্ধতি। আমার এই বিশ্লেষনে কি মনে হয়? হ্যাঁ দূর্বল এবং লো প্রফাইল শিক্ষা প্রশিক্ষণ পদ্ধতিই দায়ী পুরো দেশের শিক্ষার দূরাবস্থার জন্য।

কি করতে হবে ক্রমাগত ভাবে এর থেকে রেহায় পেতে হলে এটাই এখন কথা! উত্তর একটাই, তা হোল সুশিক্ষাই একমাত্র সমাধাণ এবং তা হতে হবে শুরু থেকে শেষ অর্থাৎ কিন্ডারগার্টেন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত। বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে সমস্ত স্তরের শিক্ষকদের একত্রিত করে কি শিক্ষা? কেমন ধরণের শিক্ষা? কি ভাবে শিক্ষা? বিষয়গুল নিয়ে সম্মিলিত ভাবে সর্বস্তরের শিক্ষকদের সমন্বয়ে আলোচনা করতে হবে। এখানে বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রির উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাসহ শিক্ষার্থীর বাবা-মা এবং শিক্ষামন্ত্রনালয়ের সমন্বয়ও ঘটাতে হবে। শুরু থেকে শেষ শিক্ষার গোলস এ অবজেক্টিভস্ হতে হবে এক এবং অভিন্ন।

শিক্ষাদানে ও গ্রহণে মজা সৃষ্টি করতে হবে। হেয়ার এ্যান্ড নাও কনসেপ্ট ব্যবহার করতে হবে যেন শিক্ষার্থী তার ধ্যানে ও জ্ঞানে মনযোগী হয়।

এ মুহুর্তে আমি একটি লেবু চিপে তার থেকে দুফোটা রস বের করে আমার মুখে দিয়েছি, পাঠক লেবুর কথা বলতেই, যে যেখানেই আছি না কেন তার জিহ্বাতে পানি আসতে বাধ্য হবে। কারণ লেবুর রস আমাদের ধ্যানে রয়েছে যা সহজে আকৃষ্ট করতে সাহায্য করে আমাদের ব্রেনে।

ঠিক এ লেবুর রসের মত করে শিক্ষকদেরকে শিক্ষা প্রদান করা শিখাতে হবে যাতে করে শিক্ষার্থী শিক্ষার মধ্যে মজা খুঁজে পায়। ‘লার্নিং ফ্রম লার্নার এবং লার্নিং বাই ডুইং কনসেপ্ট’ ব্যবহার করা শিখাতে হবে।

পড়াশোনার সঙ্গে ‘অন দি জব ট্রেনিংয়ের’ ব্যবস্থা করতে হবে। বড় বড় কলকারখানা ট্যুর, বিভিন্ন শিল্পকারখানা ট্যুর এসব পরিদর্শনে শিক্ষার্থীর মধ্য মটিভেশনের সৃষ্টি হবে, তখন তারা জানার জন্য শিখবে।

পরীক্ষার প্রশ্নেরধরণ পরিবর্তন করতে হবে যাতে করে হ্যাঁ বা না দিয়ে কিছু উত্তর না আসে। শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তির উন্নতিই হচ্ছে আসল শিক্ষা মনে রাখতে হবে। সর্বপরি মনে রাখতে হবে, এই তো সেদিনের কথা আমরা ব্যবহার করেছি পোস্ট অফিস, ব্যাংক বা ড্রাইভ-ইন পে। আজকের ডিজিটালের যুগে ব্যবহার করছি বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন যেমন গুগোল পে, এপেল পে, আইফোন পে বা সুইস পে ঘরে, রাস্থায় বা পথে বসে, টেকনোলজির দ্রুত উন্নতির কারণে।

পুরনো লেখাপড়ায় যদি নতুন মর্ডান টেকনোলজির সমন্বয় না থাকে, হবে কি সে শিক্ষা গ্রহণযোগ্য আজকের যুগে? বর্তমান যে শিক্ষা শিক্ষার্থীরা পাবে সেটাই হবে তাদের উপার্জন যা তারা বিক্রি করবে বাকি জীবনে।

এখন যেমন বাব-মার প্রচুর অর্থ ব্যয়ে শিক্ষা গ্রহণের পরেও চাকরি না পাওয়ার কারণে নতুন করে ঘুষ দিতে হয় চাকরি পেতে। স্বাভাবিক ভাবেই শিক্ষার্থীরা চাকরিতে ঢুকে ঘুষ বা নানা ধরনের দূর্নীতি করে কারণ যে পরিমান অর্থ লস হয়েছে তা উঠাতে সবাই উঠে পড়ে লাগে, যেমনটি রাজনীতির ক্ষেত্রেও লক্ষনীয়।

সুস্থ্য এবং মানসম্মত সুশিক্ষায় আনতে পারবে জাতির পরিবর্তন। তাই আশাকরি সবার প্রচেষ্টা ও রাষ্ট্রের মিশণ ভিষণ এবং পলিসি হোক সুশিক্ষার আশু সমন্বয় ঘটানোর মূল উদ্দেশ্য, এমনটি প্রত্যাশা।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×