প্রবাসীদের জন্য সরকার কী সত্যি আন্তরিক

  লুৎফুর রহমান, আমিরাত থেকে ১৫ জানুয়ারি ২০১৯, ১৫:২০ | অনলাইন সংস্করণ

প্রতিফলন

প্রবাসীদের জন্য সরকার কী আদৌ আন্তুরিক। সরকার কী সত্যি প্রবাসীবান্ধব। উত্তর নিশ্চয়- হ্যা। তার অনেক প্রতিফলন আছে। প্রবাসীদের পরিবারকে পুনবার্সন সহ লাশ পাঠাতে অনেক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। যা এর আগে ছিলো না।

কিন্তু সরকারের এতো পদক্ষেপ গুড়ে বালি করছে কতিপয় অসাধু ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা। প্রতিনিয়ত প্রবাসীরা এ ক্ষোভ থেকে সরকারকে ঘৃণা করতে বাধ্য হন, তা কী সরকারের নজরে আসে না? আবার অনেককে এও বলতে শুনি সরকারের রাজনৈতিক দলের কর্মী এরা তাই তাদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেয়া হয় না। আমার মনে হয় এ অভিযোগ সত্য না।

তবে সরকারের গাফিলতি এড়ানোর কোন সুযোগ নেই এখানে। কারণ এয়ারপোর্টে সিসিটিভি থাকলেও তা সবসময় মনিটরিং হচ্ছে না। হলে এসব ঘটনা রোধ সম্ভব। এ ছাড়া এয়ারপোর্টে প্রবাসীকল্যাণ ডেস্ক থাকলেও সেখানে কোন কর্মকর্তা নেই কেন? আমরা আমাদের এ অভিযোগ কোথায় দেবো? কারে দেখাবো মনের দুঃখ গো গানের মতো কী শুধু গান গেয়েই যাবো?

আমরা যারা প্রবাস থাকি তারা যেদেশে থাকি সেদেশের পাশাপাশি অন্যান্য দেশও ভ্রমণ করি। সেদেশেগুলোতে আপনার সব ঠিক থাকলে আপনাকে 'স্যার' সম্বোধন করে হাসিমুখে বিদায় করা হয়। আর আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশের এয়ারপোর্টগুলোতে ডাকাতের চেয়েও বড়ো খলনায়কের ভূমিকা পালন করে কতিপয় অসাধু অফিসার।

সব কিছু ঠিকঠাক থাকার পরও 'আপনাকে সন্দেহ আছে' বলে আটকিয়ে দেয়া হয়। তারপরে পাশ থেকে অন্য সহকারি এসে বলে 'এতো টাকা দিয়ে দেন' আমি ম্যানেজ করবো। এ দৃশ্য রক্তে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ ছাড়া দুনিয়ার অন্য কোন দেশে আছে বলে আমার জানা নেই। আইনের পোষাক পরা এসব অফিসারের লজ্জা না লাগলেও জাতি হিসেবে আমরা লজ্জিত!

আমার এ লেখা পড়ে সরকার বিদ্বেষী ভাবার কোন কারণও নেই। বরং বুক ফুলিয়ে বলতে পারি বর্তমান সরকারের একজন সমর্থক হিসেবে মনে প্রাণে কাজ করি। স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী বলে এ সরকার আমার বিশ্বাসে আর সমর্থনে আছে। কিন্তু সরকারের উচিত এ জন্য আরো যুগোপযোগি পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

যে ছেলেটি তার মা বাবা বউ বাচ্চা রেখে বিদেশ পাড়ি দিচ্ছে অনেক যাতনায়। সেখানে ইমিগ্রেশনে আসার পর তাকে হয়রানিতে পড়তে হয়। ফোনের অপর পাশে এয়াপোর্টের বাইরে থাকা তার বৃদ্ধ মা হয়তো এটা শুনে হার্ট এ্যাটাক করেছেন। এই দায়টা কে নিবে? শপথ নেয়া অফিসাররা? নাকি সরকার? এ ছেলেটি একদিন দেশের রেমিটেন্সের চাকা ঘুরাতে ঘাম ঝরাবে। আর সব রাজনৈতিক দল আর সরকারের কোন মন্ত্রী এলেও প্রবাসে নানা কথার ফুলঝুরি দিয়ে প্রবাসীরা দেশের সোনার সন্তান বলে বেড়াবেন।

হয়তো আপনার এসব বক্তব্য ওই ছেলেটিকে ছুঁয়ে যাবে না। কেন যাবে? সে তো সোনার বদলে অপরাধির মতো কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে পকেটে যা টাকা ছিলো সেটা এয়াপোর্টে দিতে হয়েছে। তার বাবার দেয়া শেষ চিহ্ন 'টাকা'টাও দিতে হয়েছে কেঁদে কেঁদে আইনের পোষাক পরা এসব চরিত্রহীন মানুষরূপী অমানুষকে। এমন কিছু দৃশ্যের সাক্ষী আমি নিজেও।

একজন প্রবাসী সংবাদকর্মী হিসেবে যতোবার দেশে যাই আশপাশের কাউকে না কাউকে ছাড়িয়ে নিই। কিন্তু একবার ভাবুন যে মানুষটি শেষ সম্বল ভিটে বাড়ি বিক্রি করে বিদেশ নামক জেলে পাড়ি দিচ্ছে সে তার পরিবার না এ দেশকে এগিয়ে নিতে আসছে। মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ শ্রমিকই অর্ধশিক্ষিত নিজের অধিকার না জানা মানুষগুলোকে ঠকানো হয় দেশে ফেরত যাবার সময়ও। এয়ারপোর্টে বিদেশী দেরহাম না দিলে এক্সিট সিল মারে না কতিপয় অফিসার। তাই নিরূপায় মানুষগুলো সেখানেও টাকা দিতে হয়।

আমি ঘটনা পরিষ্কার করতে দুটো দৃশ্যপট এখানে তুলে ধরবো। একটি দেশ থেকে আসার সময়, আরেকটি দেশে যাবার সময়-

কেস স্টাডি-১: ১৪ জানুয়ারি ২০১৯। সন্ধ্যা ৬.৩০ মিনিট। বাংলাদেশ সময়। সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে আমার আপন ভাই দুবাই আসছে। সঙ্গে আমার খালাতোও ভাইও। যে ১০ বছর ধরে দুবাই থাকে। ইমিগ্রেশনে আসার পর সব কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও অফিসার আমার ভাই যে নতুন আসবে তাকে বললেন আপনার প্রোফাইল নিয়ে আমাদের সন্দেহ আছে। আপনাকে যেতে দেবো না। পাশে থাকা সকহারি এসে বললো আপনার সঙ্গে ৩০০ ডলার আছে তা দিয়ে দেন স্যারকে বলবো দিয়ে দেবেন। সঙ্গে থাকা আমার খালাতো ভাই ১০ বছর ধরে দুবাই থাকেন।

তিনি দিতে নারাজ। সেই সঙ্গে ডিগ্রী ফাইনাল ইয়ারে পড়ুয়া আমার ভাইও দিতে নারাজ। অফিসার তার বোর্ডিং কার্ড ফিরিয়ে নিলেন। তাকে সন্দেহ আছে বলে আটকিয়ে দিলেন। আর খালাতো ভাইকে চোখ রাঙিয়ে বল্লেন আপনি যান, না হয় আপনাকেও আটকিয়ে দেবো। বিমানের ফ্লাইট তখন ৮ টায় ছাড়বে। বাজে ৭.৪৫ ওই লোকটি এসে আবার ২০০ ডলার চাইলো। নিরূপায় হয়ে আমার ভাই সে ২০০ ডলার দিয়ে ছুটে আসে। এর আগে বিমানের স্থানীয় ম্যানেজারের সঙ্গে আমি কথা বললে তিনি ইমিগ্রেশন আলাদা বলে নিজের দায় এড়িয়ে গেলেন।

ওই ইমিগ্রেশন অফিসারকে আমার পরিচয় দেয়ার পরেই তিনি ফোনে কথা বলা মানা বলে লাইন কেটে দিলেন। আর আমার ভাইকে ফোনের সুইচ অফ করতে বললেন। এ ঘটনা শুধু একজনের তা না। আর এটা যে শুধু সিলেটের তাও নয়। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সব জায়গায় প্রতিদিন এমন ভোগান্তি পোহাতে হয় বলে শতাধিক প্রমাণ আমার কাছে আছে।

কেস স্টাডি: ২: ২০১৬ সালের ২০ আগস্ট। ঢাকা এয়ারপোর্ট । দুবাই থেকে ঢাকায় বিমান নামলো। সবার চোখে মুখে আনন্দ। ভিনদেশ থেকে নিজদেশের আলোমাখা পরিবেশ যেন তাকে হাতছানিতে ডাকছে। একে একে সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন।

এক্সিট সীল পড়বে বলে। এখানেও ইমিগ্রেশন অফিসার ৫ দেরহাম দেন বলে বলে সবার থেকে ৫ দেরহাম নিচ্ছেন আর সীল দিচ্ছেন। কেউ দিতে অপারগ থাকলে তার পাসপোর্টে সীল দিচ্ছেন না। যখন আমার পালা আসলো। আমি বললাম কেন ৫ দেরহাম দিবো? তিনি বললেন ওই ফর্মটা আপনাদের কারো কাছে নাই তাই দিতে হবে। আমি বল্লাম ঠিক আছে ফর্ম দিন আমি ফিলাপ করি। ফর্ম এনে দেখি এটা 'ডুয়েল সিটিসেনশীপ' যারা তাদের জন্য। আমি বল্লাম এটা আমাদের জন্য না। আমরা প্রবাসী। নাগরিকত্ব শুধুমাত্র বাংলাদেশেরই।

এটা যারা ইউরোপ আমেরিকা থাকে তাদের জন্য। তারা ডুয়েল সিটিজেনশীপ। তিনি ক্ষেপে গেলেন, বেশি কথা বলেন বলে আমার পাসপোর্ট ছুড়ে মারলেন। আমার কাছে পাসপোর্ট মানে পতাকা। আর পতাকা মানে আমার দেশ, আমার মা। আমার দেশ, মাকে অপমান করা দেখে আমি তার কলার চেপে ধরলাম। হৈ হুল্লুড় শুরু হলো। এলেন ওসি।

তিনি অফিসারকে বকে আমাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। তিনি বললেন তিনি এসব জানেন না। সে যা করছে অন্যায় আর তাকে তিনি দায়িত্বে রাখবেন না। কিছু সময় বন্ধ থাকা সেবা আবার তিনি চালু করলেন অন্য অফিসার দিয়ে। আমাকে বসে চা পান করাতে তিনি ব্যস্ত হয়ে যান। আমি আমার আব্বা আইসিইউতে আছেন আমি ইমার্জেন্সি এ জন্য দেশে আসছি বলে তাড়াতাড়ি চলে এলাম।

সোজা চলে গেলাম হাসপাতালে যেখানে গিয়ে আব্বার মরদেহ দেখতে পেয়েছি। আমরা কে কোন অবস্থায় দেশে যাই আমরাই জানি। আমাদের হয়রানি আর কতো যুগ গেলে বন্ধ হবে কেউ বলতে পারেন? হ্যা ফখরুদ্দিন সরকারের সময় তুলনামূলক শান্তিতে ছিলাম। এসব হয়রানি আমাদের ছোঁয়ে যায়নি।

বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কাজে ব্যস্ত। অনেকটা সফলও সেই পথে। এয়ারপোর্ট আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব রোধ করা সম্ভব। এর আগে প্রবাসীকল্যাল ডেস্কে সবসময় লোক বসিয়ে রাখা বা এসব দুর্নীতিগ্রস্থ অফিসারদের শাস্তি দেবার জন্য অন্তত একজন আর্মি অফিসার এয়ারপোর্টে বসাতে পারেন। এমন একটি ডেস্ক হবে। যেখানে লেখা থাকবে বিমানবন্দর হয়রানি হলে এইখানে অভিযোগ করুন।

তবে হ্যা, তিনিও যদি সৎ থাকেন। আবার তিনিও যদি অসতের দলে মিশে যান আমাদের বলার কিছু থাকবে না। দেশপ্রেম প্রবাসীর মতো কারো থাকে না। সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দুবাই এসে বলেছিলেন প্রবাসীদের চোখে আমি যে খাঁটি দেশপ্রেম পাই, দেশে তা অনেক নেতার মাঝেও পাই না। এ দেশেপ্রেমটাই প্রবাসীদের বাঁচিয়ে রাখে। নিজে জ্বলে দেশকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করে। বাংলাদেশ সরকারের কাছে দেড় কোটি প্রবাসীর পক্ষথেকে আমার অনুরোধ প্লিজ, অন্তত বিমানবন্দরে আমাদের এসব হয়রানি বন্ধের গ্যারান্টি দিন।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×