একাত্তরে যুক্তরাষ্ট্রে দুঃসাহসিক অভিযান ‘ব্লকেইড’

  বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া, হল্যান্ড থেকে ১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ১২:৪৫ | অনলাইন সংস্করণ

অভিযান

ব্লকেইড বাংলায় 'অবরোধ'। ব্লকেইড একটি ইতিহাসের নাম। অন্যায়ের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ন প্রতিবাদের ইতিহাস তুলে ধরা একটি শ্বাসরুদ্ধকর ডকুমেন্টারী ছবি। বাংলাদেশ যখন জ্বলছিল, পাকিস্থানী হানাদার বাহিনী যখন ১৯৭১ সালে নিরস্ত্র বাঙালী নিধনে ব্যস্ত এবং বাংলার দামাল ছেলেরা যখন অস্ত্র হাতে স্বাধীনতার জন্য অকুতোভয়ে প্রাণ দিচ্ছিল সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে একদল শান্তি আন্দোলনকারী যারা 'কোয়েকার' হিসেবে পরিচিত, বাংলাদেশিদের পক্ষে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তারা।

তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন তারা নিক্সন-কিসিঞ্জারের বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থানের। বাংলাদেশ থেকে সহস্র কিলোমিটার দূরের একটি ছোট্ট দেশ বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানাতে, বাংলাদেশি জনগণের পক্ষে তাদের সমর্থন ব্যক্ত করতে তারা ভয়কে জয় করে, আমেরিকান পুলিশ, নৌ-বাহিনীর মুখোমুখি হয়ে বাঁধা দিয়েছিলেন পাকিস্তানের বিশাল নৌ জাহাজ 'পদ্মা'-কে ফিলাডেলফিয়ার বন্দরে।

তাদের সঙ্গে ছিলেন স্বদেশ ছেড়ে আমেরিকায় সে সময় থাকা কিছু প্রবাসী বাঙালী। পাকিস্তানী জাহাজ ভিড়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের সে বন্দরে। উদ্দেশ্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জন্য আমেরিকান অস্ত্র বহন করা, যা ব্যবহৃত হবে স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে।

যুক্তরাষ্ট্রের এ সমস্ত শান্তিকামী সদস্যরা ছোট ছোট ডিঙি নৌকা চড়ে পুলিশী চোখরাঙানিকে তুচ্ছ জ্ঞান করে ঘিরে রেখেছিলেন পাকিস্তানের বিশালদেহী নৌ-জাহাজকে। জল-কামান, পুলিশী হয়রানি, হুমকি এবং গ্রেফতার তাদের দমাতে পারেনি। তাদের একটাই লক্ষ্য কিছুতেই এ জাহাজে অস্ত্র তুলতে দেয়া হবে না।

এক সময় তারা সফল হন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নীতি পরিবর্তন করাতে এবং পাকিস্তানী জাহাজকে অস্ত্র ছাড়াই বন্দর ত্যাগ করতে হয়। তাদের এ আন্দোলনের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন বন্দরের শ্রমিকরাও। তারাও একাত্মতা ঘোষণা করেছিল আন্দোলনকারীদের সঙ্গে। ফিরে যাই তার আগের ঘটনায়।

সুলতানা আলম। বাঙালী তরুণী, আমেরিকাবাসী। একাত্তর সালের মার্চ মাসে দেশ থেকে ভেসে আসে সংবাদ নিরীহ বাঙালীর উপর হানাদার পাকবাহিনী নিধনযজ্ঞ শুরু করেছে। সদ্য মা হওয়া তরুণী সুলতানা আলম প্রথম সন্তানের আনন্দ ভুলে যান, মন পড়ে থাকে দেশে যেখানে তার সমস্ত নিকটজন। না জানি কে কেমন আছে? কী করে মাতৃভুমির এ কঠিন মুহূর্তে পাশে দাঁড়াতে পারেন সে জন্য ছটফট করতে থাকেন।

সে সময় আজকের মত অত বাঙালী ছিলনা আমেরিকায়। খুঁজতে থাকেন দেশের এ সংকট মুহূর্তে, স্বাধীনতা যুদ্ধে কাদের পাশে পাওয়া যায় তেমন ব্যক্তি ও সংগঠনকে। টেলিফোন গাইড বের করে একের পর এক ফোন করতে থাকেন। চিঠি দিতে থাকে। তাতে তিনি ব্যক্ত করেন বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া গণহত্যা নিয়ে, পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অত্যাচার, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের কথা, বাংলার আন্দোলনের কথা। অবশেষে তার এ নিরলস সন্ধানের প্রচেষ্টা সফল হয়। তিনি খুঁজে পান দুজন তরুণ 'কোয়েকার এক্টিভিস্টকে। তারা হলেন রিচার্ড টেইলর ও বিল ময়ের। দুজনেই কাজ করতেন ড. মার্টিন লুথার কিং এর সিভিল রাইটস সংস্থায়। তারপর এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে গোটা ফিলাডেলফিয়ায় এবং তারও পরে আরো দূরে। এমনি করে এগিয়ে গেছে এ শ্বাসরুদ্ধকর ডকুমেন্টকারী ছবি।

ছবিটি আবারো মনে করিয়ে দিল একাত্তরে পাক হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের কথা। তাদের সৃষ্ট গণহত্যার কথা। দুঃখ হয় সেই গণহত্যার জন্যে যে ১৯৩ পাকিস্তানী সেনা সদস্যকে বিচারের কাঠগড়ায় দাড় করানোর দাবী তা এখনো কার্যকর হয়নি। সুখের বিষয় তাদের দেশীয় দোসরদের কারো কারো বিচার এবং শাস্তি এ দেশে হয়েছে, যদিও বা এখনো অনেকে রয়ে গেছে বিচারের বাইরে। একাত্তরে বাংলাদেশে পাক হানাদার বাহিনী যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এখনো মেলেনি। বিশ্ব বাংলাদেশের এ দিকটা ভুলে গেছে বা এড়িয়ে গেছে, অথচ একাত্তরের গণহত্যা ছিল বিশ্বের মধ্যে সব চাইতে ভয়াবহ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ৬ কোটি লোক নিহত হয়েছিলেন। কিন্তু সে যুদ্ধ চলেছিল ৬ বছর ধরে এবং তিনটি মহাদেশ ছড়িয়ে। আর একাত্তরে মাত্র ৯ মাসের যুদ্ধে পাকিস্তানীরা হত্যা করেছিল ত্রিশ লক্ষ নিরীহ জনগণকে, ধর্ষণ করেছিল দুই লাখেরও বেশি মা-বোনকে, করেছিল অগ্নিসংযোগ এবং অত্যাচার। আর তাদের এ গণহত্যা, ধর্ষণে সহযোগী ভূমিকা পালন করেছিল এ দেশের রাজাকার, আল-বদররা।

দুঃখের বিষয় স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ অবাক ও নির্বাক তাকিয়ে দেখেছে মুক্তিযোদ্ধাকে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করতে, অনাহারে, অভাবে মৃত্যুবরণ করতে। অন্যদিকে রাজাকার, আলবদরদের গাড়ীতে উড়তে দেখেছে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।

একাত্তরে যে ঘটনা তা তুলে ধরেছিলেন রিচার্ড টেইলর তার বই, "ব্লকেইড: এ গাইড টু নন-ভায়োলেন্ট ইন্টারভেনশন"-এ। সেই বর্ণনার উপর ভিত্তি করে দীর্ঘদিন গবেষণা করেন ছবির পরিচালক আরিফ ইউসুফ, যিনি পেশায় আই টি বিশেষজ্ঞ, স্থায়ীভাবে থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে। তার এই অভিযানে সঙ্গী ছিলেন তার দুই বন্ধু, মৃদুল চৌধুরী এবং রশিদ মামুন পল্লব। পরিচালকের বর্ণনায়- সব কিছু গুছিয়ে এ ছবি তৈরী করা ছিল দুরূহ কাজ। কেননা কাজটা আমরা শুরু করি ২০০৮ সালে, তখন সময় অনেক গড়িয়ে গেছে।

অনেকে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন, অনেকের বয়স হয়েছে। যে বাঙালী তরুণী, যিনি দেশের সংকটময় মুহুর্তে তার প্রথম সন্তানের জন্মের যে আনন্দ তা উপভোগ করতে পারেননি বলে জানিয়েছিলেন, তিনিও ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে বাংলাদেশে ফিরে গেছেন। তাকেও খুঁজে বের করেন ছবির পরিচালক। তার মুখ থেকে শুনেছেন ৪৭ বছর আগে ঘটে যাওয়া কাহিনী। শুনেছেন আরো অন্যান্য মার্কিন শান্তি-কর্মীর মুখ থেকে যারা বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন একাত্তর সালে।

কোন বাধাই পরিচালক আরিফ ইউসুফকে দমাতে পারেনি। দেশের প্রতি তার অদম্য ভালোবাসা, এক ধরণের দায়বদ্ধতা থেকে তিনি তার পেশার বাইরে গিয়ে এই কাজ করে গেছেন। দেশের স্বাধীনতার একটি অনন্য 'ডকুমেন্ট' তৈরী করলেন। জাতি তার কাছে কৃতজ্ঞ হয়ে রইলো। পরিচালক আরিফ ইউসুফের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয় সপ্তাহ কয়েক আগে। ছবিটি প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়েছিল হল্যান্ডস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে। বিজয় মাসে দূতাবাসে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে এ ছবি প্রদর্শনের পর পরিচালক ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আয়োজক এবং দর্শকদের সঙ্গে এ ছবি নিয়ে কথা বলেন। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, যারা এ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন তাদের কাউকে কাউকে বর্তমান সরকার বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানিয়ে সম্মাননা জানান। কথাছিল দূতাবাসের অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত থাকবেন, কিন্তু থাকতে পারেননি।

সে কারণে পর্দায় তিনি উপস্থিত হয়ে নির্মাণসহ এ ছবির নানা দিক নিয়ে বক্তব্য রাখেন। বাংলাদেশ দূতাবাসকে অশেষ ধন্যবাদ। ধন্যবাদ বাংলাদেশের ইতিহাস-সাক্ষী এমন একটি ছবি প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেখার, জানার সুযোগ করে দিলো বলে।

রাষ্ট্রদূত শেখ মোহাম্মদ বেলালকে বিশেষ ধন্যবাদ না দিলে নিজেকেই ছোট করা হয়। এ কারণে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলি সাধারণত সরকারি নির্দেশ বা নির্দিষ্ঠ তালিকা ছাড়া নিজ উদ্যোগে, নিজ তাগিদে এ ধরণের কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেনা বলেই ধারণা। অনেক দূতাবাস এমন কি জাতীয় অনুষ্ঠানগুলিও আয়োজন করে দায়সারা গোছের।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×