হৃদয় থেকে নেয়া

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ২৩ জানুয়ারি ২০১৯, ০৯:৫৯ | অনলাইন সংস্করণ

হৃদয়

I am not living with my power, I am living with the help of power and this power is so wonderful and powerful to our humanity. আমি জন্মেছি বাংলাদেশে। বাস করছি বিদেশে। ভাবছি মাত্র ২০ বছর ছিলাম বাংলাদেশে। এদিকে ৩৬ বছর হয়ে গেল ছেড়েছি বাংলাদেশ।

তার পরেও যা কিছু ভালো দেখি এখানে, তা হতে হবে বা করতে হবে বাংলাদেশে। কি কারণ থাকতে পারে এর পেছনে? বিষয়টি বেশ মজার তাই কিছুটা সময় ব্যয় করেছি কারণ জানার জন্য।

আজ বর্ণনা করব তার ওপর কিছু ঘটনা যা জীবন থেকে নেয়া। মাত্র ১০ মাস মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় শিশু পূর্ণাঙ্গ রূপ ধারণ করে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে। তারপর এক বছর সময় মায়ের সান্নিধ্যে জীবনের পূর্ণাঙ্গতা লাভ করতে শুরু হয়। মা-বাবা, ভাই-বোন, পরিবার, সব মিলে জীবনের যাত্রা শুরু হতে থাকে।

জন্ম থেকে যাত্রা শুরুর সময়টুকু বাকি জীবনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়টুকু এত গুরুত্বপূর্ণ যে আমার জীবনের ৩৬ বছর হার মেনেছে সেই বাংলাদেশের ২০ বছরের কাছে। এখন প্রশ্ন, আছে কি তেমন পার্থক্য জন্মভূমি এবং মাতৃভূমির মধ্যে? সুইডেনের একটি শহর নাম স্ট্রেংন্যাস, সেখানে আমরা বসবাস করেছি সাত বছর। মাইকেল এবং লেনা আমাদের প্রতিবেশী, ভালোবেসে বিয়ে করেছে।

দুজনেই সন্তানের বাবা-মা হতে বহু চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। শেষে নানা ধরনের চেক আপ শুরু করে এবং সব ধরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরে জানতে পারে লেনার গর্ভে সন্তান হবে না। কি করা? পরে সিদ্ধান্তে আসে যে তারা surrogate প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সন্তান নিবে। মাইকেল তার স্পার্ম দিবে ইন্ডিয়ার এক মহিলাকে।

Surrogate প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এবং অর্থের বিনিময়ে অনেক দরিদ্র দেশের মহিলারা গর্ভধারণ এবং সন্তান প্রসব করে থাকে। শর্ত ছিল গর্ভধারণ থেকে প্রসব করা এবং তিন মাস ইন্ডিয়ান (surrogate) মায়ের সঙ্গে থাকবে। পুরো ১৩ মাসের সব খরচ এবং এককালীন কিছু অর্থের বিনিময়ে এ কাজ সম্পন্ন হয়।

এই ১৩ মাসের ভিতরে মাইকেল এবং লেনা দুইবার ইন্ডিয়াতে বেড়াতে গিয়েছে এবং ইন্ডিয়ান (surrogate) মায়ের সঙ্গে দেখা করেছে। পরে সেই তিন মাস বয়সের মেয়েকে তারা সুইডেনে নিয়ে আসে। মেয়ের নাম সিসিলিয়া। সিসিলিয়া দেখতে বাদামী রঙের হয়েছে। জন্মের তিনমাস থেকে শুরু করে আজ ১৭ বছর বয়স অবদি সিসিলিয়া ১০০% সুইডিশ।

বলতে গেলে তার খাওয়া থেকে শোয়া সব কিছুতেই সুইডিশ সংস্কৃতি জড়িত। সব কিছুতেই সিসিলিয়া ন্যাচারাল সুইডিশ, তবুও সে দেখতে সুইডিশদের মত নয়। এমনকি তার মায়ের সঙ্গে সে কিছুতেই মিল খুঁজে পায় না।

বাবার প্রতি সে যেমনটি ন্যাচারাল, মায়ের প্রতি তেমনটি না। সিসিলিয়া প্রশ্ন করতে শুরু করেছে যখন তার বয়স ৪-৫ বছর। সিসিলিয়ার বাবা-মা নানা ভাবে বিশ্লেষণের চেষ্টা করতে করতে এমন পর্য়ায় পৌঁছেছে যে সিসিলিয়া এখন পুরো বিষয়টি সম্পর্কে অবগত।

সিসিলিয়ার ভাবনায় ঢুকেছে সে ইন্ডিয়া যাবে এবং খুঁজে বের করবে তার গর্ভধারিণী মাকে। এরই মধ্যে ১৭ বছর পার হয়েছে মাইকেল এবং লেনার সঙ্গে নেই কোন যোগাযোগ সেই ইন্ডিয়ান (surrogate) মহিলার। তাছাড়া সেই ইন্ডিয়ান মা শুধু মাইকেল নয় আরো কয়েকটি দেশের পুরুষের স্পার্মে গর্ভবতী হয়ে বাচ্চা প্রসব করেছে।

এটা ছিল সেই ইন্ডিয়ান মহিলার পেশা। সিসিলিয়া তার বাবা-মার কাছে বায়না ধরেছে যে তার গর্ভধারিণী ইন্ডিয়ান মাকে খুঁজে বের করতে হবে। আমাদের মেয়ে জেসিকার বয়স ১৭ বছর। জেসিকার জন্ম হয় স্ট্রেংন্যাসে। স্ট্রেংন্যাস স্টকহোম থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে। সিসিলিয়া এবং জেসিকা কিন্ডারগার্টেনে এক সঙ্গে কাটিয়েছে।

তারপর আমাদের বাড়িও ছিল বেশ কাছাকাছি, সব মিলে অনেক দিনের চেনাজানা তাদের সঙ্গে। মাইকেল ধরেছে আমাকে, কি ভাবে কি করবে তা নিয়ে। এদিকে দিল্লি থেকে সুইডিশ দূতাবাস মাইকেলকে জানিয়েছে মহিলা মারা গেছেন বছর দুই আগে।

আমি আমার মত করে বোঝাতে চেষ্টা করাতে সিসিলিয়া আমাকে প্রশ্ন করেছে তুমি সুইডেনে এত বছর ধরে আছো এবং তারপরও কেন বাংলাদেশেকে নিয়ে ভাবো? আমি বলেছি দেখ আমি ২০ বছর থেকেছি সেখানে আর তুমি সর্বমোট ১৩মাস, পার্থক্য টা অনেক।

আমি এও বলেছি যে আমার মেয়ে জেসিকাও কিন্তু তোমার মত দেখতে। সিসিলিয়া উত্তরে বল্লো হ্যাঁ তবে সে তার বাবা-মার সঙ্গে জীবনযাপন করছে। আমি বল্লাম তুমিও তো তোমার বাবা-মার সঙ্গে জীবনযাপন করছো। সিসিলিয়া এগ্রী, তার পরও সে ডিজএগ্রী। বলে তুমি বুঝতে পারছ না আমার অনুভূতি।

তার অনুভূতিতে সে মনে করে লেনা তার আসল মা না, যদিও সিসিলিয়া ভালোবাসে লেনাকে মায়ের মতই। এদিকে বেচারি মা লেনা হৃদয় দিয়ে ভালোবাসে তার মেয়ে সিসিলিয়াকে। লেনা তার মেয়ের অনুভূতির কথাটাও অনুভব করে।

মাত্র ১৩টি মাস, কি এমন জাদু রয়েছে সেই ইন্ডিয়ান মায়ের মধ্যে যা সিসিলিয়া দিনের পর দিন শুধু মিস করছে! সিসিলিয়ার সব থাকতেও মনে হচ্ছে তার কিছু নেই। জন্মসূত্রে সিসিলিয়ার জন্মভূমি এবং মাতৃভূমি এক এবং অভিন্ন।

কারণ দীর্ঘ ১৩ মাস সময় তার জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। যে সময়টিতে সে তার(surrogate) মায়ের সংস্পর্শ পেয়েছে। আমার এবং সিসিলিয়ার অনুভূতির মধ্যে রয়েছে বিরাট তফাৎ। আমার সম্পর্ক বাংলাদেশের সঙ্গে জ্ন্মভূমি, মাতৃভূমি এরং জন্মের শুরু থেকে ২০ বছর অবধি।

সিসিলিয়ার জন্মসূত্রে মাতৃভূমির সংস্পর্শ রয়েছে জীবনের শুরুতে তাই হয়ত তার ভাবনায় পুরো ইন্ডিয়া নয় শুধু তার গর্ভধারিণী মা তার কাছে বড় আকারে প্রভাব বিস্তার করেছে।

সিসিলিয়া তার গর্ভধারিণী মাকে দেখতে পাবেনা, তা সে মেনে নিতে শুরু করেছে। আমি আমার ধ্যানে, জ্ঞানে এবং স্পর্শে ধরে রেখেছি বাংলাদেশকে। তাই এত বছর বিদেশে থাকা সত্বেও জন্মেসুত্রের অনুভূতিটাই প্রভাব বিস্তার করেছে আমার জীবনের উপর।

সুইডেনের প্রতি হয়েছে এবং রয়েছে দায়িত্ব ও কর্তব্য। বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে ঋণ, যা শুধু ভালোবাসার ঋণ, তাইতো যেখানে ভালো কিছু দেখি, বারবার ভাবি আর ফিরে তাকাই সেই মাতৃভূমির দিকে।

জোটে যদি মোটে দশটি টাকা জমাবার তরে, পাঠাতে মন চায় বাংলাদেশের ঘরে। ছোটবেলার সব স্মৃতি, যা শুধু মনে করিয়ে দেয় হৃদয়ের ভালোবাসা আর মায়ের সেই স্নেহ ও প্রীতি।

মাইকেল এবং লেনা সিসিলিয়াকে কথা দিয়েছে কোন এক সময় ইন্ডিয়াতে বেড়াতে নিয়ে যাবে। দেখা হবে না মাকে, তবে দেখবে তার মাতৃভূমিকে। মা-বাবার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা বা সন্তানের প্রতি মা-বাবার ভালোবাসা রয়েছে সত্যি তবে পার্থক্য রয়েছে অনুভূতির এবং তা নির্ভর করে সন্তানের জন্মসূত্রের ওপর, যেমন - বায়োলজিক্যাল, surrogate প্রক্রিয়া, বা পালিত সম্পর্ক।

সিসিলিয়ার ভালোবাসায় রয়েছে বায়োলজিক্যাল অনুভূতির দুর্বলতা। আর আমার ৩৬ বছর বাংলাদেশ ছেড়ে দূরপরবাসে থাকা অনুভূতিতে রয়েছে ভালোবাসার দূর্বলতা।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×