সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট

প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০১:৩৫ | অনলাইন সংস্করণ

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে

বাংলাদেশে যখন বন্যা হয় তখন জমিতে প্রচুর পলিমাটির আবির্ভাব ঘটে। পানি শুকাতে শুরু করে আর পলিমাটিতে ভরাট হয় জমি। আমাদের ইছামতি বিলের মাঝে আছে এক বড় পুকুর। ইছামতি বিল বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিল।

সীতারাম নামে এক রাজা রাজত্ব করতেন আমাদের এলাকাতে কোনো এক সময়। রাজা তাঁর প্রজাদের নিয়ে যখন কোথাও রওনা হতেন, শুনেছি, পথে অনেক আকস্মিক কাজ করতেন।

সীতারাম রাজার রাজত্বের মধ্যে ছিল এ ইছামতির বিল। রাজা মাঝে মধ্যে তার প্রজাদের নিয়ে বিলের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে যেতেন। হঠাৎ তিনি একদিন ইছামতির বিল পাড়ি দিচ্ছিলেন। বিরাট বিল, পাড়ি দিতে সবাই ক্লান্ত, অথচ পানীয় জলের কোনো ব্যবস্থা নেই।কী করা? শেষে সিদ্ধান্ত নিলেন যে তিনি বিলের মাঝখানে একটি বড় পুকুর খনন করবেন এবং যে চিন্তা সেই কাজ।

বিলের মাঝখানে তিনি একটি বড় পুকুর খনন করেছিলেন। সেই পুকুর সময়ের সঙ্গে পলিমাটিতে ভরাট হয়ে আস্তে আস্তে চাষের জমিতে পরিনত হয়ে যায়।

এ জমিতে যা ফলানো হয় তাই ফলে। কারণ পলিমাটি জমির উর্বরতা বাড়ায় বন্যা যেমন জন জীবনের ক্ষতি করে তেমন উপকারও করে থাকে। মজার ব্যপার হলো আমার বড় ভাই প্রফেসর ড. মান্নান মৃধা কয়েক বছর আগে সেখানে আরো বড় করে একটি পুকুর খনন করেন।

উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশে একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় করার। যেখানে থাকবে আইসিটি রিলেটেড প্রযুক্তি, সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর গবেষণা কেন্দ্র যেমন প্রোটিন, আমিষ, নিউট্রিশন, স্বাস্থ্য ইত্যাদির ওপর। শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের একত্রিত করে গবেষণা থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ দেয়া এবং তা বাস্তবে রূপান্তরিত করা ছিল এই বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য। শুধু থিওরি নয় বাস্তবতার সঙ্গে অন দি জব ট্রেনিংয়ের মধ্যে দিয়ে, লার্নিং বাই ডুইং এবং লার্নিং ফ্রম ল্যারনারস কনসেপ্টের সমন্বয়ে গড়ে উঠবে এ বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়। তখন এর নাম প্রস্তাব করা হয় NUHAT( Nohata University of Health and Agriculture Technology). প্রাথমিক পর্যায়ে আলোচনার সঙ্গে কাজের বেশ অগ্রগতি হতে থাকে। স্থানীয় অনেকেই ছোটখাটো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। কেউ আবার কিছু জমি অদল বদল করে। কেউ কিছু জমি বিক্রি করে এবং কিছু লোক কিছু জমি ডোনেশন দেয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম তৎকালীণ থ্রিজিসহ ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করা হয় সুইডেনের রয়েল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি এবং গ্রামীন ফোনের সমন্বয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কারণে।

পারিবারিক জমি এবং ফান্ডিং থেকে পুকুর কাটা, বিভিন্ন মাছের চাষ, হাঁস মুরগী, গরু ছাগল, নানা ধরণের শাকসব্জির চাষ থেকে শুরু করে, বিভিন্ন ধরণের ধানের ওপর নতুন প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে পাইলট প্লানের মাধ্যমে কাজ শুরু করা হয়।

টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে বিদেশি চিকিৎসকের সঙ্গে স্থানীয় চিকিৎসকের সমন্বয় সৃষ্টি করে নিয়মিত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশী প্রশিক্ষকও আনা হয়। কিন্তু দেখা গেল বাংলাদেশের প্রশিক্ষণের যে ধরণ যা সেই পুরোনো প্রথানুযায়ী চলছে, তাতে করে ঐ ধরণের অর্থাৎ বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করার মতো পরিবেশ দেশে হয়নি তখনো। এদিকে সরকার থেকে কোনো সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা তখনো হয়ে ওঠেনি।

কোনো উপায় না দেখে যারা কিছু জমি দিয়ে সাহায্য করেছিল তাদেরকে অর্থ বা অন্য জমি ফেরত দিয়ে সমস্ত ঝামেলার অবসান ঘটাতে হয়। এ ছাড়াও নানা বাঁধাবিঘ্নের সম্মুখীন হতে হয় যেমন কম্পিউটার চুরি, গরু চুরি, মাছ চুরি, ধান চুরি।চুরি আর চুরি।

শেষে বড় আকারের অর্থনৈতিক ক্ষতিগ্রস্ত হই আমরা। গত কয়েক বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত কাজের ইতি টানা হয়। তবে আমার বড় ভাই সুশিক্ষায় বিশ্বাসী বিধায় শুরু থেকে শিক্ষা, কী শিক্ষা, কেন শিক্ষা, কীভাবে শিক্ষা এর ওপর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

বর্তমানে তাঁর একটি কিন্ডারগার্ডেন রয়েছে। যেখানে তিনি শিক্ষার বীজ বপন থেকে তার যাত্রা শুরু করেছেন। আমাদের সেই বড় পুকুরের আশেপাশে এখনো প্রতি বছর অন্যান্য ফসলের মত প্রচুর ধান হচ্ছে সেই নতুন প্রযুক্তির মধ্য দিয়ে।

ধান বাড়িতে এনে তা খড় থেকে ছাড়িয়ে রোদে শুকানো হয়। তাকে আবার সিদ্ধ করা হয়। সিদ্ধ ধানকে রোদে শুকিয়ে ঢেকি ছাঁটা দিয়ে বা মেশিনে ছেঁটে তুষ-কুড়ো ছাড়িয়ে চাল বের করা হয়। সেই চাল সেদ্ধ করে ভাত রান্না করা হয়। পরে পেট ভরে সেই ভাত খাওয়া সে এক মজার ব্যাপার।

কী পরিমাণ শক্তি বা কী পরিমান পুষ্টি এ ভাতের ভেতর আছে তা আজকের যুগে বের করা খুবই সম্ভব। এ ধানের বীজ বপন থেকে ভাত খাওয়া পর্যন্ত সময়ের মধ্যে রয়েছে নানা ধরণের পদক্ষেপ বা ধাপ। এখন এই ভাত পেটে ঢুকলো। হজম হয়ে শরীরের নানা অঙ্গে প্রত্যঙ্গে গেল। বাকিটা বর্জ্য হিসেবে বের হয়ে জৈব সারে পরিণত হলো। খাবারের মধ্যে রয়েছে নানা ধরণের পুষ্টি, শক্তি এবং আরো কিছু যা শরীর তার মতো করে রক্তের মধ্য দিয়ে যেখানে যা দরকার পৌঁছে দিচ্ছে।

বীজ বপন থেকে শুরু করে শরীরের শেষ পর্যন্ত ধাপগুলোকে ধরতে পারি একটি প্রসেস হিসেবে। এ শুরু থেকে শেষের মাঝখানে রয়েছে বিভিন্ন ধাপ এবং তার জন্য রয়েছে কিছু মাধ্যম যেমন শ্রমিক, পানি, সূর্যের আলো, বাতাস, তাপমাত্রা, জায়গা এবং শরীরের বিভিন্ন অংশ এবং তাদের সক্রিয় ভূমিকা। এ শুরু থেকে শেষ প্রসেস এবং এর বিভিন্ন ধাপের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সময়। সময় আবার দুই প্রকার।পুরো সময় এবং অংশ বিশেষ সময়।

আমার উপরের বর্ণনা থেকে একটি বিষয় পরিস্কার। তা হলো ইটপাথর দিয়ে তৈরি বিশ্ববিদ্যালয় করে কী হবে যদি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য সফল না হয়! বিশ্ববিদ্যালয় হয়নি বলে শিক্ষা থেমে নেই।

ডিজিটাল যুগে থেমে থাকতে পারেনা সুশিক্ষা। তাই গ্রামের কৃষকের সে বীজ বপন থেকে শুরু করে ভাত পেটে যাওয়া পর্যন্ত ধাপগুলোকে যদি একত্রিত করি তাহলে হয়ে গেল সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট।

কারণ এখানে রয়েছে ল্যান্ড, লেবার, অর্গানাইজেশন এবং ক্যাপিটালসহ অর্থনীতির মূল দিকসমূহ। সাপ্লাই মানে কোন জিনিস এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় দেয়া। চেইন মানে যুক্ত করা যেমন স্টেপ বাই স্টেপের সমন্বয়। ম্যানেজমেন্ট মানে পুরো জিনিসগুলো যেন সিস্টেমের সঙ্গে চলে সেই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। যে এই দায়িত্বে সে ম্যানেজার। যে কাজ করে সে কর্মচারি। ম্যানেজার ম্যানেজ করে এবং ম্যানেজার হতে পারে অনেক রকমের, নির্ভর করছে তার দায়িত্ব এবং কর্তব্যর ওপর।

এ বিষয়টি পড়তে অনেকে যায় হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডন বিসনেস স্কুল বা স্টকহোম স্কুল অফ ইকোনমিক্সে। হ্যাঁ শিক্ষার জন্য যেকোনো দেশে যাওয়া যেতে পারে। তবে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কিন্তু শেখা এবং জানা।

তাই আমরা যে যেখানে আছি, যদি কিছু শিখতে চাই, তা অবশ্যই সম্ভব। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন বাঁধাবিঘ্নকে ভাবনায় ঢোকানো এবং তা থেকে সমাধান বের করাই কিন্তু আসল শিক্ষা। আমার মনে হয় প্রশিক্ষণ এমন করে অনেক জটিল বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রকৃত জ্ঞানের আলো দিতে পারে। এর জন্য দরকার মোটিভেশন এবং ডেডিকেশন। এই একইভাবে আমরা যদি নিজেদের শরীরকে নিয়ে ভাবি তাহলে অনেক কিছুই শিখতে পারি। আমরা যারা আমাদের শরীরকে সুন্দর করে ম্যানেজ করতে শিখেছি তারা সুস্থ রয়েছি।জীবনে বেঁচে থাকার জন্য সমাজের নানা অসুস্থ পরিবেশকে আমরা ইচ্ছা করলে উপেক্ষা করতে পারি। এ পারা না পারার দায়িত্ব আমাদের নিজেদের ওপর নির্ভর করছে। জীবনের পাঠশালা থেকে যে শিক্ষা আমরা পেয়ে থাকি তা কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য শ্রেষ্ঠ শিক্ষা।

আমরা কি সত্যিকারার্থে আমাদেরকে জানতে চেষ্টা করছি? এ প্রশ্নের উত্তর শুধু আমরাই জানি। ডিজিটাল যুগে স্মার্টফোনের মাঝে রয়েছে সেই বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে পেতে পারি সব অজানা তথ্য। শেখার শেষ নেই যেমন, কৌতুহলীরও শেষ নেই তেমন। সবার আগে সর্বশেষ শেখার যেন না হয় শেষ, এসো নতুন করে শিখি।