ভালোবাসি তোমাদের

প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৯:২৯ | অনলাইন সংস্করণ

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে

বলবে না কেউ আর কোনো দিন বাবা কেমন আছো? বাবা কেমন আছো -এ শুধু প্রশ্ন নয়, এ হৃদয়ের মাঝে এক ভালবাসার বন্ধন। এ বন্ধনে পৃথিবীর সব সন্তানই পড়েছে ধরা। যে সরেছে সে মরেছে।

ছোটবেলায় মাকে বিরক্ত করতে আমি ছিলাম পাকা। সব সময় লেগে থাকতাম মায়ের পিছে। কেন যেন মনে হতো আমি তার বেশি আদরের। বাবা চাকুরি জীবনের বেশির ভাগ সময় কর্মস্থলে একা কাটিয়েছেন। মাকেই সব কিছু সামলাতে হতো তখন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বড়রা ছেড়েছে বাড়ি। সবাই স্বাধীন হওয়ার জন্য উদগ্রীব। আমি তখন খুবই ছোট। তারপরও কেমন যেন রুটিন মাফিক ট্রেনিং চলছে। মা শিখিয়েছেন কি করতে হবে যখন মিলিটারি বাড়িতে আসবে। কোথায় পালাতে হবে, কাকে জানাতে হবে ইত্যাদি।

গোলাগুলি শুরু হলেই মসজিদে গিয়ে আশ্রয় নেয়া ছিল আমাদের প্রথম কাজ। মা শুধু মা নন, উনি আমাদের পরিবারের কমান্ডিং অফিসার, ওনার কথায় সব চলে। বাবা মাঝে মধ্যে বাড়ি আসতেন, তবে খুবই কম। যুদ্ধকালীন সময় আমাদের লেখাপড়া একেবারেই বন্ধ ছিল।

অন্ধকারের ফেরিওয়ালা হয়ে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে নৌকায় করে পালিয়ে বেড়ান এক জীবন। নয় মাস যুদ্ধের পরে পরিবারের পুনর্মিলন। সব দু:খ কষ্ট ভুলে স্বাধীনতার খুশিতে নতুন করে জীবন শুরু হলো। স্কুলে আবার যেতে শুরু করেছি।

প্রাইমারি স্কুল শেষে হাইস্কুল এবং পরে কলেজ তাও বাড়ি ছেড়ে ঢাকায়। বেশ মনে পড়ত ছোট ভাই-বোন সহ বাবা-মাকে। দেশের সবকিছু ভালোই লাগতো তারপরও কেন যেন বিদেশে যেতে হবে পড়াশুনা করতে, মনের মধ্যে বেশ চেপে বসলো ইচ্ছেটা। শেষে দেশ ছেড়ে পাড়ি দিলাম বিদেশ। তখন চিঠির মাধ্যমে দেশের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় হতো। লেখাপড়া শেষে চাকরি, পরে বিয়েসাদি সবই হলো। ভাই বোন সবাই বলতে গেলে প্রতিষ্ঠিত। বাবা-মাকে প্রতি বছর সুইডেনে আসা যাওয়ার ব্যবস্থা করা হলো। গ্রীষ্মকালে এখানে থাকবেন আর শীতকালে থাকবেন বাংলাদেশে। আমাদের সময় ভালোই কেটেছে তখন। বাবা-মা ইউরোপ, আমেরিকা ঘুরেছেন বেশ। দুজনকে এক সঙ্গে রাখা এবং থাকা ছিল মূল উদ্দেশ্য।

সুইডেন যদিও তাদের সবসময় ভালো লাগতো না তবুও বাংলাদেশের মতো করে রাখতে চেষ্টা করেছি। যেমন বাংলা খাবার থেকে শুরু করে বাংলা টিভি চ্যানেলের ব্যবস্থা ছিল তাদের জন্য। প্রতিনিয়ত টিভিতে আজানের ধ্বনি শোনা, অনেক বিষয়ে জানা ও শেখা তাঁদের জীবনের নতুন রুটিন হয়ে উঠলো। মনে হতো ছোটবেলা যেমন উনারা আমাদের দায়ভার নিয়েছিলেন এখন আমরা নিয়েছি তাদের।

মাঝে মধ্যে ঝগড়া ঝাটিও লাগতো। তখন ভয় দেখাতো যে তারা দেশে চলে যাবে। আমি চেষ্টা করেছি সাপ্তাহিক ছুটির দিনে তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে। একটি মজার ব্যাপার তা হলো শুক্রবার হলেই বাবা-মা ফোন করতেন কখন বাসায় ফিরবো। সাধারণত কাজ শেষে ফিরতে আটটা বেজে যেতো। বাবার কাজ ছিল সাতটা ত্রিশ বাজলেই ফোন করা এবং জানা আর কতক্ষণ লাগতে পারে ফিরতে। কারণ সব রান্না শেষে ভাত রান্না হবে, যেন আমি এসেই গরম ভাত খেতে পারি। বহুবার বলেছি মাইক্রো ওয়েব ওভেন রয়েছে তা ছাড়া ইলেক্ট্রিক চুলা ইত্যাদি থাকতেও তাঁরা সেই ছোটবেলায় যা করতেন যেমন অপেক্ষা করতেন কখন বাড়ি আসবো।

আমি ঠান্ডা ভাত কখনও খেতাম না। তাই সে অভ্যাস তারা ভুলেননি কখনও। সব কথা লিখতে গেলে হবে না শেষ সারাদিনেও। তাই লিখছি তাদের শেষের দিনগুলির কিছু কথা। বাবা-মা হজ্ব যাওয়ার নিয়ত করলেন এবং সিদ্ধান্ত নিলেন যে সুইডেন থেকে নয়, বাংলাদেশ থেকে সেখানে যাবেন। বললাম ঠিক আছে। ওনারা দেশে গিয়ে হজ্বের উদ্দেশ্য রওনা হলেন। বাবা বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন মক্কাশরীফে। কি করা? সুইডেন থেকে সৌদিতে ফোন করে দুইজন বাংলাদেশি হাফেজিকে ঠিক করলাম ওনাদের হজ্ব পালনে যেন সাহায্য করে। হাফেজিরা প্রতিদিন আমাকে জানাতো ওনারা কখন কোথায় কি করছেন।

বাবা-মা ফোনে জানাতেন তাদের প্রতিটি সময়ের কথা। আমার অনুভুতিতে মনে হতো আমি তাদের সঙ্গেই আছি। হজ্ব করে তারা ফিরলেন প্রথমে বাংলাদেশে, পরে সুইডেনে।

সুইডেনে এসে হজ্বের পুরো বর্ণনা জানালেন। আমার মা মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে খুবই আগ্রহী ছিলেন। তার উৎসাহ আর অনুপ্রেরণায় গ্রামে একটি মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং সেটা তিনি দেখে গিয়েছেন।

সে কলেজে এখন হাজারও মেয়ে পড়াশুনা করছে। ২০০৫ সালের জুলাই মাস, সন্ধ্যায় মাকে ফোন করেছি স্টকহোম থেকে। তখন বাবা-মা লিনসোপিংএ থাকেন। স্টকহোম থেকে সিনসোপিংএর দুরত্ব ২৫০কি.মি।

কথা শেষ করলেন। এশার নামাজের আজান পড়েছে টিভিতে। তাই নামাজে দাড়াবেন তারা। মাঝরাতে বাবা ফোন করে বল্লেন ‘বাবা তোমার মা রাতে নামাজ শেষে মাথা ঘুরছে বলে বিছানায় শুতে যায়, পরে কথায় জড়োতা দেখে ইমারজেন্সিতে ফোন করেছি’।

বল্লাম ভালো করেছেন, আমি ফোন করলাম হাসপাতালে এবং আমার ছোট ভাই এবং তার পরিবার একই শহরে থাকে তারাও সেখানে রয়েছে। যাইহোক হাসপাতালে ভর্তি করা হলো এবং জানা গেল মা স্ট্রোক করেছেন।

পুরো বাম দিকে স্ট্রোকের কারণে অবশ হয়েছে তাই কথা বলার সমস্যা দেখা দিয়েছে। মার চিকিৎসায় চেষ্টার ত্রুটি হয়নি তবুও বয়স এবং শারিরীক অসুস্থতার কারণে মার জীবনাবসান হয় ২০০৯ সালে এবং কবর দেয়া হয় সুইডেনে। মার অনুপস্থিতিতে বাবা ভীষণ ভাবে ভেঙ্গে পড়েন। তার দায়ভার ছিল প্রথমে যেমন সবার ওপর, পরে তা হয়েছিল শুধু তাঁর সহধর্মীনী এবং জীবনসঙ্গী আমার মার ওপর। কারণ ততদিনে আমরা সবাই প্রতিষ্ঠিত।

মার জানাযা এবং দাফন শেষ করে বাবা বললেন তিনি দেশে যাবেন এবং চল্লিশা করবেন বাংলাদেশে। আমাদের বড়ভাই বাবাকে নিয়ে বাংলাদেশে গেলেন। কিছুদিন না যেতেই ঠিক একইভাবে বাবারও রাতে স্ট্রোক হয়।

যতদূর সম্ভব চেষ্টা করা হয় তাকে সুস্থ করতে কিন্তু তা আর হয়নি। নিয়তির টানে তাকেও বিদায় দিতে হয়। বাবার কবর দেয়া হয়েছে বাড়ির মসজিদের সামনে আর মা রয়েছেন সুইডেনে। জন্মের পর মৃত্যু হবেই তা আমরা জানি তবে কখন বা কোথায় তা জানিনে।

সুইডেনের সঙ্গে আমাদের একটি ভালোবাসার সেতু তৈরি হয়েছে। কারণ আমাদের মা রয়েছেন এখানে বাবা রয়েছেন বাংলাদেশে। বাবা-মার মতো করে কেও বলবে না আর কখন ফিরবি বাবা অফিস থেকে? তাদের সঙ্গে আর কোন দিন দেখা হবে না।

পাঠক, জানি ভাবনাতে এ মূহর্তে আমি ফিরিয়ে এনেছি আমাদের সবার বাবা-মাকে। মনে রাখতে হবে আমরা যেন এমন কিছু না করি তাদের সঙ্গে যা পরবর্তীতে অনুশোচনা হয় বিবেকের কাছে। বাবা-মার প্রতি আমাদের দায়িত্ব এবং কর্তব্য যেন নিখাধ ভালবাসার হয়। আজ স্মৃতির পাতা থেকে হৃদয়ের কিছু কথা মনে পড়ে গেল তাই এ লেখা।