লাশের মিছিল গোটা দেশকে করেছে শোকার্ত

  এম আর ফারজানা, নিউজার্সি থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১২:১৪ | অনলাইন সংস্করণ

লাশের মিছিল

বেঁচে থাকার মত সুন্দর আর কিছু নেই। একজন মানুষ পঙ্গু হোক, অন্ধ হোক, বোবা হোক তবুও সে বেঁচে থাকতে চায়। আমরা জানি আমাদের একদিন মৃত্যু হবে।

কেউ সেটা ঠেকাতে পারবে না। কিন্তু অস্বাভাবিক মৃত্যু আমরা কেউ চাই না। তবুও ঘটে। পুরান ঢাকার অগ্নিকান্ডের ঘটনায় বাংলাদেশ এখন শোকের সাগরে ডুবে আছে। আপনজনের আহাজারীতে বাতাস ভারী হয়ে গেছে।

পুরান ঢাকার চকবাজার যেন এক মৃত্যুপুরী উপত্যকা। এত এত মৃত্যু !! লাশের সারি সারি লাইন। এর আগেও ঘটেছিল এরকম ভয়াবহ দুর্ঘটনা। ২০১০ সালে মাত্র ৯ বছর আগে নিমতলীতে একি ধরনের অগ্নিকান্ডে নিহত হয়েছিল প্রায় ১১৯ জন। সেদিনের কথা এখনো ভুলিনি। আগুনের লেলিহান শিখা গ্রাস করেছিল জীবন্ত মানুষগুলোকে।

নিমতলীর ঘটনার পর পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যালের কারখানা, প্লাস্টিকের গুদাম, পারফিউমের কারখানা সরানো নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এমন কি সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে আমরা কিছু শিক্ষা নেইনি, সচেতন হয়নি। বরং কিছুদিন পর ভুলে গিয়ে সেই আগের মতই চলেছি। ফলাফল আবারও লাশের মিছিল। এ ঘটনা এত দ্রুত ঘটেছে যে দৌড়ে কেউ নিরাপদে দূরত্বে যাওয়ার সময় পায়নি।

চুড়িহাট্টার পাঁচরাস্তার মোড়ে পিকআপ ভ্যানের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে সেখানকার বৈদ্যুতিক ছোট্ট ট্রান্সফরমারের বিস্ফোরণ ঘটায়। আর সেখান থেকেই পাশের ভবনে আগুন ধরে চারদিক দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। চার বন্ধু ছিল একসঙ্গে, একজন অন্তসত্তা স্ত্রী’ নীচে নামতে পারেনি বলে তার স্বামীও ছিল সঙ্গে। এক বাবা ছেলের জন্য খাবার কিনতে গিয়ে ফিরে এসে দেখে আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে তার ছেলে সেই আগুনের মধ্যে। রিক্সায়, গাড়ীতে, দোকানে যে যেভাবে ছিল সব যেন ক্ষণিকের মধ্যে শেষ হয়ে গেল।

কি যন্ত্রণা, কি কষ্ট সেটা সেই ভাবলে হাত পা অবশ হয়ে আসে। আর আগুন গ্রাস করবেই বা না কেন ? আগুন দ্রুত ছড়ানোর সব উপাদানই তো ছিল সেখানে। ওয়াহিদ ম্যানশনের মালিক নীচতলা, দোতালায় প্ল্যাস্টিক পণ্য আর পারফিউম গোডাউন হিসেবে ভাড়া দিয়েছিলেন।

সবাই খামখেয়ালী করেই নিজের ইচ্ছামত চলছে। কারো যেন কোন দায়বদ্ধতা নেই। আর নিহত হলেই আফসোস করে। মেয়র সাহেবও বলছেন, চেষ্টা করছেন, কি চেষ্টা করছেন? এ ক্যামিক্যাল গোডাউন এখানে তো থাকার কথা না। নোটিস দিয়েছেন? ফাইন করেছেন? জেলে দিয়েছেন? না কিছুই করেননি নিমতলীর ঘটনার পর। অনুরোধ নাকি করেছেন। আপনার অনুরোধকে এরা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ব্যবসা ঠিকি করছে যার ফলে এত প্রাণহানি।

অব্যস্থাপনা, অপরিকল্পিত নগরায়ন, অসেচতনতা, আইনের অকার্যকারিতা সব মিলিয়েই ৬৭ জন প্রাণ হারিয়ে গেল। জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ী সমাজ নেতাসহ প্রশাসনের দায়িত্বশীলরা এর দায় কেউ এড়াতে পারেন না। মাত্র অল্প কিছুদিন আগে আগুন লেগেছিল রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। সেদিন ১২০০ রোগীকে দ্রুততম সময়ে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া গেছে। নিরাপদে সরাতে পেরেছিল কারন হাসপাতালের চারপাশ প্রশস্ত ছিল।

ডাক্তার, নার্স আন্তরিকভাবে কাজ করেছিল। গতকালও চকবাজারে ফায়ারসার্ভিসের লোকেরা আগুন নেভানোর জন্য যথেষ্ট আন্তরিক ছিল।

কিন্তু রাস্তা এত সরু ছিল যে তারা সময় মত তাদের কাজ করতে পারেনি। তবুও তাদের চেষ্টার কোন ক্রটি ছিল না। আগুন নেভানোর পর একেকটা লাশ খুঁজে বের করেছে আর কেঁদেছেন চোখের পানি আড়াল করে। সরকার হয়তো অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করবে, পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াবে।

কিন্তু এটা তো কোন সমাধান না। সরকারের কাছে দাবী জানাই ক্যামিক্যাল গোডাউনগুলো সরিয়ে নেয়া হোক যত দ্রুতসম্ভব। কোন অনুরোধ নয় একেবারে নোটিশ দেয়া হোক। কেউ যদি অমান্য করতে চায় তাকে আইনের আওতায় আনা হোক, কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করেন। পুরান ঢাকায় একেকটা বাড়ী যেন একেকটা মৃত্যুর ফাঁদ।

কোন বৈদ্যুতিক তার যেন রাস্তায় ঝুলে না থাকে। সেটাও আরেকটা সমস্যা। দেখাযাবে কোন দুর্ঘটনা ঘটলে আমরা আফসোস করবো, কিন্তু ঘটনা যাতে না ঘটে সেই পরিবেশ তৈরি করা সবার দায়িত্ব। যে প্রভাতে একুশ এসেছিল রক্ত রাঙিয়ে সে প্রভাতে এমন নির্মম ইতিহাস হবে আমরা কি ভেবেছিলাম। কিংবা যারা হারিয়ে গেল তারাও কি ভেবেছিল যে শহীদ মিনারে তাদের যাওয়া হবে না কোনদিন। ফেরা হবে না আপনজনের কাছে। একজন মা যখন তার সন্তানের লাশ না, এক টুকরো পুড়ে যাওয়া মাংসের দলা হলেও চলবে বলছিল তখন যেন কেঁদে উঠেছিল সকল মায়ের বুক।

জমজ বাচ্চাগুলো অপলকে তাকিয়ে আপনজনকে খুঁজছে। ভাই হারানোর শোকে অন্যভাই পাগল প্রায়। বাবা যেন ছেলে হারিয়ে স্তব্ধ। কি নির্মম সেই দৃশ্য, যেন কেঁদে উঠেছে দেশের মাটি। যেন বলছে আর কত মৃত্যু হলে বন্ধ হবে এসব। লাশের মিছিল দেখে গোটা দেশ আজ শোকার্ত।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : চকবাজার আগুনে মৃত্যুর মিছিল

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×