নিজেকে বিক্রি করতে শেখাই হলো আসল শিক্ষা

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১২:০১ | অনলাইন সংস্করণ

শিক্ষা

বৃক্ষ তোমার নাম কী? ফলে পরিচয়। শিক্ষা বা জ্ঞানের আলো তেমনই একটি 'ফল' বা বিষয় যার মাধ্যমে ব্যক্তি, সমাজ, দেশ, এমনকি মহাদেশ আলোকিত হয়ে ওঠে, তার ভালো-মন্দ, বিশেষ গুণাগুণ আর বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে। ফল যেমন না খেলে তার স্বাদ সম্পর্কে জানা যায় না, তেমনি বিদ্বান ব্যক্তির জ্ঞানের আলোয় কুসংস্কারের অন্ধকার দূর করা না গেলে সেই শিক্ষার মূল্য নেই।

মানুষ হিসেবে আমাদের পরিচয়কেও ফলবান বৃক্ষের মতো করতে হলে দরকার সঠিক সময়ে সঠিক কাজ। সবার আগে দরকার সুশিক্ষা, যে শিক্ষা আমাদের মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে, যে শিক্ষা আমাদের ভাল ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য গড়তে শেখাবে, যে শিক্ষা আমাদের প্রয়োজন মেটাতেও রাখবে অনন্য ভূমিকা।

আজ এ একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে টিকে থাকতে চাইলে সেই সুশিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান সময়ে সুশিক্ষার এই বিভিন্ন ধরণের উপযোগিতার মাঝে যুক্ত হয়েছে, বিশ্ববাজারে নিজেদের বিক্রয় করার সক্ষমতা তৈরি করা।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথাই ধরি। তিনি যদি তাঁর সাহিত্যকর্ম বিশ্বদরবারে সঠিকভাবে তুলে ধরতে না পারতেন, তবে হয়তো সাহিত্যে এখনো নোবেলের জন্য আমাদের অপেক্ষায় থাকতে হতো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু লেখালেখি করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি তাঁর লেখাকে ইংরেজদের সাহায্যে অনুবাদ করিয়েছিলেন।

পরবর্তীতে গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ করে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন এবং বিশ্বদরবারে তাঁকে বিশ্বকবি হিসেবে বিক্রি করেন। অর্থাৎ তিনি তার জ্ঞানের আলোয় ভারতবর্ষের কুসংস্কার দূর করার যে চেষ্টা ছিল সেটা প্রতিষ্ঠা করেন। আধুনিক ব্যবসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলতে গেলে, তিনি তার রাবিন্দ্রিক কাব্যচর্চাকে ঠিক মতো ‘বিক্রি’ (প্রতিষ্ঠা) করতে পেরেছিলেন। নিজেকে সর্বোত্তম উপায়ে তুলে ধরতে পেরেছিলেন। আর আমরা পেয়েছিলাম একজন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে।

মানুষ হিসেবে আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, আমরা প্রত্যেকেই আলাদা; স্বকীয় ব্যক্তিত্বে কিংবা বৈশিষ্ট্যে অসাধারণ। একটু সাহায্য ও সহানুভূতি পেলে আমরা আমাদের মেধার প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম। তবে তার জন্য দরকার ব্যক্তির আগ্রহ এবং চেষ্টা। এখন যদি সেই আগ্রহ এবং চেষ্টা না থাকে, তাহলে কিছু করা সম্ভব হবে না। আমরা নিজেরাও কিন্তু প্রতিদিন আমাদেরকে বিক্রি করতে চেষ্টা করছি, জ্ঞাত কিংবা অজ্ঞাতসারে।

বিক্রি করতে গিয়ে যেন ভারসাম্য হারিয়ে না ফেলি সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আমাদের শিক্ষার আলো যদি বিবেককে সঠিক পথে পরিচালিত করতে না পারে, তখন বিবেক ভালো-মন্দের পার্থক্য হারিয়ে ফেলবে। হারিয়ে ফেলবে তার ভারসাম্যতা। তখন মানব জাতি দানবে পরিণত হবে। কারণ জ্ঞানের প্রদীপ শিখা যখন আলো না ছড়িয়ে কালি বেশি ছড়াবে, তখন তা সুশিক্ষা না হয়ে হবে কুশিক্ষা।

অতএব নিজেদেরকে বিক্রি করতে গিয়ে আমরা যেন পথভ্রষ্ট না হই সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। এখন প্রশ্ন কিভাবে নিজেকে বিক্রি করা সম্ভব? আমার জীবনের অভিজ্ঞতা আর ভাবনা থেকে কিছু তথ্য তুলে ধরবো এই বেচাকেনার ওপর।

তার আগে আরও একজন গুণী লোকের কিছু মূল্যবান তথ্য জেনে নেই। ওয়ারেন এডওয়ার্ড বাফেট, যাকে আমরা ওয়ারেন বাফেট নামে চিনি, তিনি একজন মার্কিন ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং জনহিতৈষী ব্যক্তি। তিনি শেয়ার বাজারের মাধ্যমে তার ভাগ্য গড়েছেন।

জীবনে সফলতা পেতে এবং কেনাবেচা করতে ওয়ারেন বাফেট এর অসাধারণ কিছু পরামর্শ রয়েছে। যেমন, ‘সততা খুবই দামি একটি উপহার, তা কখনোই সস্তা লোকের নিকট থেকে আশা করা ঠিক হবে না। কখনোই সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখা উচিত নয়। পা পানিতে ডুবিয়ে কখনোই নদীর গভীরতা মাপা ঠিক নয়। যা প্রয়োজন নেই তা ক্রয় করলে শীঘ্রই যা প্রয়োজন তা বিক্রি করতে হবে। কখনোই আয়ের একমাত্র উৎসের উপর নির্ভর করা ঠিক হবে না। বিনিয়োগের মাধ্যমে আরেকটি উৎস তৈরি করা ভালো এবং খরচের পর যা অবশিষ্ট থাকে তা সঞ্চয় না করে বরং সঞ্চয়ের পর যা অবশিষ্ট থাকে তা খরচ করা শিখো’।

এগুলো হচ্ছে ওয়ারেন বাফেটের জীবন থেকে নেয়া শিক্ষা। শেয়ার বাজার এমন একটি ব্যবসা যেখানে নানা মত রয়েছে। মূলত বিশ্বের সব কিছুই শেয়ার বাজারে বেচাকেনা হচ্ছে। যা ভালো তার চাহিদা যেমন বেশি তেমন বেচাকেনাও হচ্ছে ভালো।

শিক্ষাকেও ঠিক তেমনি করে উন্নতমানের এবং প্রয়োজন বা চাহিদাভিত্তিক করতে হবে যাতে করে তা বিক্রি করা যায়। আমরা একজন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর একজন ওয়ারেন বাফেটকে জানলাম যারা নিজেদেরকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সফলভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন।

অন্যের জীবনের সফলতার গল্প জানতে হবে, তাঁদের কাছ থেকে জীবনের বিভিন্ন বাঁকের জন্য শিক্ষাগ্রহণ করার চেষ্টা থাকতে হবে। তবে সফলতা এসে ধরা দেবে। আজ স্টোকহোমের KTH (রয়েল ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি) এ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রফেসর ড. মান্নান মৃধার সঙ্গে লাঞ্চ মিটিংএ নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

যেহেতু আমি বাংলাদেশের শিক্ষার ওপর লিখি তাই কথা হতেই তিনি বললেন দেশে ভুরিভুরি বেকার ছেলেমেয়ে রয়েছে যাদের কর্মসংস্থানের কোনো ব্যবস্থা নেই। অথচ বিশ্বে অনেক দেশ কর্মীর অভাবে শিল্প, কলকারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে। টিভিতে খবর দেখার সময় শেয়ার বাজারের কিছু খবর নজরে পড়ে গেল। তখন মনে পড়ে গেল প্রফেসর ড. মান্নান মৃধার কথা। মনে পড়ে গেল বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কথা। বাংলাদেশের জনসংখ্যার কথা, বেকারত্বের কথা। একই সঙ্গে ভাবনাতে এলো বাংলাদেশ কী করতে পারে এমন একটি সময়ে যখন পৃথিবীর কিছু দেশ খুঁজছে দক্ষকর্মী।

অথচ রয়েছে আমাদের দেশে লাখ লাখ বেকার যুবক। তাদের হয়তো সেই যোগ্যতা নেই, যা এই পৃথিবী খুঁজছে। তাই বলে কি সম্ভব নয় প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতা অর্জন করা? অবশ্যই তা সম্ভব। বর্তমানে চেক রিপাবলিক তাঁদের অটো মোবাইল বা মোটরগাড়ি প্রস্তুতকারী কারখানাগুলোতে জনবল নিয়োগের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ কর্মীর অভাবে তাঁদের কারখানাগুলো অচল হবার পথে।

চেক রিপাবলিক সেন্ট্রাল ইউরোপের একটি দেশ। এর চারপাশের দেশগুলি হলো: অস্ট্রিয়া, জার্মানি, পোল্যান্ড এবং স্লোভাকিয়া। দেশটি ২০০৪ সালে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অধিভুক্ত হয় এবং ২০০৭ সালে সেনজেন স্টেটে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করে। বাংলাদেশের উচিত সারা বিশ্বের এই সুযোগগুলো কাজে লাগানো। সরকার চেক রিপাবলিকের সঙ্গে আলোচনা করে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির উদ্যোগ নিতে পারে।

দেশের বেকার শিক্ষার্থীদের চাহিদাভিত্তিক এবং কাজের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে এ সুযোগ তৈরি করা অসম্ভব কোনো বিষয় নয়। এতে দুই দেশই লাভবান হবে। এর জন্য অবশ্যই সরকারকে সুদূরপ্রসারী মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ জনশক্তি রপ্তানি ব্যুরোকে ঢেলে সাজাতে হবে। বহির্বিশ্বের সঙ্গে এ ব্যাপারে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। যারা সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন, তাঁদের একটু প্রচেষ্টা এ সেক্টরে অনেক গুণগত পরিবর্তন আনতে সক্ষম। সরকারের কাজের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দরকার তাঁদের নিজেদের বিক্রয় করতে শেখা-শিক্ষা দিয়ে, যোগ্যতা দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে।

আর এটি সম্ভব কেবল সুশিক্ষা এবং চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। আমি আমাকে বিক্রি করেছিলাম আমার মতো করে ১৯৮৫ সালে, যেদিন বিদেশে (সুইডেনে) পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছিলাম। তখন থেকেই বুঝতে পেরেছি, পৃথিবী হলো এক বিশাল বাজার, যেখানে প্রয়োজন অনুসারে চলছে ‘ক্রয়’ এবং ‘বিক্রয়’। সেই থেকে লেগে রয়েছি এ বাজারের লেনদেনের সঙ্গে। দরকারে এই ‘ক্রয়’ এবং ‘বিক্রয়’ এর সঙ্গে সুশিক্ষার সমন্বয় ঘটিয়ে নিজেকে বিক্রয় করতে শেখাই হোক আগামী প্রজন্মের অন্যতম লক্ষ্য।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×