সুইডেনের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে আইসক্রিম কেনার স্মৃতি

সুইডেন হারাল গণতন্ত্রের বিশ্বস্ততাকে

প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১২:৫৫ | অনলাইন সংস্করণ

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে

স্টকহোমে রাজার বাগান বাড়িতে ( কুংসট্রেডগোর্ডেনে) দিনের কাজ সেরে জুলাই মাসের এক বিকেলে ঘুরছি আর দেখছি। সবে এসেছি বাংলাদেশ থেকে। এসেই সামার জব (গ্রীষ্মকালীন চাকরি) করতে শুরু করেছি।

কাজ হোটেলের বিছানা বানানো। তিন মাস সামার জব শেষে লিনসোপিং যাব। মূলত এসেছি লিনসোপিং বিশ্ববিদ্যালয়ে গেস্ট স্টুডেন্ট হিসেবে পড়তে।

 

১৫ আগস্ট প্রথম ক্লাস শুরু হবে সুইডিশ ভাষার ওপর। এক বছরের মধ্যে ভাষা শেখা শেষ করে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর পড়ালেখা শুরু করতে হবে।

দেশ থেকে কোনো টাকা পয়সা না নিয়েই এসেছি। ভাগ্যিস বড় ভাই ছিলেন তাই ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই তিনি আমার সামার জবের ব্যবস্থা করেছেন।

 

১৯৮৫ সালের কথা। সচরাচর প্রথম বছর সবাইকে বাবা-মায়ের টাকায় পড়তে হয়। হোটেল এবং রেস্টুরেন্টে কাজ করে তিন মাসে যে টাকা জমা হবে তাতে পুরো বছরের পড়াশোনার খরচ হয়ে যাবে। মাঝেমধ্যে বিকেলে ছুটি হত, তাই ঘুরে ঘুরে স্টকহোমকে দেখার মধ্যে ছিল এক অন্যরকম আনন্দ। আজ এসেছি রাজার বাগান বাড়ি ঘুরতে।

চারপাশে ছোট ছোট দোকান যেখানে রয়েছে বিভিন্ন ধরণের জিনিসপত্র থেকে শুরু করে খাবার এবং আইসক্রিম বিক্রির ব্যবস্থা। সামারে সুইডেনে আইসক্রিমের মেলা বসে। সুইডিশ আইসক্রিম খেতে এমনিতেই মজা, তারপর সুন্দর আবহাওয়া-মনে সৃষ্টি হয় এক দারুণ অনুভূতি। সবাই বিশাল লম্বা লাইনে দাঁড়িয়েছে আইসক্রিম কেনার জন্য।

একটি বিষয় সুইডেন এসেই লক্ষ্য করেছি। তা হলো এদেশের লোকজন বেশ সুশৃংখল, সবাই লাইনে দাঁড়াতে পছন্দ করে। এদেদেশেও লাইন অ্যান্ড ফাইন এবং হায়ার অ্যান্ড ফায়ার আমেরিকানদের মত প্রচলিত। আজ লাইন এতবড় যে আমার চান্স আসতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। তাতে মনে হচ্ছে আইসক্রিম আর খাওয়াই হবে না।

 

এদিকে আজ আমার ছুটি। তাই ঘুরবো এবং নতুন কিছু দেখব বলে পরিকল্পনা করেছি। কী করা! মাথায় চাপলো এক দুষ্টবুদ্ধি। হঠাৎ লাইনের মাঝখানে ঢুকে পড়লাম। পেছনে এক ভদ্রলোক বিরক্ত হয়ে সুইডিশ ভাষায় গড়গড় করে কী যেন বলতে লাগলো। আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। না শোনার ভান করে দাঁড়িয়েই রইলাম।

পরে ভদ্রলোক ইংরেজিতে বললো, হ্যালো তুমি হুট করে ঢুকে পড়লে লাইনে তাও আমাদের দুজনের মাঝখানে! তুমি নিশ্চয়ই টুরিস্ট এবং ইন্ডিয়া থেকে এসেছ।

 

আমি উত্তরে বললাম না, এসেছি বাংলাদেশ থেকে। ভদ্রলোক বললেন বাংলাদেশ অনেক জনবহুল দেশ, লাইনে ঢুকে পড়া কঠিন কিছু না। কিন্তু আমাদের জনসংখ্যা মাত্র আট মিলিয়ন (৮০ লাখ), এখানে সবার নজরে পড়ে যখন কেউ বেআইনি কিছু করে।বললাম, দু:খিত আমার তাড়া আছে।

এছাড়া তোমাদের নিয়মকানুন এখনও শেখা হয়নি। তোমাদের সমস্যা হলে বল লাইন ছেড়ে চলে যাব। ভদ্রলোক এবং তার সঙ্গিনী কী সব বলাবলি করছেন বুঝতে পারলাম না।

 

আমি বললাম, সুইডিস আইসক্রিম খাবার ইচ্ছে ছিল তা আর হবে না লাইন ছেড়ে গেলে। এ কথা শুনে ভদ্রমহিলা বললেন, ঠিক আছে তুমি থাক আমাদের সঙ্গে। আমি বেশ খুশির সঙ্গে ধন্যবাদ দিলাম।

লাইনে দাঁড়িয়ে আছি কিছু করার নেই তাই মাঝেমধ্যে এটাসেটা জিজ্ঞেস করছি এবং তাঁরা বেশ আনন্দের সঙ্গে উত্তর দিচ্ছেন। যদিও শুনেছি সুইডিশরা কম কথা বলে তবুও কোনো এক পর্যায়ে তাঁরা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কতদিন থাকব?

 

বললাম, আপনাদের দেশে পড়াশোনা করতে এসেছি। বললেন তা সুইডেনে কেন এসেছ? উত্তরে বললাম আপনাদের দেশ থেকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়, তারপর সুইডিস অ্যাবা (ABBA) মিউজিক গ্রুপ এবং বিয়ন বোরি টেনিস খেলোয়াড় এসব শুনেছি ছোটবেলায়।

তাই আপনাদের দেশ আমার পছন্দের মধ্যে ছিল, এখন সুযোগ হয়েছে চলে এসেছি। ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন আর কী জানো আমাদের দেশ সম্পর্কে? বোফর্স অস্ত্র কোম্পানি, সুন্দরী রমণী এবং সুইডিশ রাজার কথা শুনেছি। আরও শুনেছি আপনাদের প্রধানমন্ত্রী উলফ পালমের কথা।

 

তিনি জানতে চাইলেন উলফ পালমের সম্পর্কে আমি কী জানি। বললাম ভিয়েতনাম যুদ্ধে তিনি আমেরিকার বিরুদ্ধে সোচ্ছার ছিলেন।সাহস আছে আপনাদের প্রধানমন্ত্রীর।

 

ইতিমধ্যে লাইন ছোট হয়ে এসেছে এবার আমাদের আইসক্রিম কেনার পালা। আমি আমার অর্ডার দিলাম। তাঁরা দুজন কিছুতেই আমাকে মূল্য পরিশোধ করতে দিলেন না। আমি তো অবাক! কয়েকবার ধন্যবাদ দিলাম।

বিদায় নেয়ার কিছুক্ষণ আগে হাত বাড়িয়ে দিলেন। হ্যান্ডশেকের সঙ্গে বলতে লাগলেন, আশা করি তুমি আমাদের দেশ, সংস্কৃতি,(হেসে বললেন) সুইডিশ রমণী এবং শিক্ষা প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা পছন্দ করবে যতদিন থাকবে আমাদের দেশে।

 

আমার নাম উলফ পালমে। সে আমার স্ত্রী লিসবেত পালমে।
শুনে আমি শুধু অবাক নয়, মুহূর্তের মধ্যে হতভম্ব হয়ে গেলাম! ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছি তাঁর মুখের দিকে। কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছিনে ইনিই সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী!

 

দেখেছি হয়তো টিভিতে কিন্তু কিভাবে বুঝবো সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী লাইনে আইসক্রিম কেনার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন তাও সবার সঙ্গে! যাই হোক বললাম তাঁকে, আমার স্বপ্নেও ভাবতে সাহস হবে না যে একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী লাইনে দাঁড়িয়ে আইসক্রিম কিনতে পারেন।

 

কারণ আমাদের দেশে জীবনে কখনও এমনটি হয়নি বা শুনিনি যে একজন প্রধানমন্ত্রী আইসক্রিম বা অন্যকিছু কেনার জন্য লাইনে দাঁড়াবে। তারপর নিরাপত্তার ব্যাপার তো আছেই। উত্তরে তিনি আমাকে বলেছিলেন ‘আমরা জনগণের প্রতিনিধি এবং এখানে সবাই সমান। সুইডেন গণতন্ত্রের দেশ। শুধু রাজাকে আমরা সবাই একটু অন্যরকম দেখি।

কথা শেষ করে বিদায় নিয়ে আমি হোটেলে ফিরে এলাম। জীবনে এমন একটি মুহুর্ত আসবে তা ভাবতে পারিনি, কিন্তু তা এসেছিল সেদিন। সামার জব শেষে লিনসোপিংএ এসেছি। লিনসোপিং স্টকহোম থেকে দুই ঘন্টার জার্নি। নতুন শহর নতুন পরিবেশ। নিজেকে অ্যাডজাস্ট করতে, নতুন একটি ভাষায় কথা বলা শিখতে, এদের খাবারের সঙ্গে পরিচিত হতে বেশ ভালো লাগছে। লেখাপড়ার সঙ্গেসঙ্গে সময়ও বেশ ভালো কাটছে। ইতিমধ্যে মোটামুটি সুইডিশে কথা বলা শিখেছি।

 

একদিন আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে সবাইকে প্রধানমন্ত্রী পালমের সঙ্গে পরিচয়ের ঘটনাটি বললাম।

আশ্চর্যের বিষয় যে সবাই আমার বর্ণনায় স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখালো। তাদের কাছে বিষয়টি অতি স্বাভাবিক। তাদের প্রধানমন্ত্রী সাধারণ মানুষের মতোই তো চলাফেরা করবে, এতে অবাক হওয়ার কী আছে? তিনি তো ক্রিমিনাল বা ভয়ংকর কেউ নন। তিনি জনগণের প্রতিনিধি। তিনি অবশ্যই আমাদের সঙ্গে আমাদের মতো করেই চলাফেরা করবেন’। আমাকে তারা সুন্দর করে বুঝিয়ে দিল সেদিন গণতন্ত্র কাকে বলে।

সুইডিশ ভাষায় দক্ষতা বাড়ানোর জন্য আমি নিয়মিত সুইডিশ টেলিভিশন দেখি বিশেষ করে সুইডিশ খবরগুলো। সেদিন ছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬ সাল। রাতের খবরে শুনলাম প্রধানমন্ত্রী উলফ পালমে নিহত হয়েছেন সিনেমা শেষে তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে হেঁটে বাড়িতে ফেরার পথে। কে বা কারা তাঁকে হত্যা করে পালিয়ে যায় সেদিন রাতে।

 

খবর শোনার পর আমি সত্যিই মনে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর একাকি চলাফেরা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে কথা হয়।

 

বন্ধু-বান্ধবীরা আমার কথাগুলোকে একটু হাস্যকার ভাবে নিয়েছিল সেদিন যখন বলেছিলাম তাঁর নিরাপত্তার বিষয়ে কিছু কথা। হঠাৎ আজ এ কী হলো? সুইডেন হারালো এক বিশ্বনেতাকে।

হারালো গণতন্ত্রের বিশ্বস্ততাকে। আমি হারালাম আমার প্রিয় মানুষটিকে যাকে আমি গণতন্ত্রের আদর্শ পথচারী বলে মনে করেছিলাম। আজ ২৮ ফেব্রুয়ারি। মনে পড়ে গেল কুংসট্রেডগোর্ডেনে (Kungsträdgården) আইসক্রিম কেনার কথা।

 

মনে পড়ে গেল উলফ এবং লিসবেত পালমের কথা। ৩৩ বছর পেরিয়ে গেছে। এখনও আমরা জানতে পারিনি কে বা কারা তাঁকে খুন করেছে এবং কেন? তবে চলছে তাঁর মৃত্যু রহস্যের উপর তদন্ত আজও। জানি না পৃথিবী জানবে কিনা সে সত্য কোনোদিন!

 

আর আমি জানি না আমার প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ সুইডেনের মতো গণতন্ত্র কোনোদিন পাবে কিনা! পাবে কিনা উলফ পালমের মতো কোনো প্রধানমন্ত্রীকে যিনি দোকানে কেনাকাটা করতে সাধারণ মানুষের সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে যাবেন কোনো দ্বিধা ছাড়াই।