আমি ড্রাগস নিয়ে কাজ করি

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১১:৩৪ | অনলাইন সংস্করণ

ড্রাগস

সামান্য একটি ভুলের কারণে আমেরিকার লসঅ্যাঞ্জেলস এয়ারপোর্টের জেলে প্রায় দুই ঘন্টা থাকতে হয়েছিল আমাকে সেদিন। সুইডেনে ছাত্রবস্থায় একবার ভিসার জন্য আমেরিকান দূতাবাসে আবেদন করেছিলাম ১৯৮৭ সালে।

ফ্লোরিডায় শীতের ছুটিতে ১০ দিনের জন্য বেড়াতে যাবো আমার এক আমেরিকান বান্ধবীর সঙ্গে। স্টকহোমে আমেরিকান দূতাবাসে ইন্টারভিউতে আমার ডাক পড়ল। সব কিছু বললাম যা তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন। কোন এক পর্যায়ে জিজ্ঞেস করলেন যে মেয়েটির সঙ্গে যাবো তার সঙ্গে আমার কি সম্পর্ক এবং কি ভাবে চেনাজানা। বললাম আমরা একসঙ্গে পড়ি। সে খ্রিস্টমাসে তার বাবা- মাকে দেখতে যাবে এবং এক সঙ্গে খ্রিস্টমাস পালন করবে, আমাকেও দাওয়াত করেছে।

বান্ধবীর দাওয়াত সেইসঙ্গে বাংলাদেশের পাসপোর্টে রয়েছে সুইডেনের রেসিডেন্স পারপিট এবং যাওয়া আসার প্লেন টিকিট তারপরও ভিসা হলো না, মনটা খারাপ হয়ে গেল। কারণটা জানতে বেশ ইচ্ছে হয়েছিল, দূতাবাস ব্যাখা দিতে বাধ্য নয় বলে এড়িয়ে গেল। বান্ধবী চলে গেল আর আমি সুইডেনে রয়ে গেলাম। মনে কষ্ট পেয়েছিলাম ভিসা না হবার কারণে। সেদিন থেকে জেদ চেপেছিল যদি কোনদিন আমেরিকাতে যাই তবে ভিসা ছাড়াই যাবো। যে কথা সেই কাজ। সেই কথা সত্যি হয়েছিল ১৯৯৫ সালে। আমার এক সপ্তাহের কোর্স (Preparing for an FDA Pre-Approval Inspection at San Diego, CA). সান ডিয়াগোতে। প্লেনটিকিট সরাসরি সান ডিয়াগোতে না কিনে লসঅ্যাঞ্জেলসে কিনলাম।

আমার ছোট বোন জলি আহমেদ এবং তার স্বামী থাকে লসঅ্যাঞ্জেলেসে। আমার স্ত্রী মারিয়া মেটার্নিটি লিভে আছে ছেলে জনাথানকে নিয়ে বাড়িতে। মারিয়াকে বললাম ‘তোমরাও চল থাকবে জলিদের সঙ্গে লসঅ্যাঞ্জেলসে, আমার কোর্স শেষে আর কয়েকদিন একসঙ্গে বেড়িয়ে সুইডেন ফিরব’। ও যেতে রাজি হলো। কিছু গিফট কেনাকাটা করলাম জলিদের জন্য এবং এক ধরণের শক্ত রুটি জনাথানের জন্য। কারণ জনাথানের দাঁত উঠতে শুরু করেছে তাই সে শক্ত জিনিস চিবাতে পছন্দ করে। ব্যস সবাই মিলে রওনা দিলাম আমেরিকার উদ্দেশ্যে। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজে করে স্টকহোম টু লন্ডন হিথ্রো পরে হিথ্রো টু লসঅ্যঞ্জেলসে। রওনা দিয়েছি দিনে এবং দিনে এসে ল্যান্ড করলাম বটে তবে পথে কখন রাত শেষে দিন হয়েছে তা টের পেলাম না সময়ের ব্যবধানের কারণে।

ল্যান্ডিংয়ের কিছু সময় আগে একটি সবুজ রংয়ের ফর্ম দিয়ে গেল বিমান বালা এবং বললো এটা পুরণ করে সঙ্গে নিয়ে যাবেন পরে কাস্টমসে দিতে হবে। বেশ ক্লান্ত সবাই, ইমিগ্রেশনে ধরেছে আমাকে। কেন এসেছি। কোথায় থাকব। কি করব। কতদিন থাকব। সঙ্গে কে কে এসেছে। কি করি, ইত্যাদি ইত্যাদি। সব প্রশ্নের উত্তরে পাশ করে বেকসুর খালাস বলে মনে হলো। পরে আমাদের ল্যাগেজ নিয়ে কাস্টমসের মোকাবেলাতে সব কিছু দেখল এবং সেই সবুজ ফর্ম নিল। জিজ্ঞেস করল কোনো খাবার যেমন শাক-সব্জি, ফল এসব আছে কিনা, বললাম না শুধু বাচ্চার জন্য কিছু ড্রাগস আছে। তুমি কি কর আবারও জিজ্ঞেস করল বললাম আমি ড্রাগসের উপর কাজ করি।

কাস্টমসে আটকে দিল এবং ফোন করতেই তিনজন পুলিশ এসে হাজির। তিনজনকেই দেখে মনে হলো আমেরিকান মেক্সিকান এবং স্প্যানিশ ভাষাতে কথা বলছে তাদের মধ্যে। আমাকে এবং আমার পরিবারকে ভালো মত চেক করতে শুরু করল। ধরা খেলাম যখন তারা ব্যাগের ভিতর শক্ত রুটি এবং কিছু ওষুধ পেল। প্রশ্ন করতে মারিয়া তাদের সঙ্গে স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলতে শুরু করল। মারিয়া বললো যে জনাথানের দাঁত উঠছে তাই সে যখন বিরক্ত বোধ করে শক্ত রুটি চিবালে আরাম পায়।

সাদা ইউরোপিয়ান মেয়ে স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলায় তারা বেশ অবাক হয়েছে। পুলিশ বিষয়টি যুক্তিসম্মত বলে মনে করল। আমার ব্যাগে রয়েছে ছোট্ট একটি বোতলে কিছু ঝাল মরিচের গুড়া। সুইডেনে তখন ঝাল মরিচ পাওয়া যায় না তাই বাবা-মা এনেছিলেন বাংলাদেশ থেকে। জলি বিষয়টি জানত। জলিকে আসার আগে জিজ্ঞেস করেছিলাম তার জন্য কিছু আনতে হবে কিনা সুইডেন থেকে। সে বলেছিল একটু মরিচের গুড়া যেন নিয়ে আসি।

এবার পুলিশ জিজ্ঞেস করল মরিচের গুড়োর ব্যাপারটি। বললাম বিষয়টি কিন্তু তাদের বিশ্বাস হচ্ছে না কারণ আমেরিকায় সবই তো পাওয়া যায় তাই সন্দেহ বেশি হয়েছে তাদের। এদিকে আমি বলেছি ড্রাগসের উপর কাজ করি। এবার আরো দুইজন আমেরিকান পুলিশ এসে হাজির।

ভাবছি কি বিপদে পড়লাম! আমেরিকান পুলিশ বোতল খুলে মুখে দিতে আমি বললাম দেখ ভালো হবে না কিন্তু? পরে তোমরা আমার উপর ঝামেলা করলে ঠিক হবে না। তারা আরও সন্দেহের চোখে আমাকে দেখতে শুরু করল।

এদিকে ঘন্টা পার হয়েছে। একজন আমেরিকান পুলিশ বোতল খুলে বেশ খানিকটা মরিচের গুড়ো মুখে দিতেই প্রচন্ড আকারে চিৎকার। বাংলায় অনুবাদ করলে বলতে হয় বলছে - ওরে মারে মরিছি। সর্বনাশ! বিশ মরিচের ঝাল মুখে দিয়েছে জিহ্বা তো ছিড়ে যাবার কথা। মারিয়াও তাদের নিষেধ করেছে কিন্তু শোনেনি কারো কথা। মেক্সিকান পুলিশ ভুল বুঝেছে আমাকে কারণ আমি বলেছিলাম ড্রাগসের উপর কাজ করি।

যাইহোক ডাক্তার, ক্রিমিনাল পুলিশ সবাই এসে ভালো মত চেক করে অবৈধ কিছুই পেল না, শেষে আমাদেরকে ছেড়ে দিল। তবে বাংলাদেশের সেই মরিচের গুড়ো নিতে দিল না জলির জন্য।

চেকিং পর্ব শেষে বাইরে এলাম। জলি এবং তার স্বামী আমাদের জন্য দুই ঘন্টার বেশি অপেক্ষায় রয়েছে। আমাদের জার্নী ছিল সত্যি এক নতুন অভিজ্ঞতা। আমি একদিন জলিদের সঙ্গে কাটিয়ে চলে এলাম সান ডিয়াগোতে। FDA (Food and Drug Administration ) প্রশিক্ষণ শেষে ফিরে এলাম লসঅ্যাঞ্জেলসে। ঘুরলাম হলিউড। লসঅ্যাঞ্জেলসের প্রধানতম আকর্ষন হলিউডে রয়েছে উল্লেখযোগ্য দর্শনীয়স্থান।

হলিউডকে খ্যাতির দ্যুতি দিয়েছে এর ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি, অসংখ্য তারকা এবং তাদের জৌলুস। এখানে শুধু হেঁটে বেড়ানোও এক প্রকার রোমাঞ্চ, যেন স্বপ্নের মাঝে বিচরণ, যেন অনুভব করতে পারা প্রিয় তারকাদের পদচারণা। তাই গেলাম সেখানে এবং হাঁটলাম মনের আনন্দে আমরাও।

পরে সেই বিশ্বখ্যাত ভেনিস বিচে কিছুক্ষণ। লসঅ্যাঞ্জেলেসে এসে ভেনিস বিচ না দেখা, কি করে হয় সেটা? সমুদ্র তীরে তৈরী করেছে হেঁটে বেড়ানোর এক রোমান্টিক পথ, সব কিছু দেখা হলো। ছুটির দিনগুলো কাটল ভালো আমাদের এবং ফিরে এলাম সুইডেনে।

সুইডেনে ১৯৮৫ সালে পড়তে আসার পর প্রথম ৪-৫ বছর বেশ ঝামেলা গিয়েছে দেশ বিদেশ ঘুরতে। সব কিছু থাকা সত্বেও একটু নাজেহাল করা তাও বিনা কারণে ছিল একটি রুটিন।

তবে একটি জিনিস শিখেছিলাম তা হলো ইমিগ্রেশন বা কাস্টমস কতৃপক্ষের সঙ্গে অযথা ঝামেলায় না জড়ানো ভালো। বিরক্ত হলেও ধৈর্য এবং সহনশীলতা দেখানো উচিত।

জানিনে ১৯৮৭ সালে আমাকে আমেরিকার ভিসা না দেয়ার কারণ কি ছিল! বাংলাদেশের পাসপোর্ট তাই? ঘটনা যাই হোক না কেন, একটি জিনিস এখনও স্বপ্নে দেখি তা হলো কবে হবে বাংলাদেশে সেই পাসপোর্ট যার মাধ্যমে ভিসা ছাড়া দেশ বিদেশ ঘোরা যাবে!

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×