বুড়িগঙ্গা তুমি কেমন আছো

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ০২ মার্চ ২০১৯, ২৩:৫০ | অনলাইন সংস্করণ

বুড়িগঙ্গা

টেমস নদীর তীরে গড়ে উঠেছে লন্ডন শহর। হাডসন নদীর তীরে গড়ে উঠেছে নিউইয়র্ক শহর।

মারে ডার্লিং নদীর তীরে গড়ে উঠেছে সিডনির অপেরা হাউজ। সীন নদীর তীরে গড়ে উঠেছে প্যারিস। যমুনা নদীর তীরে গড়ে উঠেছে তাজমহলের শহর আগ্রা। সুইডেনের ম্যালারেন এবং বাল্টিক সাগরের তীরে গড়ে উঠেছে স্টকহোম।

নবগঙ্গা নদীর তীরে গড়ে উঠেছে আমার গ্রাম নহাটা। চিত্রা নদীর তীরে গড়ে উঠেছে আমার নানাবাড়ি। আর বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে আজ থেকে ৪০০ বছর আগে উঠেছিল গড়ে বাংলার মোগল সাম্রাজ্যের চতুর্থ সম্রাট জাহাঙ্গীরের শহর ঢাকা।

ঢাকা মহানগরের চারপাশে বুড়িগঙ্গা, বালু, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা এ চারটি নদ। ব্রহ্মপুত্র আর শীতলক্ষ্যার পানি এক স্রোতে মিশে বুড়িগঙ্গা নদীর সৃষ্টি হয়েছিল যা ধলেশ্বরী হয়ে সোজা দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে মিশেছিল কোনো একদিন।

বুড়িগঙ্গা কোনো এক সময় জোয়ার ভাটা প্রভাবিত একটি নদী ছিল। নদীটির নামকরণ বুড়িগঙ্গা করার পেছনে একটি কাহিনীও রয়েছে। প্রাচীনকালে গঙ্গা নদীর একটি প্রবাহ ধলেশ্বরীর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে পতিত হতো। ধীরে ধীরে এ প্রবাহটি তার গতিপথ পরিবর্তন করার ফলে একসময় গঙ্গার সঙ্গে তার যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরবর্তীতে এ বিচ্ছিন্ন প্রবাহটি বুড়িগঙ্গা নামে অভিহিত হয়। বুড়িগঙ্গা তুমি কি সেই আগের মতোই আছো? নাকি একেবারেই বুড়ি হয়ে গেছো? নাকি মরে বেঁচে আছো? তুমি কি মাঝে মধ্যে বেড়াতে যাও সেই বঙ্গোপসাগরে? ধলেশ্বরীর সঙ্গে কি তোমার দেখা হয়? তোমার সেই ছোটবেলার সাথীরা ব্রহ্মপুত্র আর শীতলক্ষ্যা কেমন আছে? তুমি কি সত্যিই অচল হয়ে পড়েছো? তোমার ১৭ কোটি সন্তানের মধ্যে কেও কি তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে না? কারো কি সাধ হয় না সেই মোগলদের মতো তোমার জোয়ারভাটার রূপ দেখে বিস্ময়াভিভূত হতে? আমি দেখেছি পৃথিবীর বড় বড় শহর গড়ে উঠেছে বড় বড় নদীর পাড়ে। এবং তারা কিন্তু ভালোই আছে। তারা সত্যি গর্বিত তাদের শহর নিয়ে। তুমি তো আবার বুড়ি সেজেছো সেই অনেক আগে, তা তোমার ঢাকা শহরের খবর কী? তোমার শহরবাসীদের কি মন চায়না হাঁটতে তোমার পাশ দিয়ে? সঙ্গিনীর হাত ধরে তোমার পাশ দিয়ে সুন্দর বিকেলে একটু হাঁটাহাঁটি কি হতে পারে না? আমি তো হাঁটি প্রতিদিন সুইডেনের বাল্টিক সাগরের তীর দিয়ে। কোনো সময় একা, কোনো সময় প্রিয়জনকে নিয়ে, স্ত্রী, ভাই বা বন্ধুকে নিয়ে। মাঝে মধ্যে ছবিতে দেখি আমার সেই ছোটবেলার নদীগুলোকে।

তারাও তেমন ভালো নেই। তাদের পুরো শরীরে কচুরিপানাতে ঢাকা, ময়লা আবর্জনায় ভরা। শুনেছি তোমার অবস্থা আরো খারাপ। সাগরের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করা তোমার ঠিক হয়নি। বন্ধ করার বা যোগাযোগ রাখার পেছনে তোমার দোষ দেয়া ঠিক হবে না। ভাবছি নতুন প্রজন্মদের বলবো তারা যদি কিছু করতে পারে তোমার জন্য।

কোনো এক সময় কবি গুরু রবি ঠাকুরকে বলা হলো বাংলার মানুষের জন্য কিছু কর? তিনি হুড় হুড় করে নতুন প্রজন্মকে কবিতার ছন্দে লিখে দিলেন, ‘ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা, ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ, আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।’ আমি তো আবার কবি নই কিভাবে যে ওদেরকে বলি!

তবে আমি উপরের যে সব শহরের কথা তুলে ধরেছি তারা যেমন প্রযুক্তির দিকে উন্নতি করছে, পরিস্কার-পরিছন্নতার দিক দিয়েও তারা সুন্দরভাবে সেজেগুজে মাথা উঁচু করে আছে, যা আমি নিজের চোখে দেখেছি।

কিন্তু তোমার তীরে গড়ে ওঠা ঢাকা শহরটি তেমন সুন্দর করে সাজতে পারেনি। কারণ কি জানো? কারণ বিশ্বের সব ভালো ভালো শহর তাদের নদীকে বাদ দিয়ে কিছুই ভাবতে পারে না। তাদের কথা নদীর সৌন্দর্য না থাকলে তাদের শহরের চেহারা মূল্যহীন। ঢাকার অবস্হা হয়েছে দেবদাসের পারুর মতো। রূপ আর অহংকার যতই থাকুক তোমাকে নোংরা করে রেখে পৃথিবীতে মুখ দেখাতে চেষ্টা করলেও তা বাস্তবে সম্ভব হবেনা, পারুর চেহারার মত দাগ লেগে আছে। ঢাকার চেহারা তো তোমার প্রতিচ্ছবি মাত্র। তোমাকে বাদ দিয়ে ঢাকা কিভাবে ভালো থাকতে পারে? প্রকৃতির নির্মম পরিহাস। কিছুই কি আমরা উপলব্ধি করতে পারছিনে?

সারা বিশ্বের গড়ে ওঠা শহর-বন্দর, নদী-নালার পরিবেশ যেমন সুন্দর, বাংলাদেশের শহর-বন্দর, নদী-নালার পরিবেশ তেমন সুন্দর নয় কেন? কারণ সেখানকার মানুষ তাদের শহরের এবং নদীকে সমানভাবে ভালোবাসে। তারা তাদের নদীকে নর্দমায় পরিণত করেনি। মনে হচ্ছে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের জীবনের বেশ মিল রয়েছে। বুড়িগঙ্গাকে উপেক্ষা করে ঢাকাকে সুন্দর করা সম্ভব হবে কি? হবে না। সন্তানের যেমন মঙ্গল হবে না তার বাব-মাকে কষ্টে রেখে তেমন করে ঢাকা কখনও সুন্দর শহর হতে পারবে না বুড়িগঙ্গাকে নর্দমায় পরিপূর্ণ করে রেখে।

১৭ কোটি মানুষের রাজধানী ঢাকা। সেই ঢাকার পাশে যদি নদী থাকতেও তা প্রবাহিত না হয় তাহলে কি হবে সেই রাজধানী দিয়ে? যে নদী ৪০০ বছর আগে ধাইছে সাগর পানে আজ তাকে তিলে তিলে ধ্বংস করা হচ্ছে এবং আমরা ১৭ কোটি মানুষ তা দেখছি অথচ তার জন্য কিছুই করছিনা।

সে দেশের মানুষ ভালো থাকতে পারে বলে আমার বিশ্বাস হয় না। প্রযুক্তির যুগে বুড়িগঙ্গাকে আবার নতুন জীবন দেয়ার জন্য দেশের সকলকে অনুরোধ করছি।

অনুরোধ করছি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারকে। বুড়িগঙ্গাকে খনন করে তার সৌন্দর্যকে ফিরিয়ে এনে নদীর দুইধারে ইট পাথর দিয়ে সুন্দর করে গড়ে তুলতে হবে। তার পাশে সুন্দর সুন্দর গাছপালা লাগিয়ে বসার ব্যবস্থা করে তাকে ভালোবাসার ছোঁয়ায় ফিরিয়ে আনতে হবে। তবেই হবে ঢাকার আত্মতৃপ্তি এবং বাংলাদেশের রাজধানীর সার্থকথা। বুড়িগঙ্গার অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে হলে তাকে গণভবনের লেকের মতো করে গড়ে তোলা হোক। বাংলাদেশের বয়স যখন ৫০ বছর হবে, জানিনে বুড়িগঙ্গা তোমার বয়স কত হবে? বড় জানতে ইচ্ছে করে।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×