লাইসেন্স টু কিল

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ০৪ মার্চ ২০১৯, ১০:১৭ | অনলাইন সংস্করণ

সমস্যা

আমার এক সুইডিশ বন্ধু কিছুদিন আগে আমাকে তার একটি ব্যক্তিগত সমস্যার কথা বলেছিল। বন্ধুকে কেউ একজন বেশ বিরক্ত করছে। এ ব্যাপারে আইনের আশ্রয় গ্রহনের পরও বন্ধুটি সন্তুষ্ট না। সে মনে করে সে আশাব্যাঞ্জক কোন ফলাফল পায়নি।

সুইডেনে সাধারণত বিশেষ কিছু না হওয়া পর্যন্ত শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সমস্যায় এদেশের আইন নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থা গ্রহন করতে চায়না। এমন পরিস্থিতিতে এদেশের মানুষ অনেকেই প্রাইভেট ডিটেকটিভের সাহায্য নিয়ে থাকে।

পুলিশ কর্তৃপক্ষ মনে করে এসব ছোটখাটো বিষয় সমাধান করার মত রিসোর্স তাদের নেই। তাই বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত সুইডেনেও অনেক বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থা রয়েছে যারা অনেক জটিল এবং কঠিন কাজ চুক্তির বিনিময়ে স্বল্প সময়ে করে থাকে।

বন্ধুর সমস্যাটা নিয়ে আজ আলোচনা করছিলাম আমার প্রতিবেশী টমি লিন্ডকভিস্টের সঙ্গে। টমি পেশায় ফায়ার ব্রিগেডের এক্সপার্ট (অগ্নি নির্বাপক বিশেষজ্ঞ)।

সে সুইডেনের মিলিটারিদের ফায়ার সার্ভিসের উপর বিশেষ ধরণের প্রশিক্ষন দিয়ে থাকে। এছাড়া ডাইভিংয়ের উপরও তার খুব ভালো দক্ষতা আছে। সব কিছু শোনার পর টমি একটি বেসরকারী নিরাপত্তা বাহিনীর (SRS) সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।

এ নিরাপত্তা বাহিনীতে যারা কাজ করে তাদের বেশির ভাগ অবসরপ্রাপ্ত (আর্লি রিটায়ার্ড) মিলিটারি, ছেপো (সিআইডি) এবং গোয়েন্দা বাহিনীর (এফবিআই) লোক।

এরা নানা ধরণের জটিল সমস্যার সমাধান করে থাকেন। জিজ্ঞেস করলাম এদের আবার খুন খারাপি করার অধিকার (লাইসেন্স টু কিল) আছে কি না? টমি বললো -না না, তবে এদের কাজের যে ধরণ আর এরা যা করে; সেটা ঝামেলা মুক্ত মিশন। এছাড়াও গ্রাহক সন্তুষ্টি (কাস্টমার স্যাটিসফ্যাকশন) থাকে শতভাগ।

বাড়ি ফিরেই সকালে সমস্যাগ্রস্ত বন্ধুকে টেলিফোনে বিষয়টি জানালাম এবং বেসরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর (SRS) সঙ্গে যোগাযোগের জন্য যে প্রয়োজনীয় তথ্য দরকার তা দিলাম।

সারা দিন কাজের চাপে কখন যে সময় পার হয়েছে টের পাইনি। বেশ ক্নান্ত। হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। কি ব্যপার? এ অবেলায় ফোন? -এস আর এস নিরাপত্তা (SRS) বাহিনী বলছি। -কি ব্যপার? -আমরা তোমার বন্ধুর সমস্যার কথা শুনেছি টমি লিন্ডকভিস্টের থেকে।

এখন তোমার কাছে তোমার বন্ধুর বিষয় জানতে চাই। একই সঙ্গে যে লোকটি সমস্যার কারণ তার বিষয়েও কিছু তথ্য জানা দরকার। এখন সে বিষয়ে তুমি কতটুকু জানো তাও জানতে চাই।

বিষয়টি আমার কাছে বেশ কৌতূহলোদ্দীপক মনে হচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম, -তোমাদের খরচ কি পরিমান? এবং কাজের বর্ণনা কি? সব বলা যাবে না তবে যতটুকু জানার দরকার তা বলব। ঠিক আছে বল শুনি। প্রথমে তোমার বন্ধুর সমস্যা শুনব সব শোনার পর আমরা SWOT-analysis করব (Strength, Weakness, Opportunities and Threats)। এ বাবদ খরচ ত্রিশ হাজার ক্রোনার।

পরে যে লোকটি সমস্যার কারণ, তার বিষয় জানব এবং একইভাবে সে বিষয়েও SWOT-analysis করব। খরচ ত্রিশ হাজার ক্রোনার। যদি আমাদের বিশ্লেষণের (analysis) পরে দেখি বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তবে কাজে হাত দেবো এবং তখন প্রতি ঘন্টায় মাত্র ১২০০ ক্রোনার। কাজ করতে বা ঝামেলা মেটাতে দুই থেকে তিন ঘন্টা লাগবে।

আমি একটু বেশিই কৌতূহলী হয়ে গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, সবাই কাজের উপর চার্জ করে বেশি কিন্তু তোমরা কাজের ওপর বলতে গেলে সামান্যই চার্জ করছ অথচ সব জানাশোনার ওপর প্রচুর চার্জ? কারণ টা কি জানতে পারি? আমাদের কাজে প্রিপারেশন খুব গুরুত্বপূর্ণ। কাজ করতে দরকার নির্ভুল সিদ্ধান্ত ও তার গ্রহণযোগ্য বাস্তবায়ন।

যদি ভালো প্রিপারেশন না নিয়ে কাজ করি এবং পরে যদি দেখা যায় ভুল ইনফরমেশনের কারণে বা ভালো প্রিপারেশনের অভাবে সিদ্ধান্তে ভুল হয়েছে তখন আমাদেরকেই জেলে ঢুকতে হবে।

তাই আমাদের কাজে প্রিপারেশন খুব গুরুত্বপূর্ণ। পুরো ঘটনা জানার পরে টেলিফোন রেখে ভাবতে শুরু করেছি। আজ নতুন শিক্ষা প্রশিক্ষণের এক ধারা যা ‘লিসন লার্ন্ড’ হিসেবে আমাকে চমকে দিয়েছে। আমি জানতাম স্পোর্টসের জগতে খেলোয়াড়রা সব সময় প্রিপারেশনের দিকে গুরুত্ব বেশি দিয়ে থাকে। কারণ তারা জানে বেস্ট প্রাকটিস এবং ভালো প্রিপারেশন মেকস আ ম্যান পারফেক্ট। আজ আমি জানলাম নিরাপত্তা বাহিনীর কাজের প্রস্তুতি এবং সে প্রস্তুতির গুরুত্বের উপর কিছু নতুন তথ্য।

আজকে আমার এ নতুন শিক্ষার সঙ্গে আমাদের দক্ষিন এশিয়ার সমাজ ব্যবস্থার তুলনা করলে সত্যি ভাবনাতে পড়তে হয়। কারণ বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপট ভিন্ন।

তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে অবাধ তথ্য প্রবাহের সুযোগ রয়েছে। ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ যদি ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেয় এবং তা যদি যুগোপযোগি না হয় কিংবা সময়ের সঙ্গে মিল না থাকে তখন তাতে বিশ্বস্ততার অভাব দেখা দেয়। তেমন একটি উদাহরণ দিতে চাই সদ্য কাশ্মির প্রসংগে। ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে যে উত্তেজনা চলছে তার মধ্যে সঠিক তথ্য প্রবাহের অভাব রয়েছে।

ভালো প্রস্তুতি ছাড়া যে সব খবর ছাড়ানো হচ্ছে যা সত্যি দু:খজনক। এ ক্ষেত্রে এটা পরিস্কার যে দুর্বল প্রস্তুতি, মিথ্যা প্রচারণা সকলের কাছেই বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়।

বিখ্যাত ঔপন্যাসিক ইয়ান ফ্লেমিং কর্তৃক সৃষ্ট উপন্যাসের কাল্পনিক চরিত্র জেমস বন্ডের লাইসেন্স টু কিল যা সিনেমার পর্দায় কোটি মানুষ দেখেছে। ব্রিটিশ গোয়েন্দা বাহিনীর (সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস) জেমস বন্ডের লাইসেন্স টু কিল ছবিটা আমিও দেখেছি সিনেমার পর্দায়। কিন্তু সত্যিকারে অনেক গোয়েন্দা বাহিনী পৃথিবীতে রয়েছে যাদের লাইসেন্স নেই তবুও তারা বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে যা ভাবতেও গা শিওরে উঠে।

আমি এমন একটি দেশে বাস করি যেখানে কাজের সমন্বয় এবং নিরাপত্তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্বাভাবিকভাবেই মনে কষ্ট লাগে যখন দেখি বেখেয়ালে বা দুর্নীতির কারণে নিজের মাতৃভূমিতে মারাত্বক কিছু ঘটে যাচ্ছে।

সর্বশেষ বাংলাদেশের অগ্নিকান্ডের ঘটনা নিয়ে টমির সঙ্গে কথা বলতে (যেহেতু সে পেশায় ফায়ার সার্ভিসের একজন দক্ষ কর্মি) সে অবাক হলো শুনে যে বাংলাদেশে সব সুযোগ সুবিধা থাকতেও তা ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি দুর্বল পরিকাঠামোর কারণে! পৃথিবীর অন্য দেশের মতো বাংলাদেশের সিটি প্ল্যান বলে যে একটি কথা আছে তা কেউ মানে না। পুরো বাংলাদেশে ঘর দুয়ার থেকে শুরু করে রাস্থা ঘাট সব কিছুই তৈরি করা হয় সেটা না মেনে।

বাংলাদেশের সদ্য ঘটে যাওয়া অগ্নিকান্ড আমাকে মর্মাহত করেছে। নিমতলীর অগ্নিকান্ড এবং তারপর চকবাজার মৃত্যুপুরীর পুণ:আবিস্কার! এ দায় কার? আজ আমার প্রশ্ন, কে নেবে এই এত শত মানুষ পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার দায়ভার? কে নেবে এই শতাধিক বাংলাদেশি পরিবার স্বজনের পোড়া দেহের ছাই খুঁজে না পাওয়ার দায়ভার? বাংলাদেশের কর্মরত প্রশাসন এ দায় এড়িয়ে যেতে পারে না।

আমি আমার একটি লেখাতে জানিয়েছি ঢাকাকে ফাঁকা করতে হবে। ঢাকা সিটির ব্যবস্থাপনার কোনো পরিকাঠামো (ইনফ্রাস্ট্রাকচার) নেই। বহি:বিশ্বের বর্তমান নানা দুর্ঘটনার কথা জানার পর মনে একটি জিনিস ঢুকেছে তা হলো ব্রিটিশ গোয়েন্দা বাহিনী কল্পনায় জেমস বন্ডকে লাইসেন্স টু কিলের পারমিশন দিয়েছে সিনেমার পর্দায়।

মনে হচ্ছে আমাদের সমাজে অব্যবস্থাপনা, স্বেচ্ছাচারিতা, দূরদর্শিতার অভাব, দুর্নীতি এবং দূর্বল প্রস্তুতি (প্রিপারেশন) লাইসেন্স টু কিলের চেয়ে ভয়ংকর রূপ ধারণ করে চলছে।

সিনেমার জগতে বা রূপালি পর্দায় যা আমরা দেখি, তার সবকিছু বাস্তবজীবনের সঙ্গে যেন এডজাস্ট না করি। বরং বাস্তব জীবনের সঙ্গে নিজেদেরকে খাপ খাইয়ে সুইডেনের গোয়েন্দা বাহিনীর মত SWOT-analys করে সুক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়া শেখা হোক আমাদের নৈতিক দায়িত্ব এবং কর্তব্য।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×