পরশ্রীকাতর নয় প্রশংসায় আকৃষ্ট হই

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ০৬ মার্চ ২০১৯, ১০:০৩ | অনলাইন সংস্করণ

প্রশংসা

লোভ-লালসা, কামনা-বাসনা, হিংসা-ক্রোধ মানুষকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে দেয়। মানুষের এ হিংস্রতা ও বর্বরতার সঙ্গে পরশ্রীকাতরতা যখন যোগ হয় তখন মানুষ অমানুষে পরিনত হয়।

এ এক ধরনের বদঅভ্যাস এবং জন্মের পর পরিবেশ এবং পরিস্থিতির ওপর এর বৃদ্ধি বা হ্রাস হয়ে থাকে।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে এটা এক ধরণের রোগ বা মানষিক অসুস্থতা। আমি মনে করি এটা এক ধরনের বদ অভ্যাস। যদিও আমি পেশাদার মনোবিজ্ঞানী না বা তেমন প্রশিক্ষণও এর উপর আমার নেই।

তবে বাস্তব জীবনে যা দেখছি বা উপলব্ধি করছি তাতে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তার ওপর বিশ্বাস রেখে তুলে ধরতে পারব এর কারণ এবং সমাধান। টুইন বা জমজ সন্তান জন্মেছিল আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে থাইল্যান্ডের এক দ্বীপ ফুকেটে (Phuket)। ছুটিতে টুইনদের বাবা আমেরিকা থেকে এসেছিল থাইল্যান্ড বেড়াতে।

রোমান্টিক ভালোবাসা এবং ছুটির বিনোদনের স্মৃতি হিসেবে থাই রমনীর গর্বে রেখে যায় প্রতিশ্রুতি। তাকে ওয়াদা করেছিল সেই আমেরিকান ফিরে আসবে কিন্তু আসেনি কোনদিন ফিরে সে আর।

এদিকে ১৬ বছরের গর্ভধারিনী রমনী অপেক্ষা করতে করতে হঠাৎ দশ মাস দশ দিন পার হয়ে যায়, শেষে ভূমিষ্ট হয় এই জমজরা। জন্মের তিনমাস তারা একত্রে থেকেছে। তারপর অভাব এবং সমাজের সেই পাছে লোকে কিছু বলের তাড়নায় শিশু আশ্রমে রাতের আঁধারে ফেলে চলে যায় মা তার দুই কন্যাদের। অন্ধকারে বিচ্ছেদ ঘটে মা ও মেয়েদের। বিচ্ছেদ ঘটে ভালোবাসার। বিচ্ছেদ ঘটে জীবনের। বিচ্ছেদ ঘটে ভৌগলিক সীমারেখার। বিচ্ছেদ ঘটে দুই বোনের। দুই বোনের একজন বড় হয়েছে থাইল্যান্ডের একটি অতি সাধারণ পরিবারে। অন্যজন বড় হয়েছে সুইডেনের নর্থে। তার একজনকে আমি চিনি যে আমার পরিবারের সঙ্গেও পরিচিত দশ বছর ধরে। আমার ছেলে-মেয়ে, জনাথান এবং জেসিকা স্টকহোমের টেনিস ক্লাব সালকে (SALK) টেনিস প্রাকটিস করে। আমি সেখানে এসেছি সেদিন তাদের খেলা দেখতে। হঠাৎ পাশে এসে সুইডিশ ভাষায় একজন মহিলা নিজের পরিচয় দিল। হ্যালো, আমার নাম হ্যানা, আমি তোমার ছেলে-মেয়েকে ফলোকরি এবং মুগ্ধ তাদের খেলায়। চেহারায় সুন্দরী রমনী তাতে কোন সন্দেহ নেই। তবে দেখতে পুরো সুইডিশ না হলেও কথায় এবং কর্মে ১০০% সুইডিশ। সে বুঝতে পেরেছে যে আমি কিউরিয়াস তাই নিজের থেকে বাকি পরিচয় সংক্ষেপে বর্ণনা করল।

সুইডিশ বাবা-মার পালিত একমাত্র কন্যা বলতে গেলে জীবনের শুরু থেকে। হ্যানা বিবাহিত। সামী জোহান, ব্যাংক একজিকিউটিভ। দুই ছেলে, নাম সাবাসতিয়ান ও ফিলিপ এবং মেয়ে ইসাবেলা। পেশায় হ্যানা তার নিজের কোম্পানীর ম্যানেজিং ডাইরেক্টর। হ্যানার পরিবারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বেশ গাড়ো।হতে চলেছে।

হ্যানার বাড়িতে আজ আমাদের সবার দাওয়াত। জোহান হ্যানার স্বামী ভালো রান্না করে তাই সে নিজেই নানা রকমের সুইডিশ খাবারের আয়োজন করেছে। স্টকহোমের এক্সক্লুসিভ এরিয়াতে বিরাট বড় বাসা নিয়ে বলতে গেলে রাজকীয় পরিবেশে এরা বসবাস করে। যাইহোক পুরো বাসা ঘোরাঘুরির মাঝে অবিকল আরেক হ্যানা এসে হাজির! এবার আমার মেয়ে বলে দুইজন হ্যানা, হঠাৎ এ কি ব্যাপার? ওরা তখনও জানেনা হ্যানার জীবন কাহিনী। পরিচয় পর্বে জানা গেলো হ্যানার বোন বেড়াতে এসেছে থাইল্যান্ড থেকে, কিছুদিন থাকবে।

আলাপ আলোচনা, হাসি তামাসার সঙ্গে রাতের ডিনার শেষে আমরা চলে এলাম আমাদের বাড়িতে। হ্যানার সঙ্গে টেনিস ক্লাবে আমার প্রায়ই দেখা হয়। সে নিজেও টেনিস খেলে এবং আমার সঙ্গে তার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে দ্বিধাবোধ করে না।

আজ তার মন খারাপ, জিজ্ঞেস করতেই জীবনের কিছু সিক্রেট শেয়ার করল আমার সঙ্গে। হ্যানার বয়স ১৮ হবার আগেই সে তার সুইডিশ বাবা-মাকে বলে রেখেছিল যে থাইল্যান্ড গিয়ে খুঁজে বের করবে তার বাওলজিক্যাল মা এবং বোনকে। তার বয়স ১৮ হলে সে থাইল্যান্ড গিয়ে জানতে পারে মা মারা গেছেন তবে বোনের খোঁজ মেলে এবং সেই থেকে তাদের সম্পর্কে।

হ্যানার বোনের নাম লিলি। লিলির কোন ছেলে- মেয়ে নেই। হোটেল ম্যানেজমেন্টের উপর কাজ করে থাইল্যান্ডের ফুকেট দ্বীপে। প্রতি বছর একমাস ইউরোপে সে ছুটি কাটায় তার বোন হ্যানার সঙ্গে। লিলির বদঅভ্যাসগুলো হলো সে হ্যানাকে ছোট করে দেখে, হিংসা করে এবং সবসময় অনিশ্চয়তায় ভোগে। এমনকি তার ছেলে-মেয়ে, স্বামী সব কিছুই লিলির জন্য অসহ্যকর। অথচ হ্যানা তার বোনের সব থাকতেও তাকে ইউরোপে বেড়ানো থেকে শুরু করে সমস্ত কিছু মনের আনন্দে করে যাচ্ছে। লিলি তার হিংসাত্মক আচরণ থেকে শুরু করে ছোট মনের পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে প্রতিটি পদক্ষেপে।

হ্যানা মনে করে সে কত ভাগ্যবান যে এতবছর পরে তার একমাত্র বোনকে খুঁজে পেয়েছে। পেয়েছে বাওলোজিক্যাল ভালোবাসার ছোয়া যা তাকে অর্থে নয় মনে বড়লোক করেছে। লিলির ভাবনাতে সারাক্ষণ শুধু ম্যাটেরিয়ালিস্টিক চিন্তাভাবনা এবং মূলত সৌন্দর্য্যের ও রূপের বাহ্যিক ইন্দ্রজাল যা থাকে ঘিরে রেখেছে।

হয়ত লিলির জীবনে সব কিছু আসেনি তার জন্মের শুরু থেকে। হয়ত নেই সেই থাইল্যান্ডের ফুকেট দ্বীপে সব কিছু যা সুইডেনে হ্যানার আছে। কিন্তু বিশাল সাগরের কুলে বাস করা রমনীর মধ্যে কেনো ভালোবাসার এবং উদারতার ঢেউ বৈছেনা? কেনো সেই সাগরের ঢেউ ধুয়ে মুছে সব গ্লানি সাফ করছেনা? কেন সরিয়ে নেয়নি তার মনের ভেতরের কলুষতা এতদিনেও? হ্যানার সমস্ত কথা শোনার পর আমার ব্যক্তিগত অভিমত এটাই তা হলো পরিবেশ এবং পরিস্থিতি এর জন্য দায়ী। আমি হ্যানার জীবনের ঘটনার সঙ্গে আমাদের ব্যক্তি জীবনের বেশ মিল খুঁজে পাই। মানব মানবের জন্য, সে মানব যদি দানব হয় তখন সাগর কেনো, সোনা দিয়ে মোড়ালেও তার চরিত্রে পরিবর্তন আসবে না। তাই আমাদের মনের ভেতরে যে সৌন্দর্য রয়েছে তাকে প্রতিদিন ভালোবাসার ছোয়াতে আকৃষ্ট করে রাখতে হবে। আমাদের অন্যের সব ভালোকে সহ্য করার মত শক্তি বা মন মানসিকতার অভাব বেশ লক্ষ্যনীয়। কারো দু:খে, দুখের সাথি এবং সুখে, সুখের আনন্দ উপভোগ করার মত মোনমানসিকতা গড়ে তোলার দায়ভার আমাদের নিজেদের এবং এতে প্রচুর আত্মতৃপ্তি রয়েছে।

আমি মনে করি আমার আশেপাশে যারা আছে তারা যদি ভালো থাকে, সুস্থ থাকে তাহলে আমার তো ভালো লাগে। আমি সত্যি আনন্দ পাই যদি দেখি কেও ভালো করছে তার কর্মে বা প্রতিভায়।

আমি আমার সহধর্মীনিকে কখনও দেখিনি বা বলতে শুনিনি যে সে কারো ভালো দেখে আমাকে কোনো নেগেটিভ কিছু বলেছে তার জীবনে। বরং যখনই দেখি কারো সমস্যা বা কেও প্রয়োজনে আমাদের কাছে এসেছে বা আসে সে তার হৃদয় উজাড় করে দিতে কৃপনতা কখনও করেনি।

হয়ত তাই আমিও শিখেছি আমার স্ত্রীর মত করে ভাবতে কারণ আমার পরিবেশ তাকে ঘিরে। হয়ত অনেকের ভাগ্যে এমনটি সুযোগ হয়ে ওঠেনি এখনও। নেয়ায় যেমন তৃপ্তি রয়েছে দেয়ায়ও কিন্তু তেমন তৃপ্তি। তবে এর জন্য প্রাকটিস করতে হবে। প্রাকটিস মেকস আ ম্যান পারফেক্ট। হিংসা বিদ্বেষ বা পরশ্রীকাতরতা শুধু ব্যক্তির ব্যক্তিত্বকে নষ্ট করে না, নষ্ট করে মনুষ্যত্বকে, নষ্ট করে সমাজকে।

আমাদের এমন একটি সুন্দর মন, তাকে আমরা অসুন্দর করে মনুষ্যত্বের অবক্ষয় ঘটাতে পারিনা। ঘৃণা বা হিংসা নয়, এসো ভালোবাসি।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×