স্বাধীনতা পেয়েছি হারানোর জন্য নয়

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ০৭ মার্চ ২০১৯, ১১:৫৯ | অনলাইন সংস্করণ

স্বাধীনতা

মার্চ মাস মনের গভীরে জমে থাকা হাসি-কান্নার মাস।দু:খ-কষ্ট এবং ত্যাগের মাস। প্রিয়জনকে হারানোর যে ব্যাথা তা অনুভব করার মাস। ভালোলাগা ও ভালোবাসার মাস- স্বাধীনতার মাস।

তবে ১৯৭০-৭১ সালের যুদ্ধ চলাকালীন সময় ছিল নয় মাস। সেই নয়টি মাসে যে ক্ষতি, ত্যাগ, নির্যাতন, হতাশা, হত্যা, দু:খ, কষ্ট, কান্না, আর্তনাদ, হারানো সুর, আশা, প্রত্যাশা এবং ভালোবাসা আমরা বিসর্জন দিয়েছি তা ভোলার নয়।

তখনকার পুরো নয় মাসের ইতিহাস তুলে ধরলে এবং স্মৃতিচারণ করলে মনে হয় না কেও বলবে চল ফিরে যাই সে সময়ে।

কারণ সে সময় জীবন ছিল শুধু অন্ধকারে ভরা। তবুও আমাদের সৌভাগ্য হয়েছিল সেই অন্ধকার পেরিয়ে আলোর জগতে সেদিন লাল সবুজের পতাকা উড়ানোর। হয়েছিল ভালোবাসার পুনর্মিলন।

তাই প্রতিবছর এসময়ে জাতীয় স্মৃতিসৌধকে সুভাষিত ফুল দিয়ে ভালোবাসা নিবেদন করি। আর নানা রঙে নতুন রূপে সেজে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করি। ইতিহাস হতে পারে কখনও উপহাস, হতে পারে দু:খ, হতে পারে সুখ, হতে পারে ভালোবাসা।

ইতিহাস ঘটে যাওয়া ঘটনাকেই মনে করিয়ে দেয় বা দিয়ে থাকে। কিন্তু ইতিহাস ফিরিয়ে দিতে পারে না আমাদের চাওয়া পাওয়াকে। স্বাধীনতার মাস ফিরে আসবে প্রতি বছর তবে ফিরে আসবে না যাঁরা যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন দেশকে স্বাধীন করার জন্য। যুদ্ধের সেই পুরনো স্মৃতিগুলো বেদনাদায়ক ও হৃদয় বিদারক ইতিহাস। তাই সে ইতিহাস নিয়ে ঘাটাঘাটি করলে দু:খ বাড়ে বই কমে না। টিভিতে একটি অনুষ্ঠানে কিছুদিন আগে দেখলাম আলোচনা চলছে কত লোক যুদ্ধেপ্রাণ দিয়েছে তা নিয়ে। বুলেটের গুলি যা শরীরে ঢুকে দেহকে ঝাঁঝরা করে মূহুর্তের মধ্যে শেষ করে দিয়েছিল জানিনা তাদের সংখ্যা কত।

আমরা এখনও এও জানিনা যারা বেঁচে মরে আছে পুরনো সেই স্মৃতিকে জড়িয়ে ধরে তাদের সংখ্যা কত। আমরা শুধু জানি যে আমরা অনেক কিছু জানিনা আজও। মৃত্যুর সংখ্যা তিন বা ত্রিশলক্ষ এ নিয়ে আর সময় নষ্ট না করে বরং কাউকে যেনো আর অকাল মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে না হয় সেদিকে নজর দেই।

স্বাধীনতা যুদ্ধে যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন তাদেরকে একটু স্বরণ করছি, কিন্তু যারা প্রতিদিন নানাভাবে মরছে যেমন সড়ক দু:র্ঘটনায়, ক্রসফায়ারে, বিষাক্ত খাবার খেয়ে বা খাবারের ভেতরে বিষ মিশিয়ে জাতিকে যারা তিলে তিলে হত্যা করছে কি করছি বা ভাবছি সে বিষয়ে?

জানি কি তাদের সংখ্যা কত? এবং কেন, কে বা কারা এর জন্য দায়ী? সময় কি এখনও আসেনি তা জানার? আমি মনে করি সোনারবাংলা গড়ার পরিকল্পনা হোক আমাদের জীবনের আলোচনার বিষয় প্রতিক্ষণ, সারাক্ষণ এবং সর্বক্ষণ।

স্বাধীনতা লাভ করার পরে আমরা ভালো কি করতে পেরেছি সেগুলো আমরা দেখতে চেষ্টা করি। আমরা এখন স্বাধীনভাবে আমাদের ভালো মন্দ নিয়ে বসবাস করছি। আমাদের সিদ্ধান্তে অন্য কারো কর্তৃত্ব নেই।

আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। এখন আমাদের প্রথম কাজ হবে আমাদের স্বাধীনতাকে শক্ত এবং সুন্দর করে ধরে রাখা। ভালো করে গড়ে তুলতে হবে আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান থেকে শুরু করে আমাদের প্রতিটি অংশকে। জমির উর্বরতা বাড়াতে হবে। নদী গুলোকে পুন:খনন করে পুনরায় নতুন জীবন ফিরিয়ে আনতে হবে। রাস্তাগুলোকে সুন্দর করে তৈরি করতে হবে। প্রতিটি শহরের যে সিটি ম্যাপ রয়েছে তার দিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। বেআইনিভাবে কিছু নির্মান করা চলবে না। আমাদের ছেলে-মেয়ে আমাদের দেশেই থাকবে তাই তাদের কথা ভাবতে হবে। স্বাধীনতার মাসে সবাইকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে যেনো এমন কিছু না করি যা নতুন প্রজন্মের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

আমাদের ভাবতে হবে যে সবধরণের কেমিক্যাল যা আমরা ব্যবহার করছি (যেমন বিভিন্ন ধরণের পশুর চামড়া পরিস্কারের জন্য) তা ড্রেন দিয়ে কোথায় যাচ্ছে? বাংলাদেশের পানি এবং মাটিতে। পরে সেই বিষাক্ত পানির মাছ আমরা খাচ্ছি। কাপড়ের রং খাবারে মিশিয়ে নিজে এবং অন্যকে খাওয়ানো হচ্ছে। আমাদের অকাল মৃত্যু এবং নানা ধরণের রোগের কারণ সত্বেও আমরা এখনও টের পাচ্ছিনা এর পরিনতি। কি হবে আমাদের ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যত ভেবেছি কি তা? দেশে যারা অর্থে ভালো আছে তারা তাদের ছেলে-মেয়েদের বিদেশে প্রতিষ্ঠিত করতে উঠে পড়ে লেগেছে। বছরে ৬০-৮০ হাজার ডলার দিয়ে তাদের ছেলে-মেয়েদের বিদেশে পড়াতে পারছে। কিন্তু এদের সংখ্যা কত? ১৭ কোটি লোকের মধ্যে ০.৫% এর চেয়ে কম। কি হবে বাকিদের? দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। দেশের দায়িত্বরত রাষ্ট্রপ্রধানরা যখন নিজ দেশের চিকিৎসক এবং চিকিৎসা উপেক্ষা করে ভিন দেশ পাড়ি দেন স্বাভাবিকভাবেই দেশের জনগণ পুরো স্বাস্থ্যসেবার প্রতি ভরসা (রেসপেক্ট) হারিয়ে ফেলে।

বিদেশি বিশেষজ্ঞদের অনেক সময় সংকটপূর্ণ (ক্রিটিক্যাল) রোগী দেখতে দেশে আনা হচ্ছে এবং তাদের মূল্যায়নে (ইভালুয়েশনে) তারা বলছে বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা ইউরোপ বা আমেরিকার তুলনায় খারাপ নয় বরং সমমানের তুলনা করলে তাদের সঙ্গে। তারপরও দেশের চিকিৎসার উপর কারো আস্থা নেই কেন? স্বাধীনতার মাসে এসব বিষয় অবশ্যই আলোচনা হওয়া দরকার। আরেকটি বিষয় তা হলো যখনই বিরোধী দল গণহরতাল ডাকে সবাই সামান্য অর্থের লোভে শহর বন্দর ভেঙ্গে চুরে কৃতিত্বের সঙ্গে মিশন সম্পন্ন করে। কিন্তু কেনো কেও তো কখনও ঠিক একইভাবে সামান্য অর্থ দিয়ে বলছে না এসো ঢাকাকে পরিষ্কার করি বা নদী নালার ময়লা পরিষ্কার করি! দেশকে ভালোবাসতে হলে বহিঃশত্রুর সঙ্গে যেমন লড়াই করতে হবে ঠিক তেমনি করে দেশের আভ্যন্তরিন সমস্যার সমাধানও করতে হবে। স্বাধীনতার মাসে টিভি, রেডিও, নিউজ পেপারে দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার।

সরকারের ভুলত্রুটি নিয়ে আলোচনা করতে হলে সংসদ ভবনে ঢুকে সেখানে পরিবর্তনের জন্য সংগ্রাম করতে হবে। সংসদের বাইরে হট্টগোল (কেওয়াস) সৃষ্টি করে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করা, মানুষের কর্মজীবন নষ্ট করা কখনওই উচিত হবে না। ৪৬ বছর এসব করে তেমন লাভ হয়নি দেশের ক্ষতি ছাড়া। বর্তমান রাজনীতি প্রতিহিংসার রাজনীতি, এটা বন্ধ করতে হবে। সরকারকেও ভাবতে হবে হাতের পাঁচটি আংগুল সমান না এবং সব আংগুলই সমান দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে না।

একটি দেশে ১৭ কোটি লোক তাদের চেহারা যেমন ভিন্ন, চিন্তা চেতনাও ভিন্ন এসব জেনে শুনেই যখন সরকার দায়িত্ব নিয়েছেন তখন ম্যানেজ করা শিখতে হবে। এত দু:খ, এত দারিদ্র্য, এত বঞ্চনা, এত দুর্নীতি, এত স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতা নিয়ে এত কামড়াকামড়ি- তারপরও বলব আমরা স্বাধীন। আমাদের দেশটা স্বাধীন, কারণ আমরা স্বাধীন একটি রাষ্ট্র পেয়েছি, আমরা পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্তি পেয়েছি।

কিন্তু পাইনি হৃদয়ের চাওয়া পাওয়া আর সংবিধান স্বীকৃত নাগরিক অধিকার এখনও। জনগনকে ভয় বা জেল হাজতে ভরেই যদি সরকার দেশ চালাবেন তবে কি দরকার ছিল দেশকে স্বাধীন করার?

যখন কেও ভিন্নমত পোষন করে তারমানে সে শত্রু নয়। যাস্ট বুঝতে শিখতে হবে এগ্রী টু ডিজএগ্রী কনসেপ্ট। একইসঙ্গে দেশের ক্ষতি করে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করাও তো বেআইনি এবং মস্তবড় অপরাধ। দেশের সরকার সবার সরকার, বিরোধী বা দলীয় বলে কোন কথা নেই। আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব নিজের, গণতন্ত্রের এবং দেশের স্বার্থে, সরকারের ভুলত্রুটিগুলোকে সংশোধন করতে এবং পরিকাঠামো তৈরি করতে সাহায্য করা। বাংলাকেই সোনার বাংলা করতে হবে এবং তার জন্য দূর করতে হবে অমানুষিক আচরণ এবং তৈরি করতে হবে নিজেকে একজন আদর্শ নাগরিক হিসেবে।

আদর্শ নাগরিক হতে হলে নিজেকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। মনে রাখতে হবে বাংলদেশের সমস্যাই বর্তমান পৃথিবীর সমস্যা। কারণ আমরাই পৃথিবী। আজ একজন ইরাকি কুর্দির সঙ্গে দেখা হলে সে বললো তার কোনো দেশ নেই। সে রিফুজি হয়ে সুইডেনে ঢোকে আজ থেকে ৩৫ বছর আগে। সুইডেন তার বর্তমান বাসস্থান। অথচ একদিন সে জন্মে ছিল ইরাকে।

ইরাক সরকার কুর্দিদের নানা ধরণের অন্যায় অত্যাচারের মধ্য দিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল। জানিনা কেন বা কি কারনে এমনটি করেছিল। পৃথিবীর অনেক দেশ রয়েছে যারা এখনও স্বাধীন হতে পারেনি! যাইহোক কুর্দির দু:খ তার নিজের কোনো দেশ নেই কিন্তু আমাদের তা থাকতেও আমরা তার মর্ম অনুভব করছিনা। সুইডেনে বসবাসরত এ কুর্দি মানসিক অশান্তির কারণে ভর্তি হয়েছে হাসপাতালে কারণ তার ধ্যানে, জ্ঞানে সে ভাবে তার নিজের কোন দেশ নেই।

তাকে দেখে মনে পড়ে গেলো বাংলাদেশের কথা। রাজনৈতিক মতবিরোধের কারনে যদি দেশ ছাড়তে হয় তবে কি মূল্য থাকতে পারে সে রাজনীতির! যদি কেও সত্যিকারে দেশের শত্রু হয় তার আইনের মাধ্যমে বিচার হওয়া উচিত। এখন প্রশ্ন আইন কি তার গতিতে চলছে নাকি তাকে মেনুপুলেট করা হচ্ছে? আমি জানিনা তবে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে যেন কোনো বেআইনী কিছু না হয়।

স্বাধীনতার মধ্যে যে একটি আনন্দ রয়েছে তা উপভোগ করতে হবে। কারণ স্বাধীন হয়েছি পরাধীন হবার জন্য নয়। স্বাধীনতা মানে বাকস্বাধীনতার বহি:প্রকাশ তা যেনো সবাই উপভোগ করতে পারে সে বিষয় সরকারকে খেয়াল রাখতে হবে। এবারের স্বাধীনতার মাসে আমরা কি নতুন প্রতিজ্ঞায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে পারি না? অবশ্যই পারি।

মাত্র দুটি শর্ত যদি মেনে চলতে শিখি তবে পেতে পারি আসল স্বাধীনতা। শর্ত এক - কোন অন্যায় করব না। শর্ত দুই - শুধু যেন মনে রাখি শর্ত এক। সবাইকে স্বাধীনতা দিবসের প্রাণঢালা ভালোবাসা।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×