সুইডেনে মানবাধিকার

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ১৮ মার্চ ২০১৯, ১১:০৩ | অনলাইন সংস্করণ

হিরো

বহিঃশত্রুকে খুন করলে হিরো আর ঘরের শত্রুকে খুন করলে জিরো। পৃথিবীর সর্বত্র জানতাম একই অবস্থা। যখন বাইরের কেউ নিজের দেশকে আক্রমন করে তখন দেশ রক্ষার্থে আক্রমণকারীকে খুন করলে আমরা হই বীরবিক্রম, বীরপ্রতিক বা বীরউত্তম। কিন্তু যদি কেউ নিজের পরিবার বা আপনজনকে আক্রমন করে এবং যদি আক্রমনকারীকে খুন করা হয় তখন জেল হাজত।

এখন বহিঃশত্রুর আক্রমন মোকাবিলা করার জন্য নানাধরণের প্রতিরোধের ব্যবস্থা রয়েছে। যদি কেউ অমানুষিকভাবে কাউকে আক্রমন করে তার জন্য বিভিন্ন শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।

আইন নিজের হাতে নেয়া বেআইনী বিধায় জেল হাজত অনিবার্য। দেশ বলতে কি বোঝায়? পরিবার, সমাজ, ভৌগলিক আয়তন। আমার কাছে বিষয়টি পরিস্কার না তাই ভাবনায় ঢুকেছে। বহিঃশত্রুর মোকাবেলায় হিরো অথচ দেশের কেউ একই কাজ করলে শাস্তি নিশ্চিত এবং এ আইন সারা বিশ্বে রয়েছে।

আজ থেকে ২০ বছর আগের কথা। আমি তখন স্টকহোমের অদূরে স্ট্রেংন্যাসে বসবাস করি। কোন এক শীতের সন্ধায় বন্ধুর বাড়িতে চোর দরজা খুলে ঘরে ঢুকতে চেষ্টা করছে।

বন্ধু টের পেয়ে চিৎকার করে, চোর সিড়ি দিয়ে তাড়াহুড়ো করে পালাতে গিয়ে বরফের কারণে পড়ে পায়ে ভীষণ আঘাত পায়। বন্ধু তাকে ধরে এবং পুলিশে ফোন করে। পুলিশ তৎক্ষনাত এসে হাজির হয় এবং তাকে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যায়। জানা যায় সে ইস্ট ইউরোপের কোন এক দেশ থেকে এসেছে। সে জেনেছে যে সুইডেনে ঢুকে ছোটখাটো অন্যায় করলে বা চুরি চামারি করলে মাস খানেক জেল হয়। তার ধারণায় সুইডিশ জেলে থাকা মানে মিনিমাম থ্রি-স্টার হোটেলের সুযোগ সুবিধা এবং প্রতিদিন তার একটি ভাতার ব্যবস্থা থাকে।

সব মিলে মাস খানেক সুইডিশ জেলে থাকার মত সুযোগ করে নিতে পারলে হোটেলে থাকা খাওয়ার পরে যে অর্থ পাবে তা তার দেশের এক বছরের আয়ের সমান। জেনে শুনেই তারা এ ধরণের ক্রাইম করতে সুইডেনে ঢুকে থাকে যা শুনেছিলাম তখন। মজার ঘটনা যা বলতে এ লেখা তা হলো বন্ধুর বাড়িতে চোর চুরি করতে এসে ব্যর্থ। পুলিশের হাতে ধরা পড়ে এবং পরে সে আমার বন্ধুর নামে কেস করে। সুইডিস উকিল চোরের পক্ষ হয়ে কেস দিয়েছে।

সুইডেনে যদি কেউ খুন করে এবং যদি সে অন্য দেশের হয়, তবে সে বিনা খরচে আইনগত সাহায্য পাবার অধিকার রাখে। সোজা কথায় বললে বলা যায়, অভিযুক্ত ‘অপরাধীর’ অপরাধ প্রমান না হওয়া পর্যন্ত সে আইনি সহায়তা পাবে এবং রাষ্ট্র সেটা নিশ্চিত করবে।

বন্ধু কোর্টে গেল এবং কারণ জিজ্ঞেস করল তার অপরাধের। জানতে পারল যে চোর ভয়ে দৌঁড়ে পালাতে গিয়ে সিড়ি থেকে পড়ে পা ভাঙ্গার জন্য বন্ধু দায়ী। বন্ধু বললো মানে? জজসাহেব বললেন তুমি যদি সিড়ির বরফ পরিষ্কার করে রাখতে তাহলে সিড়ি স্লিপারি হতো না এবং বেচারার পা ভাঙ্গত না। বন্ধু বললো জজ সাহেব আপনি সুস্থ আছেন তো? আমার বাড়িতে চোর চুরি করতে এসেছে আমাকে দেখে দৌঁড়ে পালাতে গিয়ে সে পড়েছে।

তার তো আমার বাড়ির সামনে আসার কথাই না? জজসাহেব বললেন তার জন্য তার শাস্তি হবে তবে তোমার দুহাজার ক্রোনার জরিমানা। কারণ বরফ পরিস্কার করোনি সময়মত। বন্ধুর সব কথা শুনে আমার মেজাজ সেদিন সত্যি খারাপ হয়েছিল এবং ইচ্ছে হয়েছিল নতুন করে পড়াশোনা শুরু করি আইনের উপর। সুইডেনের আইনের বিশ্লেষন হলো আইন মানুষের জন্য। অতএব তার ব্যবহার ন্যায্য হতে হবে।

আমার বন্ধু তার উকিলের মাধ্যমে সেদিন ২০০০ ক্রোনার জরিমানা মওকুফের জন্য ৫০০০ ক্রোনার খরচ করেছিল। আইনের উপর ভালোই রাগ হয়েছিল তার সেদিন এবং প্রেস্টিজে লেগেছিল তাই সেদিন অর্থনৈতিক দন্ড দিয়েছিল তবু জরিমানা দেয়নি। বন্ধুর কথা শুনে আমি ভেবেছিলাম চোর বিদেশি এবং সুইডেনে থাকার পারমিশন নেই, মরে গেলে বা বড় আকারে ক্ষতি হলেও কিছু হবে না। কারণ সে বহিঃশত্রু।

কিন্তু না, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে। বেআইনি কোনো কিছুর বিশেষ কোনো জায়গা নেই সুইডেনে। দুই বছর আগে (৭ এপ্রিল ২০১৭) স্টকহোমে রাহকমাত আকিলো নামের এক শরণার্থী এসেছিল উজবেকিস্তান থেকে।

বছর দুই ধরে শরণার্থী হিসেবে সুইডেনে বাস করছে। দেশ ছেড়েছে সুইডেনে পারমিশনের জন্য এবং অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছে। একজন শরণার্থী হিসেবে সুইডেন সরকার তার দায়ভার নিয়েছে।

থাকা, খাওয়া, ফ্রি-চিকিৎসাসহ প্রতিমাসে তার ভাতা রয়েছে। শুক্রবার, ৭ এপ্রিল এক ট্রাক ড্রাইভার স্টকহোমের সবচেয়ে ব্যস্ততম রাস্তা ড্রটনিং গতানে মাল নামাচ্ছিল। রাহকমাত আকিলো হঠাৎ সেই ট্রাকের ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ে এবং লোকের ভিড়ে চালিয়ে দেয় সেই ট্রাক। এতে এব্বা ওকেরলুন্ড (Ebba Åkerlund) সহ পাঁচজন নিহত, ১৫ জন আহত এবং আশেপাশের অনেক দোকান ক্ষতিগ্রস্থ হয়। হাজারও মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।

আকিলো সুইডিশদের আশ্রয়ে দুই বছরের বেশি খেয়ে পরে সুন্দর জীবনযাপন করেছে, বিনিময়ে সে এই জঘন্য কাজ করেছে। যে তার নিজের জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত হয়েছে। জানিনে কার বা কিসের লোভে পড়ে সেদিন সে এত বড় অমানবিক কাজ করেছিল! জানিনে পৃথিবীর অন্য কোন দেশ হলে সেদিন তার কি হতো! জানিনে আমরা বাংলাদেশে তাকে কি করতাম! তবে সুইডেনে সে সর্বোচ্চ আইনের সাহায্য পেয়েছে এবং এখনও এখানকার জেলে রয়েছে। চলছে আলোচনা তার দেশের সঙ্গে তবে তার জন্মস্থান উজবেকিস্তান তাকে ফেরত নিতে রাজি নয়। সুইডেনের জেলে সে রয়েছে, যা তার জন্য ফোর-স্টার হোটেল কারণ সব ধরণের সুযোগ সুবিধা ভোগ করে চলছে সে বিনা পয়সায়।

সম্প্রতি নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে আরেক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেল। ব্রেন্টন ট্যারেন্ট নামে ২৮ বছরের এ সন্ত্রাসী নিউ সাউথ ওয়েলসের গ্রাফটন অস্ট্রেলীয়ার নাগরিক। ব্রেন্টন সহ আরো তিনজন তার মধ্যে একজন মহিলা মিলে ক্রাইস্টচার্চ শহরের দুটো মসজিদে ঢুকে ৪৯ জনকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে।

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে সন্ত্রাসের ভিডিও দেখে মনে হচ্ছিল ভিডিও গেমসের শুটিং চলছে। সন্ত্রাসী ব্রেন্টন ইউরোপের অনেক ঘটনা বিশেষ করে স্টকহোমের ড্রটনিং গতানের বর্ণনা করেছে। তার মতে মুসলিম টেরোরিস্টরা অতীতে যা করছে, তার প্রতিশোধ নিতে এ জঘন্য কাজ করেছে সে। আমার ভাবনায় ঢুকেছে এরা কি সত্যি মানুষ নাকি অন্য কিছু! ক্রাইস্টচার্চ নিউজিল্যান্ডের ছোট্ট একটি শহর যেখানের মোট লোক সংখ্যা চার লক্ষের মত।

নানা বর্ণ এবং ধর্মের লোকের বসবাস রয়েছে এখানে। আট বছর আগে ভূমিকম্পের কারনে শহরের অনেক ক্ষতি হয়। পরে আস্তে আস্তে শহর গড়ে উঠেছে এবং বিভিন্ন দেশের লোক বাস করছে শান্তিতে এ শহরে। হঠাৎ আকিলোর মত এ সন্ত্রাসী কুৎসিত দানবের মত এক মর্মান্তিকে ঘটনা ঘটিয়ে দিল। জানিনে নিউজিল্যান্ডের বিচারের কাঠগড়াতে কি বিচার হবে তার! আমরা একই পৃথিবীতে বাস করছি। তবে ভাবতে অবাক লাগে যখন মাঝে মধ্যে দেখি বাংলাদেশে নিরাপরাধ অনেক মানুষ বছরের পর বছর জেলে পড়ে আছে বিনা বিচারে এবং বিনা কারণে।

এদিকে সুইডেনে (আকিলোর মত) বড় বড় ক্রিমিনাল হওয়া সত্বেও মানবিক সাহায্য সহ হাজারও সুযোগ সুবিধা ভোগ করছে। এ কেমন বিচার বা অবিচার! অমানুষিক কাজ করার পরেও বিচার বিবেচনার কাঠগড়ায় বিবেচিত হবার সুযোগ যদি হিউম্যান রাইটস হয়, তাহলে সুইডেনে সেটা আছে। যা পৃথিবীর অন্য কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। ক্রাইস্টচার্চে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত শহীদ মুসলিম ভাই বোনদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধ। ঘৃণা নয় ভালোবাসা দিয়েই হোক সকল সমস্যার সমাধান।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×