এমন তো কথা ছিল না

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ১৯ মার্চ ২০১৯, ১৬:০৩ | অনলাইন সংস্করণ

দুর্দিন

বাংলার এই দুর্দিনে, এলিট নামের কিছু মানুষ যারা দুর্নীতিগ্রস্ত কীট তারা দেশকে তিলে তিলে ধ্বংস করছে বিধায় দেশের মেহনতি মানুষের এই পরিণতি আজ।

মানুষ মানুষের জন্য। হ্যাঁ কথা সত্য। খুবই সত্য যে তারা নিজেদেরকে নিজেরাই এখন ধ্বংস করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করছে না। কয়েকদিন আগে আমার লেখা মাসুদ বিশ্বাসের করুণ পরিণতির উপর। মাগুরা জেলা, নহাটা ইউনিয়নে, বেজড়া গ্রামের দিনমজুর মাছুদ বিশ্বাস কয়েক মাস ধরে আক্রান্ত হয়ে মৃতপ্রায় অবস্থা।

এ অবস্থায় ঢাকা হৃদরোগ হাসপাতালে বিভিন্ন পরিক্ষা নিরিক্ষা, সর্বশেষে এনজিওগ্রাম করলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন তার হাতের ঐ অংশ কেটে ফেলতে হবে এবং হার্টে একটি রিং বসাতে হবে। সহায় সম্বলহীন দিনমজুর মাসুদের চিকিৎসার জন্য নিজের সামর্থের সবটুকু শেষ করে আজ তিনি নিঃস্ব।

বয়স ৫০ প্লাস, বিবাহিত, ৫ সন্তানের বাবা এবং পেশায় নানা কর্মের কর্মী। কঠিন হলেও ভালোবাসার কুটিরে সে গড়ে তুলেছে এক সুখের জীবন। অর্থের সন্ধানে ইছামতির বিলে মাছ ধরতে গিয়ে হঠাৎ ঘটে তার ডান হাতের এই পরিণতি।

ডাক্তার বলেছেন দু-একদিনের মধ্যে তার হাত একেবারে গোড়া থেকে কাটতে হবে৷ আর যেহেতু হাতে রক্ত চলাচল হচ্ছে না সেজন্য হাত কাটার পরে ঘা শুকাবে না, তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। হৃদরোগ ইনস্টিটিউট বলেছে যে হাত কাটতে প্রায় এক দেড় লক্ষ টাকার মতো খরচ হবে। অনেকের সাহায্য সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত অনেক চেষ্টার পর তাকে পঙ্গু হাসপাতাল অপারেশন করে তার ডান হাত কেটে ফেলা হয়েছে। আশ্চর্যের ব্যাপার যে তার জ্ঞান ফিরতেই তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দিয়ে বিদায় দেয়া হয়েছে।

এখন প্রশ্ন, হাইজিনিক (ঘা শুকানোর সময়) বলে যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে সে কিভাবে তা ম্যানেজ করবে? কোথায়, কিভাবে বা কার সাহায্য সে পাবে? সে তো আর দশজনের মতো সচ্ছল নয়। সে তো এখন ভিখারী হয়েছে। তার তো অর্থ বলে কিছুই নেই এ মুহূর্তে।

তাকে নানা ধরণের ওষুধ খেতে হবে। তাকে আবার ১৪ দিন পরে ফিরে আসতে হবে সেই পঙ্গু হাসপাতালে সব ঠিক আছে কিনা জানতে। জানিনে দেশের নিয়ম কী? নিয়ম যাই হোক না কেন, তার চিকিৎসার দায়ভার আমাদের সবার। তাই তার হাইজিনের বিষয় এড়িয়ে গেলে তো রোগীর পুরো দায়িত্ব নেয়া হলো না? পৃথিবীর কোথাও শুনিনি যেখানে গণতন্ত্রের সামান্যতম গন্ধ রয়েছে যে একটি হাত কেটে ফেলার পরপরই রোগীকে হাসপাতাল ছেড়ে দেয়। আমার বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছে। আমাদের কর্মে বা পরিচয়ে আমাদের যে পরিচয়ই হোক না কেনো, মন্ত্রী বা কৃষক বলে কোন পার্থক্য থাকার কথা নয় বিশেষ করে হাসপাতাল বা ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার বা হাসপাতালে আমাদের পরিচয় রোগী এবং রোগীর চিকিৎসা সমমানের হওয়া উচিত এবং তা হতে হবে।

যদি বাংলাদেশ বিশ্বে তার নিজের নাম ধরে রাখতে চায় তবে এ দায়িত্ব এড়ালে চলবে না। এতবড় অধঃপতন মেনে নেয়া যায় না, যেতে পারে না। দেশের ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে ১৫ কোনটিই তো মাছুদ বিশ্বাসের মত গরীব। তাদের দায়ভার তো তাদের প্রতিনিধিদের নেয়ার কথা! দেশটা যদি ১৫ কোটি মানুষের না হয়ে দুই কোটি মানুষের জন্য হয় তাহলে ১৫ কোটি মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা কী দরকার? দেশ যদি শুধু এলিটদের জন্যই হয়ে থাকে তবে কেন তা সরাসরি বলা হচ্ছে না? এই তো সেদিন দেখলাম একজন রাজনীতিবিদের অসুখে সারা বিশ্বের চিকিৎসক জড়িত হয়েছে। শুধু তাই নয়, দেশের চিকিৎসা পদ্ধতি, দেশের ডাক্তার বাদ দিয়ে বিদেশি ডাক্তার দিয়ে বিদেশি চিকিৎসা চলছে। অথচ সেই দেশেরই নাগরিক বহু কর্মের কর্মী (দীনমজুর) তাকে দেশের নিম্নতম চিকিৎসা দেবার ক্ষমতা, যোগ্যতা, সহানুভূতি বা দায়ভার যদি জাতি নিতে ব্যর্থ হয় তবে আবারও বলবো কেন স্বাধীন হয়েছিলাম? এর উত্তর চাই দেশের ১৭ কোটি মানুষের কাছে। আমি শুধু মাছুদ বিশ্বাস নয় তার মত ১৫ কোটি মাছুদের কথা বলছি। আমি খবরে দেখছি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নতুন প্রজন্মের কুকীর্তি।

দেশের সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত এবং খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভোটাভুটির কারণে যদি শিক্ষার্থীরা জীবনের শুরুতে কুৎসিত এবং কলুষিত হয়, কিভাবে তারা বাংলাদেশের দায়িত্ব নিবে? এরা চালাবে বাংলাদেশ? শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশিক্ষণে যদি এমনটি ঘটে কাদের উপর ভরসা করবে জাতি! কাদের উপর ভরসা করবে সেই বাকি ১৫ কোটি মেহেনতি মানুষ? যাদেরকে বলেছিলেন জাতির পিতা একদিন ‘তোদের ভাগ্যের পরিবর্তনের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। জাতির পিতা তুমি কোথায়?

দেখে যাও তোমার সেই সংগ্রামের ফল! মনে করেছিলাম নতুন জীবন এবং ভালোবাসা দিয়ে শেষ করবো মাছুদ বিশ্বাসের গল্প। উপরের ছবিতে মাছুদ বিশ্বাস তার স্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে একটু হাসিমুখে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে যারা তার বিপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে। ভেবেছিলাম মাছুদ বিশ্বাস তার এক হাত হারিয়ে পাবে ৩০-৩৪ কোটি হাত। জানিনে সে আশা পুরণ হবে কিনা! কী হতে কী হয়ে গেল! বাংলার মেহনতি মানুষের জন্য সত্যি কষ্ট হচ্ছে। তাই আজকের এ লেখায় সত্যের ঝরণা বয়ে গেল। আমি বিশ্বাস করি মানুষকে, আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশকে। আমি বিশ্বাস করি জাতির পিতার স্বপ্নকে। মহান আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন।

[প্রিয় পাঠক, যুগান্তর অনলাইনে পরবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাসে আপনার কমিউনিটির নানান খবর, ভ্রমণ, আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে।]

ঘটনাপ্রবাহ : রহমান মৃধার কলাম

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×